ঢাকা, বুধবার 12 November 2014 ২৮ কার্তিক ১৪২১, ১৮ মহররম ১৪৩৬ হিজরী
Online Edition

কেবল কথার তুবড়ি ছুটছে

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : সরকারের মন্ত্রীরা কেবলই কথার তুবড়ি ছুটিয়ে চলেছেন। একজনের কথার সঙ্গে অপরজনের কথার কোনো মিল নেই। একই বিষয়ে যার যা খুশি বলে যাচ্ছেন। এক মন্ত্রী যা বলছেন, অপরজন বলছেন তার একেবারে বিপরীত কথা। আইন-কানুন বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলছেন এক কথা, এটর্নি জেনারেল বলছেন আরেক কথা। কেউ সকালে যে কথা বলছেন, বিকালে বলছেন তার সম্পূর্ণ উল্টো কথা। সরকারের কোনো সমালোচনামূলক কথা কেউ বললে আওয়ামী মন্ত্রীরা হা-হা-রা-রা করে উঠছেন। সমালোচককে একেবারে তুলোধুনো করে ছাড়ছেন।
তার মধ্যে নতুন আপদ যুক্ত হয়েছে সাইবার অপরাধ দমন আইন। এ আইনের কোনো দরকারই ছিল না। কারণ সাইবার আইন দিয়ে সরকার যার বিচার করতে চাইছে, প্রচলিত আইনেই তার বিচারের ব্যবস্থা আছে। প্রচলিত আইনে যে অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা দুই বছর জেল, একই অপরাধের জন্য সাইবার আইনে সাজা ১৪ বছর জেল। এ আইনে ইতিমধ্যে কয়েকজনকে কারাদন্ড দেয়াও হয়েছে। এখন বিচারের অপেক্ষায় আছেন এক নিরক্ষর বাদাম বিক্রেতা। তিনি আর তার এইটেপড়ুয়া ছেলে নাকি মোবাইল ফোনে কি একটা জোক শুনছিলেন। তাতে শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কি নাকি কথোপথন ছিলো। কিন্তু কথাগুলো কোনো মানুষের মুখে ছিলো না। ছিলো বিড়ালের মুখে। মেটালিক সাউন্ড।
এ খবর পেয়ে পুলিশের ওসি সমিত কুমার কুন্ডু স্বয়ং ফোর্স নিয়ে ছুটে গিয়ে বাপ-বেটাকে বেঁধে নিয়ে এসে জেলে পুরে দিয়েছেন। এই পরিবারটি থাকে খাস জমির ওপর গড়ে তোলা ঝুপড়ি ঘরে। তাদের কোনো জায়গা-জমি নেই। বাদাম বিক্রির টাকায়ই চলে চার সদস্যের সংসার। বাপ-বেটা দুজনেই জেলে যাওয়ায় অন্য চার সদস্য অনাহারে পড়েছে। গত ১৯ অক্টোবর ‘প্রথম আলো’য় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যার শিরোনাম ছিল, ‘প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে মুঠোফোনে কটূক্তি, বাবা-ছেলে গ্রেফতার’। তারপর গোটা বাংলাদেশে এক তোলপাড় পরিস্থিতি। বাবার নাম শুকুর আলী। ছেলের নাম সিজান। এখানে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ছিল না কিংবা সুনির্দিষ্টভাবে বোঝা যায় না যে, এর সঙ্গে শেখ প্রধানমন্ত্রী নাম জড়িত আছেন, তারপরেও পুলিশের ওসি কুন্ডু খবর পেয়ে একেবারে নিজে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। এটা একটি প্রাইভেট ব্যাপার। তারা এই কথপোকথন মাইকে প্রচার করেননি, অন্য কাউকে জানাননি। শুধু নিজেরা উপভোগ করছিলেন। তাতে কুন্ডু বাবুর এত আগ্রহ সৃষ্টি হলো কেন? যেন তারা ভাববেন তাই সত্য ও বাস্তব। কুন্ডু বাবু অতিমাত্রায় সরকারের দাস হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য অকুস্থলে গিয়ে হাজির হলেন। সাব্বাস। কুন্ডু বাবুকে কি এই বলে প্রশ্ন করা যায় যে, একটি টেলিফোনে কে কি বলছে সেটি মনিটর করে আপনি মুহূর্তেই ঐ বাদাম বিক্রেতা ও তার ছেলেকে গ্রেফতার করতে ছুটে গেলেন এবং গ্রেফতার করে ফেললেন।
ঐ সময়ে কি কুন্ডু বাবুর এলাকায় একটিও অপরাধের ঘটনা ঘটেনি? তিনি কি হত্যা, গুম, মাদক পাচার, যৌন হয়রানি-এসব বিষয়ে একটি অভিযোগও পাননি? তিনি কি একইভাবে মুহূর্তেই ফোর্স নিয়ে ওসব অপরাধের একটা সুরাহা করতে গিয়েছেন? কুন্ডু বাবু অস্পষ্ট আইনে একটি পরিবারের ভাত মেরেছেন, অপর জায়গায় ভয়াবহ অপরাধের ক্ষেত্রে চোখ বন্ধ করে আছেন। একদিন এর জন্যও এদের জবাবদিহি করতে হবে। সরকার বদলাবেই। দশকের পর দশক ধরে পৃথিবীর কোথায়ও কোনো সরকার ক্ষমতায় থাকে নাই। তখন এসব ওসি কোথায় যাবেন? পুলিশের কাছ থেকে জনগণের প্রত্যাশা সহযোগিতা। কিন্তু জনগণকে হয়রানির করার কাজে তারা নিয়োজিত হয়ে পড়েছেন। জনতার উত্থানে আমরা ইতিহাসে দেখেছি, তখন কুন্ডুদের কপালে বড় দুর্ভোগ হয়। সে দুর্ভোগ ঠেকানো যায় না।
বিষয়টি নিয়ে দৈনিক মানবজমিন পত্রিকায় কয়েক দিন আগে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। তার শিরোনাম ছিলো, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। মানবজমিনে এই রিপোর্টটি প্রকাশের পর সত্যি সত্যি তা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হয়েছে বলেই মনে হলো। বাদাম বিক্রেতা শুকুর আলী ছাড়া না পেলেও তার ১৩ বছরের ছেলে সিজান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে এবং পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। উল্লেখ্য এ পর্যন্ত সাইবার আইনে যাদের আটক বা বিচারের আওতায় আনা হয়েছে, তার প্রায় সবই হয়েছে প্রধানমন্ত্রী বা তার পরিবারের বিরুদ্ধে অবমাননার অভিযোগে।
এ নিয়ে সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান গত ২৭ অক্টোবর ‘প্রথম আলো’তে লিখেছেন যে, ‘আপাতত অধিকতর উদ্বেগজনক হলো, এটা প্রধানমন্ত্রীর অবমাননা আইনে পরিণত হচ্ছে। সাইবার ট্রাইব্যুনালের প্রথম সাজাও ঘটেছে প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে। খুলনার এক সংখ্যালঘু তরুণের প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুর জন্য অবমাননাকর গান তৈরি ও প্রচারে জন্য সাত বছর জেল হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনে এ পর্যন্ত যত মামলা হয়েছে, তা প্রধানত প্রধানমন্ত্রীকে অবমাননাকেন্দ্রিক। কিন্তু এই সীমার মধ্যে বেশিদিন এটা থাকবে না। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ঘায়েলে আইনটির ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পেতে পারে। সব খবর গণমাধ্যমে দ্রুত আসবে বলেও মনে হয় না। প্রচলিত অন্য আইনে একই অপরাধের বিচার করা গেলেও পুলিশ প্রশাসন এখন সুযোগ পেলেই তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা ঠোকার প্রবণতা দেখাবে। এর অজামিনযোগ্যতা, অন্তত সাত বছর জেল খাটা, এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান-ভয় দেখানোর জন্য সবই উপাদেয়।’ মিজানুর রহমান খানের এই আশঙ্কা ইতিমধ্যেই সত্যে পণিত হতে শুরু করেছে।
আইনটিকে কার্যত এমনভাবে বিন্যাস করা হয়েছে, যাতে প্রধানমন্ত্রী বা তার সরকারের কোনোরকম সমালোচনাই করা যাবে না। সরকার যা কিছুই করুক না কেন, গোটা দেশবাসীকে হীরক রাজার পারিষদদের মতো কেবল বলে যেতে হবে, তা ঠিক, তা ঠিক। এর নাম যেমন গণতন্ত্র নয়, তেমনি জনগণও অনন্তকাল যে মুখে কুলুপ এঁটে থাকবে, তারও কোনো গ্যারান্টি নেই। এই আইন দিয়ে ফেসবুক ব্যবহারকারীদেরও সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে যে চাইছে, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। ইতিমধ্যে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, সরকার ফেসবুক ব্যবহারকারী অনেককে খুঁজতে শুরু করেছে। যদিও তাতে কোনো অশালীন বা অবমামনাকর উক্তি নেই। সরকারের সমালোচনা আছে মাত্র। এর উল্টো ফল হওয়াই স্বাভাবিক।
এসব অপআইনের ফলে জনপ্রতিনিধিত্বহীন এমপিরা যে কতোটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন, তার সাম্প্রতিক দু-একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। খারাপ রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে নাটোরের এক এমপি নাস্তানাবুদ হয়ে তার বিরক্তি প্রকাশ করছিলেন। তখন পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোর তাকে বলেছিল, রাস্তা ঠিক করে নিলেই তো পারেন। এতে এমপি সাহেবের দারুণ গোস্বা হয়। তিনি পুলিশ ডেকে ঐ ছেলেসহ বেশ কিছু গ্রামবাসী আটক করিয়ে নিয়ে যান। তাদের বিরুদ্ধে কোন আইনে মামলা দেয়া হয়েছে বলতে পারি না।
প্রায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে আর এক এমপির ক্ষেত্রে। এক গ্রামবাসীর কয়েকটা ছাগল এমপি সাহেবের গাছের পাতা খেয়ে ফেলায় তিনি যারপর নাই রাগান্বিত হয়েছেন। তিনিও পুলিশ ডেকে ঐ পাঁচটি ছাগল ও ছাগলের মালিককে থনা হাজকে আটক করিয়ে রেখেছেন। এসব ঘটনায় পেছনের কারণগুলো সরকারের অনুধাবন করা দরকার। এমপি হতে ঐ লোকের জনগণের ভোটের দরকার হয়নি। তিনি বোধ করি নিশ্চিত জানেন যে, ভবিষ্যতে ভোটের নির্বাচন হলেও জনগণ তাকে ভোট দেবে না। যদি জনগণের ভোটের আশা তাদের থাকতো, তা হলে সামান্য কারণে নিজ এলাকার জনগণকে তিনি এমন নাকানি-চুবানি দেয়ার কাজ করতে পারতেন না।
আমরা সরকারের হর্তাকর্তা ব্যক্তিদের কাছ থেকে নানা বিষয়ে অবিরাম সাফল্যের ফিরিস্তি শুনছি। তার একটি প্রধান খাত বিদ্যুৎ। সরকার নাকি ইতিমধ্যে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উপাদন করেছে। সরকারের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা সুয়োগ পেলেই কত হাজার কত শ’ কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছেন, তার ফিরিস্তি আমাদের শোনান। সেক্ষেত্রে বিএনপি আমলের উৎপাদনের কথাও বলেন। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে সে ফিরিস্তি বা পরিসংখ্যানের কোনো মূল্য নেই। আমরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চাই। কিন্তু তা কিছুতেই পাচ্ছি না। এই লেখাটি লিখতে বসেছি আড়াই ঘণ্টা আগে। এর মধ্যে তিনবার বিদ্যুৎ গেলো। দুইবার কম সময়ের জন্য, একবার পুরো এক ঘণ্টা। আমার কাছে সরকারের পরিসংখ্যানের মূল্য কী!
সরকার আবার কখনও কখনও যুক্তি দেখায় যে, বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু আমরা নিত্যই খবর দেখি যে বিদ্যুতের অভাবে বহু কলকারখানা বন্ধ। কোনো কারখানা উৎপাদন ক্ষমতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পারছে না। গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং আরও ভয়াবহ। পহেলা নবেম্বর তো সারা দেশই বিদ্যুৎবিহীন ছিল ১০ ঘণ্টা। এখনও তার কারণ জানা গেল না। এদিকে যেটুকু বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, তা হচ্ছে সর্বনাশা রেন্টাল বা কুইক রেন্টালের মাধ্যমে। বিদ্যুতের জন্য রেন্টাল বা কুইক রেন্টালের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা একটি দেশকে অর্থনৈতিকভাবে একেবারে দেউলিয়া করে দেয়। এক্ষেত্রে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়ে যাচ্ছে। সে লুটের বিরুদ্ধে কেউ যাতে কোনোদিন কোনো প্রশ্ন করতে না পারে, কোনো আদালতে যেতে না পারে তার জন্য আইন করেছে সরকার। তা থেকেও স্পষ্ট হয় যে এ খাতে দুর্নীতি আড়াল করতে সরকার কতটা মরিয়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর কোনো কিছুই আড়াল করে রাখা যায় না। এ সরকারও আড়াল করতে পারবে বলে মনে হয় না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ