ঢাকা, বুধবার 12 November 2014 ২৮ কার্তিক ১৪২১, ১৮ মহররম ১৪৩৬ হিজরী
Online Edition

স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি

বাঙ্গাল আবদুল কুদ্দুস : গাজা যুদ্ধে ইহুদী সন্ত্রাসবাদী ইসরাইল বিশ্ববাসীর চোখের সামনে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, বর্বরতা, গণহত্যা, মানবাধিকার লংঘন ও যুদ্ধাপরাধের পর বিশ্বব্যাপী স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনীদের প্রতি সমর্থন ও সহানুভূতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরদিকে যুদ্ধাপরাধী ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রচ- ঘৃণা ও ধিক্কার বেড়ে চলেছে সর্বোপরি তাদের সমর্থন কমতে শুরু করেছে। সন্ত্রাসবাদী ইসরাইলের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন যে দিন দিন কমে আসছে তার প্রমাণ হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য রাষ্ট্রগুলো একটার পর একটা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়ে যাচ্ছে। গত মাসে পশ্চিমা রাষ্ট্র সুইডেন ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখানে উল্লেখ করা যাচ্ছে যে, সুইডেনের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্র বুলগেরিয়া, সাইপ্রাস, হাঙ্গেরী, পোল্যান্ড, চেক-রিপাবলিক, মাল্টা ও রুমানিয়াসহ আরো রাষ্ট্র ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ পর্যন্ত ১৩৩টিরও বেশি রাষ্ট্র ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে সুইডেনই হচ্ছে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দানকারী প্রথম পশ্চিম ইউরোপীয় সদস্য রাষ্ট্র। ফিলিস্তিন ও ইসরাইল উভয়ের প্রতি সহানুভূতিশীল ও বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্র হচ্ছে সুইডেন। স্বাভাবিকভাবে, ইসরাইলী কর্মকর্তারা ফিলিস্তিনকে সুইডেন কর্তৃক স্বীকৃতি দেয়াকে মেনে নিতে পারেনি। তারা এই স্বীকৃতির বিরোধিতা করেছেন। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এভিমডোর লিবারম্যান সুইডেন কর্তৃক ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, সুইডেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী তাড়াহুড়ো করে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। সুইডেন স্বীকৃতি দেয়ার ব্যাপারে কোনো তাড়াহুড়া করেনি।
উল্লেখ্য যে, ১৯৬০-এর দশকেই সুইডেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উলুফ পালমি তার পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে উপনিবেশবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে তারা জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে সমর্থনদানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন। ফিলিস্তিনীদের ভাগ্য নিছক আরব-ইসরাইল সংঘাতের কারণে কেবল প্রস্তাব গ্রহণের উপরই নির্ভরশীল থাকা উচিত নয়। এই অভিমত সুইডেনের। তাই, সুইডেনই ফিলিস্তিনীদের স্বীকৃতি দানকারী প্রথম পশ্চিমা দেশগুলোর অন্যতম দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং অধিকৃত অঞ্চল থেকে ইসরাইলী দখলদারীত্ব প্রত্যাহারের ব্যাপারে সুইডেনই জোরালো আহ্বান জানিয়েছিল। সুইডেনের জাতিসংঘ প্রতিনিধি এন্ডারস ফার্ম ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘে তার উচ্চকণ্ঠ বক্তৃতায় পিএলওর ফিলিস্তিন রাষ্ট্রসংক্রান্ত ঘোষণার প্রতি জোরালো সমর্থন জানান। সোস্যাল ডেমোক্র্যাট নেতা স্টেন এন্ডারসন ফিলিস্তিনী মুক্তি সংস্থা (পিএলও) চেয়ারম্যান ইয়াসির আরাফাতকে ১৯৮৮ সালের শেষের দিকে সুইডেনে নিয়ে আসেন এবং তাঁকে ফিলিস্তিনের ‘রাষ্ট্রপ্রধান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
সুইডেনের নতুন প্রধানমন্ত্রীর মতো সোস্যাল ডেমোক্র্যাটরা ফিলিস্তিনীদের ব্যাপারে বেশি সহানুভূতিশীল। মানবতার শত্রু ইসরাইল তথাকথিত ‘অপারেশন প্রোটেকটিভ এডোর’ নামে নাজাফ গণহত্যা চালিয়ে  ২১০০ ফিলিস্তিনীকে হত্যা ও হাজার হাজার ফিলিস্তিনী নাগরিককে মারাত্মকভাবে আহত ও চির পঙ্গু করে। গোটা গাজা উপত্যকাকে একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। গাজাকে ধ্বংসাস্তূপে পরিণত করে ইতিহাসে নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করার পর ইহুদী সন্ত্রাসবাদী ইসরাইলীদের যুদ্ধাপরাধ ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও যুক্তরাজ্যসহ অনেক পশ্চিমা দেশেও বিক্ষোভ হয়েছে। গাজা যুদ্ধ রাজনৈতিক দৃশ্যপটেও অনেক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। হামাস শুধু যে একটি সামরিক শক্তি তা নয়, হামাস রাজনৈতিক দিক দিয়েও যে অনেক দূরদর্শী সংগঠন সে ব্যাপারে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে উপলব্ধি সৃষ্টি হয়েছে। ফিলিস্তিনী রাষ্ট্র এখন সবার কাছে যে একটি বাস্তবতা তার প্রমাণ শুধু বিশ্বের বিভিন্ন ছোট-বড় দেশ কর্তৃক ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এখন রাষ্ট্রের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা থেকেও এই স্বীকৃতি আসতে শুরু করেছে। তিনটি খৃস্টান চার্চের শীর্ষ কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফিলিস্তিনের অন্তর্গত ক্যাথলিক, গ্রিক অর্থডক্স ও লুথেরিয়ান চার্চ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নৈতিক দিক দিয়ে ইসরাইলকে এক বড় আঘাত করেছে।
“পশ্চিমা রাষ্ট্র সুইডেনসহ জাতিসংঘের বেশির ভাগ সদস্য রাষ্ট্র যে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, এর অর্থ হলো সন্ত্রাসবাদী ও যুদ্ধাপরাধী ইসরাইলকে ফিলিস্তিনের অধিকৃত ভূমি নিঃশর্তে ছেড়ে দিয়ে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পূর্ববর্তী সীমান্ত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার অর্থই হলো ইসরাইল কর্তৃৃক ১৯৬৭ সালের সীমান্তের স্বীকৃতি, কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, এখনো পর্যন্ত ইসরাইল অধিকৃত এলাকায় ইহুদী বসতি স্থাপন অব্যাহত রেখেছে।’
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফিলিস্তিন জাতীয় কর্তৃপক্ষ (পিএলএ) এই স্বীকৃতিকে ফিলিস্তিনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির পথে অপর একটি বিজয় হিসেবে গণ্য করতে পারে। দু’বছর আগে জাতিসংঘে ফিলিস্তিন পর্যবেক্ষকের মর্যাদা পায়। এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের মাধ্যমে ফিলিস্তিন আরো অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সদস্য পদ লাভ করতে পারে। এভাবে বিশ্বের ছোট-বড় সব দেশ কর্তৃক স্বীকৃতি অর্জনের মাধ্যমে ফিলিস্তিন অচিরেই একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে জাতিসংঘের অনুমোদন পেতে পারে। সুইডেনের মতো পশ্চিমা দেশের স্বীকৃতি অর্জনের মাধ্যমে ফিলিস্তিন স্বাধীনতা অর্জনের পথে আরো অনেক এগিয়ে গেল। এদিকে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রশ্নে ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও ভোটাভুটি হয়েছে।
গাজা যুদ্ধের পর ফিলিস্তিনের সর্বশেষ পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে? যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজাকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং ফিলিস্তিনে ফাতাহ-হামাস ঐক্য সরকার তাদের সরকারি কার্যক্রম পুরোদমে শুরু করেছে। সম্প্রতি যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা পুনর্গঠনের আর্থিক তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যে মিসরের রাজধানী কায়রোয় একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। ঐ সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিসহ ৩০টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা অংশ নিয়েছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন গাজা পুনর্গঠনে ১৬০ কোটি ডলারের রেকর্ড পরিমাণ সহায়তা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ফিলিস্তিন সরকার গাজা পুনর্গঠনে তাদের তৈরি ৭৬ পাতার একটি রিপোর্ট পেশ করেছে। তারা ৪০০ কোটি ডলার সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। এই আর্থিক সহায়তার বেশির ভাগ অর্থই ব্যয় করার পরিকল্পনা করা হয়েছে নির্মাণ পরিকল্পনায়।
উল্লেখ করা যায় যে, গাজা যুদ্ধে ইসরাইলী আগ্রাসনে ঘর-বাড়ি, সহায় সম্পদ হারিয়েছেন এক লাখেরও বেশি গাজার মানুষ। যুদ্ধে কেবল ঘর-বাড়ি নয়, অফিস-আদালত, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, বাজার, মসজিদ এমনকি জাতিসংঘ শিবিরও বোমা মেরে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। গাজা পুনর্গঠনের এই সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিকরা অংশগ্রহণ করেন। গাজা পুনর্গঠনের জন্য কুয়েত এক বিলিয়ন ডলার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২১ কোটি ২০ লাখ ডলার সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
গাজা পুনর্গঠনের উদ্যোগের সাথে সাথে হামাস-ফাতাহ ঐক্য সরকার তাদের কাজ শুরু করেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় প্রথমবারের মতো ঐক্য সরকারের মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠকের ব্যাপারে ইসরাইল কোনো বাধা দেয়নি। পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যরা গাজায় উপস্থিত হন। এটাও একটি অগ্রগতি। হামাস ও ফাতাহর মধ্যে এক সময় ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষ হলেও গাজা যুদ্ধের পর এখন তারা ঐক্যবদ্ধ। এখন ফিলিস্তিনীদের ঐক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হামাস-ফাতাহ ঐক্য অটুট রেখে বিশ্ববাসীর সমর্থন নিয়ে এগিয়ে গেলে তাদের চূড়ান্ত বিজয় তথা স্বাধীন সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় সময়ের ব্যাপার মাত্র।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ