ঢাকা, বুধবার 19 September 2018, ৪ আশ্বিন ১৪২৫, ৮ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ছিটমহল নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে শুরু হল নতুন রাজনীতি!

রাজ্যশ্রী বকসী, কলকাতা: ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সংক্রান্ত স্থলসীমান্ত চুক্তি নিয়ে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন আগাগোড়াই বিরোধিতা করে গিয়েছেন এবং একই পথে তখন হেঁটেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির রাজ্য সভাপতি রাহুল সিনহাও।
মমতার নির্দেশে যখন সংসদে এই বিষয়ে বিল পেশ হওয়া মাত্র ওয়েলে নেমে হইচই করে, কাগজ ছিঁড়ে অধিবেশন ভেস্তে দিয়েছিলেন তৃণমূল সাংসদরা, তেমনিই ইউপিএ আমলে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিটমহল বিনিময় সংক্রান্ত স্থলসীমান্ত চুক্তি বিলটি সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিলেও রাহুল সিনহার আপত্তিতে তা ঘোষণা করতে পারেননি। আর নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি সাজাতে গিয়ে রাহুলবাবু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বুঝিয়েছিলেন, ছিটমহল বিনিময়ের বিরোধিতা করেই বেশি রাজনৈতিক লাভ। তাই তৃণমূল এই পথ নিয়েছে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার কোচবিহারের নয়ারহাটে ছিটমহলের ধারে জনসভা ডেকে যখন অবস্থান বদলান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তখন সেই বিনিময়ের মতের কৃতিত্ব নিতে দেবেন না বলে জানিয়ে
রাজ্য বিজেপি সভাপতি রাহুল সিনহা।
তিনি ঘোষণা করলেন, তিনিই বরাবর এই দাবি করে আসছেন। তার আরও দাবি, আসলে বরাবরই তিনি ছিটমহল বিনিময়ের পক্ষে। ছিটমহলবাসীর অধিকার রক্ষায় তিনি চিরকাল সরব হয়ে এসেছেন, ভবিষ্যতেও হবেন।
শনিবার রাজ্য বিজেপি সভাপতিও কার্যত একই দাবি করে বোঝালেন, ছিটমহল নিয়ে ফায়দা তুলতে বিজেপি ও তৃণমূলের কেউ কারও চেয়ে পিছিয়ে থাকতে রাজি নন। নরেন্দ্র মোদী সরকার ছিটমহল বিনিময়ে উদ্যোগী হওয়ার পর রাহুলবাবু বলেন, “জনসঙ্ঘ ধারাবাহিকভাবে ছিটমহল বিনিময়ের দাবিতে আন্দোলন করে এসেছে।” তার অভিযোগ, মমতা মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ছিটমহল বিনিময়ের বিপক্ষে কড়া অবস্থান
নিলেও এখন তার অবস্থান ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়েছে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কেন্দ্রকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে, ছিটমহল বিনিময়ে তাদের আপত্তি নেই।
মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি রাহুলবাবুর কটাক্ষ, “যিনি আগে ছিটমহল বিনিময়ের বিরোধী ছিলেন, তিনি এখন তার কৃতিত্ব দাবি করছেন। এটা হতে দেব না। ১১ ডিসেম্বর দিনহাটাতেই জনসভা করে আমি মুখ্যমন্ত্রীর অবস্থান বদলের নেপথ্য কাহিনি মানুষকে জানাব।”
অপরদিকে তড়িঘড়ি ভারত আর বাংলাদেশের ১৬২টি ছিটমহলে আবারও নতুন করে সমীক্ষা করা হচ্ছে। যা থেকে বোঝা যাবে ছিটমহল বিনিময় হওয়ার পরে ঠিক কতজন নাগরিকত্ব পরিবর্তন করতে চান। ভারতের সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে স্থলসীমা চুক্তি সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিলটি নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যে পৌঁছানোর পরেই সম্ভাব্য ছিটমহল বিনিময়ের পরবর্তী পর্যায়ের পরিকল্পনা শুরু করেছেন ছিটমহলের বাসিন্দারা। এই ধরণের একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল ছিটমহল বিনিময় আন্দোলনের সদস্যরা এর আগেও।
ভারত বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সেই সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ভারতীয় ছিটমহলগুলির মাত্র ৭৪৩ জনের মতো নাগরিক বিনিময়ের পরে ভারতের নাগরিকত্ব রেখে দিতে চেয়েছিলেন, বাকিরা বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে যাবেন বলে মনস্থির করেছিলেন। অন্যদিকে ভারতের ভেতরে থাকা বাংলাদেশী ছিটমহলগুলির কোনো নাগরিকই বাংলাদেশের নাগরিক থাকতে
চান নি, সবাই ভারতের নাগরিকত্ব নেয়ার মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন। সমন্বয় কমিটির সম্পাদক দীপ্তিমান সেনগুপ্ত বলেন, “আগের সমীক্ষার পরে বেশ কিছু মানুষ নিজেদের মত পরিবর্তন করেছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। তাই নতুন করে সমীক্ষার প্রয়োজন হয়েছে। ১৬২টি ছিটমহলেই এই কাজ শুরু করেছি আমরা।”
বিগত সমীক্ষা অনুযায়ী ভারত আর বাংলাদেশের ছিটমহলগুলিতে মোট ৫১ হাজার ৫৮৪ জন মানুষ বাস করেন। কোনো দেশের ছিটমহলের কত মানুষ অন্য দেশে স্থানান্তরিত হতে চান, তার ওপরে ভিত্তি করেই তৈরি হবে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা।
“যারা ভারতীয় ছিটমহলগুলো থেকে ভারতের মূল ভূখণ্ডে যেতে চান, তাদের জন্য জমি, বাসস্থান, উপার্জনের ব্যবস্থা আর দৈনন্দিন জীবনযাপনের ব্যবস্থা থাকবে, সেই জন্যই ঠিক কত লোককে পুনর্বাসন দিতে হবে, সেটা জানা জরুরি,” বলছিলেন সেনগুপ্ত।
এখন দেখার একটাই যে পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন ভোটের আগে বহু প্রতিক্ষিত ছিটমহল সমস্যার সমাধানে ছিটমহল অধ্যুষিত এলাকার এই ৫১ হাজার ৫৮৪ জন মানুষের ভাগ্যে কি ঘটে!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ