ঢাকা, শুক্রবার 14 November 2014 ৩০ কার্তিক ১৪২১, ২০ মহররম ১৪৩৬ হিজরী
Online Edition

অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন

গত ১০ নভেম্বর ‘পানিশূন্য হবে দেশ’ শিরোনামে একটি খবর মুদ্রিত হয়েছে পত্রিকান্তরে। খবরটিতে বলা হয়, আন্তঃনদী সংযোগ, টিপাইমুখ বাঁধ ও গঙ্গা নদীর ওপর আরও ১৬টি বাঁধ নির্মাণ করা হলে বাংলাদেশ পানিশূন্য হয়ে পড়বে। গঙ্গা নদীর ওপর প্রায় ৪০০ টির মত ছোট-বড় বাঁধ রয়েছে। আরও ১৬টি বাঁধ নির্মিত হলে বাংলাদেশের জন্য ধ্বংস বয়ে নিয়ে আসবে। এমন অভিমত ব্যক্ত করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত গত ৪০ বছর ধরে সব আন্তর্জাতিক নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করছে। সম্প্রতি দেশটি পানি প্রত্যাহারের আরও যেসব প্রকল্প হাতে নিয়েছে তা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে যাবে। সব নদী পানিশূন্য হয়ে দেশ মরুভূমিতে পরিণত হবে। উল্লেখ্য যে, ১৯৭৪ সালে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর মাত্র ৪১ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে চালু করে ভারত। এরপর প্রায় ৪০ বছর পার হয়ে গেছে, আজও বন্ধ হয়নি ফারাক্কার পরীক্ষামূলক কাজ! শুধু ফারাক্কার প্রভাবেই দেশ প্রতিবছর মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। সম্প্রতি আরো যেসব প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, তার ক্ষতিকর প্রভাব বাংলাদেশের জন্য হবে আরো ভয়াবহ।
আমরা প্রতিবেশী দেশ ভারতকে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবেই বিবেচনা করি। ভারতও বাংলাদেশকে বন্ধু রাষ্ট্র বলে উল্লেখ করে থাকে। কিন্তু বন্ধু রাষ্ট্রের এ কেমন আচরণ! ভারতে যারা সরকার পরিচালনা করেন, বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন, তারা তো একথা ভাল করেই জানেন যে, উজানের দেশে বাঁধ নির্মাণ করা হলে ভাটির দেশে পানি সংকট দেখা দেবে। এতে জীবন-জীবিকা ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। তারপরও ভারত সরকার একের পর এক বাঁধ নির্মাণ করে যাচ্ছে। ফলে প্রতিবছর শুষ্ক মওসুমে বাংলাদেশের প্রায় সব নদী পানিশূন্য থাকছে। আর অবাক ব্যাপার হলো, ভারতের এ ক্ষতিকর কাজের বিরুদ্ধে যখন বাংলাদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, তখন ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা এমন কিছু করবে না যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়। কিন্তু ভারতের সে প্রতিশ্রুতি আর রক্ষিত হয় না। বন্ধু রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি কি এমনই হয়?
নদী বিশেষজ্ঞরা বলেন, আন্তর্জাতিক নদীগুলোতে কোনো দেশ ইচ্ছে করলেই বাঁধ নির্মাণ করতে পারে না। বাঁধ নির্মাণের জন্য রয়েছে আন্তর্জাতিক আইনকানুন। অথচ ভারত এসব আইনের কোনো তোয়াক্কাই করছে না। ১৯৬৬ সালের হেলসিংকী নীতিমালার ৪ ও ৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি অববাহিকাভুক্ত দেশ অভিন্ন নদীর পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্য দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন বিবেচনা করবে। এজন্য অবশ্যই অন্য দেশের যাতে ক্ষতি না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। একই নীতিমালার ২৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, এক অববাহিকার একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক অববাহিকার প্রবাহিত পানি ব্যবহার সম্পর্কে গৃহীত পদক্ষেপ অবহিত করবে। আর ১৯৭১ সালে ইউনেস্কো জলাভূমি সম্পর্কিত রামসার কনভেনশনের নীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশ প্রকৃতি এবং জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘ নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিটি দেশ আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহ থেকে পানি ব্যবহারের সময় পার্শ্ববর্তী একই অববাহিকার অন্যান্য দেশের যাতে কোন বড় ধরনের ক্ষতি না হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। দুঃখের সাথে উল্লেখ করতে হয় ভারত একের পর এক বাঁধ নির্মাণ অব্যাহত রাখলেও আন্তর্জাতিক এসব আইন ও নীতিমালাকে কোনো গুরুত্বই দিচ্ছে না। তারা এক তরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করে যাচ্ছে। ভারতের এমন আগ্রাসী নীতি উভয় দেশের বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে এক বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা মনে করি সমস্যা যখন ভারত সৃষ্টি করেছে তখন সমাধানের দায়িত্বও ভারতের ওপরই বর্তায়। ভারত যৌক্তিক সেই দায়িত্ব পালন করে কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ