ঢাকা, বুধবার 12 November 2014 ২৮ কার্তিক ১৪২১, ১৮ মহররম ১৪৩৬ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোক ও কারুশিল্প

আখতার হামিদ খান : বাংলাদেশের লোক ও কারুশিল্পের ঐতিহ্য অনেক পুরনো। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে লোক ও কারুশিল্পের অবস্থান মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত, বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতীক, কায়িক শ্রমে ও নান্দনিক কৌশলে ব্যবহারিক বস্তুকে সৌন্দর্য ও কারুমন্ডিত করার উদ্দেশ্য অলঙ্ককরণকেই আমরা ‘কারুশিল্প’ হিসেবে অভিহিত করি। অন্যদিকে যৌথ চেতনার ফসল হচ্ছে লোকশিল্প। যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহজ-সরল পরিবেশে তৈরি হয়। একজন প্রধান স্রষ্টার পরিবেশে তৈরি হয়। একজন প্রধান স্রষ্টার সৃষ্টিকর্ম আরও কয়েকজনের স্পর্শে হয়ে ওঠে সর্বজনীন লোকশিল্প। গঠনশৈলী, বিষয়বস্তু, উৎপাদন ও নির্মাণ কৌশলে লোকজ রূপ থাকায় তা লোকশিল্প হিসেবে পরিগণিত হয়। আর সুশৃঙ্খল সূত্রমাফিক তৈরি করা হলেও কারুশিল্পে থাকে ঐতিহ্যের সমাচার। এরপরও তা সৃজনশীলতা পাশাপাশি বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বাংলাদেশের কারুশিল্প ও কারুশিল্পীদের অবদান অনস্বীকার্য। আবহমানকাল থেকেই এদেশের লোক ও কারুশিল্প নিজ নিজ ধারায় প্রবহমান।
কারুশিল্প হলো লোকশিল্পের দোসর, এ দুয়ের ব্যবধানও খুব সামান্য। এ কারণেই অনেক সময় এ দুটিকে এক ও অভিন্ন মনে হয়। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের পাশাপাশি লোক ও কারুশিল্প আমাদের সংস্কৃতিরও পরিচয় বহন করে। লোক ও কারুশিল্পের কল্যাণেই বহির্বিশ্বে এক সময় বাংলাদেশের পরিচিতি ছিল সেরা মানের শিল্পের দেশ হিসেবে। এক্ষেত্রে আমাদের এক গৌরবময় অতীত ছিল। এ দেশের লোক ও কারুশিল্পীদের সহজাত রুচি, সৌকর্য ও শিল্পবোধ থেকে সৃষ্ট শিল্পকর্ম যুগ যুগ ধরে মানুষকে যান্ত্রিক সভ্যতা আমাদের সেই ঐতিহ্যকে হুমকির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে সত্যি। কিন্তু এখনও তা বিলীন হয়ে যায়নি।
আয়তন ও বৈচিত্র্যের তুলনায় বাংলাদেশের লোক ও কারুশিল্পের ভান্ডার অনেক বেশি সমৃদ্ধ। কারুশিল্পের বিশাল ভান্ডারে রয়েছে জামদানি, বেনারসি, কাতান, খদ্দর কাপড়, ঢাকাই শাড়ি, রেশমের তৈরি কাপড়, কম্বল, সতরঞ্জি,অলঙ্কার, ধাতব শিল্প, সুতি শিল্প, রঞ্জন শিল্প, শঙ্খ শিল্প, মৃৎ শিল্প, চামড়া শিল্প, দারু শিল্প, ঝিনুক শিল্প, হাতির দাঁতের কাজ, পুতুল শিল্প, পিতল-কাঁসা শিল্প, বাঁশ-বেত শিল্প, শোলা শিল্প, লাক্ষ্য, মোম, বিয়ের সাজ ইত্যাদি। এছাড়া নকশি কাঁথা, নকশি শিকা, নকশী পিঠা, শীতল পাটি, খেলনা পুতুল, মাটির ফলকচিত্র, ছাঁচ, আলপনা, কোমর তাঁতে কাপড় বুনুন, লোকবাদ্য যন্ত্র, পাতা ও খড়ের জিনিস, লোকচিত্র প্রভৃতি আমাদের লোক ও কারুশিল্পের নিদর্শন। বেঁচে থাকার তাগিদে কাজ করতে গিয়ে এবং অবসর মুহূর্তে বসে এসব শিল্প-সম্পদ তৈরি করেছে কারুশিল্পীরা। বাংলাদেশের লোকজীবনের শৈল্পিক বৈশিষ্ট্যগুলোই বিধৃত হয়েছে আমাদের লোক ও কারুশিল্পে। এসব শিল্প আমাদের ঐতিহ্যের প্রতীক, সেই সাথে গৌরবেরও।
তাঁত ও বয়ন শিল্প : বাংলাদেশের তাঁত ও বয়ন শিল্পের ঐতিহ্য সর্বজনবিদিত। বিশেষ করে এ দেশের মসলিন ও জামদানির রয়েছে বিশ্বজোড়া খ্যাতি। কথিত আছে, এই মসলিন এবং জামদানি সারাবিশ্বে উঁচুমানের বস্ত্র হিসেবে বিবেচিত ছিল প্রায় অষ্টাদশ শতকের শেষ পর্যন্ত। হস্তচালিত তাঁত শিল্পেরই ফসল ঢাকাই মসলিন। আর সূক্ষ্ম জমিনের ওপর দুটি তোলা বিচিত্র সব নকশামন্ডিত মসলিনের নাম হচ্ছে- জামদানি। জামদানি মূলত মসলিনেরই অংশ। প্রাচীন আমলে উন্নতমানের জামদানি তৈরি হতো ঢাকা, ধামরাই, সোনারগাঁ, বাজিতপুর, জঙ্গলবাড়ী প্রভৃতি স্থানে। বর্তমানে ঢাকা, সোনারগাঁ, আড়াইহাজার, নরসিংদী, মনোহরদী প্রভৃতি স্থানে তৈরি হয়। আর ডেমরার হাট হচ্ছে জামদানির প্রধান বিক্রয় কেন্দ্র। জামদানি নকশা এখন শুধু শাড়িতেই সীমাবদ্ধ নেই। এমব্রয়ডারি পোশাক, শুভেচ্ছা কার্ড, বিয়ের আলপনা, চিঠির প্যাড এমনকি চামড়ার জিনিসপত্রেও বিস্তৃতি লাভ করেছে। প্রাচীনকাল থেকে এখন পর্যন্ত অক্ষুণ্ন রয়েছে জামদানির কদর। সময়ের প্রয়োজনে মসলিন, জামদানি কালের আবর্তে বিলীন হলেও আজও অক্ষুণ্ন রয়েছে ঢাকাই শাড়ির গৌরবময় জনপ্রিয়তা।
গালিচা বুনন : বাংলাদেশের গালিচা বুননের ঐতিহ্যও সুপ্রাচীন। ষোড়শ শতাব্দীতেই ঘোড়াঘাটে পাটের বস্ত্র বয়ন করা হতো বলে কথিত আছে। সতরঞ্জি বয়নের প্রাচীন কেন্দ্র অবস্থিত রংপুরের নিসবাতগঞ্জে। ঢাকার বেশ কয়েকটি কারখানায় পাট ও উল দিয়ে তৈরি করা হয় কার্পেট। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ঢাকায় পাট দিয়ে বোনা হতো ছালা ও লেপের কাপড়।
রঞ্জন শিল্প : বিলুপ্তপ্রায় রঞ্জন শিল্প বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার (বিসিক) প্রকল্প সহায়তায় নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। বর্তমানে সোনারগাঁ, রূপসী, সাভার এবং কুমুদিনী, প্রশিকা, গণস্বাস্থ্য, ব্র্যাক প্রভৃতি সংস্থার উৎপাদন কেন্দ্রে বেশকিছু কারিগর এ শিল্পে নিয়োজিত রয়েছেন। আর এসব কারখানায় উৎপাদিত রঙও রফতানি হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।
নকশি কাঁথা : নকশি কাঁথা বাংলাদেশের লোক ও কারু শিল্পের ঐতিহ্যমন্ডিত ও নান্দনিক নিদর্শন। পুরনো কাপড়ের কাঁথা সেলাই করে তার ওপর গ্রামবাংলার মহিলারা বিভিন্ন নকশা তোলেন-একেই বলে নকশি কাঁথা। এই নকশি কাঁথায় জড়িয়ে থাকে অনেক সুখ-দুঃখের স্মৃতি। ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, খুলনা, রাজশাহী, যশোর, ফরিদপুর, পাবনা, দিনাজপুর, বগুড়া প্রভৃতি জেলায় তৈরি হয় বিচিত্র ধরনের নকশা সংবলিত কাঁথা। এসব নকশি কাঁথার ব্যবহার ভেদে বিভিন্ন নামও রয়েছে। যেমন গায়ে দেয়ার কাঁথা, বিছানার কাঁথা, শিশুর কাঁথা, সুজনী কাঁথা, বর্তনী রুমাল কাঁথা, পালকর কাঁথা, বালিশের ঢাকনি, দস্তরখানা, পান পেঁচানী, আরশীলতা প্রভৃতি।
শিকাশিল্প : বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোক ও কারুশিল্প স্বতন্ত্র ও আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল শিকাশিল্প। পাট হচ্ছে শিকা তৈরির প্রধান উপকরণ। তবে নকশি শিকা তৈরিতে কঞ্চি সুতলি, ঝিনুক, কড়ি, শঙ্খ, কাপড়, পোড়ামাটির বল ইত্যাদিও ব্যবহৃত হয়। বইপত্র, কাঁথা-বালিশ, শিশি-বোতল, বাসনপত্র, পাতিল-কলসি, আয়না-চিরুনি এসব সর্বত্রই বিভিন্ন সাইজের শিকা তৈরি করেন গ্রামীণ মাহলারা। হালে শিকার ব্যবহার কিছুটা কমলেও একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। গ্রামীন মহিলাদের তৈরি নকশি শিকার অসংখ্য আঞ্চলিক নাম রয়েছে, যেমন- উল্টাবেড়ী, ফুলটুংগী, রসুন দানা, আংটিবেড়, ফুলমালা, ডালিম বেড়, ফুলচাং, গানজা ইত্যাদি। বিদেশিদের কাছেও বাংলাদেশের শিকাশিল্প আবেদন তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। পাট দিয়ে ঐতিহ্যবাহী শিকা তৈরির পাশাপাশি আজকাল পাটের তৈরি টেবিল ম্যাট, মানি ব্যাগ, ফ্লোর ব্যাগ, নেট, প্লেটম্যাট, লেডিস ব্যাগ, দেয়াল সজ্জা ও গৃহসজ্জারও রকমারি সামগ্রী তৈরি হচ্ছে। এসব সামগ্রীও দেশ-বিদেশে সমানভাবে সমাদৃত হচ্ছে।
নকশি পিঠা : বাংলাদেশের লোক কারুশিল্পে নকশি পিঠার ঐতিহ্যও অনেক দিনের। পিঠার গায়ে নকশা এঁকে অথবা ছাঁচে ফেলে পিঠাকে চিত্রিত করে তৈরি করা হয় নকশি পিঠা। নকশায় তোলা হয় দৈনন্দিন জীবনের রকমারি চিত্র। এসব নকশি পিঠা একান্তভাবেই নারীমনের সৃজনশীলতার ফসল। ঋতুভিত্তিক বাংলাদেশের বিভিন্ন উৎসব, পার্বণ, আচার-অনুষ্ঠান, পূজা-পার্বণ, বিয়ে-শাদী প্রভৃতি উপলক্ষে নানা স্বাদের নকশি পিঠা তৈরি করা হয়। এসব পিঠারও রয়েছে বিভিন্ন নাম। যেমন- চিরল পাতা, সজনেপাতা, কাজলপাতা, জামাইমুখ, কন্যামুখ, পাকন, বিবিখানা প্রভৃতি।
নকশি পাখা : নকশিকাঁথা, নকশি শিকা আর নকশি পিঠার মতোই বাংলাদেশের লোক ও কারুশিল্পের ঐতিহ্যের আরেক প্রতীক হচ্ছে নকশি পাখা। তালপাতা, সুপারীর পাতা ও খোল, সুতা, পুরনো কাপড়, বাঁশের বেতি, নারিকেল পাতা, চুলের ফিতা, পাখির পালক ইত্যাদি অতি সাধারণ ও সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে পাখা তৈরি করা হয়। আগে গ্রীষ্মকালে শরীর ঠান্ডা করার জন্য গ্রামবাংলায় হাতপাখার ব্যাপক প্রচলন ছিল। এখনও গ্রামবাংলায় নকশি পাখার ব্যবহার রয়েছে। তা নগর জীবনের অসহনীয় লোডশেডিংয়ের সময়ও ব্যবহার করা হয়। এসব নকশি পাখার রয়েছে বিভিন্ন নাম- যেমন বাঘাবন্দী, শঙ্খলতা, কাঞ্চনমালা, সজনে ফুল ইত্যাদি। এক সময় বর, বধূ ও তাদের সঙ্গে আসা মেহমানদের বড় সাইজের তালপাতার হাতপাখা দিয়ে বাতাস করা হতো।
শীতলপাটি : বাংলাদেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এক শিল্পের নিদর্শন হচ্ছে শীতলপাটি। মুর্তা নামক এক ধরনের বেতি বা পাতি দিয়ে শীতলপাটি বোনা হয়। সিলেটের বালাগঞ্জ, রাজনগর, বরিশালের স্বরূপকাঠি, ফরিদপুরের সাতৈর, নোয়াখালীর সোনাগাজী, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা প্রভৃতি স্থানে উন্নতমানের শীতলপাটি তৈরি হয়। আজকাল মানিব্যাগ, হাতব্যাগ, কাঁধে ঝোলানোর ব্যাগ, টেলিম্যাট প্রভৃতি কাজে ব্যবহৃত হয় শীতলপাটি।
লোকচিত্র : লোকচিত্র বাংলাদেশের লোক ও কারু শিল্পের এক বর্ণাঢ্য ও ঐতিহ্যবাহী ভুবন। নানা সৃষ্টিতে রূপ লাভ করেছে সৃজনশীল চিত্রশিল্প। আবহমানকালের লোক সমাজের দৈনন্দিন জীবন, ধর্ম বিশ্বাস, লৌকিক আচার-আচরণ ধারণ করে আসছে এ দেশের এক অমূল্য সম্পদ চিত্রিত হাঁড়ি। অঞ্চলভেদে এসব চিত্রিত হাঁড়ির রয়েছে বিভিন্ন নাম। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই চিত্রিত হাঁড়ি, কলসি পাওয়া যায়। এরপরও ঢাকার ধামরাই, নয়ারহাট, টাঙ্গাইলের কালিহাতি, রাজশাহীর বসন্তপুর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের বারোঘরিয়া প্রভৃতি এলাকার চিত্রিত হাঁড়ি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাজশাহীর শখের হাঁড়িতে রয়েছে বাংলাদেশের আবহমানকালের ঐতিহ্য। এসব হাঁড়িতে ঘোড়া, পাখি, শাপলা ফুল, পানপাতা, মাছ প্রভৃতি মটিফ ব্যবহৃত হয়।
মৃৎশিল্প : বাংলাদেশের লোক ও কারু শিল্পে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে মৃৎশিল্প। এ শিল্পের হাজার বছরের ইতিহাসও রয়েছে। এ শিল্পকে ঘিরে গ্রামবাংলার অনেক পরিবার জীবন-জীবিকাও নির্বাহ করে। ঢাকা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, কুমিল্লা, সিলেট, যশোর, দিনাজপুর, কক্সবাজার প্রভৃতি জেলার মৃৎ শিল্পীরা ঐতিহ্যগতভাবে মাটির জিনিসপত্র তৈরি করে আসছে। দেশের ঐতিহ্যবাহী মৃত শিল্পসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে হাঁড়িপাতিল, কলসি, সানকি, চুলা, শাক-সবজি, ফলমূল, খেলনা, পুতুল, ঘরের টালি, পানি সেচের নালি, ধর্মীয় প্রতিকৃতি, প্রাণীজ প্রতিকৃতি, অলঙ্কার প্রভৃতি। গ্রামীণ হাটবাজার এবং শহর-বন্দরেও মাটির জিনিসপত্র পাওয়া যায়।
ঢাকার রায়েরবাজার এবং আড়ং, কারিকা, প্রবর্তনা, কারুপণ্য, বিসিক ও অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ মিরপুর রোডের পাশে, টিএসসি সংলগ্ন ফুটপাতে, ইডেন মহিলা কলেজের প্রাচীর সংলগ্ন, শিশু একাডেমীর সামনেসহ বিভিন্ন স্থানে মাটির জিনিসপত্র বেচাকেনা হয়। এছাড়া সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধের কাছে মৃৎশিল্পের পর্যটন বাজারও গড়ে উঠেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ