ঢাকা, শনিবার 15 November 2014 ১ অগ্রহায়ন ১৪২১, ২১ মহররম ১৪৩৬ হিজরী
Online Edition

বেহাল ব্যাংকিংখাত

দেশের অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন যে, ব্যাংক ঋণের নজিরবিহীন উচ্চহারের সুদ- সুদের চক্রবৃদ্ধিতে বড় রকমের ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে গোটা অর্থনীতি। আসল বিনিয়োগকারীরা উচ্চসুদের চাপে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়লেও ব্যাংকগুলোর কোনো লোকসানই হচ্ছে না। প্রতিবছর বেশি মুনাফা করে যাচ্ছে দেশের ব্যাংকিং সেক্টর। অন্যদিকে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে, জোড়াতালি দিয়ে চলতে গিয়ে পুরো অর্থনীতি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে নতুন ব্যাংকগুলোকে। আওয়ামীদলীয় রাজনৈতিক বিবেচনায় নিজস্ব লোকজনদের দেয়া নতুন ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা জানিয়েছেন, বিনিয়োগ মন্দার প্রভাব তাদের ওপর পড়েছে। নতুন কোনো বিনিয়োগ নেই। ভালো গ্রাহকও পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যবসা না থাকায় টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে। বিনিয়োগ না থাকায় লোকসান ঠেকাতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র উদ্ধৃত করে খবরে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন নির্দেশনা পরিপালনে ব্যর্থ হচ্ছে নতুন ব্যাংকগুলো। বেশিরভাগ ব্যাংক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার গাইডলাইন মানছে না। পুরনো ব্যাংকের ব্যাপারে অপর এক প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ব্যাংক ঋণের উচ্চসুদ ও চক্রবৃদ্ধির মহাজনি ব্যবসার জাঁতাকলে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকরা। সবকিছু গ্রাস করে ফেলছে উচ্চসুদের চক্রবৃদ্ধিহারের কাবলিওয়ালা(?) এ কঠিন ফাঁদ। দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিগত ৬-৭ বছর ধরেই অনিয়ম, অব্যবস্থা, অদক্ষতা এবং জালিয়াতি প্রতারণা, কমিশন, ঘুষ-দুর্নীতি ও সীমাহীন লুটপাটের কারণেই এই সেক্টরের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেককেই বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সারাদেশের ঋণগ্রহীতা ব্যবসায়ী, শিল্প মালিকদের আর্থিক ক্ষতি আর দুর্ভোগের শেষ নেই। একদিকে গড়ে তোলা শিল্পপ্রতিষ্ঠান রক্ষা করার প্রাণপণ চেষ্টা, অপরদিকে ব্যাংকের দায়দেনা পরিশোধ করার চাপ বেড়ে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলোতে আমানতকারী এবং ঋণ গ্রহণকারীদের সুদের হারে বেশি রকমের ব্যবধানে আর্থিক সংকট প্রকট হচ্ছে।
প্রকাশিত খবরে আরো বলা হয়েছে যে, বিশ্বের দ্বিতীয় আর কোনো দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে দেশে আমাদের বাংলাদেশের মতো এমন উচ্চসুদ আদায়ের প্রমাণ কেউ দেখাতে পারেন? গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশে অর্থনীতিবান্ধব (?) সরকারের আমলে একজন উদ্যোক্তাকে ২২ থেকে ২৩ শতাংশ সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয়। ব্যাংকের বার্ষিক সুদের হার ১৫ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর আদায় করা বিভিন্ন সার্ভিস চার্জ ও কমিশন যোগ করলে ঋণের প্রকৃত সুদের হার বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৫ শতাংশ। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে ব্যাংক সুদের গড় হার ৯ শতাংশ। ভারী শিল্প-কারখানা স্থাপন করলে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক উদ্যোক্তাদের ৭ শতাংশ হারে সুদে ঋণ দিচ্ছে। শ্রীলঙ্কায় পরিবেশবান্ধব ও উৎপাদনমুখী শিল্পঋণের সুদের হার বাংলাদেশী টাকায় ৮ থেকে ১২ শতাংশ। পাকিস্তানে ঐসব খাতে সুদের হার ৯ থেকে ১২ শতাংশ। রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে এ হার আরো অনেক কম। বাস্তবতা হচ্ছে, বিশ্বের বৃহৎ পুঁজিবাদী সংস্থাগুলোর মতোই বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো পুঁজি সরবরাহের সূতিকাগার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার কারণে নানা জটিল চক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে দেশের শিল্প উৎপাদন। উচ্চসুদের কারণে কৃষি ও কৃষির উপখাতগুলোর উৎপাদনের সুফল উৎপাদনকারী ও সাধারণ মানুষ ভোগ করতে পারছেন না। সরকার বাজারে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। অপরদিকে দেশের উৎপাদিত পণ্য মার খাচ্ছে বিদেশী পণ্যের কাছে। উচ্চসুদের চক্রবৃদ্ধি হারের কারণে দেশের গার্মেন্ট শিল্প মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। আবাসন খাত ঘুমিয়ে পড়েছে। অথচ ব্যাংকগুলোর মালিক, পরিচালক, পদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ একশ্রেণির জালিয়াত-লুটেরাদের বিত্তবৈভব দিন দিন কেবল বেড়েই চলছে। ফলে অর্থনৈতিক শোষণ প্রক্রিয়ায় দেশের সাধারণ মানুষ নিষ্পেষিত হচ্ছেন আর এর সুফল ভোগ করছে ব্যাংক, সরকার ও সরকারি দলের প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ লুটেরা চক্র। এই বাস্তবতা কোনো বিবেচনাতেই দেশবাসীর গ্রহণযোগ্য নয় বলেই জোরালো প্রতিবাদ উঠেছে।
পুঁজিবাজার কার্যকর ভূমিকায় আসতে না দেয়ার কারণেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর একচেটিয়া সুযোগ বেড়ে গেছে। বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোতে বাণিজ্যিক ব্যাংকের আমাদের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের ব্যাংকগুলোর এমন বেহাল দশা কল্পনা করাও যায় না। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষিতে অর্থনীতিবিদ মহল বলছেন, ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের প্রভাব বলয়ে থাকা দুর্নীতিবাজ লুটেরা চক্রের কারণেই ব্যাংকগুলোর এমন বেহাল দশা হয়েছে। ব্যাংকিং সেক্টরের বেহাল পরিস্থিতি উত্তরণে ও সামঞ্জস্য বিধানে আমানত এবং ঋণের সুদের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে ভারসাম্য আনতে হবে। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা, যাতে শতভাগ আদায় করা যায় সেদিকে খেয়াল রেখে বিনিয়োগবান্ধব ব্যাংকিং চালু রেখে প্রকৃত উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের সহায়তা করতে হবে। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের বাইরে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ইতোমধ্যেই আওয়ামীদলীয় নতুন ব্যাংকগুলোকে নিয়ে যে ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে, তা যদি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করে তাহলে আমানতকারীসহ অন্যরা যেসব ঝুঁকিতে পড়বে, তার প্রচন্ড চাপ পুরো অর্থনীতির ওপর পড়বেই। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে দেশের অর্থনীতি দেউলিয়া হওয়ার পথে দ্রুত ধাবিত হবে। হাম বড়া ভাব না দেখিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে আমাদের ব্যাংকগুলোর সুদ-সুদের চক্রবৃদ্ধি হারের এতো বড় ধরনের ব্যবধানের মূল কারণ খুঁজে বের করে তা নিরসন করা প্রয়োজন। পুঁজি সরবরাহে পুঁজিবাজার যাতে সত্যিকারের ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিশ্চিত করা দরকার। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে গোটা জাতি এগিয়ে আসবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ