ঢাকা, বুধবার 12 November 2014 ২৮ কার্তিক ১৪২১, ১৮ মহররম ১৪৩৬ হিজরী
Online Edition

অধিকাংশ বিভাগেই শ্রেণীকক্ষ সংকট ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষাকার্যক্রম

তারেক হোসাইন টুটুল, রাবি : ক্লাশ করার জন্য শহীদুল্লাহ কলা ভবন থেকে সিরাজী ভবন আবার সিরাজী ভবন থেকে শহীদুল্লাহ কলা ভবন এভাবেই প্রতিদিন ছুটাছুটি করতে হয়। কখনো একই রুমে ঠাসাঠাসি করে, শিক্ষকদের চেম্বারে একই চেয়ারে দু’জনে বসে, কখনো বা সেমিনারে এমনকি অন্য বিভাগের ক্লাস রুমেও ক্লাস করতে হয়। প্রতিদিন এভাবে ক্লাস করতে খুবই খারাপ লাগে। নিজেদের বড় অসহায় মনে হয়। এভাবেই চাপা ক্ষোভ অভিযোগের কন্ঠে কথাগুলো বলছিলেন ভাষা বিভাগের (ফার্সী) শিক্ষার্থী মাবুবুর রহমান। শুধু ভাষা বিভাগ নয়, বিশ^বিদ্যালয়ের প্রায় প্রতিটি বিভাগের চিত্র এমন। শ্রেণীকক্ষের অভাবে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, তেমনি ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমও। ফলে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন দীর্ঘায়িত হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে অর্থের অপচয়ও।  
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিশ^বিদ্যালয়ের সর্বমোট ৫০টি বিভাগে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হলেও একাডেমিক ভবন মাত্র ১১টি। এর মধ্যে শহীদুল্লাহ কলা ভবনে কলা অনুষদ ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের একটি বিভাগসহ মোট ৮টি বিভাগের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। বিভাগগুলোর মধ্যে বাংলা, ইংরেজী, ইতিহাস, আরবী, ইসলামিক স্টাডিজ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ৩টি করে ও ভাষা বিভাগের (উর্দু, ফার্সী ও সংস্কৃতি)-৪ শ্রেণী কক্ষ রয়েছে।
মমতাজ উদ্দীন কলা ভবনে সমাজকর্ম ও দর্শন বিভাগে ৪টি, সমাজ বিজ্ঞান ৩টি ও অর্থনীতি বিভাগে ৫টি ক্লাস রুম রয়েছে।  রবীন্দ্র ভবনের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদসহ প্রতিটি বিভাগের ৪টি করে ক্লাস রুম বরাদ্দ রয়েছে। সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী ভবনে ফোকলোর ও নৃ-বিজ্ঞান বিভাগে ৩টি, নাট্যকলায়-২টি ও  সঙ্গীত বিভাগে ২টি ক্লাস রুম বিদ্যমান রয়েছে। এছাড়া দ্বিতীয় বিজ্ঞান ভবন মনোবিজ্ঞান ও ফলিত রসায়ন বিভাগে ৩টি, তৃতীয় বিজ্ঞান ভবনে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি, পপুলেশন সায়েন্স এন্ড হিউমান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট বিভাগে-৫ টি করে শ্রেণী কক্ষ রয়েছে।
এসব বিভাগের প্রথম বর্ষ থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীর জন্য বরাদ্দ থাকে সর্বোচ্চ তিনটি থেকে চারটি শ্রেণীকক্ষ। যেখানে ছয় থেকে সাতটি ক্লাশ রুমের প্রয়োজন বলে মনে করেন শিক্ষার্থীরা। ফলে এসব বিভাগের কোন না কোন বর্ষের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাশ করতে পারছেন না ক্লাস রুম সংকটের কারণে। দীর্ঘদিন ধরেই এমন অবস্থা চলছে। ফলে সময়মত ক্লাস-পরীক্ষা না হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান কমে যাচ্ছে সেই সাথে দীর্ঘায়িত হচ্ছে তাদের শিক্ষাজীবনও। 
কলা অনুষদের একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, কলা অনুষদের অধিকাংশ বিভাগসহ ৮টি বিভাগের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় শহিদুল্লাহ কলা ভবনে। এসব বিভাগের মাত্র তিনটি-চারটি করে শ্রেণীকক্ষ বিদ্যামান। সেগুলো আবার অনেকাংশে ছোট। যখন অন্য কোন ব্যাচের ক্লাস পরীক্ষা চলে সেদিন আর অন্য কোন বর্ষের শিক্ষার্থীরা ক্লাস করতে পারেন না। এতে করে একদিকে যেমন সময় অপচয় হচ্ছে অন্যদিকে দীর্ঘায়িত হচ্ছে আমাদের শিক্ষাজীবন।
শ্রেণীকক্ষ সংকটের ফলে কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে জানতে চাইলে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মনিরুল ইসলাম নাঈম বলেন, পাঁচটি ব্যাচের জন্য তিনটিমাত্র শ্রেণীকক্ষ বরাদ্দ। দু’টি শহীদুল্লাহ ও একটি সিরাজী ভবনে। একই সময়ে অন্য ব্যাচের ক্লাশ থাকলে আমাদের সে ক্লাশটি আর হয় না। অনেক সময় অতিরিক্ত ক্লাশ নিতে চাইলে শ্রেণী সংকটের জন্য তা আর হয়ে ওঠে না। দেখা যায় যে, সময়মত ক্লাশ শেষ না হওয়ার কারণে পরীক্ষাও দীর্ঘায়িত হয়। একই কথা বললেন ইংরেজী বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অমিত হাসান।
হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থা বিভাগ বিভাগের চতুর্থ সেমিসটারের শিক্ষার্থী আ. রহমান বলেন, অতিরিক্ত ক্লাশ করতে চাইলে কিংবা গ্যাপ পিরিয়ডের ক্লাশটি অন্য সময় করতে চাইলে ক্লাশ সংকটের কারণে আমরা আর করতে পারি না।
আরবী বিভাগের সভাপতি প্রফেসর মুহাম্মদ আব্দুস সালাম মিঞা বলেন, শ্রেণীকক্ষ সংকট আমাদের অনেকদিন থেকেই আছে। আগের সভাপতি প্রশাসনের সাথে কয়েকবার দেখা করে কোন কাজ হয়নি। নতুন করে আমরা কয়েকবার প্রশাসনের সাথে দেখা করেছি এবং আমাদের শ্রেণীকক্ষ বরাদ্দ দেয়ার জন্য আশস্ত করেছে।
ভাষা বিভাগের প্রফেসর ড. কামাল উদ্দিন বলেন, কলা অনুষদ বরাবরই অবহেলিত। অবহেলিত হওয়ার কারণে শিক্ষকরা ঠিকমত ক্লাশ নিতে পারছে না এবং শিক্ষার্থীরা ক্লাশের জন্য এসে ঘুরে ঘুরে চলে যায় শ্রেণী কক্ষ ফাঁকা না থাকার কারণে। নতুন করে কোন বিল্ডিং হলে সেখানে কলা অনুষদকে সুযোগ দেয়া হয় না। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়া এবং ভবনের অবকাঠানোর কারণে ক্লাশ করার জন্য কিংবা ক্লাশ শেষ করে অফিসে আসার জন্য অনেকাংশে বিড়াম্বনার মধ্যে পড়তে হয়।
বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর কামরুল হাসান মজুমদার বলেন, এটাতো আর রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে। অল্প কিছু দিনের মধ্যে শ্রেণীকক্ষের আর তেমন একটা সমস্যা হবে না।
এ ব্যাপারে বিশ^বিদ্যালয় ছাত্র উপদেষ্টা প্রফেসর ছাদেকুল আরেফিন বলেন, শ্রেণীকক্ষ সংকটের বিষয়টি প্রশাসন অনেক গুরুত্বের সাথে দেখছে। এজন্য নতুন করে সিরাজী ভবনে কিছু বিভাগের ক্লাশের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভবনটি সম্পূর্ণ হলে আর এ সংকট থাকবে না। এছাড়াও চতুর্থ বিজ্ঞান ভবনের কাজ সম্পূর্ণ করার কাজ চলছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ