ঢাকা, বুধবার 12 November 2014 ২৮ কার্তিক ১৪২১, ১৮ মহররম ১৪৩৬ হিজরী
Online Edition

হায়রে মানুষ! তোমার এত অবনতি কেন?

সুহৃদ আকবর : মানুষ সৃষ্টিকর্তার সর্বোত্তম সৃষ্টি- আশরাফুল মাখলুকাত। মহান রাব্বুল আলামীন মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন কেবলমাত্র তারই ইবাদত করার জন্য। সেজন্য তিনি মানব জাতির জীবন বিধানরূপে পবিত্র আল কুরআনকে সাথে দিলেন; যাতে মানুষ সঠিক পথে থাকতে পারে। জীবনকে সাম্য আর ভ্রাতৃত্যের সৌধের ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তারা সুখে শান্তিতে পৃথিবীর বুকে বসবাস করতে পারে।
পৃথিবীর শুরু থেকে মানুষ প্রকৃতির সাথে লড়াই করে এই পর্যন্ত এসেছে। প্রকৃতির বৈরী পরিবেশের সাথে লড়াই করে নিজেদের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার নিমিত্তে নির্মাণ করেছে বিভিন্ন সভ্যতার। সেই সুমেরীয় সভ্যতা, সিন্ধু সভ্যতা, ইরানীয় সভ্যতা থেকে-মেসোপটেমিয়া সভ্যতা, ব্যাবিলনীয় সভ্যতা থেকে আজকের আধুনিক সভ্যতা পর্যন্ত। বর্তমান মানুষদের দিকে তাকালে আমার বড় দুঃখবোধ হয়। চোখ ফেটে অশ্রু নির্গত হয়। এই বুঝি সৃষ্টিকর্তার সেরা সৃষ্টির নমুনা। আধুনিক সভ্যতার নামে মেয়েদের শরীর থেকে বস্ত্র খুলে উলঙ্গ করে নাচানো হচ্ছে। হায়রে আধুনিক সভ্যতা!
বর্তমানে মানুষদের এই দশা হয়েছে, সে যেদিকে সুযোগ পাচ্ছে সেদিকেই ঠু মারছে। চুরি-চামারি, চাঁদাবাজি-ফটকাবাজি, চাপাবাজি-জোচ্চুরি, খন-গুম এমন কোনো কাজ নেই যা সে আজ করছে না। অমার ভাবতে অবাক লাগে, যে দেশে মাত্র ৩০ হাজার টাকায় মানুষ খুন হয় আমি সেই দেশের নাগরিক। গত ১৩ অক্টোবর বাসায় বসে অলস সময় কাটছিল আমার। দুপুরে ঝকঝকে রোধ আমার ব্লিডিংয়ের ছাদে এসে পড়ছিল। টবে লাগানো পেপে গাছের কচি পাতার ওপর রোদ এসে খেলা করছিল। হঠাৎ রোদ কেটে গিয়ে বৃষ্টি নেমে এলো। আজকে দুপুরে আমার গোসল করা হয়নি।
বাথরুমে যাওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় মনে হলো বৃষ্টিতে এক ঝলক ভিজলে বোধহয় মন্দ হয় না। হঠাৎ আমার সরল মনটা খুশিতে নেচে উঠল বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দে। আমি লুঙ্গি পরে শুধু পাতলা একটা গেঞ্জি গায়ে দিয়ে ছাদে গেলাম ভিজতে। অনেকক্ষণ বৃষ্টির জলে ভিজলাম। নিজের দেহ মনকে চাঙ্গা করে এরপর বাথরুমে গেলাম গোসল করতে। প্রায় আধাঘণ্টা আমি গোসল করলাম।
কিছুক্ষণ পর আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। আমি রুমমেট নাবিলকে নিয়ে চিড়িয়াখানার দিকে রওনা দিলাম। নাবিল আমার নতুন রুমমেট, সে রুমে এসেছে বেশিদিন হয়নি; ইতোমধ্যে তার সাথে আমার ভালো একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। চিড়িয়াখানায় গিয়ে আমাদের অনেক নতুন নতুন প্রাণী দেখা হলো। আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে সিংহ। তার হাটাচলা, গর্জন-তর্জন, উঠাবসা সবকিছুর ভেতর আমি একটা আর্ট লক্ষ্য করেছি। টিপু সুলতাল এই জন্যই বোধহয় বলেছেন- ‘শিয়ালের মতো একশ দিন বাঁচার চাইতে সিংহের মতো একদিন বাঁচা শ্রেয়।’ বলছিলাম মানুষের অবনতির কথা। চিড়িয়াখানা ঘুরতে ঘুরতে আমরা প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। ইতোমধ্যে গোধূলির রক্তিম আভা লুকায়িত হয়ে ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে প্রকৃতির চারদিকে। চারদিকে শুরু হয়েছে পাখির কিচির মিচির ডাক। আমার ভালোই লাগছিল। মনে হয় পাহাড়ি কোনো বনপথে আমি হাঁটছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে আমরা একটা দোকানের সামনে গিয়ে পৌঁছলাম। নাবিলকে বললাম, কিছু খাবা? সে সম্মতি জানাল। আমি দোকালের সামনে এগিয়ে গিয়ে দু’টো মজোর অর্ডার দিলাম। দোকানদার যথারীতি দু’টো মজো আমাদের হাতে ধরিয়ে দিলো। আমরা হাতে নিয়ে দেখলাম, একটি মজো বেশি বরফ হয়ে গেছে তাই আমরা সেটি ফেরত দিলাম পরিবর্তন করে দেয়ার জন্য। দোকানি বলল, তার কাছে ভালো মজো নাই। ঠিক তখনি ঘটলো ঘটনাটি- পাশের দোকান থেকে এক লোক বলল, নেন এটা নেন। নাবিল সাথে সাথে ওটা নিয়ে নিল। দোকানি দেয়ার সময় খুলে দিল। সেটা ছিল ইউরো, মজো নয়। এরপর বলল দেন আরো ৪০ টাকা দেন। আমরা দু’জন থ হয়ে রইলাম। বললাম এই দুই নম্বরি কাজ কেন করলে তোমরা? তারা সবাই একজোট হয়ে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করল। আমরা স্টুডেন্টস পরিচয় দেয়ায় তারা আর বেশি কিছু বলল না। এভাবে চললে বর্তমানের মানুষদের আচার-আচরণ। কতটুকু নিচে নামলে পরে একজন মানুষ এ রকম কাজ করতে পারে। এই রকম কাজ আমাদের সমাজে হরহামেশাই ঘটে চলছে। আরেক দিনের ঘটনা সেদিন শাহবাগ থেকে ফার্মগেট যাচ্ছিলাম। আমার সামনের সিটে বেসলেট হাতে দেয়া একজন ছেলে বসল, কন্ডাক্টর যখন ভাড়া চাইল সে ছেলেটি বলল, আমি সুমন ভাই আর শহীদ ভাইয়ের লোক। মানে সে ভাড়া দেবে না। আমরা সবাই ছেলেটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। এবং মনে মনে বললাম, ‘দুই টাকা দেয়ার মুরদ নাই, আবার শহীদ ভাই আর সুমন ভাইয়ের নাম বেচতে আইছস বেটা চোর কোথাকার।’
সুপ্রিয় পাঠক, মাত্র দুটো ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করলাম। এভাবে আরো কত রকম ঘটনা যে আমাদের দেশে ঘটে চলছে তার হিসাব আমাদের সামনে নেই। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, বর্তমান মানুষের নৈতিক মান কতটুকু নিচে নেমে গেছে। কিছু কিছু মানুষের আচরণ আর কার্যকলাপ দেখলে চোখ ফেটে রক্ত বের হতে চায়। মনে মনে ভাবি, হায়রে মানুষ! তুমি কি মহান আল্লাহ তায়ালার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি আশরাফুল মাখলুকাত।
তোমার তো এরকম হওয়ার কথা ছিল না। মানুষ কতটুকু অকৃতজ্ঞ হলে পরে, সে বড় হতে হতে যখন অনেক বড় হয়ে যায় তার সৌর্য-বীর্য, খ্যাতি-সুনাম যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তখন সে নিজেকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে দাবি করে বসে। মানুষ কতটুকু নির্বোধ হলে পরে সে চাটুকারিতা করতে করতে এক সময় এত নিচে নেমে যায় যে, সে কুকুরের চেয়েও অধম হয়ে যায়। আর মানুষের ভেতর এমনও কিছু মানুষ আছে যে, সে মহত্তের এত উপরে উঠে যায় যে, সে মর্যাদার দিক দিয়ে ফেরেশতাদেরও ছাড়িয়ে যায়। এই হলো মানুষের পরিচয়। আসুন আমরা সত্যিকারের মানুষ হওয়ার জন্য চেষ্টা করি। মানুষ হয়ে সৃষ্টির এই ধরণীতে পদচারণা করি।
লেখক : সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক
suredakbar@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ