ঢাকা, বুধবার 21 November 2018, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বাজিতখিলায় সূর্য উঠতেই অন্যরকম দৃশ্য

তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। বিদ্যুৎহীন শেরপুর সদর উপজেলার বাজিতখিলা ইউনিয়নের মুদীপাড়া। তার উপর বিজিবি-র‍্যাব-পুলিশের কড়াকড়ি। কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই ঘেঁষতে পারছিল না কেউ।

ফলে রোববার ভোর রাতে অনেকটাই চুপিসারে জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের দাফন-কাফন সম্পন্ন হয়ে যায়। যাতে সীমিত সংখ্যক স্বজন ও গ্রামবাসী উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সূর্য উঠতেই অন্যরকম দৃশ্য।

হাজার হাজার মানুষ আসছে কামারুজ্জামানের কবরে। তাদের কারো চোখে শোকের অশ্রু, কারো চোখে ভয়ার্ত চাহনি। কী করবে, না করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। কেউ কবরে একমুঠো মাটি দিচ্ছে। কেউ কবরের মাটিতে চুমু খাচ্ছে। কেউ আবার কবর জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলছে।

পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, প্রশাসনিক বাধা যত কাটবে কামারুজ্জামানের কবর ঘিরে জনতার ঢল বাড়বে।

ইতোমধ্যে শেরপুরের চরাঞ্চল থেকে অনেক সাধারণ নারী-পুরুষ ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের অনেক জায়গা থেকে কামারুজ্জামানের ভক্তদের রওনা হওয়ার কথা জানা গেছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য কামারুজ্জামানের ফাঁসি হলেও তার ভক্ত-সমর্থকরা মনে করেন তিনি নির্দোষ। রাজনৈতিক বিবেচনায় তাকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে জানিয়ে তারা দাবি করেন জীবনে কখনোই নালিতাবাড়ী উপজেলার বিধবাদের গ্রাম হিসেবে পরিচিত সোহাগপুরে যাননি কামারুজ্জামান।

রোববার ফজর নামাজের পর ভোর ৫টা ২০ মিনিটে বাজিতখিলা ইউনিয়নের কুমড়ি মুদিপাড়া গ্রামের বাড়িতে ‘বাজিতখিলা এতিমখানা মাদ্রাসা’ সংলগ্ন জমিনের কবরে কামারুজ্জামানকে কবর দেয়া হয়।

অন্যদিকে সারা রাত প্রচুর ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তার গ্রামের বাড়ির পাঁচ বর্গ কিলোমিটারের বাইরে হাজার হাজার মানুষ রাতভর অপেক্ষা করেও জানাজায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাননি।

শেরপুর সদর আসন থেকে লক্ষাধিক ভোট পাওয়া কামারুজ্জামানের জানাযায় জনসমাগম ঠেকাতে গ্রামের বাড়ির পাঁচ বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে কাউকেই প্রবেশ করতে দেয়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এমনকি ঢাকা থেকে লাশের সাথে যাওয়া গণমাধ্যম কর্মীরাও স্থানীয় বাজিতখিলা বাজারে ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে ছিলেন।

স্থানীয় একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, কামারুজ্জামানের জন্মভূমি বাজিতখিলা ইউনিয়ন জুড়েই রাতভর শতশত আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন ছিল।

রাতে ওই এলাকায় প্রচুর ঝড়-বৃষ্টি হয়। পুরো এলাকা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। ভোর ৪টার দিকে বিদ্যুৎ আসলেও থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছিল। তারপরেও জনসমাগম প্রতিহত করতে সারা রাতই সশস্ত্র টহল দিতে হয়।

বাজিতখিলা জুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে জানিয়েছেন, শেরপুরের পুলিশ সুপার মেহেদুল করিম ।

মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৫২ সালে শেরপুর জেলার বাজিতখিলা ইউনিয়নের কুমরি মুদিপাড়া গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মৌলবি ইনসান আলী সরকার।

কৃষকের সন্তান ও দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ায় শেরপুরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন কামারুজ্জামন। এলাকাবাসী তাকে ‘জামান’ সম্বোধন করতেন।

কামারুজ্জামান শেরপুর সদর আসন থেকে চারবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। প্রতিবারই তিনি বিপুল সংখ্যক ভোট পান।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জীবনের সর্বশেষ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। ওই নির্বাচনে লক্ষাধিক ভোট পান কামারুজ্জামান। কিন্তু বরাবরের মত তিনি নির্বাচনে হেরে যান।

এলাকার সন্তান হিসেবে চরাঞ্চলের নারী ও শহরের হিন্দুদের ব্যাপক সংখ্যক ভোট পান। বিজয় নিশ্চিত করতে না পারলেও কোন নির্বাচনেই তার জনপ্রিয়তা কমেনি, বরং বেড়েছে।

২০১০ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গন থেকে কামারুজ্জামানকে গ্রেপ্তারের পর এলাকাবাসী আন্দোলনের চেষ্টা করেছিল। তখন বহু সংখ্যক মামলা, কারাবাস ও মারধরসহ বিভিন্ন হয়রানির শিকার হয়। এর মধ্যে শত শত মানুষ এলাকাও ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।

কামারুজ্জামানের মৃত্যুর পরের পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, তার কবর ও পরিবারের প্রতিও অকুণ্ঠ সমর্থন বজয়া রাখবেন শেরপুরের কামারুজ্জামান ভক্তরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ