ঢাকা, বুধবার 21 November 2018, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

তিস্তা চুক্তিতে আবারও আপত্তি

তিস্তা চুক্তির আশার গুড়েতে আবারও বালু পড়েছে। এবার বালু ঢেলে দেয়ার কাজটুকু করেছেন পশ্চিম বঙ্গের সেচমন্ত্রী রাজিব ব্যানার্জি। ঢাকায় পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, যুক্তিও চমৎকারই দেখিয়েছেন তিনি। বলেছেন, বাংলাদেশ তাদের শুধু প্রতিবেশী নয়, আত্মীয়ও। কিন্তু নিজে খাওয়ার পর অতিরিক্ত থাকলেই তো প্রতিবেশীর কথা মনে পড়বে! তার রাজ্যের উত্তরাঞ্চলীয় ছয়টি জেলার চাষীদের এখন নাকি প্রচুর পানির দরকার। অন্যদিকে তিস্তায় যে পরিমাণ পানি আছে তা মোটেই পর্যাপ্ত নয়। সুতরাং বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা চুক্তির বাস্তবায়ন আপাতত সম্ভব নয়। ভবিষ্যতের ব্যাপারেও নেতিবাচক কথাই জানিয়ে রেখেছেন এই মন্ত্রী। বলেছেন, শুষ্ক মওসুমে অর্থাৎ এপ্রিল-মে মাসে তিস্তায় একেবারেই পানি থাকে না। তিস্তা তখন সরু খালে পরিণত হয় বলে ওই অঞ্চলের জেলাগুলোতে পানির জন্য হাহাকার শুরু হয়ে যায়। তার ওপর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরসহ কয়েকটি জেলায় আরো দুই লাখ হেক্টর জমিতে সেচের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সেচের জন্য প্রয়োজনীয় পানির একটা বড় অংশ নিতে হবে তিস্তা থেকে। সে কারণেও তিস্তা চুক্তিতে পশ্চিম বঙ্গের পক্ষে রাজি হওয়া সম্ভব নয়। মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটিও নাকি চুক্তির বিপক্ষেই অভিমত প্রকাশ করেছে। তাছাড়া বিষয়টির সঙ্গে বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ছাড়াও দিল্লীর কেন্দ্রীয় সরকার জড়িত রয়েছে। সকলের ঐকমত্য না হলে চুক্তির বাস্তবায়ন করা যাবে না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেচমন্ত্রী।
সর্বশেষ উপলক্ষে পশ্চিম বঙ্গ রাজ্য সরকারের একজন মন্ত্রীকে দিয়ে বলানো হলেও বিশেষ করে তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে ভারতীয়রা প্রথম থেকেই বাংলাদেশ বিরোধী অবস্থান বজায় রেখেছেন। সম্প্রতি বিদায় নেয়া প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং তার অন্য মন্ত্রীরাও সব সময় বহুবার শোনা আশ্বাসের বাইরে এক ইঞ্চি পরিমাণ এগিয়ে আসেননি। তারা একই সাথে বাঙ্গালকে হাই কোর্ট দেখানোর ঢঙে ভারতের সংবিধান এবং লোকসভা ও রাজ্যসভার তথা পার্লামেন্টের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান দিয়ে জানিয়েছেন, ভারত বাংলাদেশের মতো ছোট কোনো এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র নয় বরং প্রায় ৩০টি রাজ্যের সমন্বয়ে গঠিত একটি যুক্তরাষ্ট্র। এজন্যই তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের মতো যে কোনো বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর সম্মতি ও অনুমোদন দরকার পড়ে। কিন্তু পশ্চিম বঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমুূল কংগ্রেস চুক্তির বিরোধিতা করে চলেছে। তাছাড়া শুধু কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকার চাইলেই চলবে না, এ ধরনের বিষয়ে বিরোধী দলেরও সমর্থন থাকতে হবে। এভাবেই নানা অজুহাত দেখিয়ে এবং কথার মারপ্যাঁচ খাটিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য বিরাট বিরাট ‘না’ পাঠিয়েছেন ভারতীয় নেতারা। এই একটি বিষয়ে কংগ্রেস এবং নরেন্দ্রনাথ মোদীর বিজেপি সরকারের মধ্যে কোনো মতানৈক্য দেখা যায়নি। এখনো যাচ্ছে না। পাশাপাশি রয়েছেন তৃণমুূল কংগ্রেসের নেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার কাছে তিস্তা নাকি পশ্চিম বঙ্গের চাষীদের জন্য ‘লাইফ লাইন’। সে কারণে বাংলাদেশের কোনো মন্ত্রী কখনো দিল্লি বা কোলকাতায় গিয়ে হাজির হলেও তাকে পত্রপাঠ বিদায় করা হয়েছে। অতীতের এই তিক্ত অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও সম্প্রতি নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত সার্ক সম্মেলনে উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর থেকে নতুন পর্যায়ে আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু সে আশার গুড়েও বালু ঢেলে দিয়েছেন পশ্চিম বঙ্গের সেচমন্ত্রী।
আমরা অবশ্য ভারতীয়দের এই মনোভাবে বিস্মিত হওয়ার কোনো যুক্তি দেখি না। তাদের জন্য এটাই বরং স্বাভাবিক। কারণ, বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতীয়রা স্বাধীনতার পর থেকেই এ মনোভাবই দেখিয়ে চলেছেন। তারা এমনকি ‘ভারতপন্থী’ হিসেবে নিন্দিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত মানসম্মান বাঁচানোর জন্যও তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর করেননি। অন্যদিকে দেশপ্রেমিকদের বিরামহীন দাবি উপেক্ষা করে এবং সব জেনে-বুঝেও আওয়ামী লীগ সরকার একটির পর একটি করে ‘চাহিবা মাত্র’ ঢঙে ভারতীয়দের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। ভারতের জন্য সাফল্যের সুদীর্ঘ সিঁড়ি নির্মাণ করে দিয়েছে কিন্তু বাংলাদেশের জন্য কিছুই অর্জন করতে পারেনি। ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সব ক্ষেত্রেই সরকারের অর্জন প্রকৃতপক্ষে প্রায় শূন্যই রয়ে গেছে। আমরা মনে করি, এভাবে চলতে পারে না, যখন দুর্বল একটি রাজ্য সরকারের একজন মন্ত্রীও বাংলাদেশকে সোজা না বলে দেয়ার সাহস দেখাতে পারেন। ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বরং সমতার ভিত্তিতে হওয়া দরকার। সে লক্ষ্যে এখনই দরকার কোমর সোজা করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা। সেটা একান্ত অনুগত কোনো সরকারের পক্ষে সম্ভব কি না তাও অবশ্য যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গেই ভেবে দেখা দরকার।





অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ