ঢাকা, বুধবার 9 September 2015 ২৫ ভাদ্র ১৪২২, ২৪ জিলক্বদ ১৪৩৬ হিজরী
Online Edition

কুরবানী নিয়ে কোন ষড়যন্ত্র জনগণ মেনে নেবে না -হেফাজত আমীর

পরিবেশ দূষণের অজুহাত তুলে পবিত্র ঈদুল আযহায় মুসলমানদের ঘরে ঘরে পাড়া-মহল্লায় কুরবানী দেয়ার চিরাচরিত ইসলামী ঐতিহ্য বন্ধ করে এর পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট জায়গায় পশু কোরবানী দেয়া এবং নিবন্ধিত লোকের মাধ্যমে পশু জবাইয়ের বিধি জারির সরকারি উদ্যোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এটাকে দেশ থেকে ক্রমান্বয়ে ইসলামী সংস্কৃতি ও চেতনাবোধ মুছে ফেলার ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মন্তব্য করেছেন হেফাজতে ইসলামের আমীর হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী। তিনি হতাশা প্রকাশা করে বলেন, সুপরিকল্পিতভাবে দেশে একদিকে নগ্নপনা, বেহায়াপনাসহ ক্ষতিকর সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো হচ্ছে, অন্যদিকে ইসলামী সংস্কৃতিকে হেয় প্রতিপন্ন ও সংকোচনের অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে।
হেফাজত আমীরের প্রেস সচিব মাওলানা মুনির আহমদ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, শুধু পাড়া-মহল্লা থেকে কুরবানীর সংস্কৃতিকে সরিয়ে দেয়া নয়, যানজটের অজুহাত খাড়া করে পশুর হাটে নিয়ন্ত্রণ আরোপের মাধ্যমে কুরবানীদাতাদের জন্য পশু ক্রয়েও সংকট তৈরির ষড়যন্ত্র চলছে। তিনি বলেন, কুরবানীর দিন জনসাধারণকে পশুবর্জ্য সুনির্দিষ্ট জায়গায় ফেলার জন্য উদ্বুদ্ধ করে ব্যাপক প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশন পশুবর্জ্য অপসারণে কুরবানীর দিন বাড়তি জনবল নিয়োগ দিতে পারতো। অথচ সিটি কর্পোরেশনকে রাস্তা মেরামত, নালা-নর্দমা পরিষ্কার ও জলাবদ্ধতা নিরসনের চেয়েও কুরবানীর ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি সংকোচনেই উৎসাহী দেখা যাচ্ছে। তিনি সরকারের প্রতি শত শত বছর ধরে চালু থাকা ইসলামী নিদর্শন পবিত্র কুরবানীর ঐতিহ্যবিরোধী এই উদ্যোগ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এতে করে সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের মনে মারাত্মক ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।
বিবৃতিতে হেফাজত আমীর আরো বলেন, একদিকে শহুরে ধনীক শ্রেণীর পান্তা-ইলিশের ক্ষতিকর সংস্কৃতির প্রসার ঘটানোর নানা উদ্যোগ নিয়ে দেশের ৮০-৯০ ভাগ গরীব ও সামর্থ্যহীন জনগণকে উপহাস ও অসহায়ত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়ার চর্চা চলছে, অন্যদিকে পবিত্র কুরবানীকে উপলক্ষ করে বেকার পরিবারে গরু পালন, গরু বেচা-বিক্রির সাথে গরীব মানুষের সম্পৃক্ততা, ঈদের দিন গরীব-মজদুরদের উচ্চ বেতনে কামলা খাটা থেকে শুরু করে কুরবানীর গোশত বিলি-বণ্টন, কুরবানীর পশুর চামড়া বিক্রির মূল্য দানসহ সবক্ষেত্রেই গরীবদের জন্য উপকারী সার্বজনীন মুসলিম সংস্কৃতির পবিত্র কুরবানীকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত ও সংকুচিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে গরীবদের স্বার্থে আঘাত হানা হচ্ছে।
পরিবেশ দূষণের প্রসঙ্গ টেনে হেফাজত আমীর বলেন, পরিবেশ দুষণ! রাজপথ মাসের পনের দিন মল-মূত্র ও ময়লা-আবর্জনা মিশ্রিত পানিতে ডুবে একাকার হয়ে থাকলেও সিটি কর্পোরেশনের কার্যকর তৎপরতা দেখা যায় না। অথচ গরীবদের জন্য অত্যন্ত উপকারী এবং মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের বহিঃপ্রকাশের এই মহান সংস্কৃতির দিনেই তারা পরিবেশ দূষণকে বড় করে দেখাতে চায়।
হেফাজত আমীর বলেন, পবিত্র কুরবানীর মাধ্যমে গভীর আত্মত্যাগের পাশাপাশি মুসলমানদের ধনী-গরীব, ফকির-মিসকীনদের মধ্যে যে গভীর সহমর্মিতা, আত্মীয়তার মজবুত বন্ধন ও ঐক্যের সংস্কৃতির চর্চা হয়, তাতে ইসলামবিদ্বেষী চক্র চরম অস্বস্তিতে ভোগেন। এ কারণে বহু পূর্ব থেকেই তারা নানাভাবে পবিত্র কুরবানীর বিরুদ্ধে গভীর অপপ্রচার ও চক্রান্তে লিপ্ত।
হেফাজত আমীর বলেন, পবিত্র কুরবানীর পশু জবাইকে কেন্দ্র করে বাড়িতে বাড়িতে, পাড়া-মহল্লায় শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষসহ ধনী-গরীব মিলে সর্বস্তরের মুসলমানদের মধ্যে এক ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ আবেগময় ধর্মীয় উৎসব বিরাজ করে থাকে। যারা মাসে, ছয় মাসে একবার পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভালো খাবারের আয়োজন করতে পারে না, এমন সব গরীবদের মাঝে বাড়িতে বাড়িতে অকাতরে কুরবানীর গোশত বিতরণ করা হয়ে থাকে। গরীব-মিসকিন ছাড়াও আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে কুরবানীর গোশত বিতরণের মাধ্যমে সহমর্মিতা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক আরো গভীর হওয়ার সংস্কৃতির চর্চা হয় পবিত্র কুরবানীর ফলে। এ ধরনের অগণতি কল্যাণকর প্রথা পবিত্র কুরবানীর মাধ্যমে জনসমাজে চালু রয়েছে।
তিনি বলেন, আমার জোরালো সন্দেহ, পরিবেশ দূষণের অভিযোগ ও পরিচ্ছন্নতার লেবেলে ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিক্যবাদী চক্র এবং প্রতিবেশী দেশের ব্রাহ্মণ্যবাদী চক্রের সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রে প্ররোচিত হয়ে ক্ষমতাসীন মহলের কেউ কেউ এমন পদক্ষেপে উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকতে পারেন। ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্য, পবিত্র কুরবানী উদযাপনে ক্রমান্বয়ে বাজার সংকট, পশু সংকট, গরু জবাইয়ে সমস্যা তৈরি, গরীবদের মাঝে গোশত বিলির প্রথা বিলোপ, গরীব মাদ্রাসা ছাত্র ও ছিন্নমূল প্রতিবেশীদের হক কুরবানীর পশুর চামড়া দখলসহ নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে মানুষকে কুরবানীর প্রতি নিরুৎসাহিত করা এবং নির্ধারিত জায়গা ঠিক করে দিয়ে শিশু-কিশোরদের পবিত্র কুরবানীর চিরাচরিত সংস্কৃতি চর্চা থেকে দূরে রেখে ইসলামের এই গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনকে সমাজ থেকে বিলোপ বা গুরুত্বহীন করে দেয়া। পাশাপাশি ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও নাস্তিক্যবাদীদের তল্পিবাহক বিভিন্ন মিডিয়ায় পশুপ্রেম ও পশুবধের অপপ্রচার চালিয়ে নতুন প্রজন্মকে কুরবানীর প্রতি বীতশ্রদ্ধ ও নিরুৎসাহিত করা। অথচ এই পশুপ্রেম ও পশুবধের বন্দনা যারা তুলেন, দেখা যায় একদিনের জন্যও বিফ, মাটন ও চিকেন ছাড়া তাদের ডিশ কল্পনা করা যায় না। তিনি বলেন, ইসলামী সংস্কৃতির বিশেষত্ব হচ্ছে, সকল আনন্দে ধনী-গরীব, ফকির-মিসকিন, আত্মীয়-স্বজনসহ সকলকে শামিল করে নেয়া। পবিত্র কুরবানীকে কেন্দ্র করে এই একটা দিন দেশের সকল মুসলমানের পাতিলে একই রান্না হয়, ধনী-গরীব সকল শিশুদের মাঝে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়। এর চেয়ে সুন্দর ও সহমর্মিতাপূর্ণ সংস্কৃতি আর কি হতে পারে? প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ