ঢাকা, বুধবার 12 November 2014 ২৮ কার্তিক ১৪২১, ১৮ মহররম ১৪৩৬ হিজরী
Online Edition

বয়রা আবাসিক প্রকল্পের প্লট আ’লীগ নেতারা ভাগবাটোয়ারা করায় তোলপাড়

খুলনা অফিস : খুলনার স্বল্প আয়ের লোকদের জন্য নেয়া জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের (হাউজিং) ২৬টি প্লট আওয়ামী লীগের তিন এমপির ভাগ বাটোয়ারার ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। খোদ আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। খুলনা-৩ (খালিশপুর-দৌলতপুর-খানজাহান আলী) আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানের সুপারিশে ২৬টি প্লট আওয়ামী লীগের নেতা, পুলিশ কর্মকর্তা, ব্যক্তিগত কর্মকর্তাসহ তার অনুসারীদের নামে বরাদ্দ দিলেও দলের দীর্ঘ দিনের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের না দেয়ায় এ ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। 
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের (হাউজিং) প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রসপেক্টার্সের  কোন শর্তও মানা হয়নি। শর্তে রয়েছে খুলনা মহানগরীতে যে সকল ব্যক্তির নিজ ও সন্তান-সন্তানাদিদের নামে বাড়ি-ঘর আছে তারা কোন প্লট পাবে না। কিন্তু দেখা গেছে সাবেক শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান এমপি’র ডিও লেটারের মাধ্যমে তার দক্ষিণহস্ত হিসেবে পরিচিত মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম নিজে, তার বোন ও বোন জামাইয়ের নামে বরাদ্দ নিয়েছেন ৫টি প্লট। স্বল্প আয়ের লোকদের জন্য বরাদ্দ থাকলেও ব্যবসায়ী শিল্পপতি ও শত কোটি টাকার মালিক মহানগর আওয়ামী লীগের দুই শীর্ষ নেতাও প্লট পেয়েছে। এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরে তৃণমূল আওয়ামী লীগের কর্মীরা সুবিধাভোগী এই নেতাদের বিরুদ্ধে খালিশপুর ও দৌলতপুর শিল্পাঞ্চলে পোস্টারিং ও সভা-সমাবেশ করেছে।
এদিকে প্লট বরাদ্দের অনিয়ম দূরীকরণের দাবি জানিয়ে বেগম মন্নুজান সুফিয়ানের নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রী, গৃহায়ণ ও পূর্ত মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লি¬ষ্ট একাধিক দফতরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতমূলকভাবে প্লট বরাদ্দ দেয়ায় খুলনার জনমনে সরকারের প্রতি বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে। খালিশপুর থানা মহিলা লীগের সভাপতি শারমিন রহমান শিখা, ৭নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, ৮নং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক এসএম কামরুজ্জামান, ৯নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা হাসনা বানু, রেহানা ইসলাম, যুবলীগ নেতা তাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে মঙ্গলবার দৈনিক সংগ্রামের শেষের পাতায় ‘খুলনায় বয়রা আবাসিক প্রকল্পের ২৬টি প্লট আ’লীগ নেতাদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় সকালেই সকল কাগজ মুহূর্তের মধ্যে বিক্রি হয়ে যায়। পরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অফিসে যোগাযোগ করে না পেয়ে ফটোকপি করে বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে দিয়ে দেয়। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের  নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। সব মিলিয়ে মঙ্গলবার ‘খুলনায় বয়রা আবাসিক প্রকল্পের ২৬টি প্লট আ’লীগ নেতাদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা’ বিষয়টি টপ অব দ্যা টাউনে পরিণত হয়।
এ ব্যাপারে  দৌলতপুর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও খুলনা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র মোঃ মনিরুজ্জামান খান খোকন বলেন, স্বল্প আয়ের লোকদের প্লট না দিয়ে দলের প্রভাবশালী ও বিত্তবান নেতাদের নামে বরাদ্দ দিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার এমপি রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তার এ কর্মকা-ে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
খানজাহান আলী থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি বেগ লিয়াকত বলেন, আলী দীর্ঘ ১৯ বছর থানা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু এ ধরনের লুটপাটের ঘটনা কখনো দেখিনি। দলের নিবেদিত কর্মীদের নামে প্লট বরাদ্দ দিলে আমাদের কোন বক্তব্য ছিল না। কিন্তু যাদের বিলাস বহুল বাড়ি-গাড়ি আছে তাদের নামে প্লট দিয়ে নেতাকর্মীদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে।
খালিশপুর থানা আওয়ামী লীগ নেতা ও কেসিসির ১৫ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আমিনুল ইসলাম মুন্না  ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, খুলনা শহরে যাদের বাড়ি-ঘর নেই এ রকম নেতাকর্মীদের সংখ্যা বহু। তাদের নামে বরাদ্দ না দিয়ে, যারা বিত্ত বৈভবের মালিক, তাদেরকে দেয়া হয়েছে। একই ব্যক্তির পরিবারকে ৫টি প্লট দিয়ে স্বজনপ্রীতির রেকর্ড তৈরি করা হয়েছে। আমার বিশ্বাস এ অনৈতিক কর্মকা- প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হলে এসব প্লট বরাদ্দ বাতিল করে স্বল্প আয়ের লোকদের মাঝে দেয়া হবে।
অপরদিকে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের  লোকদের জন্য প্রস্তুত খুলনার বয়রা আবাসিক প্রকল্পের সংরক্ষিত  কোটার প্লট আওয়ামী লীগ  নেতাদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা শিরোনামে প্রকাশিত একটি জাতীয় দৈনিকের সংবাদ দেখে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন খুলনা বিএনপির নেতৃবৃন্দ।  নেতৃবৃন্দ মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে যে লুটপাটের মাধ্যমে গোটা দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বানিয়ে নিজেদের আখের গোছান এ বরাদ্দই তার প্রমাণ বহন করে। শুধু প্লট বরাদ্দই নয় টেন্ডারবাজি, দখলবাজি আর লুটপাটের ঘটনা আওয়ামীলীগ সরকারের আমলেই ঘটে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, খুলনার একজন সংসদ সদস্যের সুপারিশে ২৬টি প্লট আওয়ামী লীগের  নেতা, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, নেতাদের  বোন ও  বোন জামাইয়ের নামে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এমনকি মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নামেও এ প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। প্লট বরাদ্দের শর্তে খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্যে নিজ নামে, স্ত্রী-স্বামী-সন্তান ও  পোষ্যদের নামে বা  বেনামে বসবাসের জন্যে  কোনো ঘরবাড়ি অথবা জমি-ফ্ল্যাট থাকলে প্রকল্পে প্লট প্রাপ্তির অযোগ্য বিবেচিত হবেন। কিন্তু প্লটপ্রাপ্তদের সবারই নগরীতে জমি ও বাড়ি রয়েছে।
দলটির নেতারা বিবৃতিতে অবিলম্বে এ ধরনের অবৈধ প্লট বরাদ্দ বাতিল করে নিয়ম অনুযায়ী স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের মধ্যে প্লট বরাদ্দের আহবান জানিয়েছেন।
বিবৃতিদাতারা হলেন, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এম নুরুল ইসলাম দাদু ভাই, মহানগর সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু, কেসিসির মেয়র মনিরুজ্জামান মনি, সাহারুজ্জামান মোর্ত্তজা, কাজী সেকেন্দার আলী ডালিম, সৈয়দা নার্গিস আলী, মীর কায়সেদ আলী, শেখ মোশারফ হোসেন, জাফরউল্লাহ খান সাচ্চু, সিরাজুল ইসলাম মেঝো ভাই, জলিল খান কালাম, ফখরুল আলম, এডভোকেট ফজলে হালিম লিটন, অধ্যক্ষ তারিকুল ইসলাম, শেখ আমজাদ হোসেন, অধ্যাপক আরিফুজ্জামান অপু, সিরাজুল হক নান্নু, আসাদুজ্জামান মুরাদ, এস এম আরিফুর রহমান মিঠু প্রমুখ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ