ঢাকা, বুধবার 12 November 2014 ২৮ কার্তিক ১৪২১, ১৮ মহররম ১৪৩৬ হিজরী
Online Edition

ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে

ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ঘাটতি শুধু বাড়ছেই না, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের ঘাটতি সর্বোচ্চ পর্যায়েও পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-র পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে গতকাল দৈনিক সংগ্রামের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, মাত্র এক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের ঘাটতি বেড়েছে ৩৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ- প্রায় পাঁচ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। রিপোর্টে কয়েকটি পণ্য সম্পর্কিত পরিসংখ্যানেরও উল্লেখ রয়েছে। যেমন পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি ১৩৩ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে হয়েছে ৮০ দশমিক সাত মিলিয়ন ডলার। এ ব্যাপারে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ অন্য একটি তথ্য হলো, সরকারের পক্ষ থেকে চালসহ খাদ্যশস্য রফতানি করার গালগল্প শোনানো হলেও বাস্তবে আলোচ্য এক বছরেই ভারত থেকে এক হাজার ৮৫ দশমিক নয় মিলিয়ন ডলারের খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়েছে। পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় খাতটিতে বাংলাদেশের ব্যয় বেড়েছে ৫৯৮ দশমিক নয় মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দ্বিগুণেরও বেশি। অন্য সব পণ্যের বেলাতেও বাংলাদেশ কেবল পিছিয়েই পড়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি সংক্রান্ত তথ্য-পরিসংখ্যানগুলো নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীসহ তথ্যাভিজ্ঞদের স্পষ্ট অভিমত হলো, ঘাটতির পেছনে প্রধান ভূমিকা রয়েছে ভারতের। দেশটির দিক থেকে নানা ধরনের শুল্কগত বাধার কারণেই বাংলাদেশের রফতানি বাড়তে পারছে না। এ ব্যাপারে ভারতীয়দের নীতি ও কার্যক্রমকে রফতানিকারকসহ সংশ্লিষ্টজনেরা প্রতারণাপূর্ণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কারণ, প্রকাশ্যে আমদানি বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও তারা সুকৌশলে এমন কিছু শুল্ক-অশুল্ক ও আধাশুল্কগত বাধার সৃষ্টি করে চলেছে যার ফলে রফতানির সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নেয়ার পরও বাংলাদেশ থেকে বহু পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ভারত থেকে যেখানে ২০৮৬ ধরনের পণ্য আসছে সেখানে বাংলাদেশ মাত্র ১৬৮ ধরনের পণ্য রফতানি করতে পারছে। নিজেদের শিল্প সংরক্ষণের অজুহাত দেখিয়ে ভারত বাংলাদেশের ৭৫০ ধরনের পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। ভারত সেই সাথে এমন ৪৫০টি পণ্যের জন্য ছাড় দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে যেগুলোর ৯৮ শতাংশই বাংলাদেশ উৎপাদন করে না। এজন্যই বাড়তে বাড়তে মাত্র এক বছরের ব্যবধানেই বাংলাদেশের ঘাটতি পাঁচ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছে গেছে। প্রসঙ্গক্রমে দু-একটি তথ্য স্মরণ করা যেতে পারে। যেমন ১৯৯৯ সালে ঢাকা-কোলকাতা সরাসরি বাস সার্ভিস উদ্বোধন উপলক্ষে ঢাকা সফরকালে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী ২৫ ক্যাটাগরির বাংলাদেশী পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা এখনো ঘোষণাই রয়ে গেছে। ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর সফরকালেও ৪৬টি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাওয়ার কথা শোনানো হয়েছিল। কিন্তু তারও বাস্তবায়ন আজও হয়নি। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার বিষয়ে দরকষাকষির যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সরকার কখনো উল্লেখযোগ্য কোনো চেষ্টাই করেনি, এখনো করছে না। এভাবেই ‘বন্ধুত্বের হাত’ বাড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে দেশকে অর্থনৈতিক দিক থেকে ভারতের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে সরকার। সরকার ব্যস্ত রয়েছে একটি মাত্র কাজেÑ সেটা ভারতের ইচ্ছা পূরণ। এটাও আবার এমনভাবেই করা হচ্ছে যেন সবই আগে থেকে সরকারের এজেন্ডায় ছিল!
আমরা মনে করি, দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে এত বিপুল ঘাটতি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অর্থনীতিসহ বাংলাদেশের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থেই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন ঘটানোর লক্ষ্যে চেষ্টা শুরু করা দরকার। ঘাটতি কমিয়ে আনতে হলে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে ভারতে রফতানি বাড়ানোর ব্যাপারে। এ উদ্দেশ্যে ক’টনৈতিক পর্যায়ে চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি সরকারের উচিত চোরাচালান প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া। কারণ বৈধ বাণিজ্যের চাইতে কয়েকশ’ গুণ বেশি বাণিজ্য ভারত চোরাচালানের পথে করে থাকে। সুতরাং সীমান্তে কঠোর অভিযানের মাধ্যমে চোরাচালান প্রতিরোধ করা গেলে ভারতের অর্থনীতি চাপের মুখে পড়বে। দেশটি তখন বাংলাদেশের প্রতি নীতি-মনোভাব পরিবর্তন না করে পারবে না। এর ফলে দেশের রফতানি বাড়বে বহুগুণ। আমদানির ক্ষেত্রেও জাতীয় শিল্পের স্বার্থে কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। ভারত থেকে এমন সব পণ্য আমদানি করতে দেয়া চলবে না যেগুলো বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। উল্লেখ্য, ভারতসহ বিশ্বের সব দেশই এভাবে নিজেদের শিল্প ও পণ্যকে নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। এর ফলে একদিকে জাতীয় শিল্পের বিকাশ ঘটবে অন্যদিকে দেশের আমদানি ব্যয়ও অনেক কমে আসবে। চাপ কমবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও। আমরা আশা করতে চাই, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর এবং আমদানি ও রফতানির মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখবে না। এ ব্যাপারে ব্যবসায়ী এবং অর্থনীতিবিদসহ দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও নিতে হবে। না হলে কিন্তু এমন একটি প্রচারণাই জনমনে বদ্ধমূল হবে- যার সারকথা হলো, ভারতের ইচ্ছাপূরণের শর্তেই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আসতে দেয়া হয়েছিল। সে কারণেই জাতীয় স্বার্থের সর্বনাশ ঘটলেও সরকার এখনো ওই এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যই উঠেপড়ে লেগে আছে!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ