ঢাকা, বুধবার 1 July 2015 ১৬ আষাঢ় ১৪২২, ১৩ রমজান ১৪৩৬ হিজরী
Online Edition

সত্যজিৎ রায় ॥ নতুন প্রজন্মের কাছে এক সীমাহীন আকাশ

রাজ্যশ্রী বকসী : সত্যজিৎ রায় এক সীমাহীন আকাশ নতুন তথা আধুনিক প্রজন্মের কাছে। তাকে কোনও সহজ সমীকরণে ফেলা যায় না। বাঙালি হয়েও সর্বভারতীয় এবং আন্তর্জাতিক একজন মানুষ, নিজেকে এমন সাংস্কৃতিক বনেদিয়ানা ও আভিজাত্যে তিনি মেলে ধরেছিলেন যে, তাকে ‘উনি তো এই’ গোছের সমীকরণে ফেলতে পারেনি আজও আম বাঙালি। ফলত তার ক্ষেত্রে তৈরি প্রশস্তিগাথা প্রস্তুত থাকে প্রতি বছর। কিন্তু ‘মহারাজা তোমারে সেলাম’ বলে যত বিস্ফোরণ হয়, বছর বছর, তার সিকিভাগ আন্দোলন যদি সেই মহারাজকীয়ত্ব খুঁজতে মগ্ন হতো, তবে বাঙালি চরিত্রে ঢের রদবদল হত বলাবাহুল্য।
রেললাইনের পাতা খুঁটিতে কান পেতে অপু-দুর্গা যেদিন দূরাগত রেলের আওয়াজ শুনেছিল, বাংলা ছবিও যেন সেদিনই কান পেতে শুনেছিল আধুনিকতার পদধ্বনি। বস্তুত সত্যজিতের আগেও বাংলা ছবি ছিল, তবে বলা ভালো তা ছিল সাহিত্যের নেওটা, ছায়া অনুসারী। সাহিত্যের সাতমহলায় দাঁড়িয়েও ছবিকে পৃথক শিল্প হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবার আত্মবিশ্বাস বাংলা ছবিকে দিয়েছিলেন এই মানুষটিই। গল্প বলার নিখুঁত কাঠামো থেকে নান্দনিকতার শীর্ষবিন্দু ছোঁয়া সম্ভব হয়েছিল তার জন্যই।
চলচ্চিত্র বোদ্ধারা আজও তাতে বুঁদ হয়ে আছেন কিংবা থাকবেন। কিন্তু ধরা যাক সেই সত্যজিতের কথা, যিনি পরিণত বয়সে এসে লিখছেন ‘যখন ছোট ছিলাম’, জানাচ্ছেন আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ার কারণে গড়পাড়ের বাড়ি ছেড়ে চলে আসার কথা। কিন্তু জানিয়ে বলছেন, ‘আমার বয়স তখন ছয়ের কাছাকাছি। আমার মনে হয় না, সে বয়সে বড় বাড়ি থেকে ছোট বাড়ি, বা ভালো অবস্থা থেকে সাধারণ অবস্থায় গেলে মনে বিশেষ কষ্ট হয়। ‘আহা বেচারা’ কথাটা ছোটদের সম্বন্ধে বড়রাই ব্যবহার করে, ছোটরা নিজেদের বেচারা ভাবে না।’ এই তো সেই মহারাজকীয় চরিত্র, যে জানে ‘তোমারও অমল অমৃত পড়িছে ঝরিয়া’। সত্যজিত অন্বেষণে এই দিকও হয়তো অবহেলার নয়।
যেমন যখন সম্পাদক সত্যজিতের আর এক ঘটনা দেখি। ‘সন্দেশ’র জন্য তখন তাকে দেদার লিখতে হচ্ছে। পাশাপাশি ছবির কাজ তো আছেই। সে সময় শান্তিনিকেতন থেকে তাকে লেখা পাঠিয়েছেন অজেয় রায়। গল্প পড়ে, পালটা চিঠিতে তিনি লেখকের কাছে জানতে চেয়েছেন, যে বিশেষ তথ্য গল্পটিতে দেয়া আছে তা সঠিক কিনা। আজকের মতো তথ্যের এমন বিপুল বিস্ফেরণ থাকলে হয়তো নিজেই দেখেনিতেন, কিন্তু ছোটদের হাতে দেয়ার আগে এতটুকু বিচ্যুতি যেন না থাকে তাতে তার কতখানি নজর ছিল তা এই চিঠিতে বোঝা যায়।
অজেয়বাবুকে লেখা আর এক চিঠিতেই তিনি লেখেন, অন্যান্য কিশোর পত্রিকায় প্রকাশিত লেখার থেকে ‘সন্দেশ’র লেখা ভালো হলেই হবে না। কেননা সেগুলো কোনও স্ট্যান্ডার্ডই নয়। এই বোধহয় সেই অতৃপ্তি এবং আত্মবিশ্বাস যা বাংলা ছবির খোলনলচে বদলে দিতে পারে।
আর বছর ছয়েক পরে শতবর্ষে পা রাখবেন তিনি। প্রশস্তির পরিমাণ আরও খানিক দীর্ঘ হবে সন্দেহ নেই। কিন্তু বাঙালি যদি নিজেকে নির্মাণ করতে চায় তবে ফিরে দেখতে হবে এই সত্যজিতকে। কারণ যাই হোক, বাঙালি চরিত্রগতভাবে আজ আর ততো ঋজু নয়। এমনকি কোথাও কোথাও সে নিজেকে বাঙালি বলে পরিচয় দিতেও লজ্জা পায়।
ভাষা নিয়ে ভোগে হীনমন্যতায়। এহেন সময়ে সত্যজিৎ রায় সেই বিরল বাঙালি, যিনি সর্বগুণে বাঙালির সামনে উদাহরণ দিয়ে দাঁড়াতে পারেন। সমসময় যখন বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে তখন ‘ক্ল্যাসিক’ আমাদের পথ দেখায়। নির্দ্বিধায় বাঙালির কাছে তিনি সেই ক্ল্যাসিক। শতবর্ষে ‘বিগ্রহ’ বানানো বাঙালির বড় পছন্দের। নিজেকে পতনের অভিমুখ থেকে টেনে তুলতে যেন সত্যজিৎকে তা থেকে নিষ্কৃতি দেয় বাঙালি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ