ঢাকা, শুক্রবার 21 September 2018, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ১০ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

দুর্ঘটনায় ছয় বছরে ৩,০০০ শ্রমিক নিহত

ডয়েচে ভেলে: ভবন ধস, আগুনসহ নানা দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে গত ছয় বছরে কর্মক্ষেত্রে প্রায় তিন হাজার শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এর বড় অংশই পোশাক কারখানার শ্রমিক।
‘সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি’ ও ‘বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)’ সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত শতাধিক ঘটনায় এসব শ্রমিক নিহত হন।
এর মধ্যে শুধু চলতি বছরে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে ২১৭টি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৬০ জন শ্রমিক। এর মধ্যে অগ্নিকাণ্ডে ১২ জন।
পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মোট ৩,০৩৬ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন ২৪৭ জন। আর ভবন ধসে প্রায় দুই হাজার শ্রমিক নিহত হয়েছেন। মোট নিহত শ্রমিকদের দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি তৈরি পোশাক কারখানার৷
বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন, ‘কারখানাগুলো শ্রমিক নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত নজর না দেয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের পর অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক চাপে পোশাক কারখানার মালিকরা কারখানায় শ্রমিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে উদ্যোগ নিয়েছে সত্য কিন্তু তা সর্বক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নয়। আর পোশাক কারখানা ছাড়া অন্য যেসব কারখানা রয়েছে সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ রয়েই গেছে। সেদিকে নজর দেয়ার কেউ নেই।’
‘শ্রমিকের নিরাপত্তায় আইন পর্যাপ্ত নয়’-মন্তব্য করে সিরাজুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনার কবলে পড়ে আহত ও নিহতদের ক্ষতিপূরণের বিধানও কার্যকর নয়। যা আছে তাও যৎসামান্য। শ্রমিকদের গ্রুপ বিমার নামে যা চালু আছে তা হাস্যকর। তাজরীন ফ্যাশনে আগুন লাগার পর দেখা গেছে গ্রুপ বিমার নামে সর্বোচ্চ ৫০ জন শ্রমিক ক্ষতিপূরণ পাবেন। তাও জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকার কম।
এদিকে মানবাধিকার নেতা এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক নূর খান বলেন,‘কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যে কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব৷ কিন্তু বাংলাদেশে তা হচ্ছে না। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পোশাক কারখানায় শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু নিজেদের তাগিদ থেকে, দায়িত্ববোধ থেকে না হলে সেই কাজ শেষ পর্যন্ত কতটুকু নির্ভরযোগ্য হবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে।’
তিনি বলেন,‘আমাদের দেশের শিল্প কারখারনার মালিকরা মুনাফাকেই প্রধান করে দেখেন। তাই তারা চান শ্রমিকদের কম সুবিধা নিয়ে বেশি মুনাফা করতে- যা দুঃখজনক।’
‘শ্রম মন্ত্রণালয় বা কারাখানা পরিদর্শকরাও তাদের দায়িত্ব ঠিকমত পালন করেন না। ফলে শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে এত বেশি হারে দুর্ঘটনায় নিহত হচ্ছেন’ বলে মনে করেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এই পরিচালক।
অন্যদিকে মজুরি কমিশনের সাবেক প্রধান ইকতেদার আহমেদ বলেন,‘শ্রমিক নিরাপত্তার বিষয়টি ২০১৪ সালের সংশোধিত শ্রম আইনে পরিস্কার করা হয়েছে। কিন্তু এই আইন মানা হচ্ছে না। সরকারের দায়িত্ব হল এই আইন যাতে সবাই মানেন তার ব্যবস্থা করা। কিন্তু সরকার তা করছে বলে মনে হয় না।’
তিনি বলেন,‘আহত বা নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের যে বিধান তা সামান্য। আর তা আদায় করাও জটিল। মামলা ছাড়া তা আদায় করা যায় না৷ দরিদ্র শ্রমিকরা মামলা করতে পারেন না। আর ক্ষতিপূরণও পান না। রানা প্লাজা ধসের পর যেটুকু ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে তাও ত্রিপক্ষীয় চুক্তির কারণে।’
‘সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি’ ও ‘বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)’ তাদের প্রতিবেদনে গার্মেন্টসের মতো প্রতিটি সেক্টরে নিরাপত্তা কার্যক্রম বাড়ানো এবং রাজউক, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরসহ আইন বাস্তবায়নকারী অন্যান্য সংস্থার দক্ষতা ও যোগ্যতা বৃদ্ধি করাসহ ছয়টি সুপারিশ করেছে শ্রমিক নিরাপত্তার জন্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ