ঢাকা, রবিবার 22 February 2015 ১০ ফাল্গুন ১৪২১, ২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬ হিজরী
Online Edition

ফিক্হশাস্ত্র গবেষণায় পাশ্চাত্যবিদদের দৃষ্টিকোণ

॥তিন॥
মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : এভাবেই আধুনিক মুসলিম প্রজন্মকে দীন থেকে দূরে রাখতে এবং ইসলামী আইন ও শরীয়া সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ করে তুলতে পরিকল্পিতভাবে চালানো হয় এক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন। ক্রুসেড যুদ্ধের পর থেকে মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে পরিচালিত ইউরোপিয়ানদের এই বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকে। বিগত দুই শতাব্দী ধরে তাদের এ আন্দোলন আরো বেগবান হয়। আন্দোলনের ফসল ঐসব প্রাচ্যবিদদের পিছনে ব্যয় করা হয় অঢেল সম্পদ। ফলে তাদের লেখালেখি ও গবেষণায় নতুন যাত্রা যোগ হয়। এক পরিসংখ্যানে দেখে গেছে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত এই দেড়’শ বছরে প্রাচ্যবিদগণ তাদের এ অশুভ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রাচ্য তথা ইসলাম, ইসলামী শরীয়ত, মুসলমান ও মুসলিম দেশ সম্পর্কে ষাট হাজার বই-পুস্তক রচনা করেছেন। “প্রাগুক্ত, পৃ. ২১৬; ড. আকরাম জিয়া আল-ওমারী, মাওকিফুল মুস্তাশরিক্বীন মিনাস সীরাতি ওয়াস সুন্নাহ, দারুল ইশবিলিয়্যাহ, পৃ. ৬-৭”। এর মধ্যে কিছু কিছু বই মুসলিম বিশ্বে অত্যন্ত সমাদৃত। ওসব গ্রন্থে উল্লেখিত প্রাচ্যবিদদের বিভিন্ন মতামতকে আধুনিক শিক্ষিত সমাজ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে থাকেন। যা অনেক সময় মুসলমানদের নতুন প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর ও ক্ষতিকর বিষয়ে পরিণত হয়। বিশেষ করে মুসলিম জীবনপ্রণালী, আইন ও বিচার, ফিক্হ, শরীয়তসহ ইসলামের সরাসরি বিষয়ে লিখিত কতিপয় প্রাচ্যবিদদের বই। প্রাঞ্জল আরবী বা ইংরেজি ভাষায় রচিত তাদের কোনো কোনো বইয়ের দোষ-ত্রুটিগুলো মুসলিম বিশেষজ্ঞ স্কলার্স ছাড়া সাধারণ পাঠক বা ছাত্র সমাজ কখনোই ধরতে পারবে না। অথচ ঐসব আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলমান যুবসমাজ এক সময় মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন, অনেক সময় ক্ষমতার শীর্ষস্থানীয় পদে আরোহন করেন। তখন মুসলমানের সন্তান হয়েও সেসব ক্ষমতাবানদের কার্যক্রমে দেখা যায়, ইসলামের প্রতি তাদের কোনো দরদ নেই, ঈমান ও শরীয়া বিরোধী এবং মুসলমানদের স্বার্থ বিরোধী পদক্ষেপ নিতে তাদের বুক কাঁপে না। মুসলিম হয়েও ইসলামী আইন মানেন না। ইসলাম আইন সেকেলে, এসব আইন ও বিচার বর্তমানে অচল, শরীয়া আইন মধ্যযুগীয় বর্বর আইন.. (নাউজুবিল্লাহ) ইত্যাদি যেসব উক্তি বর্তমান মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে বিভিন্ন নেতা ও কর্তাব্যক্তিদের মুখে শোনা যায়, তা সেই প্রাচ্যবিদদেরই ভয়াবহ প্রভাব এবং বিদ্বিষ্ট প্রাচ্যবিদদের লেখা বিভ্রান্তিকর বই-পুস্তকের আলোয় গড়ে উঠার ভয়ানক পরিণতি।
রচনা ও গবেষণার ক্ষেত্রে প্রাচ্যবিদদের কৌশল সম্পর্কে প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. বলেন, অনেক প্রাচ্যবিদ তাদের লেখায় নির্দিষ্ট পরিমাণে বিষ মিশিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে তারা খুব সতর্কতা অবলম্বন করেন। নির্ধারিত পরিমাণের চাইতে বেশি (তথ্য) বিষ প্রয়োগ করেন না, যাতে পাঠক নি:সঙ্গতা অনুভব না করে, সতর্ক হয়ে না যায় এবং লেখকের স্বচ্ছতার প্রতি তার যে আস্থা তা যেন দুর্বল হয়ে না যায়। এমন প্রাচ্যবিদদের লেখা পাঠকের জন্যে ঐসব লেখকের চাইতে বেশি ভয়ংকর ও বিপদজনক যারা প্রকাশ্যে শত্রুতা করেন এবং নিজেদের লেখা বই-পুস্তকসমূহকে মিথ্যা ও বানোয়াট দিয়ে বোঝাই করে তোলেন। ফলে মধ্যম মানের বিবেকসম্পন্ন পাঠকের পক্ষে এসব লেখকের বিষাক্ত ও মিথ্যা তথ্যের সামনে হার না মেনে তাদের বই-পুস্তক থেকে বেরিয়ে আসা অথবা পড়া সমাপ্ত করা কঠিন হয়ে যায়। “সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭”। তবে আধুনিক যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষের দরুন পশ্চিমাদের মাঝে ইসলাম, পবিত্র কুরআন ও হাদীস নিয়ে গবেষণার আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়। বর্তমান প্রেক্ষিতে ইসলামী আইনের যথার্থতা অনেকের নিরপেক্ষ গবেষণায় ইতিবাচক হিসেবে ধরা পড়ে। ফলে পূর্ববর্তী প্রাচ্যবিদদের ইসলামী আইন ও ফিকহশাস্ত্র বিষয়ক কোনো কোনো দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে পরবর্তী প্রাচ্যবিদগণ ভিন্নমতও পোষণ করেন। বিশেষ করে পূর্ববর্তীদের মানহানিকর ও উপনিবেশবাদী সুরের স্থলে নতুনদের রচনায় স্থান করে নিয়েছে বিষয়ভিত্তিক ও একাডেমিক গবেষণা। এই প্রসঙ্গে বিশ্লেষক ফয়যাল ম্যানজু’র বক্তব্য বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, Since the beginning of Oreintalism as a discipline in the 17th century until today, research methodology in Islamic law has witnessed a paradigmatic shift. The derogatory and colonialist tone of pioneers such as Goldzihar, Schacht and Watt has been replaced by academic objectivity by scholars such as Nadia Abbott and Wael Hallaq. “Faizal Manjo Jbid, p.6”
ফিক্হ সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের মতামত-পর্যালোচনা : ইসলামী আইন, শরীয়ত ও ফিক্হশাস্ত্র নিয়ে বিদ্বিষ্ট প্রাচ্যবিদদের কয়েকটি মতামত বা অপবাদ প্রসিদ্ধ, যা ইসলামী চিন্তাধারার সাথে অত্যন্ত সাংঘর্ষিক। যথা: এক. ইসলামী আইন ও শরীয়ত প্রাচীন রোমান আইন দ্বারা প্রভাবিত ও মদদপুষ্ট। দুই. আধুনিক যুগে ইসলামী শরীয়ত বা আইন অচল। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার যোগ্যতা নেই ইসলামী আইন ও ফিক্হশাস্ত্রের। তিন. ফিক্হ বা ইসলামী আইন ধর্মের গন্ডি বহির্ভূত একটি বিষয়। ইসলামী আইন, শরীয়াহ ও ফিক্হশাস্ত্র বিষয়ে প্রাচ্যবিদদের উপযুক্ত মতামত এবং তাদের আরোপিত অপবাদসমূহ নিতান্ত প্রলাপ এবং সত্যকে আড়াল করতে অন্তরসারশূন্য অপপ্রয়াস বৈ কিছু নয়। ইসলামী আইনের বিদগ্ধ গবেষকগণ এসব অপবাদের যথাযথ জবাব দিয়েছেন তাদের বিভিন্ন গবেষণাকর্মে। এক্ষেত্রে প্রচুর বই বের হয়েছে আরব বিশ্বে। যার বিস্তারিত আলোচনা এই স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট গবেষকদের কতিপয় মূল্যায়ন দিয়েই সংক্ষিপ্তাকারে এ বিষয়ে পর্যালোচনা করতে চাই।
শরীয়াহ আইন রোমান আইনের প্রভাব : ইসলামী আইন ও শরীয়ত প্রাচীন রোমান আইন দ্বারা প্রভাবিত ও মদদপুষ্ট-এর মতামত ও অপবাদের প্রবক্তা প্রাচ্যবিদ ‘গোল্ডযিহার’, ‘ভন ক্রেমার’, ‘শেলডন অ্যামস’সহ আরো অনেকে। এ প্রসঙ্গে প্রাচ্যবিদ শেলডন অ্যামস (Sheldon Amos)-কয়েকটি প্রসিদ্ধ উক্তি প্রখ্যাত লেখক ও গবেষক ড. মামুদ হামদী জকজুক তাঁর একটি গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি শেলডনের উক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, প্রাচ্যবিদ শেলডন স্পষ্টভাষায় বলেন, মুহাম্মাদী (তথা ইসলামী) আইন হচ্ছে পূর্বাঞ্চলীয় সাম্রাজ্যের রোমান আইনের সংস্কৃত রূপ। ওটাকেই আরব রাজ্যসমূহে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী সাজিয়ে তৈরি করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, মুহাম্মাদী আইন জাস্টিনিয়ান (Justinian) আইন ছাড়া আর কিছু নয়। ওটাকেই কেবল আরবী পোশাক পরানো হয়েছে। “ড. মাহমুদ হামদী জকজুক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৩-১১৪। Mian Rashid Ahmad Khan, Islamic Jurisprudence, Sh.Muhammad Ashraf, Lahore, 1978, pp. 153-155”
ইসলামী শরীয়াহ আইনে রোমান আইনের প্রভাব-এই বিষয়ের অনুকূলে প্রাচ্যবিদদের দাবি হচ্ছে, মুসলমানরা যেসব এলাকা ও অঞ্চল জয় করেছিল সেখানকার বিজিত জাতির আইন-কানুন থেকে সাহায্য নেয়াটাই স্বাভাবিক। আর এসব এলাকায় তখন প্রচলিত ছিল রোমান আইন। মুসলমানদের পদানত হবার পূর্বে এসব এলাকা রোমান সাম্রাজ্যের আতওতাধীন ছিল। এভাবে ইসলামী ফিক্হ ও শরীয়াহ আইন রোমান আইন দ্বারা প্রভাবিত হয়। এমনকি প্রাচ্যবিদ গোল্ড যিহারের ভাষায় ‘ফিক্হ’ ও ‘ফুকাহা’ পরিভাষাদ্বয় রোমান আইনি পরিভাষা যথাক্রমে (Juris) Prudentis ও (Juris) Prudentes দ্বারা প্রভাবিত। “ড. ইবরাহীম আওয়াদ, দায়েরাতুল মা’আরিফ আল-ইসলামিয়াহ আল-ইস্তিশরাকিয়া : আদালীল ওয়া আবা আবা’তীল, মিসর : মাকতাবাতুল বালাদিল আমীন, ১৯৯৮ইং, পৃ. ৯৯”।
রোমান আইনের ক্ষেত্রে প্রথম কথা হচ্ছে, সব প্রাচ্যবিদ কিন্তু এমন দাবি করেননি। যে, ইসলামী আইন ও ফিক্হ রোমান আইন দ্বারা প্রভাবিত। যারা করেছেন তাদের অন্যতম হচ্ছেন : গোল্ড যিহার তার (Introduction to Islamic Theology and Law গ্রন্থে, ভন ক্রেমার গ্রন্থে, ডি পোর তার গ্রন্থে এবং শেলডন অ্যামস তার (Roman Civil Law) শীর্ষক গ্রন্থে। তাদের বাইরে আরো অনেক প্রাচ্যবিদ রয়েছেন যারা এ দাবির বিপক্ষে। তাদের মধ্যে মিয়্যূ, ন্যালিনিও, ওলফ, নোলডে, অ্যারমেনজুল, যায়েস প্রমুখ। উদাহরণস্বরূপ প্রাচ্যবিদ যায়েস নিশ্চিত করে বলেন, ইসলামের শরীয়াহ আইন ও রোমান আইনের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ এখানে একটা মানব রচিত এবং আরেকটার উৎস হচ্ছে ঐশী প্রত্যাদেশ। “ড. ইবরাহীম আওয়াদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৪”।
কিসের ভিত্তিতে প্রাচ্যবিদগণ বলেন, ইসলামী শরীয়ত রোমান আইন ও রোমান বিচার ব্যবস্থা থেকে নেয়া। এক্ষেত্রে তাদের দলিলসমূহ হচ্ছে মোটামুটি নিম্নরূপ: ক. ইসলামের পূর্বে আরব ও রোমানদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। এই যোগাযোগের কারণে প্রথমপক্ষ দ্বিতীয় পক্ষের আইন দ্বারা প্রভাবিত হয়। খ. মুসলমানরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে রোমানদের আইন দ্বারা প্রভাবিত হয়। গ. ইসলামী শরীয়াহ আইন আরবদের প্রচলিত কতিপয় উরফ তথা প্রথা-রেওয়াজ দ্বারা প্রভাবিত, যেসব প্রথা-রেওয়াজ পূর্ব থেকেই রোমান আইন দ্বারা প্রভাবিত ছিল। ঘ. এক্ষেত্রে তারা কতিপয় রোমান আইনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে ইঙ্গিত করেন, যা তখনকার যুগে শাম, মিসর, আলেকজান্দ্রিয়া, বৈরূত ও কায়সারিয়ায় ছিল। ঙ. এ প্রসঙ্গে তারা রোমান আইন বিষয়ক কিছু বই-পুস্তকের কথাও উল্লেখ করেন। চ. রোমান বিচারপদ্ধতির প্রভাব, যা তৎকালীন সময়ে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনস্ত রাজ্যসমূহে প্রচলিত ছিল। বিশেষ করে তারা রোমান প্রেইটর পদ্ধতি এবং ইসলামের বিচারক পদ্ধতির মধ্যে সাদৃশ রয়েছে বলে দাবি করেন।
এছাড়া প্রাচ্যবিদদের মতে, ইসলামী ফিক্হ ও রোমান আইনের মধ্যে প্রচুর সাদৃশ্য রয়েছে। যেমন অর্থাৎ বাদীকে দলিল পেশ করতে হবে, প্রাপ্ত বয়স্কের বয়স নির্ধারণ, (ক্রয়-বিক্রয়) ও (পণ্য বিনিময়)-এর মধ্যে সাদৃশ্য প্রভৃতি। তাদের দৃষ্টিতে এসব সাদৃশ্যই প্রমাণ করে, ইসলামী আইন রোমান আইন দ্বারা প্রভাবিত। “ড. মুহাম্মদ যুহদী য়াকুন, আল-কুনূনুর রূমানি ওয়াশ-শরীআতুল ইসলামিয়াহ, বৈরূত : দারু য়াকুন, পৃ. ৪৫-৮০; ড. ইবরাহীম আওয়াদ, প্রাগুক্ত, ১৯৭৫ইং, পৃ. ১০৫”। রোমান আইন বিষয়ে প্রাচ্যবিদদের উপর্যুক্ত মতামত ও দাবি নিতান্তই অজ্ঞতাপ্রসূত ইসলামী ফিক্হ ও আইনের প্রকৃত ইতিহাস এবং রোমান আইনের ইতিবৃত্ত পর্যালোচনা করলেই এসব মতামতের অসারতা প্রতীয়মান হয়।
প্রথমত, ইসলামী ফিক্হ রোমান আইনের মদদপুষ্ট- এই দাবিটাই হচ্ছে নতুন; যার সূচনা উনবিংশ শতাব্দীতে। সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি এ দাবিটা উত্থাপন করেন তিনি হচ্ছেন আলেকজান্দ্রিয়ার অধিবাসী ‘ডোমিনিলো জেতসকি’ নামক জনৈক ইতালিয়ান আইনজীবী। আলেকজান্দ্রিয়া থেকে ১৮৬৫ ইং, সালে ইতালি ভাষায় প্রকাশিত তার একটি বইয়ে তিনি এমন দাবি করেন। এখানে আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, এ দাবি যদি সঠিক হত, তাহলে ইসলামের আবির্ভাবের পর থেকে দীর্ঘ শতশত বছরে পশ্চিমা লেখক ও গবেষকগণ নিশ্চুপ বসে থাকতেন না। বাইজান্টাইন লেখকরা ইসলাম, ইসলামের নবী, ইসলামের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ নিয়ে কত লিখেছেন! কিন্তু তাদের একজনও এমন দাবি করেননি। এ দাবির সপক্ষে লেশমাত্র সত্য থাকলেও আহলে কিতাব ও পশ্চিমারা ইসলামের শত্রুতায় বইয়ের পাহাড় রচনা করে দিতেন।
ফিকহ ও ফুকাহা পরিভাষাদ্বয় রোমান আইনি পরিভাষা থেকে নেয়া-প্রাচ্যবিদ গোল্ডযিহারের এমন দাবি নিতান্তই সত্যবিবর্জিত। ইসলামী আইনের মৌলিক উৎস পবিত্র কুরআন ও হাদীস সম্পর্কে তার অজ্ঞতাই প্রমাণ করে। মিস্টার গোল্ডযিহার হয়ত জানেন না, ইসলামী আইন প্রণয়নে রোমান আইনের প্রভাবের অনেক পূর্বেই পবিত্র কুরআনে ফিকহ শব্দের মূলধাতু থেকে উৎসারিত বিভিন্ন আঙ্গিকে শব্দ অন্তত বিশ জায়গায় এসেছে। আর হাদীস শরীফে যা এসেছে তা তো অসংখ্য।
শরীয়া আইনে রোমান আইনের প্রভাব বিষয়ে প্রাচ্যবিদদের উত্থাপিত অবশিষ্ট দাবিও মতামতের জবাবে ইতিহাসের সত্য উচ্চারণ হচ্ছে, জাহিলি যুগে আরবরা বেদুঈন জীবন-যাপন করত। প্রতিবেশী বিভিন্ন জাতি যাদের মধ্যে বাইজান্টাইনও ছিল- তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কোনোই সুযোগ ছিল না। উভয়ের মধ্যে ব্যবসায়িক যে সম্পর্ক ছিল তা কাফেলাসমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। যেসব কাফেলা বছরে একবার সিরিয়া যেত তাতে আরবদের সংখ্যাও থাকত নিতান্ত অল্প। সীমিত সময়ের জন্য কাফেলা থামত সেখানে এবং বাইজান্টাইনদের সঙ্গে পণ্য বিনিময় করে পুনরায় প্রত্যাবর্তন করত। ঐসব এলাকায় বসবাসরত গাসসান জাতি বাইজান্টাইন সভ্যতা বাহ্যিক কিছু আচার-আচরণ দ্বারা প্রভাবিত ছিল বটে। কিন্তু তারাও রোমান আইন গ্রহণ করেনি। অনুরূপভাবে মিসর ও সিরিয়াবাসী বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনস্ত হওয়া সত্ত্বেও আঁকড়ে ছিল তাদের স্থানীয় আইন-কানুন।
ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মাধ্যমে ইসলামের পূর্বেই আরবদের মধ্যে রোমান আইন স্থানান্তরিত হওয়া বিষয়ে গবেষকদের বক্তব্য হচ্ছে, বরং ইহুদি আইনই রোমান আইনে প্রভাব বিস্তার করেছিল। ৭০ খ্রিস্টাব্দে ইহুদি আর রোমান সরকারের মধ্যে সংঘটিত সংঘর্ষসমূহের কারণে ইহুদিরা তাদের ধর্মীয় প্রথাসমূহ ধরে রেখেছিল। এমনিতেই তারা রোমান সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল। এদিকে ইহুদিরা ইসলামের পূর্বে আরব উপদ্বীপে এতই সংখ্যালঘু ছিল যে, আরবদের উপর তাদের কোনো প্রভাব পড়ার সম্ভাবনাই নেই। একইভাবে আরবদের মধ্যে খ্রিস্টানদের সংখ্যাও ছিল খুবই অল্প। নাজরানে যেসব খ্রিস্টান ছিল তাদের সম্পর্ক ছিল আবিসিনীয়দের সাথে। কারণ উভয়ের ধর্ম ইয়াকুবী হওয়ায় আবিসিনীয়দের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্কে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী রোমানদের তুলনায় বেশি শক্তিশালী ছিল। অন্যান্য খ্রিস্টান গোত্র যারা রোমান সাম্রাজ্যের পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় বসবাস করত তারাও তাদের গ্রামীণ ও বেদুঈন জীবনপদ্ধতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিল। রোমান আইনের কোনো কিছু তাদের মধ্যে প্রবেশের ঘটনা ঘটেনি। এ প্রসঙ্গে ড. বদরান আরো যোগ করে বলেন, ইসলামী ফিকহের কোনো ইমামই ইহুদি বংশোদ্ভুত ছিলেন না অথবা কেউই ইহুদি শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না। এছাড়া ইহুদি শরীয়া আইন লিপিবদ্ধ ছিল হিব্রু ভাষায়, যা সাধারণত আরবরা জানত না। ফলে ইসলামের পূর্বে ইহুদি কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে আরবদের মধ্যে রোমান আইন প্রভাব বিস্তার করেছিল- কথাটা সঠিক নয়। রোমান আইনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দ্বারা প্রভাবের দাবিটাও অসত্য। গবেষক ড. যুহদি ও ড. বদরান উভয়ই তাদের দীর্ঘ গবেষণাকর্মের পর এই ফলাফলে পৌছেন যে, সিরিয়া ও মিসরে যখন ইসলামের বিজয় সূচিত হয় তার অনেক পূর্বেই ঐসব কথিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে গিয়েছিল। তারপরও মুসলিম ফিক্হবিদদের মধ্যে ঐসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রভাবের দাবি তোলাটা সম্পূর্ণ অনৈতিক ও কল্পনাপ্রসূত।
এবার আসুন রোমান আইনের বই-পুস্তকের প্রভাব বিষয়ে। এ দাবি খ-নের জন্য আমাদের এতটুকু জানাই যথেষ্ট যে, আরবরা চিকিৎসা, দর্শন, সৌরবিদ্যা, অংকশাস্ত্র ইত্যাদি বিষয়ে অনেক প্রাচীন বই-পুস্তক অনুবাদ করলেও তারা কিন্তু আইনের কোনো বই অনুবাদ করেনি। এ রকম কিছু ঘটলে অন্যান অনূদিত বিষয়ের মধ্যে তার উল্লেখও থাকত নিঃসন্দেহে। উদাহরণস্বরূপ পিথাগোরাস, প্ল্যাটো, এরিস্টটল, গালিনিউস প্রমুখদের নামের সাথে সাথে তাদের বই-পুস্তকের বাইজান্টাইন আইনজ্ঞদের নামও আমরা দেখতে পেতাম। এছাড়া রোমান আইনের বই-পুস্তক নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে- ধর্মীয় আক্বীদা-বিশ্বাস মুসলিম ফিক্হবিদদেরকে সেই অনুমতি দিত না। তবে হ্যাঁ, রোমান আইনের একটি গ্রন্থ পাওয়া যায় যা আরবীতে অনূদিত হয়েছিল। তা হচ্ছে- কিন্তু এর অনুবাদ সম্পন্ন হয় ১১০০ ইং, সালে অর্থাৎ ইসলামী ফিক্হ প্রণয়নের বেশ কয়েক শতাব্দী পর। এ একটি মাত্র উদাহরণ রয়েছে যার কোনো আলোচনাই আসেনি পরবর্তীতে প্রণীত ইসলামী ফিক্হ ও আইনের গ্রন্থসমূহে।
ইসলাম ও রোমান আইনের বিচারব্যবস্থার মধ্যে সাদৃশ্যের যে দাবি উত্থাপিত হয় তার জবাবে বলা যায়, আরবরা যখন প্রথম সিরিয়া জয় করে তখন ‘প্রেইটর’ পদ্ধতি বলবৎ ছিল। কিন্তু ইসলামের সূর্য উদিত হবার অন্তত চার শতাব্দী পূর্বেই রোমান সাম্রাজ্য থেকে এই পদ্ধতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। এছাড়া উভয় পদ্ধতিতে যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, তা তো আছেই। যেমন, রোমান আইনে বাদী-বিবাদী নিজেরাই বিচারক নির্বাচন করত এবং উভয়ের দাবি বিচারকের সামনে উত্থাপন করত। বিচারক তাদের দাবিগুলো শুনে নির্দিষ্ট বিশেষ কিছু ফরমে তা লেখার নির্দেশ দিত, যেখানে বিচারক মামলার রায় কিভাবে দিবে তার চিত্র তুলে ধরা হত। অথচ ইসলামী আইনে রাষ্ট্রই বিচারক নিযুক্ত করে। উভয় পক্ষে উপস্থাপিত মামলায় ইসলামের প্রচলিত আইনে সূরাহা না হলে বিচারক শরীয়তের আলোকে গবেষণা করে সিদ্ধান্ত বের করে রায় দিয়ে থাকেন।
ইসলামী ফিক্হ ও রোমান আইনের মধ্যে আরো যেসব সাদৃশ্যের কথা বলা হয়েছে যেমন, অর্থাৎ বাদীকে দলিল পেশ করতে হবে, প্রাপ্ত বয়স্কের বয়স নির্ধারণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে সাদৃশ্য তাও সঠিক নয়। কারণ, বাদী তার দাবির সপক্ষে দলিল উপস্থাপন করবে-মর্মে ইসলামী আইনে যে ধারাটি রয়েছে তা এমন একটি আরবী প্রবাদ থেকে উৎসারিত যা হাদীস শরীফে বর্ণিত। পুরো হাদীসটা হচ্ছে- “আহমদ ইবন হুসাইন আল-বায়হাকী, সুনান আল-বায়হাকী আল-কুবরা, মক্কা: মাকতাবাতু দারিল বা’য, ১৯৯৪ইং, খ. ৮, পৃ. ১২৩”। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ