ঢাকা, বুধবার 12 November 2014 ২৮ কার্তিক ১৪২১, ১৮ মহররম ১৪৩৬ হিজরী
Online Edition

রংপুরে যুবলীগ নেতা খুনের অভিযোগে ব্যাপক হাঙ্গামা

রংপুর অফিস : সোমবার গভীর রাতে নগরীর সাতমাথা এলাকায় দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করেছে মহানগরীর ৩০নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশনের টোল আদায়কারী ইমরান আহমেদকে (৩৫)। এ ঘটনায় শ্রমিক ইউনিয়নকে দায়ী করে ইমরান ও মালিক সমিতির সমর্থকরা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও মহানগর আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক এম এ মজিদ, প্যানেল মেয়র ফরিদা কালামের বাড়িঘর, পিকআপ মালিক সমিতি, ইউনিয়নের শাখা অফিস এবং ৪টি বাস, ১টি অটো, ২টি মোটরসাইকেল ভাংচুর করে আগুন লাগিয়ে দেয়। এ ঘটনার দৃশ্য ধারণ করতে গেলে নিহত ইমরান সমর্থিতরা চ্যানেল আইয়ের ক্যামেরা ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। লাঞ্ছিত করা হয় ৩ সাংবাদিককে। এদিকে এ ঘটনায় মালিক সমিতির সন্ত্রাসীদের দায়ী করে মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে রংপুর বিভাগের ৫৬টি রুটে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট শুরু করেছে শ্রমিক ইউনিয়ন। বিকেল সাড়ে ৪টায় এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত সাতমাথা এলাকায় ইমরান সমর্থিতরা সশস্ত্র অবস্থায় অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। এ ঘটনার জের ধরে পুরো নগরীতে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
কোতোয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ আবদুল কাদের জিলানী জানান, সোমবার দিবাগত রাত ২টার দিকে শহর থেকে বাড়ি যাওয়ার পথে সাতমাথায় বিরিয়ানি হাউজের সামনে দুর্বৃত্তরা উপর্যুপরি কোপায় ইমরানকে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৫টায় ইমরান চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ইমরান সাতমাথা বীরভদ্র এলাকার দুলাল মিয়ার পুত্র বলেও জানান তিনি। ইমরান ৫ ভাই বোনের মধ্যে সবার বড়।
একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ইমরান রাত দেড়টার দিকে ডক্টরস ক্লিনিকে অবস্থানরত কোতোয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ আবদুল কাদের জিলানীর সাথে একটি মামলার বিষয়ে কথা বলে বাড়ির দিকে রওয়ানা হন। তখন তার সাথে ছিলেন কারমাইকেল কলেজ ছাত্রলীগের এক নেতা। পরে সেখান থেকে বের হয়ে অপর দুই বন্ধুকে সাথে নিয়ে ইমরান সাতমাথা বিরিয়ানি হাউজে বিরিয়ানি খেতে যান। হোটেল থেকে বের হওয়া মাত্রই আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা ১০/১২ জন দুর্বৃত্ত তাকে লোহার রড এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি কোপায়। এরপর তাকে মৃত ভেবে রাস্তায় ফেলে দুটি মাইক্রোতে করে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে টহলরত পুলিশের ভ্যানে করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যুবলীগ নেতা ইমরানের মুত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সকালে ইমরান ও মালিক সমিতি সমর্থকরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সাতমাথায় জেলা পিকআপ মালিক সমিতির অফিস, মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাতমাথা অফিস, ৩ কুড়িগ্রাম ও পাটগ্রামগামী যাত্রীবাহী বাস, ১টি অটো এবং ২টি মোটর সাইকেল ভাংচুর করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর মধ্যে একটি মোটরসাইকেল দৈনিক যুগান্তরের রংপুর অফিসের ফটো সাংবাদিক শাহিদুর রহমান শাহিদের। এ সময় ছবি তুলতে গেলে চ্যানেল আইয়ের ক্যামেরাম্যান এহসানুল হক সুমনের কাছ থেকে ক্যামেরা কেড়ে নিয়ে তা ভাংচুর ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। চ্যানেল নাইনের ক্যামেরাম্যান ফুলন চক্রবর্তীর ক্যামেরা ছিনিয়ে নিলেও তাৎক্ষণিকভাবে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সভাপতি মেহেদী হাসান শিশির ক্যামেরাটি উদ্ধার করে দেন। এ সময় ইমরান সমর্থকরা রংপুরের উদ্দেশ্যে আসা এক পথচারীকে সাংবাদিক সন্দেহে ধারালো অস্ত্র দিয়ে জখম করে। এসময় তারা পুলিশের এএসপি অশোক এবং কনেস্টবল রিয়াজকেও বেধড়ক মারপিট করে। পুলিশকে মারপিটের সময় বলা হয়, ‘তোরা ইমরানকে মেডিকেলে নিয়ে যেতে দেরি করলি কেন’ বলেও জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা।
এ ঘটনার পর ইমরান ও মালিক সমিতির সমর্থকরা মিছিল নিয়ে সাড়ে ৮ টায় নগরীর তাজহাট মোড় এলাকায় জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও মহানগর আওয়ামীলীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক এমএ মজিদ এবং তার ভাবী প্যানেল মেয়র ফরিদা কালামের বাসায় হামলা চালায়। এসময় তারা বাড়ির বিভিন্ন জিনিসপত্র ভাংচুর এবং মহিলা শিশুসহ পরিবারের লোকজনকে মারপিট করে। প্রাণভয়ে বাড়ির মহিলারা দৌড়ে অন্যত্র গিয়ে রক্ষা পায়। হামলাকারীরা এমএ মজিদের ব্যবহৃত মোটর সাইকেল ও মসজিদের সামনে থাকা একটি বাসেও আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে এলাকাবাসী ও মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা। তারা একত্রিত হয়ে হামলাকারীদের ধাওয়া দিলে হামলাকারীরা সাতমাথায় গিয়ে সশস্ত্র অবস্থান নেয়। এরপর সেখানে শতাধিক পুলিশ আসে এবং মহাসড়কে বেরিকেড দেয়।
এ ঘটনার পর সকাল ১০ টায় শ্রমিক ইউনিয়ন সম্পাদক এমএ মজিদ তার নিজ বাসভবনে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ইমরান হত্যাকা-ের জন্য মোটর মালিক সমিতির সন্ত্রাসীরাই দায়ী। নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে এই হত্যাকা- ঘটিয়ে সেটির দায় শ্রমিক ইউনিয়নের ওপর চাপানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে। তারা আমার বাড়ি ঘর অফিসে হামলা চালিয়েছে, আগুন দিয়েছে। আমার শ্রমিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, এই সন্ত্রাসীরাই ৭ ই সেপ্টেম্বর আমাকে মেরে ফেলার জন্য গুলী চালিয়েছিল। আমি বার বার প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে স্মারকলিপি দেয়ার পরেও তারা আমার ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী রাঙ্গার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, আপনারা জানেন ওনি আমাকে বার বার মারার জন্য হুমকি দিচ্ছে। আজকে তারা আমার বৃদ্ধ পিতা ও মাতাকে মারপিট করেছে। আমার দুটি মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। এসবের প্রতিবাদে তিনি প্রেস ব্রিফিংয়ে রংপুর বিভাগের ৫৬ টি রুটে একযোগে পরিবহন ধর্মঘট ঘোষণা করেন।
আকস্মিক ধর্মঘটের কারণে রংপুর বিভাগের ৮ জেলার ৫৬ টি রুটে কোন পরিবহন চলছে না। ফলে যাতায়াত এবং পন্য আনা  নেয়া বন্ধ হয়ে গেছে। চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ইমরানের পিতা দুলাল মিয়া ছেলের এমন মৃত্যুর খবর শুনে হার্ট এ্যাটাক করেছেন। তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তার অবস্থা এখনও আশংকামুক্ত নন বলে জানিয়েছেন কর্মরত চিকিৎসকরা।
বিকেল ৪ টা ২০ মিনিটে মেডিকেলে উপস্থিত কোতয়ালী থানার তদন্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, ইমরানের লাশের ময়না তদন্ত শেষে লাশ তার ভাই বিপ্লবের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এদিকে পুলিশী স্কট দিয়ে লাশ তার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
ইমরানের ছোট ভাই বিপ্লব জানান, ভাইকে হত্যার ঘটনাটি আমরা পারিবারিকভাবে রাত আড়াইটায় শুনেছি। মেয়র সরফুদ্দীন আহম্মেদ ঝন্টু ঢাকা থেকে রওয়ানা দিয়েছেন, তিনি আসলে জানাযার ব্যবস্থা করা হবে। তিনি বলেন, কারা আমার ভাইকে হত্যা করেছে তা আমরা সনাক্তের কাজ করছি। আমার পিতাও এখন মৃত্যু শয্যায়। আমরা এখন চাপে আছি। কারা হত্যা করেছে তা বলতে পারছি না। তিনি বলেন, শ্রমিক ইউনিয়নের নেতার বাড়ি, অফিস, বাস ভাংচুরের ঘটনায় আমাদের পরিবারের কেউ জড়িত নয়।
রংপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়নুল আবেদীন জানান, পরিস্থিতি এখন শান্ত আছে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
ধর্মঘট ৭২ ঘন্টার জন্য স্থগিত
মঙ্গলবার সকাল ১০ টায় রংপুর বিভাগের ৫৬ টি রুটে আহূত পরিবহন ধর্মঘট বিকেল ৫ টায় স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন। আগামী ৭২ ঘন্টার মধ্যে হামলাকারীদের গ্রেফতার না করলে আবারও শনিবার বিকেল ৫টা থেকে ধর্মঘট শুরু হবে বলে প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক এমএ মজিদ।
রংপুর মহানগরীর তাজহাটের নিজ বাড়িতে বিকেল ৫ টায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, যাত্রীদের অসুবিধার কথা বিবেচনা করে এবং প্রশাসনের আশ্বাসের ভিত্তিতে আগামী ৭২ ঘন্টার জন্য আহূত ধর্মঘট স্থগিত করা হলো। এর মধ্যে হামলাকারী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে আগামী শনিবার বিকেল ৫ টা থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ