ঢাকা, শুক্রবার 21 September 2018, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ১০ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে বাড়তি ফি ফেরত দেয়ার নির্দেশ

স্টাফ রিপোর্টার : মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার ফরম পূরণে নির্ধারিত ফির বাইরে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আদায় করা বাড়তি অর্থ ফেরতের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আদালতের আদেশে বলা হয়, সচিব ও ১০ শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এই মর্মে আদেশ জারি করবে যে, সমগ্র বাংলাদেশে যে সব বিদ্যালয় সরকার নির্ধারিত এসএসসি পরীক্ষার ফি এবং আইনগতভাবে আদায়যোগ্য ফি বহির্ভূত কোনো বাড়তি ফি আদায় করেছে, সেসব ফি আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে শিক্ষার্থীদের ফেরত দেবে। তা না হলে সংশ্লিষ্ট স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটি বাতিল বলে গণ্য হবে। আদেশ অমান্য করা হলে ওইসব ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা পরবর্তী তিন বছরের জন্য ব্যবস্থাপনা কমিটি ও গভর্নিং কমিটির নির্বাচনের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবেন।
আজ মঙ্গলবার বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ এই আদেশ দেন। এ বিষয়ে শুনানিতে ভিকারুন নিসা নুন স্কুল ও মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি বেসামরিক বিমান মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, উদয়ন স্কুলের সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, রাজউক স্কুল এন্ড কলেজের চেয়ারম্যান শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান প্রমুখ আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

শুনানিতে মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের কাছে হাইকোর্ট জানতে চান মন্ত্রী মহোদয় সরকারি আইন লঙ্ঘন করে এভাবে অতিরিক্ত ফি নেয়া কি ঠিক? জবাবে রাশেদ খান মেনন বলেন, আমরা বোর্ডের নিয়মানুযায়ী ফি নিয়েছি।
এর পর মন্ত্রীর আইনজীবী শ ম রেজাউল করিম আদালতকে বলেন, স্কুলে নিয়মিত ক্লাসের বাইরে কোচিং ক্লাস নেয়া হয়। কোচিং ক্লাস নেয়ার জন্য বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত অর্থ নিতে পারবে বলে বোর্ডের সার্কুলারে বলা আছে। এ সময় আদালত বলেন, কোচিং ক্লাস নেয়ার জন্য বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১২ শ’ টাকা অতিরিক্ত ফি নেয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ সময় আইনজীবী বলেন, বোর্ড নোটিশ দেয়ার পর অতিরিক্ত ফি ফেরত দেয়া হয়েছে।
আদালত বলেন, এটা তো শুধুমাত্র ২০টি স্কুলের প্রেক্ষাপট। আমরা সারা দেশের সব স্কুলের অবস্থা জানাতে আদেশ দিয়েছিলাম। কিন্তু শুধুমাত্র ঢাকা ও বরিশাল বোর্ড আমাদের রিপোর্ট জমা দিয়েছে।
এ সময় সরকারের ডেপুটি এটর্নি জেনারেল বলেন, ‘ঢাকা শহরের এমনও স্কুল আছে যেখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থীদেরকে কাছ থেকে ১৮ হাজার টাকা নিয়েছে। এটা পত্রিকায় আসেনি, অভিভাবকরা আমাদের জানিয়েছেন।
এরপর শিক্ষা সচিবকে উদ্দেশ্য করে আদালত বলেন, একটি আইনে সব ক্ষমতা শিক্ষা বোর্ডকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আপনারা শিক্ষা বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে একের পর এক প্রজ্ঞাপন জারি করেন। এমন বহু নজির আছে। কেন এমন করেন?
এ ব্যাপারে সচিব বলেন, এভাবে বললে তো হয় না, আমি তো মাত্র তিন মাস এসেছি, সুনির্দিষ্ট করে বললে ভাল হয়।
আদালত আরও বলেন, আপনারা যে সৃজনশীল পরীক্ষা চালু করেছেন, মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আদেশ জারি করেছেন, আপনারা এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করার কে? কাজটা তো বোর্ডের।
তখন সচিব বলেন, সৃজনশীল পরীক্ষা একটি রাষ্ট্রীয় নীতির বিষয়। এটা সরকারি সিদ্ধান্ত।
আদালত বলেন, আপনি তো শিক্ষা সচিব, আপনি কোন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি। আমরা যতটুকু জানি আপনি পদাধিকারবলে রাজউক ও রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের সভাপতি।
সচিব বলেন, আমি সভাপতি ঠিকই, কিন্তু তারা বেশী ফি নিয়েছে বলে আমি জানি না। আদালত বলেন, গ্রামাঞ্চলের বেশীরভাগ স্কুল বেশী ফি নিচ্ছে। সেখানকার অভিভাবকরা অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছল। এভাবে ফি নিলে তাদের ওপর অসহনীয় হয়ে যাবে।
সচিব বলেন, সব কিছু মন্ত্রণালয়ের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার ওপর বিষয়টি নির্ভর করে।
আদালত বলেন, আমরা আগে আদেশ দিয়েছি, কেউ যদি বর্ধিত ফি দিতে না পারে তাহলে তাকে পরীক্ষার ফরম পূরণে বাদ রাখতে পারবে না।
আদালত বলেন, স্কুলে কোচিং এর নামে বাড়তি টাকা নেয়া হচ্ছে। স্কুলে কোচিং করানো হলে বাইরে কোচিং সেন্টার কেন আছে? সচিব বলেন, ‘ব্রিটেন ও আমেরিকায় কোচিং সেন্টার আছে।
আদালত বলেন, আমাদের কমিউনিটি স্কুল ব্যবস্থা বিশ্বের কততম অবস্থানে রয়েছে?
সচিব জবাবে বলেন, ‘আমি জানি না। সারা পৃথিবীর ১৯০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান উপরের দিকে।
তখন আইনজীবী  শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন ভিসি। তখন সচিব বলেন, ‘চারজন ভিসিই হাইকোর্ট থেকে স্টে অর্ডার নিয়ে শিক্ষা বাণিজ্য চালাচ্ছে।
এরপর আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অতিরিক্ত ফি ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
এর আগে গত ১৪ ডিসেম্বর অধ্যক্ষ-প্রধান শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যানকে তলব করেছিলেন হাইকোর্ট। অতিরিক্ত ফি আদায়ের কারণে তাদের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না তা ৬ জানুয়ারি স্বশরীরে হাজির হয়ে কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছিল।
গত ১০ নবেম্বর দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত ‘এসএসসি ফরম পূরণ শুরু : আটগুণ বাড়তি ফি আদায়’ শীর্ষক প্রতিবেদন আমলে নিয়ে হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন। রুলে অতিরিক্ত ফি আদায় কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং অতিরিক্ত ফি আদায়কারীদের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে না তা জানতে চাওয়া হয়। শিক্ষা সচিবসহ বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়। একই সঙ্গে এসএসসি ফরম পূরণে বোর্ড নির্ধারিত সর্বোচ্চ এক হাজার ৪শ’ টাকার বেশী না নেয়ার জন্যও নির্দেশনা দেয়া হয়। এ ছাড়া যুগান্তরের প্রতিবেদক মুসতাক আহমদকে প্রতিবেদনটির যথার্থতা নিশ্চিত করতে বলা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ