ঢাকা, মঙ্গলবার 16 December 2014 ২ পৌষ ১৪২১, ২২ সফর ১৪৩৬ হিজরী
Online Edition

মতিউর-হামিদুরের লাশ দেশে এসেছিল যেভাবে

জিবলু রহমান : গৌবের মুক্তিযুদ্ধের মৃত্যু নাই। স্বাধীনতার শিখা চিরদিন প্রজ্বলিত থাকবে। আর এই স্বাধীনতার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, লড়াই করেছেন, তারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে থাকা অনেক বাঙ্গালী অফিসার ও জওয়ান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। তাদের একটি অংশ ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে দেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে পোস্টিংয়ে ছিলেন। কেউবা এসেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ছুটিতে। আরেক দল ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর মাতৃভূমিকে শত্রুর কবল থেকে মুক্ত করার সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। দেশের ভেতরে সেনাবাহিনী ছাড়াও ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধে শামিল হয়েছিলেন। তাদের একটি অংশ নিজ নিজ হাতিয়ার নিয়ে যুদ্ধে অংশ নেন।
পৃথীবিতে যুগ যুগ ধরে যারা বীরত্ব দেখিয়েছেন তারাই জনসাধারণের ভালোবাসার স্বরূপ উপাধি পেয়েছেন। ইতিহাসে দেখা যায়, মোগল সাম্রাজ্যের শক্তিশালী শাসক জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ আকবর ‘মহান শাসক’ হিসেবে মানুষের কাছ থেকে স্বীকৃতি পেয়েছেন। মহাবীর টিপু সুলতান ‘শের-এ-মহীশুর’ উপাধি পেয়েছেন। কৃষকদের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে রাজনীতিতে সাহসী ভূমিকার জন্য একেএম ফজলুল হকের সঙ্গে শের-এ-বাংলা’ উপাধি সংযোজিত হয়েছে। মওলানা আবদুল হামিদ খান বিখ্যাত ভাসান চরে জ্বালাময়ী বক্তব্য দিয়ে ‘ভাসানী’ নাম পেয়েছেন, মওলানা আব্দুর রশিদ ছোটবেলা থেকে যুক্তিসঙ্গত তর্ক করে এবং বিভিন্ন তর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে বিজয়ী হয়ে ‘তর্কবাগীশ’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ১৯৬৯ সাল থেকে ‘বঙ্গবন্ধুু উপাধি ব্যবহৃত হচ্ছে।
এতগুলো উদাহরণ উল্লেখের কারণ হলো মুক্তিযুদ্ধের পরে যারা নিজের জীবনের পরোয়া না করে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এবং যারা জীবিত ছিলেন তাদের যুদ্ধত্তোর কয়েকটি খেতাবে ভূষিত করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরবময় ভূমিকার জন্য বাংলাদেশ সরকার চার ক্যাটাগরিতে খেতাব বা বীরত্ব পদক দেয়। বীরশ্রেষ্ঠ, বীরউত্তম, বীরবিক্রম আর বীরপ্রতীক পদবী ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বীরত্বের পুরস্কার। ১৯৭৩ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের সময় সাতজনকে বীরশ্রেষ্ঠ, ৬৮ জনকে বীর উত্তম, ১৭৫ জনকে বীরবিক্রম ও ৪২৬ জনকে বীরপ্রতীক খেতাব দেয়া হয়। এগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ সম্মান ছিল বীরশ্রেষ্ঠ। বীরশ্রেষ্ঠ সম্মানে ভূষিত ৭ জনই মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ হয়েছিলেন।
আলোচনার প্রথমে মতিউর রহমানের বীরত্বের কাহিনী উল্লেখ করছি। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর মতিউর রহমানের হাতিয়ার বন্দুক বা কামান নয়, ছিল বিমান। তিনি বিমান নিয়েই শত্রুর দেশ থেকে পালাতে চেষ্টা করেন। এতে সফল হননি। কিন্তু এমন অতুলনীয় কীর্তি মুক্তিপাগল বাঙ্গালীদের অনুপ্রাণিত করে। মতিউরের জন্ম ঢাকায় ২৯ অক্টোবর ১৯৪১ সালে। পুরনো ঢাকার ১০৯ নম্বর আগা সাদেক রোডে তার বাবার তৈরি করা বাড়িতে তারা ১১ ভাইবোন বড় হন। মতিউর ছিলেন আট নম্বরে। সবাই তাকে মতি বলে ডাকতেন। তবে ভাইবোনদের মধ্যে হুড়োহুড়ির সময় তাকে সবদর নামে খেপানো হতো। তার বাবা আব্দুস সামাদ ছিলেন জেলা সাব-রেজিস্ট্রার। মা গৃহবধূ মোবারকুন্নেসা। তারা তাদের প্রায় প্রতিটি ছেলেমেয়েকে সাধ্যমতো সুশিক্ষিত করেছিলেন। বাবা নিজে সময়কে মূল্য দিতেন। ছেলেমেয়েদের কাছ থেকেও কঠোর শৃঙ্খলা পরাছুতা আশা করতেন। কেউ এতে এদিক-সেদিক করলে পারিবারিক আদালতে মায়ের দেয়া রিপোর্ট অনুসারে বাবা বিচার করতেন।
মতিউর ছেলে বেলা থেকে দুরন্ত এবং হাসিখুশি ছিলেন। সবসময় মজা ও অন্যকে আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করতেন। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে পড়ালেখার সময় তার ফল ছিল বেশ ভালো। ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত এখানে পড়ার পর তিনি সুযোগ পান পশ্চিম পাকিস্তানের সাগোরদায় অবস্থিত পাকিস্তান এয়ারফোর্স স্কুলে। এ স্কুল বিমান সেনা তৈরির সুতিকাগার হিসেবে কাজ করেছে। পিএফ স্কুল থেকে অসাধারণ একাডেমিক ফল নিয়ে পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে যোগ দেন এবং একের পর এক সাফল্য অর্জন করেন। বিমান চালনার পাশাপাশি তিনি সাতার, ফুটবল, হকি, বাস্কেটবল, ভলিবলসহ বিভিন্ন খেলায় পারদর্শিতা দেখান। গানপাগল মতিউর খেতে ভালোবাসতেন। তার পছন্দের খাবার ছিল ডিম ভাজা, চাপলী কাবাব ইত্যাদি।
মতিউর ১৯৬১ সালে রিসালপুরে পাকিস্তান বিমানবাহিনী একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। মাত্র দুই বছর পর ১৯৬৩ সালে বৈমানিক হিসেবে কমিশন পান। বীরত্ব ও কৃতিত্ব প্রদর্শনের জন্য খুব অল্প সময়েই তিনি নানাভাবে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের পক্ষে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে তিনি কৃতিত্ব দেখান। বিমান চালনায় দুরন্তপনার জন্য তার সঙ্গীরা তাকে ডেয়ার ডেভিল ফাইটার পাইলট নামে ডাকতেন। এরই মাঝে তিনি একবার বিমান ক্রাশ করে বেঁচে যান। এ কারণে তাকে এক বছর গ্রাউন্ডেড করে রাখা হয়। যদিও একই অপরাধে অন্য পশ্চিম পাকিস্তানীদের লঘুদন্ড দেয়া হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানীদের বৈরী আচরণের শিকার হয়েও নিজস্ব যোগ্যতায় মতিউর রিসালপুর একাডেমিতে কোয়ালিফায়েড ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টর হিসেবে মনোনীত হন এবং সাফল্যের পরিচয় দেন।
মতিউর রহমান ১৯ এপ্রিল ১৯৬৮ সালে বিয়ে করেন। স্ত্রী মিলির পরিবারও তার পরিবারের মতোই বড়। বিয়েতে দুই পক্ষের সামনে একটি করে আপত্তি ছিল। ছেলে পক্ষের কারো কারো বক্তব্য ছিল, মেয়ে ফর্সা নয়। অপরদিকে মেয়ে পক্ষের একটি বক্তব্য ছিল, ছেলে খুবই বেপরোয়া। এরই মধ্যে একবার বিমান ক্র্যাশ করেছে এবং গাড়ি এক্সিডেন্ট করেছে। দুটো বাহনই ধ্বংস হয়েছে। যদিও হবু বর বেঁচে গিয়েছেন। বিয়ের পর মতিউরের চঞ্চলতার জন্য নানি শাশুড়ি তার নাম দিয়েছিলেন লাফাইন্যা জামাই। তাদের বিয়ের মধ্যস্থতাকারী ছিলেন প্রিন্সিপাল সাইদুর রহমান। তিনি ছাড়াও দুই পক্ষে ছিলেন ডক্টরেট ডিগ্রীধারী দুলাভাই। মতিউর রহমানের দুলাভাই ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ। অপরদিকে মিলি রহমানের দুলাভাই ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং মতিউর রহমানের ব্যক্তিগত জীবনবোধ তাকে পশ্চিম পাকিস্তানীদের শোষণের বিরুদ্ধে মানসিকভাবে তৈরি হতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
 ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ডাকসু ভিপি আসম আব্দুর রব যখন কলাভবনে প্রথম স্বাধীনতার পতাকা তুলছিলেন তখন ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন মতিউর। আবার ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবের ভাষণ শুনতে ড. আলাউদ্দিন আল আজাদের সঙ্গী হয়েছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালে মতিউর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর একমাস গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করেছিলেন। দেশে যুদ্ধ লেগেছে। একজন সৈনিকের কাজ হলো রণকৌশল সর্ম্পকে সবাইকে সচেতন করা। তিনি ভুলে যান স্ত্রী-সন্তানাদি, আত্মীয়-স্বজনের কথা। তিনি গ্রামবাসীকে নিয়ে সভা করে পাকিস্তানী সৈন্যদের প্রতিহত করার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন। গ্রামের মাঠে সংঘবদ্ধ লোকজনকে ট্রেনিং দেয়াও শুরু করেন।
মতিউর মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন দেশ স্বাধীন হবে। এ কারণে মার্চে যখন তিনি ছুটিতে ঢাকায় ছিলেন তার প্রায় বড় সময় কাটিয়েছেন গোপন সাংগঠনিক কাজে। দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে তখন ঢাকার অবস্থানকারী বাঙ্গালী বিমান অফিসাররা গ্রুপ ক্যাপ্টেন একে খন্দকারের নেতৃত্বে জোটবদ্ধ হচ্ছিলেন। এ সময় উইং কমান্ডার এমকে বাশার, স্কোয়াড্রন লিডার এম সদরুদ্দীন, ফ্লাইট লে. সুলতান মাহমুদ, ফ্লাইট লে. এম হামিদুল্লাহসহ আরো কয়েকজন বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা ও কর্মচারী গোপনে মিলিত হতেন। ফ্লাইট লে. মতিউর রহমান ছিলেন অন্যতম সমন্বয়কারীর ভূমিকায়। পাকিস্তান এয়ার ফোর্সের বাঙ্গালী ১৮ জন পাইলট এবং প্রায় ৫০ জন টেকনিশিয়ান একত্র হয়ে ভারতে চলে গিয়ে বিদ্রোহ করার সিদ্ধান্ত নেন। মতিউর এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিলেও তিনি নিজে তাতে অংশ নিতে পারেননি। যুদ্ধের শুরুতে তিনি যান তার গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরার রামনগর গ্রামে।
এপ্রিল মাসের মধ্যভাগে আশুগঞ্জ, নরসিংদী, ভৈরব, রায়পুরা এলাকায় পাকিস্তান বিমানবাহিনী প্রচ- বোমাবর্ষণ শুরু করলে তিনি কিছুটা বিমর্ষ হয়ে পড়েন। যে সৈনিকের ধর্ম দেশমাতৃকার রক্ষা করা সে যখন অস্ত্রে¿র অভাব অর্থাৎ একটি বিমানের অভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ সময় হারায় তার মনতো বিমর্ষ-খারাপ থাকবেই। এ ধরনের চিত্র তিনি গ্রামে বসে সহ্য করতে না পেরে চলে যান ঢাকায়। ঢাকায় ফিরেও তার মন শান্ত ছিল না। একসময় প্রিয়তমা স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘জানো-পাকিস্থানী যে পাইলটরা আজ আমাদের দেশের ওপর বোমার ফেলছে ওদের আমি ট্রেনিং দিয়েছি।’ আসলে তখন সেই পরিস্থিতি তার কাছে ছিল ‘যে করলো চক্ষু দান তারে করো অপমান’ প্রবাদের মতো। স্ত্রী মিলি ও দুই শিশু কন্যা মাহীন ও তুহিনকে ঢাকায় রেখে আসায় মানসিক অস্থিরতায় ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে স্ট্র্র্যাটেজি বদলান। পারিবারিক পরামর্শ ও তার নিজের প্ল্যান বাস্তবায়নের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
ভগ্নহৃদয় মতিউর মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে ৬ মে পাকিস্থানের করাচিতে ফিরে যান। সেখান থেকে তিনি একটি বিমান হাইজ্যাক করে ভারতে পালিয়ে গিয়ে তারপর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার চিন্তা করেন। বাঙ্গালী সৈনিকদের প্রতি পাকিস্থানীদের সর্বদা সজাগ দৃষ্টি থাকার কারণে তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হন তিনি। মানসিক যন্ত্রণাকে তিনি মনের মধ্যেই চেপে রেখে সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। এক মাসের ব্যবধানে জুলাই মাসে পাকিস্তান এয়ার লাইন্সের (পিআইএ) একটি বোয়িং বিমান হাইজ্যাক করার পরিকল্পনা নেন। ‘কপালের লেখন না যায় খন্ডন।’ এবারো তিনি ব্যর্থ হন। দুর্ভাগ্যবশত পরিকল্পনাটি শেষ মুহূর্তে ফাঁস হয়ে যায়। সৌভাগ্যবশত কোনো বাঙ্গালী অফিসারের নাম জানতে পারেনি পাকিস্তানীরা। পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে বলে তার মনোবল ভেঙে যায়নি।
বিমান হাইজ্যাক করার পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ার ফলে হঠাৎ করে পশ্চিম পাকিস্তানের সকল বাঙ্গালী পাইলটকে গ্রাউন্ডেড করে দেয়া হয়। মতিউর রহমান করাচি মশরুর বিমান ঘাঁটিতে বেস কমান্ডার সব বাঙ্গালী বৈমানিককে একত্রিত করে সতর্ক করে দেন যে কোনো অপারেশন্যাল এলাকায় তারা যেতে পারবে না এবং তাদের জন্য বিমান চালনা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। সঙ্গে সঙ্গে মতিউর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন। সংকল্প নিলেন বিমান দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে শক্তিশালী করার। তিনি কর্তৃপক্ষের আস্থাভাজন হয়ে মশরুর বিমান ঘাঁটিতে বেস ফ্লাইট সেফটি অফিসারের দায়িত্ব লাভ করেন।
পিআইএর বিমান হাইজ্যাক পরিকল্পনা বানচাল হওয়ায় মতিউর রহমান মানসিকভাবে বেশ আঘাত পেলেন। এই মানসিকভাবে আঘাতই তাকে আরো মরিয়া করে তুলে। এই সময় তিনি পাইলট অফিসার রাশেদ মিনহাজকে জেট বিমান উড্ডয়ন শিক্ষা দিতেন। ছুটিতে দেশে যাওয়ার সময় ছিল আসন্ন। তিনি মনে মনে পরিকল্পনা করলেন মিনহাজ যখন বিমান চড়ে উড়তে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তে তিনিও ওই বিমানে চড়ে মনিহাজসহই বিমানটি হাইজ্যাক করবেন এবং সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের আকাশে প্রবেশ করবেন। তার এই মনোবাসনা কেউ জানতে পারেনি। এমনকি তার স্ত্রীও তার কথাবার্তা-হাবভাবে বুঝতে পারেননি যে তিনি এত বড় একটা অ্যাকশন করতে যাচ্ছেন।
২০ আগস্ট শুক্রবার বেলা সোয়া ১১টায় মতিউর রহমানের ছাত্র পাইলট অফিসার মিনহাজ ‘টি-৩৩’ বিমান নিয়ে উড়বার জন্য প্রস্তুতি নিলেন। পূর্ব শিডিউল মতে সেটি আকাশে উড়বার জন্য প্রস্তুত ছিল। কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য প্রত্যেক বিমানের একটা সাংকেতিক নাম থাকে। টি-৩৩ বিমানটির নাম ছিল ব্লু বার্ড-১৬৬। মিনহাজ টি-৩৩ নিয়ে উড়বার অনুমতি চাইলে কন্ট্রোল টাওয়ার তাকে নিয়মমাফিক অনুমতি অর্থাৎ স্ট্যান্ডার্ড ক্লিয়ারেন্স দেয়। কন্ট্রোল টাওয়ারে তখন ডিউটিতে ছিলেন বাঙ্গালী পাইলট অফিসার ফরিদউজ্জামান এবং পাকিস্তান বৈমানিক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আসিম। ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পর বিমানটি যখন রানওয়ে ২৭ এ ঢোকার জন্য চার নং ট্যাক্সি ট্রাক দিয়ে এগিয়ে টিলার আড়ালে পৌছে, মতিউর তখন তার গাড়ি নিয়ে তীব্রগতিতে ধেয়ে যান সেখানে। তিনি বিমান থামানোর নিদিষ্ট সংকেত দেন মিনহাজকে। নিয়ম হলো কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে বিমান নিয়ে উড়বার ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পরও যদি ফ্লাইট সেফটি অফিসার কোনো বিশেষ কারণে বৈমানিককে বিমান থামানোর সংকেত দেখান, তাহলে ওই বৈমানিক বিমান থামাতে বাধ্য থাকেন। নিরাপত্তা অফিসারের সংকেত মানতেই হলো রাশেদ মিনহাজের।
রানওয়েতে ট্যাক্সিট্রাকের মাঝপথে বিমানটিকে থেমে গিয়ে ক্যানোপি খুলতে দেখে কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে পাইলট অফিসার ফরিউজ্জামান টি-৩৩ কে জিজ্ঞাসা করেন কোনো রকম অসুবিধা আছে কিনা? টি-৩৩ থেকে কোনো জবাব আসেনি। এরই মধ্যে বিমান থামিয়ে ক্যানেপি (বৈমানিকের বসার স্থানের ওপর স্বচ্ছ আবরণ) খোলার সঙ্গে সঙ্গে মতিউর ক্ষিপ্তগতিতে লাফিয়ে ওঠেন ককপিটের পেছনের আসনে। ককপিটে ওঠার আগে নিজের গাড়িকে বিমানের পেছনে আড়াআড়িভাবে রেখেছিলেন যাতে অন্য কোনো বিমান তার পিছু না নিতে পারে। মতিউর তার পিস্তল বাসায় রেখে প্যারাসুট হেলমেট কিছু না নিয়েই সম্পূর্ণ নিরস্ত্র-নিরাপত্তাহীনভাবে বিমানে চড়ে বসেছিলেন। কারণ তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, তিনি যে কোনো পরিস্থিতিতে অনায়াসে ভারতে গুজরাটের বিমানঘাঁটি জামনগরে অবতরণ করতে পারবেন। ককপিটে শুরু হলো মতিউর-মিনহাজ অর্থাৎ গুরু-শিষ্যের তুমুল লড়াই। ধস্তাধস্তির মধ্যে বিমানটি হঠাৎ দ্রুত রানওয়ের মাত্র কয়েক ফুট ওপর দিয়ে বিপজ্জনকভাবে টি-৩৩ বিমানটি রানওয়ের দিকে এগিয়ে যায়। কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে কোনো অনুমতি না নিয়ে বিমানটি বহু কষ্টে উপরে উঠে যায়। বিমানটি এমনভাবে একাত-ওকাত হয়ে উড়তে থাকে যাতে বোঝা যায় বিমানটি নিয়ন্ত্রণের জন্য ককপিটের ভেতর ভীষণ হাতাহাতি চলছে। রাডারে যাতে বিমানের অবস্থান ধরা না যায় তার জন্য টি-৩৩ খুব নিচু দিয়ে উড়ে গেল। বিমানের ডানা দুটি তখনো জোরে কাঁপছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই বিমানটি দিগন্তে মিলিয়ে যায়। কন্ট্রোল টাওয়ারে তখন হুলস্থূল পড়ে গেছে। দুঃসংবাদ বাতাসের এসে গেল।
পাকিস্তানী ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আসিম সঙ্গে সঙ্গে বেস কমান্ডারকে টি-৩৩ ছিনতাইয়ের খবর জানালেন। খবর শোনামাত্র বেস কমান্ডারও দ্রুত কন্ট্রোল টাওয়ারে চলে এলেন। অল্পক্ষেণের মধ্যেই দুটি এফ-৮৬ জঙ্গি বিমান টি-৩৩ এর খোঁজে আকাশে উড়ে যায়। সারাদিন অনেক চেষ্টা করেও টি-৩৩ এর কোনো হদিস করা গেল না। বিকালের দিকে খবর পাওয়া গেল থাট্টার অদূরে তালাহারে বিমানটি টি-৩৩ বিধ্বস্ত হয়েছে এবং দুজন বৈমানিকই নিহত হয়েছেন। অত্যন্ত দক্ষ প্রশিক্ষক ও বৈমানিক হিসেবে মতিউর সর্বজন স্বীকৃত ছিলেন। কিন্তু বিধি বাম। অনুমান করা হয় যে, মিনহাজ প্যারাসুটের সাহায্যে নামার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু ভূমি থেকে বিমানের উচ্চতা কম হওয়ায় সফল হননি। মতিউর ছিটকে পড়েন মাটিতে। মিনহাজের দেহ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও মতিউরের দেহ প্রায় অবিকৃত থেকে যায়।
স্ত্রী এবং দুই মেয়েকে শত্রুর মুখে রেখে তিনি দেশের জন্যই এই ত্যাগ স্বীকার করেছেন। ঘটনাটি পাকিস্তানী বিমান বাহিনীসহ সবখানে আলোড়ন তোলে। মতিউর রহমানের স্ত্রী মিলি ও দুই বাচ্চার জীবনে নেমে আসে অবর্ণনীয় মানসিক অত্যাচার। একটি বাড়িতে তাদের আটকে রাখা হয়। যে বাড়ির রং ছিল কালো। মিলি রহমানের এক বোন রোজী কুদ্দুস ছিলেন তাদেরই প্রতিবেশী। তার স্বামী এম এ কুদ্দুস বিমান বাহিনীর অফিসার হওয়ায় তাদেরও ধরে নিয়ে যায়। এদের পাশাপাশি পাশবিক অত্যাচার চালায় ফ্লাইট লে. মতিউর রহমানের সহকর্মী সাইফুল আযম, ফ্লাইট অফিসার মিজান, এসএম সুলতানসহ আরো অনেক বাঙ্গালী বিমানবাহিনীর সদস্যের ওপর। পাকিস্তান সরকার রশিদ মিনহাজকে জাতীয় বীর হিসেবে নিশান-ই-হায়দার উপাধিতে ভূষিত করে আর মতিউর রহমানকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করে করাচিতে মাসরুর এয়ার বেসের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের গোরস্তানে কবর দেয়া হয়।
মতিউর রহমান সম্পর্কে প্রয়াত মিসেস জাহানারা ইমাম লিখেছেন, ‘কোনো কোনো মানুষ জন্মায় ভবিষ্যতের দিকে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। তার চারপাশের সবকিছুর প্রতি তার যে মনোযোগ থাকে না, এমন নয়। বাবা-মা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান প্রভৃতি তার জীবনের কেন্দ্রে সে পরিপূর্ণভাবে সজাগ থাকে, দায়িত্ব পালন করে। যার যার প্রাপ্য তাকে দেয়। এসব সত্ত্বেও তার দৃষ্টি প্রসারিত হয়ে থাকে সামনের দিকে। চারপাশের গন্ডির ভেতরে আবদ্ধ সবকিছুর উপর দিয়ে দূরে, অনেক দূরে। ফ্লাইট লে. মতিউর রহমান বীরশ্রেষ্ঠ এমনই একজন মানুষ ছিলেন।’
বাংলাদেশে সাত বীরশ্রেষ্ঠের ৫ জনের কবর হলেও বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরের কবর থেকে যায় করাচিতে। বিমানবাহিনীর কবরস্থানে। ফলে কেউ পাকিস্তান গেলেও যেখানে ঢুকতে পারতো না। বছরের পর বছর ধরে অযত্ন, অবহেলায় পড়ে ছিল এই বীরের কবর। শহীদ মতিউরের কবরে কাছে যেতে চেয়ে তার পরিবারের পক্ষ থেকে এক আবেদন করা হয়। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধানের কাছে এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করতে বলা হয়। খালেদা জিয়া সরকারের প্রথম মেয়াদে ১৯৯৪ সালে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়টি অনুমোদন করে পাকিস্তানে শহীদ মতিউরের কবরের কাছে তার পরিবারের সদস্যদের যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরের মেয়ে মাহীন, তার স্বামী ফয়সাল খন্দোকার ও তাদের ছেলে রাশাদ পাকিস্তানে মতিউর রহমানের কবর জিয়ারতের সুযোগ পান। কবর দেয়ার ২৩ বছর পর পরিবারের সদস্যরা সেখানে যান। কিন্তু দ্বিতীয় দিন যাওয়ার সময়ই তারা অনেক বাধা পান। এরপর থেকে ফ্লাইট লে. মতিউর রহমানের দেহাবশেষ আনার বিষয়টি আলোচনায় আসতে থাকে। বিশেষ করে তার পরিবারের সদস্যরা এ বিষয়ে চেষ্টা করতে থাকেন। শহীদের স্ত্রী মিলি রহমান পত্রিকায় লিখে, স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন।
প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত আগ্রহে বিষয়টি গতি পায়। ২০০৬ সালের মার্চে পাকিস্তান সফরকালে পাকিস্তানী সরকারের সঙ্গে তিনি সরাসরি এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের একটি টিম পাকিস্তানে যায়। তারা বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের দেহাবশেষ বাংলাদেশে নিয়ে আসেন ২৪ জুন। কবর থেকে লাশ বা দেহাবশেষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেয়ার বিষয়টি নতুন ঘটনা নয়। বায়তুল মোকাররমের খতিব উবায়দুল হক ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে একে বৈধ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বাংলাদেশের ভেতরেও এর উদাহরণ আছে। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের লাশ চট্টগ্রামে দুর্গম স্থানের কবর থেকে তুলে ঢাকায় আনা হয়েছিল।
ইতিহাসে লাশ বা দেহাবশেষ বহনের বড় উদাহরণ ফরাসি শাসক নেপোলিয়ন বোনাপার্টের লাশ। ১৮১৫ সালে ওয়াটারলু যুদ্ধে ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়ে তাকে নির্বাসনে যেতে হয় সেন্ট হেলেনা দ্বীপে। সেখানেই নিঃসঙ্গ অবস্থায় তার মৃত্যু হয় ৫ মে ১৮২১ সালে। এর প্রায় ঊনিশ বছর পর ১৮৪০ সালে তার লাশ ফ্রান্সে আনা হয় রাষ্ট্রীয় সম্মানে। বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক অস্কার ওয়াইল্ডের লাশও স্থানান্তরিত হয়। কোরিয়ান ওয়ারসহ বিভিন্ন যুদ্ধে নিহত আমেরিকান সৈন্যদের লাশ পাঠানোর ঘটনা নিয়মিতই ঘটছে। কয়েক হাজার বছর আগে মারা যাওয়া ইজিপশিয়ান ফারাওদের মামি সে দেশে ফিরিয়ে দেয়ার একটি দাবির কথাও সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে।
কথিত আছে, আলেকজান্ডার দি গ্রেট বিশ্ব জয় করার শেষ প্রান্তে এসে তার সহযোগীদের বলেছিলেন, যদি আমি মারা যাই তবে লাশ নিয়ে ফেরার পথে আমার ডান হাত বাইরে বের করে রেখো। যেন মানুষ বুঝতে পারে বিশ্বজয়ী আলেকজান্ডার আজ ঘরে ফিরছে শূন্য হাতে। প্রচলিত এ বক্তব্যের সঙ্গে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরের অনেক পার্থক্য আছে। ৩৫ বছর পর তিনি ঘরে ফিরলেন। তবে শূন্য হাতে নয়, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় উজার করা ভালোবাসায় পূর্ণ হয়েই তিনি দেশে ফিরে এসেছেন। এদেশের মানুষকে তার মতো বীরেরা জীবনের বিনিময়ে এদের দিয়েছেন। সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ-স্বাধীনতা।
মতিউরের দেহাবশেষ ২৪ জুন ২০০৬ সাল রাতে পাকিস্তান থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছে। দেশের মানুষের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তা গ্রহণ করেন। পরদিন সকালে প্যারেড স্কোয়ারে দোয়া ও দর্শনার্থীদের জন্য তা কিছুক্ষণ রাখা হয়। যদিও এ সময় অতিরিক্ত কড়া নিরাপত্তার কারণে অনেকের পক্ষেই কফিনের কাছে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ন্যাশনাল প্যারেড স্কোয়ার এক সময় পরিচিত ছিলো কুর্মিটোল এয়ারপোর্ট হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধে মতিউর রহমান বাংলাদেশ ছাড়ার সময় এ এয়ারপোর্ট ব্যবহার করেছিলেন। ৩৫ বছর পর তিনি সেই এয়ারপোর্টেই এসে কিছুটা সময় থাকলেন। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সবার জন্যই একটি অসাধারণ ঘটনা। বিশেষ করে দেশের স্বাধীনতার পর জন্ম নেয়া প্রজন্মের জন্য এ এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা। দেশের জন্য শহীদ হওয়া সর্বোচ্চ খেতাবপ্রাপ্ত এক বীরের মৃত্যুর ৩৫ বছর পর কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করার বিষয়টি এক অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দেয়। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরকে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের সংরক্ষিত অংশে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
বীরশ্রেষ্ঠদের গ্রামে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় দরিদ্র মানুষের জন্য স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে সময় কাটছে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্ত্রী মিলি রহমানের। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর মতিউর রহমানের দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনায় একটি প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে তার। কিন্তু তিনি দীর্ঘদিন ধরে মতিউর রহমানের গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার রামনগর গ্রামকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর নগর’ করার যে দাবি জানিয়ে আসছেন, তা আজও পূরণ হয়নি। মিলি রহমান বর্তমানে ঢাকার মনিপুরীপাড়ায় বসবাস করেন। তার দুই সন্তান মাহিন মতিউর ও তুহিন মতিউর বর্তমানে প্রবাসে। ঢাকার মনিপুরীপাড়ায় যে বাসটিতে মিলি রহমানের বসবাস, সে বাসাটির প্রায় সর্বত্রই সাজানো হয়েছে মতিউরের স্মৃতিচিহ্ন। ড্রইংরুমের দেয়ালে বাঁধানো পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একটি এফ-৮৬ ও একটি টি-৩৭ বিমান।
হামিদুর রহমান ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর থানার খোরদা খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আক্কাশ আলী একজন দরিদ্র কৃষক এবং মাতা কায়সুননেসা গৃহিণী ছিলেন। সিলেট বিভাগের ধলই ফ্রন্ট। সেখানে এক সাধারণ সৈনিক সিপাহী হামিদুর রহমানের অসাধারণ কৃতিত্বের দরুন গোটা যুদ্ধের গতি পরিবর্তিত হয়ে যায়। হামিদুর রহমান ১৯৭১ সালে অল্প সময়ের জন্য আনসার বাহিনীতে ছিলেন। ২ ফেব্রুয়ারি ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ভর্তি হন। ভর্তির পর তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাস ইস্ট বেঙ্গল সেন্টারে প্রশিক্ষণের জন্য যান। ২৫ মার্চ প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরবর্তী ধলই দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের প্রায় চারশ’ গজ দূরে অবস্থিত ধলই চা বাগান। এরই পূর্ব প্রান্তে ধলই বর্ডার আউটপোস্ট অবস্থিত। ধলই সীমান্ত চৌকি থেকে নেমে মাত্র ২০০ গজ দূরে বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত খুঁটি। চা পাতার সবুজ বুক চিরে আঁকাবাঁকা টিলার পথ চলে গেছে সীমান্তে। খুঁটিগুলো ফসলের ক্ষেতে ক্ষীণ একটি ছড়ার জলরেখা দু’ভাগ করে দিয়েছে দু’দেশের জনপদ। বর্তমানে কমলগঞ্জ থানা সদরের বাজার চৌমোহনা থেকে দক্ষিণে মাধবপুর হয়ে ইট বিছানো সড়কটি দিয়ে এখন দু-একটি বাস চলাচল করলেও তা পাত্রকলা চা বাগানে গিয়ে থেমে যায়। দু-একটি পুরানো মডেলের জিপ ধলই পর্যন্ত কখনো কখনো গিয়ে পৌঁছে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরই ধলই সীমান্ত ফাঁড়িটির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে পাকিস্থানী বাহিনী ফাঁড়িটি তাদের দখলে নিয়ে যায়। যোগাযোগের ক্ষেত্রে অঞ্চলটি দুর্গম হলেও মৌলভীবাজার জেলার বিস্তৃত অঞ্চলে প্রবেশের ক্ষেত্রে এ সীমান্ত ফাঁড়িটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত রেখার দু’পাশ থেকেই দুই অঞ্চলে সহজে নজর রাখা যায়। দেশের অভ্যন্তরে সীমান্ত ফাঁড়িটির একদিকে রয়েছে শ্রীমঙ্গল থানার সীমান্ত এলাকাজুড়ে চা বাগান এবং সমতল মিলে সীমান্ত জনপদ।
 সামরিক দিক থেকে এই ফাঁড়িটি দখল করা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্তের ওপার (ভারত) থেকে অবরুদ্ধ বাংলাদেশে প্রবেশ করতে এই ফাঁড়িতে অবস্থানরত পাক বাহিনীর বাধার সম্মুখীন হয়। এই ঘাঁটি দখলের দায়িত্ব দেয়া হয় প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘সি’ কোম্পানিকে। ২৮ অক্টোবর ভোরে আক্রমণের দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়। রাত ১০টায় যাত্রা শুরু হয়। ভোর চারটায় লক্ষ্যস্থলে কাছে পৌঁছে চূড়ান্ত আক্রমণ করার কথা। গাছপালার জন্য রাতের অন্ধকার এমন জমাট বেঁধে ছিল যে মাত্র কয়েক হাত দূরে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। চরম প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও ‘সি’ কোম্পানির সৈন্যরা দুই প্লাটুন সামনে ও এক প্লাটুন অনুসরণকারী হয়ে অগ্রসর হতে থাকে। শত্রুর অবস্থান পর্যবেক্ষণের জন্য হাবিলদার মকবুল গাছে উঠেন অন্ধকার কেটে যাওয়ার পর। তিনি গাছ থেকে নামার পরপরই শুরু হয় শত্রুর গোলাবর্ষণ। গুলীর গতি পরিবর্তনের জন্য অধিনায়ক লে. কাইউম গোলন্দাজ বাহিনীর সাহায্যে শত্রুর ওপর পাল্টা গোলাবর্ষণের জন্য বেতারে যোগাযোগ করেন। গোলাবর্ষণের ফলে ঘাঁটির এক অংশে আগুণ ধরে যায় এবং শত্রুর গোলাগুীল বন্ধ হয়ে যায়। ‘সি’ কোম্পানির সৈনিকরা এবার অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু ঘাঁটির কাছাকাছি আসতেই মইন ফিল্টে বিস্ফোরণের ফলে বেশ কিছু সৈন্য হতাহত হয়। ঘাঁটিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই ঘাঁটির চতুর্দিকে মাইন পুঁতে তাকে সুরক্ষিত করা হয়েছিল। মাইন বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় শত্রুর অবিরাম গুলীবর্ষণ। আকস্মিক আক্রমণে হতাহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। বাধ্য হয়ে সৈনিকরা ভূমিতে অবস্থান নেয়। আর অধিক অগ্রসর হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। এদিকে ঘাঁটির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণায় শত্রুর এলএমজির অবস্থানের ফলে গাছপালার জন্য নিজস্ব মেশিনগান দিয়ে গুলী করেও কোনো ফল হচ্ছিল না। এলএমজিটা বিধ্বস্ত করতে না পারলে ঘাঁটি দখল অসম্ভব। এই অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্য এগিয়ে এলেন সিপাহী হামিদুর রহমান।
সাবধানে বুকে হেটে মুষলধারে বিক্ষিপ্ত গুলীবৃষ্টি উপেক্ষা করে ক্রলিং করে শত্রুর অগোচরে তিনি এগিয়ে গেলেন এলএমজির পোস্টের কাছে। বুকের নিচে কঠিন মাটি, সামনে-পেছনে, ডানে-বাঁয়ে-উপরে চলছে গুলী। উভয়পক্ষের আগ্নেয়াস্ত্রের মুহুমুর্হু গর্জন শান্ত প্রকৃতিকে করে তুলেছিল বিভীষিকাময়। সবকিছু উপেক্ষা করে, এমনকি নিশ্চিত মৃত্যুকে অবহেলা করে হামিদুর রহমান ঝাঁপিয়ে পড়েন শত্রুর এলএমজি পোস্টের ওপর। এলএমজি চালনায় নিয়োজিত দুই শত্রু সেনার সঙ্গে শুরু হয় ধ্বস্তাধ্বস্তি। ঝাঁকে ঝাঁকে গুলী এসে তার সমস্ত শরীর ঝাঁঝরা করে দেয়। তিনিও ক্ষত-বিক্ষত করে দিলেন এলএমজির চালক দুজনকে। এলএমজি বিধ্বস্ত হলো, তিনিও নিথর হলেন। এলএমজি নিষ্ক্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হয়ে উঠলেন মুক্তিযোদ্ধারা। ঘাঁটি দখল হলো, যুদ্ধে গতিও পরিবর্তন হয়ে গেল।
সেদিন হামিদুরের মৃতদেহটি সহযোদ্ধারা কাঁধে বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন সীমান্তের ওপারে। পরবর্তী সময়ে তাকে সীমান্ত থেকে দেড়-দু’মাইল অভ্যন্তরের ভারত এলাকার ‘আমবাসা’ গ্রামে সমাধিস্থ করা হয়। বর্তমানে ধলই সীমান্ত ফাঁড়ির কাঁঠালতলার সম্মুখেই নারকেলবীথির ছায়ায় নির্মাণ করা হয়েছে ‘শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান বীরশ্রেষ্ঠ সরণি’। সীমান্তের এক নিভৃত অঞ্চলে লোকচক্ষুর আড়ালে পড়ে আছে তার স্মৃতিসৌধটি। লাল চৌকা ভিত্তির ওপর একটি সাদা স্তম্ভ আকাশের দিকে উঠে গেছে। তার ডান পাশে সাত বীরশ্রেষ্ঠের প্রতীকে লাল চিহ্ন খচিত সাতটি ফলা উজ্জ্বল। লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা স্মৃতিসৌধটি সংরক্ষিত ও পরিচ্ছন্ন। এটি সীমান্ত চৌকির বিডিআর জোয়ানরা নিয়মিত স্মৃতিসৌধটি দেখাশোনা করছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও অনেক দিন হামিদুরের স্মৃতি ধরে রাখার কোনো উদ্যোগ ছিল না। ১৯৯২ সালে ১৭ রাইফেল ব্যাটালিয়ানের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বীরশ্রেষ্ঠ সরণি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। সে বছর ২ ফেব্রুয়ারি ১৭ রাইফেল ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক মহিদুর রহমান বাবুল সরণির নির্মাণ কাজ শুরু করেন এবং ২১ ফেব্রুয়ারি বিডিআর সিলেটের সেক্টর কর্মান্ডার লে. কর্নেল মোঃ বজলুল করিম উদ্বোধন করেন।
বীরশ্রেষ্ঠের দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনার ঘটনাকে জাতির জন্য একটি বিশেষ দিন, আনন্দের দিন। বীরশ্রেষ্ঠের দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, এটা অত্যন্ত আনন্দের। এটা আরও আগেই হওয়া উচিত ছিল। যে মাটির স্বাধীনতার জন্য হামিদুর জীবন দিয়েছেন সেই মাটিতে তার প্রত্যাবর্তন এ জাতির জন্য অত্যন্ত গৌরবের ঘটনা।
প্যারেড স্কোয়ারে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে হামিদুর রহমানের কফিন নিয়ে যাওয়া হয় মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও তিন বাহিনীর প্রধানদের উপস্থিতিতে তিন বাহিনীর একটি চৌকস দল আবারও গার্ড অব অনার প্রদর্শন করে সেখানে। এরপর লাল গালিচা বিছানো পথে ধীর পায়ে সেনাসদস্যরা হামিদুরের কফিন নিয়ে যায় তার জন্য নির্ধারিত কবরের দিকে। মুক্তিযুদ্ধের আরেক বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লে. মতিউর রহমানের কবরের উল্টো দিকে হামিদুর রহমানকে চিরতরের জন্য শায়িত করা হয়। দাফন কার্য পরিচালনা করেন ধর্মীয় শিক্ষক আমিনুল হক। দুপুর ১২টায় তাকে শায়িত করার পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা এবং তিন বাহিনীর প্রধানগণ, সেক্টর কমান্ডার এবং সর্বস্তরের মুক্তিযোদ্ধারা বীরশ্রেষ্ঠের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বর্ণাঢ্য আয়োজনে সেনাবাহিনীর ১০ সদস্যের একটি দল একযোগে ১০টি রাইফেলে তিনবার করে গুলী ছুঁড়ে ‘গান স্যালিউট’ করেন। তারপর তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে মরণোত্তর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। ফাতেহা পাঠ ও বিশেষ মোনাজাতের মাধ্যমে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের দাফন সম্পন্ন হয়। অবশেষে বাংলার মাটিতেই ঠাঁই হলো ৭ বীরশ্রেষ্ঠ সবারই। সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল, ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর, মুন্সী আব্দুর রউফ, ইঞ্জিনিয়ার রুহুল আমিন, নুর মোহাম্মদ শেখ আগেই ঘুমিয়েছিলেন বাংলার মাটিতে। ৫ বীর সন্তান রয়েছেন বাংলার আনাচে-কানাচে। কিন্তু বাকি দুই শ্রেষ্ঠ সন্তান ছিলেন দেশের বাইরে। তারা হলেন ফ্লাইট লে. মতিউর রহমান এবং সিপাহী হামিদুর রহমান।
বিশ্বের বুকে যতদিন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উড্ডীন থাকবে, ততদিন পর্যন্ত জ্বলজ্বল করে জ্বলবে মতিউর-হামিদুরসহ সব শহীদানের নাম। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ এই বীরের স্বাধীন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন সবার মনে, বিশেষ করে দেশের অগণিত মুক্তিযোদ্ধার মনে যে গভীর সুখানুভূতির জন্ম দিয়েছে তা ব্যাখ্যা করা সত্যিই কঠিন। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জীবিত মুক্তিযোদ্ধারা নানাভাবে অবহেলার শিকার হলেও শহীদদের স্বমহিমায় মর্যাদা দিতে কেউ পিছপা হননি। কারণ তাদের আত্মবলিদানেই আজ আমরা স্বাধীন দেশে বসবাসের অধিকারী হয়েছি। শুধু মুখেই মুক্তিযোদ্ধাদের ‘সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সন্তান’ বলা সীমাবদ্ধ থাকার কারণে অতীতে তাদের যথাযোগ্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি। এখনো মুক্তিযোদ্ধারা সাধারণভাবে অবহেলিত। সংবাদপত্রের পাতায় প্রতিদিনই বয়সের ভারে ন্যুব্জ মুক্তিযোদ্ধাদের করুণ জীবন কাহিনী পড়তে হয়। সেখানে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী এই বীরদের জীবনযুদ্ধে পরাজিত হিসেবে দেখা যায়। এটা যে কত গভীর বেদনাদায়ক ব্যর্থতা, সেটা জাতি হিসেবে আমাদের বুঝতে হবে। এ ধরনের ব্যর্থতার কারণেই দীর্ঘ ৪২ বছর পর এই স্বাধীন দেশে আজো মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন হয়নি। এখন এটা অনেকে উপলব্ধি করতে পারছেন বলেই সম্ভব হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাভ। তবে সেটা সবার জন্য যথাযথভাবে নিশ্চিত করা এখনো সম্ভব না হলেও বিদেশের মাটিতে অবহেলায় পড়ে থাকা আমাদের বীরশ্রেষ্ঠদের দেহাবশেষ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে দেশে এনে স্বমহিমায় সমাহিত করা হচ্ছে। এটা নিঃসন্দেহে সবার জন্য আনন্দের ও গৌরবের। কিন্তু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়ে গেছে। আর মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের অনেকেই এখনো বিস্মৃতির শিকার। দেশের ডাকে মায়ের বুক খালি করে যারা হাসতে হাসতে জীবন বিসর্জন দিয়েছেন তাদের কোনো তালিকা নেই আমাদের হাতে। এই বীর শহীদরা কে, কোথায়, কিভাবে চরম আত্মদান করেছেন তার কোনো ইতিহাস নেই এত বছর পরও। এটা বড় লজ্জার বিষয়। দেশে দেরিতে হলেও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে। কিন্তু তারপরও দেশের কোথাও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নির্দিষ্ট কোনো সমাধিস্থল করা হয়নি। এখন যে মুক্তিযোদ্ধারা একে একে মারা যাচ্ছেন তাদের কবরও ঠিকমত সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে কিনা, আমাদের জানা নেই। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একদিন হয়তো কিছুই খুঁজে পাবে না। তাই মনে প্রশ্ন জাগে, আর কতদিন এই উপেক্ষা নীরবে মেনে নিতে হবে। এখন সময় এসেছে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্বমহিমায় ইতিহাসের বুকে প্রতিষ্ঠা করার। আগামী প্রজন্মকে পথের দিশা দেখাতে পারে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ বিরেরা। এজন্য তাদের অমর দেশপ্রেমের গৌরব গাঁথা ইতিহাসের পাতায় লিখে রাখা দরকার। ইতোমধ্যে অনেক সময় অবহেলায় চলে গেছে। এখনো যদি সজাগ হয়ে দায়িত্ব পালনে আমরা এগিয়ে না আসি তবে কোনোভাবেই মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার দাবি করা যাবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ