ঢাকা, রোববার 23 September 2018, ৮ আশ্বিন ১৪২৫, ১২ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশে দুর্নীতি আগের চেয়ে বেড়েছে

‘দুর্নীতির ধারণা সূচক ২০১৪’ প্রকাশ অনুষ্ঠানে টিআইবি

# দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় সরকারকেই নিতে হবে----সুলতানা কামাল

# আমাদের দেশে সংস্থাগুলো বরাবরই দুর্নীতির কথা অস্বীকার করে---ড. ইফতেখারুজ্জামান

স্টাফ রিপোর্টার : বৈশ্বিক দুর্নীতির ধারণা সূচকে (সিপিআই) বাংলাদেশে দুর্নীতি আগের চেয়ে বেড়েছে। বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) সিপিআই-এ দক্ষিণ এশিয়ার ৭টি দেশের মধ্যে দুর্নীতিতে দ্বিতীয় স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ আর বৈশ্বিক দুর্নীতির সূচকে ১৪তম। দেশে দুর্নীতি বেড়ে যাওয়ায় সূচকে আগের বছরের চেয়ে দু’ধাপ অবনমন হয়েছে। ২০১৩ সালে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৬তম।

গতকাল বুধবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে টিআইয়ের পক্ষে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক সাংবাদিক সম্মেলন করে এ তথ্য জানায়। সাংবাদিক সম্মেলনেই টিআই’র এ বছরের সিপিআই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। দুর্নীতির ধারণা সূচক নিচের দিকে গেলে দুর্নীতি কমে। আর উপরের দিকে এগোলে দুর্নীতি বাড়ে। সাংবাদিক সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে  উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন এডভোকেট সুলতানা কামাল, সদস্য এম হাফিজউদ্দিন খান, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এ টি এম শামসুল হুদা, উপ-নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের প্রমুখ।

টিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে দুর্নীতিতে প্রথম অবস্থানে রয়েছে আফগানিস্তান (স্কোর-১২)। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ভাল অবস্থানে রয়েছে ভুটান অর্থ্যাৎ দেশটির দুর্নীতি এ অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে কম। ঊর্ধ্বক্রম অনুসারে তালিকায় ভুটানের অবস্থান ৩০তম (স্কোর ৬৫)। শ্রীলঙ্কা ও ভারতের স্কোর ৩৮ এবং নেপাল ও পাকিস্তানের স্কোর ২৯। দুর্নীতির ধারণা সূচকের ১০০ এর স্কেলে বাংলাদেশের স্কোর ২৫, যা ২০১৩ সালের তুলনায় ২ পয়েন্ট কমেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশে দুর্নীতি বেড়েছে। ঊর্ধ্বক্রম অনুসারে তালিকায় ৯ ধাপ নিচে নেমে বিশ্বের ১৭৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৪৫তম অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের মতো একই স্কোর পাওয়া অন্যান্য দেশগুলো হলো গিনি, লাওস, কেনিয়া ও পাপুয়া নিউ গিনি। ২০১৩ সালে বেশী দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় নিচের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬তম ছিল। মোট স্কোর ২৭ পেয়ে বিশ্বের ১৭৭টি দেশের মধ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার দিক দিয়ে সূচকে ৮ ধাপ এগিয়ে ১৩৬তম অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ।

এ বছর দুর্নীতির ধারণা সূচকে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ সোমালিয়া ও উত্তর কোরিয়া। সূচকের নিম্নক্রম অনুসারে ১৭৫টি দেশের মধ্যে এই দু’দেশের অবস্থান ১৭৪। ওই দু’দেশের স্কোর ৮। আর সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে রয়েছে ডেনমার্ক। ১০০ স্কেলের মধ্যে দেশটির স্কোর ৯২। কম দুর্নীতিগ্রস্ত ১০টি দেশের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে নিউজিল্যান্ড (স্কোর ৯১) ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ফিনল্যান্ড (স্কোর ৮৯)।

টিআইবি মনে করে, বাংলাদেশে দুর্নীতি বাড়ার মূল কারণ দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণে ঘাটতি, দুদকে স্বাধীনতা খর্বের উদ্যোগ ও দুদকের প্রত্যাশিত সক্রিয়তার ঘাটতি, দুর্নীতির ঘটনায় জড়িতদের বিচারের সম্মুখীন করার ঘাটতি, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা, স্বার্থের দ্ব›দ্ধ, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ ও উচ্চমাত্রায় অবৈধ অর্থের পাচার।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল বলেন, বিগত বছরগুলোতে আমরা আমাদের অগ্রগতি ধরে রাখতে পারিনি, যা খুব উদ্বেগজনক। এর কারণ হচ্ছে, দেশের সব সেক্টরে নির্বাহীদের ক্ষমতার প্রয়োগ এবং অধস্তনদের প্রতি ঊর্ধ্বতনদের কর্তৃত্ব কাজ করে। এর কারণে সংসদ সদস্যরাও স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করতে পারে না। এছাড়া দুর্নীতির বিচারহীনতাও একটি বড় কারণ বলে মনে করা হয়।

তিনি আরো বলেন, দুর্নীতির কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশের মতো অন্য কোনো দেশে সাধারণ মানুষ দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। যে কোনো প্রকার দুর্ঘটনাও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। খতিয়ে দেখলে পাওয়া যাবে, এতে জড়িত আছে উচ্চপর্যায়ের কোনো ক্ষমতাশালী ব্যক্তি। এর কারণ হচ্ছে প্রভাব। তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর ও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ আমরা দেখতে পাইনি। সে কারণে রাজনৈতিক অঙ্গীকার অনুযায়ী কার্যকরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় সরকারকেই নিতে হবে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতি উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে উন্নতি করা সম্ভব নয়। এ জন্য আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করার কথা থাকলেও সেভাবে কাজ করতে পারছে না। বিশেষ করে দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না।  এছাড়া দুর্নীতির ঘটনায় জড়িতদের বিচারের সম্মুখীন করার ঘাটতি বা দুর্নীতি অস্বীকৃতির মানসিকতাও দেশের দুর্নীতি বাড়িয়ে দেয় বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, পদ্মা সেতু, রেলওয়েতে নিয়োগ, শেয়ারবাজার, হলমার্ক, ডেসটিনি, সোনালী ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংক, রানা প্লাজা, ক্ষমতাবানদের বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন সম্পদ অর্জনের কোনো বিচার হয় না।  আমাদের দেশে সংস্থাগুলো বরাবরই দুর্নীতির কথা অস্বীকার করে। ফলে মানুষ আরো বেশি দুর্নীতি করতে চায়। তিনি আরো বলেন, আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশে দুর্নীতি যদি মধ্যম সারির পর্যায়ে উন্নীত করা যায়, তবে জিডিপি আরো ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

সিপিআই ২০১৪ এর জন্য বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সূত্র হিসেবে ৭টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য যথাক্রমে: বার্টেলসমান ফাউন্ডেশন পরিচালিত ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স, ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট পরিচালিত কান্ট্রি রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট্, গ্লোবাল ইনসাইটের কান্ট্রি রিস্ক রেটিংস্, পলিটিক্যাল রিস্ক সার্ভিসেস এর ইন্টারন্যাশনাল কান্ট্রি রিস্ক গাইড, বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনস্টিটিউশনাল অ্যাসেসমেন্ট, ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের এক্সিউকিউটিভ ওপিনিয়ন সার্ভে এবং ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট পরিচালিত রুল অব ল’ ইনডেক্স এর রিপোর্টসমূহের জরিপ ব্যবহৃত হয়েছে।

সাংবাদিক সম্মেলনে জানানো হয়, সিপিআই নির্ণয়ে টিআইবি কোনো ভূমিকা পালন করে না। এমনকি টিআইবি’র গবেষণা থেকে প্রাপ্ত কোনো তথ্য বা বিশ্লেষণ সিপিআই-এ পাঠানো হয় না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের টিআই চ্যাপ্টারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অন্যান্য দেশের টিআই চ্যাপ্টারের মতই টিআইবি দুর্নীতির ধারণা সূচক স্থানীয় পর্যায়ে প্রকাশ করে মাত্র।

টিআইবি’র পক্ষ থেকে দুর্নীতি কমাতে কিছু করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে। যার মধ্যে- রাজনৈতিক সদিচ্ছাই মূল চাবিকাঠি। এছাড়া ভয় বা করুণার ঊর্ধ্বে উঠে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিকাঠামো শক্তিশালীকরণ, সংসদকে কার্যকর করা, দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনাত ও কার্যকারীতা, বিচারিক প্রক্রিয়ায় সততা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে সততা নিশ্চিত করাসহ দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, প্রধান প্রধান জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা এবং দুর্নীতি বিরোধী চাহিদা বৃদ্ধির জন্য সুশীল সমাজসহ সাধারণ নাগরিক, গণমাধ্যম, এনজিওগুলোর সক্রিয় ভূমিকা পালন করা।
 প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করল দুদক : এদিকে, টিআইয়ের দুর্নীতির ধারণা সূচক প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। টিআইয়ের প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর বিষয়টি সম্পর্কে দুদকের অবস্থান জানতে সংস্থাটির কমিশনার সাহাবুদ্দিনের কাছে যান সংবাদকর্মীরা। সংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিবেদনটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে সাহাবুদ্দিন বলেন, টিআইবির পরিসংখ্যান প্রকৃত চিত্রের চেয়ে ভিন্নতর। দুদক তাদের প্রতিবেদনের সঙ্গে একমত নয়। তিনি বলেন, বাস্তবতার নিরিখে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি গ্রহণযোগ্য নয়। যদিও তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনটি আমরা এখনো হাতে পাইনি। হাতে পেলেও সেটা গ্রহণযোগ্য হবে বলে মনে করি না।#

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ