ঢাকা, বুধবার 21 November 2018, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মোদি-নওয়াজের দূরত কমলো না

সংগ্রাম ডেস্ক : সার্ক সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দুই শীর্ষ প্রতিবেশী দেশ ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্কের বরফ গলার যে আশা এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ছিল তা আশাই থেকে গেল। দুই দেশের দুই শীর্ষনেতা নিজেদের মধ্যকার দূরত্ব ঘুচাতে পারলেন না।

বুধবার সার্ক শীর্ষ-সম্মেলনে তিন ঘণ্টার বৈঠকে ছিটেফোঁটা সৌজন্য-বিনিময়ও হল না দুই  প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে। নরেন্দ্র মোদি এবং নওয়াজ শরীফ দুজন দুজনের দিকে এক বারও চেয়ে দেখলেন না পর্যন্ত।

সার্ক শীর্ষ বৈঠক চলাকালীন ভারত ও পাকিস্তানের আলাদা করে সাক্ষাতের সম্ভাবনা যে নেই, তা স্পষ্ট হয়েছে বুধবারই। তবু কাঠমুণ্ডুতে গোটা বিশ্বের নজর ছিল এই দুই দেশের দিকেই। কিন্তু চুক্তি-আলোচনা এ সব পেরিয়ে ভারত-পাক সীমান্তের চাপা উত্তেজনাই যেন উঠে এল সার্ক বৈঠকের মঞ্চে।

মলদ্বীপ আর নেপালের প্রধানমন্ত্রী বসে ছিলেন দু’জনের মাঝে। তাদের পাশ থেকেই উঠে শরিফ ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে পেছন দিয়ে তাকে পেরিয়ে মঞ্চে উঠলেন, বক্তৃতা করলেন। মোদিকে যেন দেখলেনই না। পাল্টা এল মোদির তরফেও।

করমর্দন দূরে থাক, মঞ্চে ওঠার পরে যিনি নিজের প্রথম সার্ক শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশের শেখ হাসিনা, শ্রীলঙ্কার মাহিন্দা রাজাপক্ষে, এমনকী আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরফ ঘনিকে শুভেচ্ছা জানালেন। ভুলেও নাম করলেন না নওয়াজ শরিফের।

কূটনীতিকরা জানাচ্ছেন, কার্গিল যুদ্ধ পরবর্তী সার্ক সম্মেলনে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর সঙ্গে এক রকম নাটকীয় ভাবেই হাত মেলান সে সময়ের পাক প্রধানমন্ত্রী পারভেজ মোশাররফ।

দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের শৈত্য সত্ত্বেও মোশাররফের সেই আচরণে চমকে যান সবাই। এ বার সেই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে কি না, তা দেখতে উদগ্রীব ছিলেন অনেকেই।

কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, শরীফের পক্ষে নিজে উদ্যোগী হয়ে এ কাজ করা সম্ভব ছিল না। ভারত নিয়ে কড়া অবস্থান বজায় না রাখলে তিনি নিজের দেশেই সমালোচিত হতেন। আর মোদি এগিয়ে এসে সৌজন্য দেখালে আখেরে লাভ হত শরীফেরই। কিন্তু কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের সঙ্গে পাক রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাতের পর দুই দেশের বিদেশসচিব পর্যায়ের বৈঠক বাতিল করে ভারত।

আর ২৬/১১-র ছ’বছর পূর্তিতে মোদি যে এ ব্যাপারে সক্রিয়তা দেখাবেন না, সেটাই প্রত্যাশিত। উল্টে পাকিস্তানের সঙ্গে দূরত্ব আরো স্পষ্ট করে দিয়ে অন্য দেশের প্রধানমন্ত্রীদের সৌজন্য দেখাতে কসুর করেননি ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

সার্কভুক্ত দেশগুলির উন্নয়নে ভারত কীভাবে কাজ করতে চায়, এর পরেই মোদি চলে যান সেই প্রসঙ্গে। পড়শি দেশের মধ্যে রেল-রাস্তা-বিদ্যুৎ-ট্রানজিট যোগাযোগের মাধ্যমে ভারত-বাংলাদেশ যোগাযোগ দৃঢ় হয়েছে, শক্তি ক্ষেত্রে ভারত-নেপাল সহযোগিতার নয়া যুগ তৈরি করতে চলেছে, জোরদার হচ্ছে ভারত-ভুটান সম্পর্ক, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে সহজ হয়েছে ভারত-শ্রীলঙ্কার ব্যবসায়িক লেনদেন, দূরত্ব এবং প্রতিবন্ধকতা বাধা হয়নি আফগানিস্তান-ভারতের সম্পর্ক তৈরিতে, ভারত-পাকিস্তানের রেল-বাস যোগাযোগ সাহায্য করছে দুই দেশের মানুষকে এ সব উদাহরণ দিয়ে মোদি বোঝাতে চেয়েছেন দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নেতৃত্বের রাশ তিনি নিজের হাতেই রাখতে চান।

পাশাপাশি ২৬/১১-র ছয় বছর পূর্তিতে সন্ত্রাসবাদীদের মদত দেয়া বন্ধ করতে মোদি বার্তা দিয়েছেন সব দেশকে। কিন্তু নওয়াজ শরীফ তার বক্তব্যে এমন কোনো প্রসঙ্গই রাখেননি যাতে সন্ত্রাস দমনে পাকিস্তানের উদ্যোগ চোখে পড়ে।

কূটনীতিকদের মতে, সার্ক সম্মেলনে তেমন ইতিবাচক কোনো বার্তা দিতে পারল না ভারত বা পাকিস্তান। তা ছাড়া, মোদি আজ সার্ক-গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলির সুবিধায় উপগ্রহ উৎক্ষেপণ, মুক্ত বাণিজ্য, সহজে বাণিজ্যিক ভিসা এমন নানা প্রতিশ্রুতির আশ্বাস দিলেও পাকিস্তানের নেতিবাচক অবস্থানে ফিকে হয়েছে সবই।

যোগাযোগ ব্যবস্থা সংক্রান্ত চুক্তির মধ্যে ‘মোটর ভেহিকলস্ প্যাক্ট’সহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে সায় দেয়নি পাকিস্তান। প্রতি দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সহজে পণ্য পরিবহণ জোরদার করতে যেখানে সব দেশ সক্রিয়, সেখানে পাকিস্তানের এই অবস্থান হতাশ করেছে অনেককেই। কারণ শুধু একটি দেশের আপত্তির ফলে এই সব প্রকল্প রূপায়ণ জোর ধাক্কা খেল।

তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তান জেনেবুঝেই এই পদক্ষেপ করেছে। কারণ সার্কে সদস্যপদ পেতে চিন তৎপর হওয়ায় এমনিতেই উদ্বেগে রয়েছে ভারত। সার্কভুক্ত দেশগুলির মধ্যে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নিতে পারে চিন, সেই আশঙ্কায় ভারত চাইছে চিনকে ঠেকিয়ে রাখতে।

কূটনৈতিক সূত্রে দাবি, সেই জন্যই চিনের সদস্যপদের জন্য সওয়াল করছে পাকিস্তান। কিন্তু চিনের সঙ্গে মিলে ভারতকে কোণঠাসা করার পাকিস্তানের চেষ্টা রুখতে চায় ভারত। তাই ভারতের প্রস্তাবিত চুক্তিতে সায় না দিয়ে পাল্টা বার্তা দিল পাকিস্তান।
সূত্র: আনন্দবাজার

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ