ঢাকা, রোববার 18 November 2018, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

পাবনায় তাফসীরুল কোরআন মাহফিলে যুবলীগ ছাত্রলীগের স্বশস্ত্র হামলা ভাংচুর ॥ মাহফিল পন্ড

পাবনা সংবাদদাতা :পাবনা বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির বার্ষিক তাফসিরুল কোরআন মাহফিলে সরকার বিরোধী বক্তব্য দেয়ার অভিযোগে মাহফিল পন্ড করে দিয়েছে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ১১ টার দিকে মধ্য শহরে (কাপড় ব্যবসায়ী পট্টি) আওরঙ্গজেব রোডে এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় জালাসার আয়োজক আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সাবেক সভাপতি ও বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির সাধারন সম্পাদক আলহাজ্ব নুরুউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনার পরপরই (আটক হওয়ার আগে) পাবনা বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির সাধারন সম্পাদক আলহাজ্ব নুরুউদ্দিন আহমেদ বাবলু সাংবাদিকদের জানান, “প্রতি বছরের ন্যায় আমাদের বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির উদ্যোগে ৩১তম বার্ষিক তাফসীরুল কোরআন মাহফিলের আয়োজন করা হয়। সমিতির সভাপতি আতাহার আলীর সভাপতিত্বে সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া এই মাহফিলে ২য় বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন গাজীপুর জেলার মাওলানা মো. কফিল উদ্দিন ইবনে আমিন। এরপর রাত ১০ টার দিকে মাহফিলের প্রধান বক্তা বগুড়া নিবাসী ও ঢাকার একটি মসজিদের খতীব মাওলানা আব্দুল্লাহ-আল-আমীন তাফসীর পেশ শুরু করেন। তিনি কুরআনের সুরা মুদ্দাসসিরের ৪১ আয়াত থেকে ৫০ আয়াত তেলাওয়াত করে এই আয়াতের তাফসীর পেশ করার এক পর্যায়ে তার ব্যাখ্যামূলক বক্তব্যে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন। এতে সরকারের অতীত ও বর্তমান নেতিবাচক কার্যক্রমও উঠে আসে। তার এই বক্তব্যকে সমর্থন দিয়ে মাহফিলের উপস্থিত জনতা মুহুর্মুহু শ্লোগান দিতে থাকে।” বাবলু আরও জানান, “মাহফিলের এই আবেগঘন পরিবেশে হঠাৎ করেই আওয়ামীলীগ ও যুবলীগের ৩/৪জন অতি পরিচিত নেতার নেতৃত্বে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি দল নিউমার্কেটের দিক থেকে মাহফিলের মঞ্চের পশ্চিম পাশে আসে। তাদের কয়েকজন মঞ্চে উঠে শোরগোল সৃষ্টি করে এবং অতিথিদের লাঞ্চিত করে মাইক ছিনিয়ে নিয়ে আমাদেরকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে শুরু করে। এ সময় মঞ্চের সামনে উপবিষ্ট সাধারণ মুসল্লীরা তাদের জুতা-সেন্ডেল মঞ্চের দিকে নিক্ষেপ করতে থাকে। এতে আগত দলটি পিছু হটে। মুহুর্তের মধ্যেই মঞ্চের পশ্চিম পাশ থেকে কয়েক রাউন্ড গুলি ও পটকা ফাটানোর শব্দ শুনি। এই অবস্থায় আমরা অতিথি ও বক্তাবৃন্দের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে মঞ্চ ত্যাগ করি। এতে উপস্থিত মুসল্লিসহ সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করতে থাকে।” এদিকে প্রত্যক্ষদর্শী ও মাহফিলে উপস্থিত একাধিক মুসল্লী জানিয়েছেন, “মাওলানা সাহেব বক্তব্য শুরু করার পরে হঠাৎ করে মধ্যবয়সী ও যুবকদের ২৫/৩০ জনের একটি দল এসে মাইক বন্ধ করার নির্দেশ দিতে থাকে। তারা মঞ্চ, ডেকোরেশন, লাইটিং ভাংচুর করে তছনছ করতে থাকলে সভাস্থলের বসার জায়গাগুলি অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। এসময় মাইকে শোরগোলের পাশাপাশি কয়েক রাউন্ড গুলি ও পটকা ফাটানোর শব্দ শোনা যায়। এরপর মঞ্চে উপবিষ্ট অতিথি, আয়োজক ও বক্তাবৃন্দ মঞ্চ ছেড়ে চলে যান।” প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, “এরপর যুবকদের ঐ দলটি পুনরায় সুসজ্জিত হয়ে এসে মঞ্চে দখল করে নিয়ে মাইকে মাহফিল আয়োজনকারীদের খুঁজে বের করার ঘোষণা দিতে থাকে। এছাড়া মাহফিলের আয়োজকদের প্রতিরোধ করার আহ্বান জানায়। আর সাধারণ মানুষকে মাহফিলস্থল ত্যাগ করে চলে যেতে বলে। তারা এসময় মাহফিলের মাইকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করতে থাকে। এতে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ছুটতে থাকে।” মুসল্লিরা আরও জানান, “প্রায় সোয়া ১১ টা পর্যন্ত এরকম আতঙ্কিত অবস্থা চলতে থাকে। মাহফিলের সময় খোলা থাকা দোকান-পাটও এ সময় বন্ধ হয়ে যায়। তারা মাইকে এরূপ তান্ডব চালানোর সময় পুলিশ এসে মাহফিলের মঞ্চের চতুর্দিকে অস্ত্র তাক করে সাধারণ মুসল্লিদেরকে ৫ মিনিটের মধ্যে মাহফিলসহ এর আশ-পাশের এলাকা ত্যাগ করতে নির্দেশ দেয়।” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বস্ত্রব্যবসায়ী একজন নেতা জানান, “মাহফিল স্থলের পাশে একটি আবাসিক হোটেলের নিচ থেকে আমাদের ব্যবসায়ী নেতা আলহাজ্ব নূরুদ্দীন আহমেদ বাবলুকে রাত ১২টার দিকে পুলিশ আটক করে নিয়ে গেছে।” এ ব্যাপারে পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আহসানুল হক জানান, তাফসির মাহফিলে বক্তাগণ এলোমেলো কথা বললে ছেলে-পেলেদের দলবদ্ধভাবে মাহফিলের দিকে আসতে দেখে বক্তারা মাহফিলের মঞ্চ ত্যাগ করেন। এতে উপস্থিত মুসল্লিদের অনেকেই আতঙ্কিত চলে গেলে মাহফিলটি শেষ হয়ে যায়।” তবে গুলি বা পটকা ফাটানোর কথা তিনি অস্বীকার করলেও শহরের পরিস্থিতি থমথমে রয়েছে বলে জানান। তিনি আরও বলেন, “নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে রাত ১২টার দিকে মাহফিলের আয়োজক আলহাজ্ব নূরুদ্দীন আহমেদ বাবলুকে আটক করে পাবনা থানায় আনা হয়েছে এবং তাকেসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে স্থানীয় আওয়ামীলীগের কোন নেতার সাথে কথা বলা সম্ভব না হলেও ঘটনাস্থলে আগত কয়েকজন আওয়ামীলীগ ও যুবলীগ কর্মীরা উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, “বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির নাম করে জামায়াত-শিবির সংঘটিত হওয়ার চেষ্টা করছিল। একই সাথে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীকে হেয় করার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকার মন্তব্য করছিল এবং সরকার বিরোধী বিভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছিল তারা। এ জন্যেই জনতা তাদের মাহফিল বন্ধ করে দিয়েছে।” সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে জনসাধারণের অনেক জুতা-সেন্ডেল পড়ে থাকতে দেখা গেছে। মাহফিলস্থল আওরঙ্গজেব রোড ছাড়াও পার্শ্ববর্তী খলীফাপট্টি রোড, বেনিয়াপট্টি রোড, সোনাপট্টি রোড, দই বাজার মোড়, বড় বাজার এলাকা এবং নিউ মার্কেট এলাকায় হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও মুসল্লীবৃন্দের পাশাপাশি ধর্মপ্রাণ মহিলারাও অংশগ্রহণ করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ