ঢাকা, বৃহস্পতিবার 11 December 2014 ২৭ অগ্রহায়ন ১৪২১, ১৭ সফর ১৪৩৬ হিজরী
Online Edition

ক্লাবের কাছে জিম্মি দেশের ফুটবল!

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : দেশের ক্লাব ফুটবলই ফুটবলের প্রাণ। কিন্তু নানা কারণেই ফুটবল মওসুম পেছানোর পাশাপাশি বন্ধ থাকে পেশাদার লিগের খেলা। এখন নতুন মওসুম শুরু নিয়ে যেমন দেখা দিয়েছে শঙ্কা, তেমনি মওসুম শেষ হবে কিনা তা নিয়েও দেখা দিয়েছে সে প্রশ্ন। ঘরোয়া ফুটবলের আসর শেষ হয়েছে চার মাসেরও বেশি সময় হতে চলল। নতুন আরেকটি মওসুমের অপেক্ষা যেন বেড়েইে চলেছে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) একটার পর একটা মিটিংয়ে পেছাচ্ছে ২০১৪-১৫ ফুটবল মওসুম। শিডিউলে আঁচড়টা কে দেয়, তা এখন অনেকটাই পরিস্কার। ক্লাবের দাবির কাছে নতি স্বীকার করেই পেছাচ্ছে ফুটবল মাঠে গড়ানো। যেমন করে সর্বশেষ মিটিংয়ে এক ঝটকায় ফেডারেশন কাপের আসর পিছিয়ে ৪০ দিন! ক্লাবগুলো যেভাবে চাইছে ঠিক, সেভাবেই পরিচালিত হচ্ছে দেশের ঘলোয়া ফুটবলের আসর। এখন শঙ্কা দেখা দিয়েছে ফুটবল মৌসুমের ক্যালেন্ডার শেষ করার। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ফুটবলের বড় শত্রু কারা। সেখানে সবার আগে নাম এসেছে ক্লাবগুলোর! পেশাদারিত্বের খোলসে ঢুকলেও বাফুফে রীতিমতো জিম্মি করে রেখেছে প্রিমিয়ার ও চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের দলগুলো। পেশাদার লিগের বাইলজের দু-তিনটা ছাড়া অন্য সব ধারা পরোয়া করে না ক্লাবগুলো। সে কারণে শেখ জামালের মতো বড় ক্লাব পরোয়া করে না বাফুফের কোনো নির্দেশনা। যেমন করে দেশসেরা এ ক্লাবটি প্রথমে অনূর্ধ্ব-১৬ এবং সবশেষ অনূর্ধ্ব-১৮ ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নেয়নি।
বয়সভিত্তিক এ প্রতিযোগিতায় প্রথমবার অংশ না নেয়ায় আর্থিক দন্ডের মুখে পড়লেও পরে এসে আবর সংশোধিত হয়নি শেখ জামাল। এছাড়া ক্ষমতার অংশীদার হলে তো আইন মানার কোনো প্রয়োজন নেই। এখন ক্লাবগুলোর মধ্যে প্রকাশ্যে যত বিভেদ থাকুক না কেন, লিগ কমিটিকে নিজেদের নির্দেশনা মতো চালাতে অন্তরালে অলিখিত সমঝোতা রয়েছে তাদের। জোট এতটা শক্ত, বাফুফের পেশাদার লিগ কমিটির প্রতিটি সিদ্ধান্তকে ঠুনকো বানিয়ে দেয়!
সর্বশেষ ২০১৪-১৫ মওসুমকে এক মাস পেছনে নিয়ে গেছে ক্লাব জোট। সেখানে বাফুফেকে মনে হয়েছে ননীর পুতুল! প্রতিষ্ঠানটি যেন ক্লাবগুলোর এজেন্ডা বাস্তবায়নেই দিনের পর দিন সহায়তা দিয়ে আসছে। ১৮ ডিসেম্বর জাপান অনূর্ধ্ব-২১ দলের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলবে জাতীয় দল। প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে এরই মধ্যে। লিগ কমিটি ১৯ ডিসেম্বর ফেডারেশন কাপ শুরুর সিদ্ধান্ত নিলেও গত সভায় পিছিয়ে নিয়েছে ২৫ জানুয়ারি। সভা সূত্র জানায়, ‘ক্লাব প্রতিনিধিদের ভাষ্যÑ দু-তিনটি ক্লাব ঘর গোছালেও অন্যরা এখনও অপ্রস্তুত!’ অথচ ১২ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা প্রিমিয়ার লিগের ফুটবলার নিবন্ধন প্রক্রিয়া। তবে ক্লাবগুলোর দাপটে সময় না আরেক দফা বাড়ায় লিগ কমিটি, তা-ই দেখার বিষয়। কারণ ২০১৪-১৫ মৌসুমের স্থানীয় ফুটবলার নিবন্ধনের সময় বাকি থাকলেও ক্লাবগুলো যেন ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিচ্ছে সময়।
অবশ্য ২০০৬-০৭ মওসুমে পেশাদার লিগ শুরুর পর থেকে শেষ তিন-চারদিনে প্রক্রিয়া সেরেছে ক্লাবগুলো। মূলত ১৬ থেকে ২৭ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের জন্য মওসুমে বিরতি পড়বে। তাই মওসুম সূচক টুর্নামেন্টের পর এক মাস ক্যাম্প চালাতে চায় না তারা। তাই কখন খেলা চলবে আর কখন ছেদ পড়বে, তাও জানেন না বাফুফে কর্তারা। এ কারণেই বাংলাদেশের ফুটবল যেন নামেই পেশাদার যুগে প্রবেশ করেছে এ কথা বলার পক্ষে যুক্তি রয়েছে যথেষ্ট। পুরো ফুটবলদুনিয়ায় পেশাদার লিগ হয় ফেডারেশনের বাইরে স্বতন্ত্র কমিটির আওতায়। ৭ মওসুম পরও সে পথে যেতে পারেনি বাফুফে! পেশাদার লিগের অন্যতম শর্ত- নিজস্ব ভেন্যু, ফ্যান ক্লাব, বয়সভিত্তিক দল থাকা বাধ্যতামূলক। পেশাদারিত্বে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও কিছুই নেই শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের! অর্থ সঙ্কটের অজুহাতে দু-দুটি বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টে অংশ নেয়নি তারা। অথচ কলকাতার আইএফএ শিল্ডে রানার্সআপ ও ভুটানের কিংস কাপ জিতে এশিয়ার ফুটবলে নিজেদের ‘পরাশক্তি’র তালিকায় ঢুকিয়েছে। ঢাকার বাইরে নেপাল ও শ্রীলঙ্কার প্রীতি ম্যাচে দর্শকঢল দেখে সিলেট, রাজশাহী এবং যশোরে ভেন্যু করার মৌখিক প্রস্তাব দিয়েছিল শেখ জামাল, মোহামেডান ও বিজেএমসি। কিন্তু অর্থ সঙ্কট দেখিয়ে ঢাকার বাইরে খেলতে রাজি না কেউই! ঢাকার বাইরে ভেন্যু করার ঘোষণাকে তাই ফাকা বুলিই বলছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ফুটবল মওসুমে সুপার কাপ আয়োজনে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয় বাফুফে। নেপথ্য কারণ ছিল দুটি। স্পন্সর সঙ্কট ও সময়স্বল্পতা। লক্ষণীয় বিষয় ওই ব্যর্থতা থেকেও শিক্ষা নেয়নি বাফুফের পেশাদার লিগ কমিটি। এবার শুরু থেকেই কাবগুলোর কথায় বশ্যতা স্বীকার তাদের, যা চলতি মওসুমেও নির্ধারিত সব আসর আয়োজন সম্ভব না হওয়ার ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
ফেডারেশন কাপ ১৯ ডিসেম্বরের বদলে ২৫ জানুয়ারি থেকে শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়ে যেন সে দিকেই এগোচ্ছে বাফুফে। কোটি টাকার সুপার কাপ নিয়ে গত মওসুমে কথা আর আশ্বাসের ঢল বইয়ে দিয়েছিলেন পেশাদার লিগ কমিটির চেয়ারম্যান। অথচ বাস্তবতা হলো মাঠেই গড়ায়নি এ মর্যাদাপূর্ণ আসর। অথচ ভারত এক টুর্নামেন্ট দিয়ে নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো দেশের ফুটবল। বাংলাদেশের সুপার কাপও ছিল এমন এক টুর্নামেন্ট। ২০০৯ সালে প্রথম আয়োজনে সাড়া পড়েছিল ব্যাপক। সে সাড়াটি এমনই ছিল, অনেকেই স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিলেন ঢাকার ফুটবলে সুদিন ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে। সেবার ফাইনালে খেলা আবাহনী-মোহামেডানের ম্যাচ দেখতে গ্যালারীর সমান দর্শক বাইরে অপেক্ষা করেছিল।
বাফুফে সে জোয়ার ধরে রাখতে পারেনি, যা করছে তা নিজেদের চেয়ার আঁকড়ে ধরে রাখার জন্য। ফেডারেশন কাপ দিয়ে ঘড়োয়া মওসুম শুরু হওয়ার কথা। প্রতি মওসুমে পেশাদার লিগের কাবগুলোকে নিয়ে ফেডারেশন কাপ, স্বাধীনতা কাপ, প্রিমিয়ার লিগ ও সুপার কাপ এ চারটি আসর আয়োজনের নিয়ম আছে বাফুফের। অথচ ২০১১ সালের পর মাত্র একবারই চারটি প্রতিযোগিতা মাঠে নিতে পেরেছিল বাফুফে।
মওসুম শেষের আসর বলে সুপার কাপের জন্য সময় আর পাওয়া যায় না বর্ষা, রোজা এগুলো এসে যাওয়ায়। তাই এবার মোটামুটি হলফ করেই বলে দেয়া যায় যেভাবে চলছে পেশাদার লিগ কমিটি তাতে এ মওসুমেও সব আসর আয়োজন করতে পারবে না তারা। এছাড়া আন্তর্জাতিক কোন টুর্নামেন্ট কিংবা প্রীতি ম্যাচও বাগড়া দেয় পেশাদার লিগ আয়োজনে। আগামী জানুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপ শেষে ২৫ জানুয়ারি ফেডারেশন কাপ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তা আদৌ হবে কিনাÑ তাতে রয়েছে ঘোর সন্দেহ। তাই নতুন মওসুম শুরুর সময় ধরা হয়েছে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসকে। দেড় দশক পর শুরু হওয়া বঙ্গবন্ধু কাপ শেষ হতে হতে ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ লেগে যাবে।
এরপর দুই পর্বের পেশাদার লিগের সমাপ্তি টানতে মে গড়িয়ে জুন মাস লেগে যাবে। আছে স্বাধীনতা কাপ, যা মার্চে হওয়ার কথা। স্বাধীনতা কাপ হলে লিগ শেষ হতে আরো সময় লেগে যাবে। মাঝখানে ২৭-৩১ মার্চ ঢাকায় বসছে এএফসি অনূর্ধ্ব-২৩ ফুটবলের ‘ই’ গ্রুপের খেলা। আছে এএফসি কাপ এবং এশিয়াপ কাপ ও বিশ্বকাপ বাছাই পর্বও। এগুলো শেষ হতে হতেই এসে যাবে জুন মাস। জুনে শুরু হবে বর্ষা মওসুম। তখন কর্দমাক্ত মাঠের কারণে স্বাভাবিক খেলা আয়োজন সম্ভব হয় না। হলেও ক’দিন পরপরই খেলা বন্ধ করতে হয় মাঠ অনুপযুক্ত হওয়ার কারণে। তখনই আবার রোজা ও ঈদ এসে হাজির হবে। ফলে ফুটবল মওসুম চার আসর দিয়ে শেষ করতে পারবে না বাফুফে।
এজন্য প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, পেশাদার লিগ কমিটির চেয়ারম্যান ও বাফুফের সিনিয়র সহ-সভাপতি আবদুল সালাম মুর্শেদীর কঠোরতা নিয়েও। তিনিই কাবগুলোকে খুশি করতে গিয়ে শিডিউল ওলট-পালট করছেন। যে কারণে খেলা পিছিয়েই যাচ্ছে। পাশাপাশি বাফুফেতে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিরাই যে বিভিন্ন ক্লাবের প্রতিনিধি হয়ে এসেছেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য মতে, সালাম মুর্শেদী কঠোর থাকলেই কাবগুলো এভাবে ছড়ি ঘোরাতে পারত না। সময়মতোই শুরু হতো সব খেলা। লিগ কমিটির এই ব্যর্থতার কারণে ছয় মাস ধরে পেশাদারি কাবগুলো বসে আছে। জাতীয় দলের কয়েকটি ম্যাচ আর শেখ জামাল ও আবাহনীর কিংস কাপে অংশগ্রহণ ছাড়া আর কিছুই নেই। অবশ্য এবার সব আসর আয়োজনের ব্যাপারে আশার বাণী শোনালেন বাফুফের সাধাল সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগ।
মার্চের মধ্যে কমলাপুর স্টেডিয়ামের অ্যাস্ট্রো টার্ফ স্থাপনের কাজ শেষ হয়ে যাবে। ফলে এপ্রিল থেকে কমলাপুর স্টেডিয়াম পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যাবে। তখন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের পাশাপাশি কমলাপুরেও খেলা আয়োজন করা যাবে। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের মাঠ বৃষ্টির কারণে অনুপযুক্ত হয়ে গেলে কমলাপুর হবে বিকল্প। সে ক্ষেত্রে বৃষ্টি বা মাঠ স্বল্পতায় খেলা বন্ধ থাকবে না। অর্থাৎ চলতি মওসুমে সব টুর্নামেন্টই আয়োজন করা সম্ভব হবে। আশ্বাস বাফুফে সাধারন সম্পাদকের কন্ঠে। তবে এ মওসুমের ক্যালেন্ডার অনুসরণে বাফুফের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। পেশাদার লিগে অংশগ্রহণকারী একটি দলের ম্যানেজার কিছুটা ক্ষোভের সুরে বলেন, ’এভাবে একটি দেশের ফুটবল ক্যালেন্ডার চালানো সম্ভব হবেনা। এবার বাফুফে মওসুম শেষ করতে পারবে না বলেই আমার বিশ্বাস। যেভাবে খেলা পেছানো হচ্ছে তাতেই সন্দেহ। পেশাদার লিগ কমিটির গত সভায় ফেডারেশন কাপ পেছানোর সিদ্ধান্তের সময় আমি প্রতিবাদ করেছি। অযথাই আসরটি পিছিয়ে মওসুমকে অপূর্ণ রাখার আশঙ্কা সৃষ্টি করা হয়েছে’। জানা গেছে, এ নিয়ে সালাম মুর্শেদীর বিপক্ষেই বাফুফেতে অসন্তুষ্টি বাড়ছে। তবু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। ক্লাবগুলো বসে আছে বাফুফের ঘাড়ের উপর। তারা যেভাবে বলবে সেভাবেই কাজ হবে। যখন চাইবে বন্ধ হবে আর না চাইবে তখন চলবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ