ঢাকা, বৃহস্পতিবার 11 December 2014 ২৭ অগ্রহায়ন ১৪২১, ১৭ সফর ১৪৩৬ হিজরী
Online Edition

স্বজনহারারা কাঁদলেন এবং কাঁদালেন

** মানবাধিকার হরণ হবে এই কথা শোনার জন্য বাংলাদেশ হয়নি ---ড. শাহদীন মালিক
** সবচেয়ে বড় মানবাধিকার হরণের ঘটনা ঘটে ৫ জানুয়ারি ---মাহমুদুর রহমান মান্না
স্টাফ রিপোর্টার : বিশ্ব মানবাধিকার দিবসের অনুষ্ঠান মঞ্চে এসে কেউ শোনাচ্ছেন তার স্বামীকে তুলে নেয়া থেকে না পাওয়ার দুর্বিষহ বেদনাগাঁথা। কারো বর্ণনায় ভারী হয়ে আসছে পরিবেশ, কেউ অঝোরে চোখের পানি ফেলে বলে চলেছেন, সন্তান হারানোর মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতা।
গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে নানাভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা এভাবেই তাদের স্বজন হারানোর কষ্টের কথা শুনিয়েছেন। তারা নিজেরা কেঁদেছেন, কাঁদিয়েছেন উপস্থিত সবাইকে। তাদের একেকজনের বিবরণে ভারী হয়ে উঠছিল পরিবেশ। ‘মানবাধিকার হরণ: এ কী পরিস্থিতিতে দেশ’ শিরোনামের এই আলোচনা সভার আয়োজন করে আইনজ্ঞ-মানবাধিকারকর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত ‘মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি’ নামের একটি ফোরাম। আলোচনার প্রথম পর্বে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা তাদের অভিজ্ঞতার বিবরণ দেন। দ্বিতীয় তথা শেষ পর্বে দেশের বিশিষ্টজনেরা বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় নিহত নজরুল ইসলামের ভাই আব্দুস সালাম বলেন, র‌্যাবের সবাই স্বীকার করেছে তারা আমার ভাইকে হত্যা করেছে। তাহলে এই বিচার করতে দেরি হচ্ছে কেন? এই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি নূর হোসেন বিদেশে আছে, শুনেছিলাম তাকে দেশে আনা হবে। আজ ৮ মাস হলো তাকে দেশে আনা হয়নি। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই তাকে দেশে এনে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলের বিচার করা হোক।
ঢাকা মহানগরীর সবুজবাগ থানা ছাত্রদল নেতা মাহবুব হাসানের স্ত্রী তানজিনা আক্তারের অভিযোগ, এক বছর আগে তার স্বামীকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিচয়ধারী লোকজন। দু’সন্তান নিয়ে আমাদের দিনগুলো কীভাবে কাটছে, আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের মো. রফিক বলেন, ২০০০ সালের ২৩ অক্টোবর সেনাবাহিনী ও এলাকাবাসীর মধ্যে সংঘর্ষের সময় তার ছেলে জামাল নিহত হন। তিনি বলেন, আমি সব সময় গোয়েন্দা নজরদারিতে থাকি। আজ এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ঢাকায় এসেছি। বাড়িতে ফিরে আমার কী পরিস্থিতি হবে তা ভাবতেও পারি না।
রাজধানীর মিরপুর কালশী বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দা শহীদ আলী বাহাদুর অভিযোগ করেন, ক্যাম্প দখল করার জন্য নয়জনকে হত্যা করা হয়েছে। কয়েক দিন আগে একজনকে পিটিয়ে মেরেছে পুলিশ। এর এক মাস আগে চাঁদা দাবি করে না পেয়ে জাবেদ নামের একজনকে হত্যা করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত আমাদের ক্যাম্প দখলের চেষ্টা হচ্ছে।
যশোরের মালোপাড়ার বিশ্বজিৎ বিশ্বাস বলেন, হামলার শিকার হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী আমাদের তিনটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। একটাও পূরণ হয়নি। পুলিশ আসামী ধরে। ১০-১২ দিন পরে আসামীর জামিন হয়ে যায়।
এভাবে বেলা পৌনে ১১টা থেকে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারের অন্ততঃ ২০ জন সদস্য তাদের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। পরে দ্বিতীয় পর্বে শুরু হয় বিশিষ্টজনদের বক্তৃতা। এ পর্বে প্রখ্যাত আইনজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক, বিশিষ্ট কলামিস্ট-প্রাবন্ধিক সৈয়দ আবুল মকসুদ, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, সুজনের সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, নারায়ণগঞ্জ বার কাউন্সিলের সভাপতি এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, আইনজীবী  ব্যারিস্টার সারা হোসেন, মানবাধিকারকর্মী শাহনাজ হুদা প্রমুখ। আলোচনা সভা শেষে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এই গুম-খুনের বিরুদ্ধে তারা মানববন্ধন করেন। 
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে বিচার বিভাগীয় দুটো কমিশন গঠনের দাবি জানান সুপ্রীমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক। তিনি বলেন, গুম-খুন-অপহরণের ঘটনায় একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় কমিশন হবে। বিচার বিভাগীয় অপর কমিশনটি হবে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার জন্য। আগামী ২১ ফেব্রুয়ারির আগে এই কমিশন দুটো গঠন করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সব অভিযোগ তদন্ত করতে হবে।
মানবাধিকার হরণ হবে এই কথা শোনার জন্য বাংলাদেশ হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজকে আমাদের মানবাধিকার নিয়ে উল্লাস করার কথা ছিলো। এই মানবাধিকার হরণের বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতেই হবে। তিনি আরো বলেন, আমরা সরকারকে বলেছি র‌্যাব বিলুপ্ত করার জন্য। এরা আপনাদের জন্যই কাল হবে। আমরা অনেকে ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। আমরা চাই না সরকারের লোকদের মুখে শুনি যে আমাদের র‌্যাব থেকে বাঁচাও।
র‌্যাবের ‘ক্রসফায়ার’ প্রসঙ্গে সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, এসবের পেছনে রয়েছে দেশের সংঘাতময় রাজনীতি। সংঘাতের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানান তিনি।
আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এদেশের সবচেয়ে বড় মানবাধিকার হরণের ঘটনা ঘটেছে ৫ জানুয়ারি। ওইদিন দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছেন। তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারির আগে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, সংবিধান রক্ষার জন্য এ নির্বাচন করা হচ্ছে। কিন্তু নির্বাচন পার হওয়ার পর এখন তিনি পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার কথা বলছেন। তিনি আরো বলেন, আমরা দুর্নীতিকে যেভাবে না বলবো, ঠিক ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকেও একইভাবে না বলবো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ