ঢাকা, সোমবার 3 August 2015 ১৯ শ্রাবণ ১৪২২, ১৭ শাওয়াল ১৪৩৬ হিজরী
Online Edition

কাঁচামালের অভাবে বন্ধ হওয়ার পথে রাঙ্গুনিয়া কর্ণফুলী জুট মিল

রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা : রাঙ্গুনিয়ার কর্ণফুলী জুট মিলস ও ফোরাত কর্ণফুলী কার্পেট ফ্যাক্টরী কাঁচামালের অভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ৪শ’ মণের পাটের স্থলে মাত্র ১০ মণ পাট দিয়ে কোনো মতে উৎপাদন চালু রাখা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন করতে না পারায় মাসে কোটি কোটি টাকা লোকসান গুণছে কারখানাটি।
কর্ণফুলী জুট মিলস ও ফোরাত কর্ণফুলী কার্পেট ফ্যাক্টরী ২০১৩ সালের ২৬ জানুয়ারি পুনরায় চালু হয়। উদ্বোধনের ৩ মাসের মধ্যে শ্রমিক কর্মচারীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মিলের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়। মানসম্মত পণ্য উৎপাদন হওয়ায় সম্মিলিত কে.এফ.ডি বিখ্যাত সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মডেল মিল হিসেবে স্বীকৃতি এবং উৎপাদন, কারিগরি পুরস্কার লাভ করেছে।
মিল সূত্র জানায়, বর্তমানে বিজেএমসি ও মিল কতৃপক্ষের নিকট কে.এফ.ডির উৎপাদিত পণ্যের প্রচুর বিক্রয় আদেশ রয়েছে। আর্থিক ও কাঁচামাল সংকটে মিলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন ৪শ’ মন পাট প্রয়োজন। সেখানে মাত্র ১০ মণ পাট সরবরাহ হচ্ছে। কাজের অভাবে শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়ছে। মিলের ৬০টি স্পেনিং মেশিনের মধ্যে ২০-২৫টি মেশিন কোন রকমে চালু রয়েছে।
শ্রমিক নেতা মো: ইসকান্দর মিয়া বলেন, পাট সংগ্রহের উপযুক্ত সময়ে কর্তৃপক্ষ মাঠপর্যায়ে থেকে ন্যায্য মূল্যে পাট সংগ্রহ করতে না পারলে পরবর্তীতে বেশি দামে পাট ক্রয় করলে উৎপাদনের সাথে বিক্রয়ের বিরাট ব্যবধান সৃষ্টি হবে।
সূত্র জানায়, ২০০৭ সালে বিজেএমসির নিয়ন্ত্রাণাধীন কে.এফ.ডি লিমিটেড মিল দু’টি বন্ধ ঘোষণা করে। তত্ত্ববধায়ক সরকারের সময়ে ‘মুসা সাদ গ্রুপ’কে ভাড়ায় লীজ প্রদান করে। মুছা সাদ গ্রুপ দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ব্যাপক হারে শ্রমিক ছাটাই, মিলের মেশিনারি যন্ত্রাংশের ব্যাপক ক্ষতি করে বলে মিল সূত্রে জানা গেছে। রাঙ্গুনিয়া থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের প্রচেষ্টায় মিল দু’টি চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। মেহনতি শ্রমিকদের প্রচেষ্টায় মিল দু’টি লাভের মুখ দেখে।
২০০৭ সালে কেএফডিসহ আরো ৪টি পাটকল একই অভিযোগে বন্ধ ঘোষণা করে। মহাজোট সরকার কন্ধকৃত মিল খুলনার দৌলতপুর জুটমিল, পিপলস্ জুট মিল, কর্ণফুলী জুট মিল, ফোরাত কর্ণফুলী জুট মিল, যশোরের আলিম জুট মিল একই সাথে ক্রমান্বয়ে সরকারিভাবে চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করে। চালুকৃত মিলের মধ্যে শুধুমাত্র কেএফডির শ্রমিকদের স্থায়ীকরণ ও নিয়োগপত্র এখনো প্রদান করেনি। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরী এখনো নিশ্চিত করা হয়নি বলে শ্রমিকরা অভিযোগ করেন। অথচ একই সময়ে চালু হওয়া অন্যান্য মিলে শ্রমিকদের স্থায়ীকরণ ও অন্যান্য সুবিধাদি নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। কেএফডি শ্রমিকদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে বলে মেহনতি শ্রমিকরা জানিয়েছেন। মেহনতি শ্রমিকরা জানান, বর্তমানে কেএফডিতে প্রায় ৮শ শ্রমিক কর্মরত আছে। তার মধ্যে মহিলা শ্রমিক ৩ শতাধিক। সরকারি নীতিমালা মোতাবেক শ্রমিকদের যোগ্যতা অনুসারে বেতন নির্ধারণে নিয়ম থাকলেও কর্ণফুলী জুট মিলে তা মানা হচ্ছে না। তারপরও শ্রমিকদের মধ্যে তিন গ্রেডে সর্দার, সার্জেন্টসহ শতাধিক শ্রমিককে দৈনিক বেতন দেয়া হচ্ছে ২৮৯ টাকা। দুই শতাধিক শ্রমিককে দৈনিক ২৮৫ টাকা ও পাঁচ শতাধিক শ্রমিককে দৈনিক ২৭৭ টাকা করে মজুরী প্রদান করা হচ্ছে। তাছাড়া ডেপ্লামেন্ট ডেকোরেটর ফ্রেব্রি´ (ডিএফডি) এর ৩০ জন শ্রমিক দৈনিক শুধুমাত্র ১৬৫ টাকা বেতনে চাকরি করছেন। বতর্মান দ্রব্যমূল্যের বাজারে তা অত্যন্ত নগণ্য বলে শ্রমিকরা জানিয়েছেন। শ্রমিকদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, বর্তমানে যে বেতন দেয়া হচ্ছে তা দিয়ে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া খরচ, ভরণপোষণ চালানো মোটেই সম্ভব হচ্ছে না। তবুও বেঁচে থাকার নূন্যতম আশ্রয় হিসেবে এই চাকরি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
শ্রমিক নেতা মো: ইসকান্দর মিয়া জানান, বর্তমান সরকারের পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মীর্জা আযমকে লিখিতভাবে ডিএফডি শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি, নিয়োগপত্র অথবা পরিচয়পত্র প্রদান, মহার্ঘভাতা, সরকারি ছুটিকালীন বেতন, মেডিকেল ভাতা, বাসা ভাড়া, শ্রমিকদের গ্রেডভিত্তিক বেতনের জন্য আবেদন করা হয়। পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মীর্জা আযম শ্রমিকদের আবেদন মানবিক বিবেচনায় নিয়ে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিসমূহ অবিলম্বে বাস্তবায়নের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য মিল কতৃপক্ষকে নিদের্শ দেন।
মন্ত্রীর নির্দেশ তিন মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। মিলের প্রকল্প প্রধান জসিম উদ্দিন জানান, পাটের অভাবে মিলের এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। বাজেট পাওয়া মাত্রই পাট কেনার উদ্যোগ নেয়া হবে।
উল্লেখ্য, কর্ণফুলী জুট ও কার্পেট মিল দু’টি সত্তরের দশকে বিখ্যাত দাউদ শিল্পগোষ্ঠীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়। এরপর থেকে এই মিলে প্রায়ই ৫ হাজার শ্রমিক কর্মরত ছিল। শ্রমিকদের কোলাহলে মুখরিত ছিল এই কারখানা দু’টি। বর্তমানে যা প্রতিদিন মৃত্যুর প্রহর গুণছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ