ঢাকা, শনিবার 31 October 2015 ১৬ কার্তিক ১৪২২, ১৭ মহররম ১৪৩৭ হিজরী
Online Edition

নবাবি আমল ও বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা

আখতার হামিদ খান : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
পলাশীর যুদ্ধ : ষড়যন্ত্রকারীগণ যখন সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত তখন রবার্ট ক্লাইভ অতি সামান্য অযুহাতে সিরাজের দিকে অগ্রসর হন। নবাবও ষড়যন্ত্রের কথা জ্ঞাত হয়ে পূর্বেই প্রস্তুত ছিলেন। সুতরাং তিনি সৈন্যের ইংরেজদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ শে জুন প্রাতঃকালে ভাগীরথীর তীরে পলাশীর প্রান্তরে উভয় পক্ষে যুদ্ধ হয়। নবাবের সৈন্য সংখ্যা ছিল মোট ৫০,০০০ (১৫,০০অশ্বারোহী এবং ৩৫,০০০ পদাতিক)। নবাবের মোট কামান ছিল ৫৩ টি। সিনফ্রেঁ নামক একজন ফরাসি সেনানায়কের অধীনেও কয়েকটি কামান ছিল। ইংরেজদের মোট সৈন্য ছিল ৩,০০০ (২২০০ সিপাহী এবং ৮০০ ইউরোপীয়ান-পদাতিক ও গোলন্দাজ)। যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর এবং রায়দুর্লভের চক্রান্তে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সৈন্যবাহিনীর এক বিশাল অংশ যুদ্ধ থেকে নিরস্ত্র রইল। কেবল মাত্র মীরমদন ও মোহনলাল এবং সিনফ্রেঁ অধীনে মুষ্টিমেয় ফরাসি সৈন্য ইংরেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকেন। মীরমদন ও মহোনলালের সমরকুশলতার সম্মুখে ইংরেজ বাহিনী দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারল না। পাশ্ববর্তী আক্রমণে তার সৈন্য বাহিনী অপসারণে বাধ্য হলেন। সিরাজের জয় যখন সুনিশ্চিত, সেসময় মীরমদন নিহত হন। শিবিরের চারদিকে স্বজাতি শ্রত্রু দ্বারা পরিবেষ্টিত সিরাজ অন্য কোন উপায় না দেখে যুদ্ধের ভার গ্রহণ করার জন্য মীরজাফরের শরণাপন্ন হন। তিনি মীরজাফরকে ডেকে আনলেন এবং আলিবর্দী খানের আমলের মীরজাফরের আনুগত্যপূর্ণ ব্যবহারের কথা স্বরণ করিয়ে দিয়ে উপস্থিত বিপদে সাহায্য করার জন্য তাকে অনুনয় করলেন। এমন কি তিনি নিজ উষ্ণীস মীরজাফরের সম্মুখে নিক্ষেপ করে বললেন,” জাফর খান, এই উষ্ণীষের সম্মান রক্ষা করুন।” এভাবে তিনি বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের অন্তরে দেশাত্ববোধ ও স্বাধীনতা স্পৃহা জাগাতে চাইলেন। মীরজাফর মুখে সিরাজের প্রতি আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি দান করতে ত্রুটি করলেন না বটে, কিন্তু সিরাজের হতাশা লক্ষ্য করে অšতরে অšতরে তার সর্বনাশ সাধনের জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলেন। তিনি সিরাজউদ্দৌলাকে যুদ্ধ ত্যাগের পরামর্শ দিলেন। গোলাম হোসেন রচিত’ সয়ার-উল-মুতাখেরিন গ্রন্থ থেকে জানা যায়, মীর মদনের মৃত্যুর পরেও মোহনলালের একক চেষ্টায় যুদ্ধের গতি সিরাজের অনুকূলে ছিল। কিন্তু নিজ অদূরদর্শিতা ও মানসিক দুর্বলতাহেতু সিরাজ মীরজাফরের সর্বনাশাত্বক পরামর্শ গ্রহণে স্বীকৃত হলেন। তিনি মোহনলালকে যুদ্ধ ত্যাগের আদেশ দিলেন। মোহনলাল প্রথমে এই আদেশ মেনে নেননি। কিন্তু নবাবের পুনঃ পুনঃ আদেশে শেষ পর্যন্ত তাকে যুদ্ধ ত্যাগ করতে হয়। সেই সঙ্গে সিরাজেরও পতন ঘটে। ইংরেজদের পাল্টা আক্রমণে নবাব বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং কোনক্রমে প্রাণ নিয়ে পলায়ন করেন। এ যুদ্ধে ইংরেজদের ২৩ জন সৈন্য নিহত ও ৪৯ জন আহত হয়েছিল। নবাবের ৫০০ সৈন্য নিহত হয়েছিল। রাজধানীতে ফিরে সিরাজ প্রচুর অর্থ বিতরণ করে সৈন্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন। কিন্তু আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও অনুচরগণ অর্থ গ্রহণ করে শেষ পর্যন্ত সিরাজকে পরিত্যাগ করে। নিরুপায় হয়ে সিরাজ স্বীয় পত্নী ও কন্যাসহ পলায়ন করেন। যুদ্ধ ক্ষেত্রে ক্লাইভ মীরজাফরকে নতুন নবাব বলে অভিনন্দন ও কুর্নিশ করতে ত্রুটি করলেন না। ২৬ শে জুন মীরজাফরের অভিষেক হয়। ২৯শে জুন মীরজাফর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হলেন। সিরাজের উদ্দেশ্য ছিল ভাগলপুরে ফরাসি সৈন্যাধ্যক্ষ মসিয়ে ল’র সঙ্গে যোগদান করে পুনরায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন। কিন্তু পথিমধ্যে রাজমহলে রাত কাটাতে গিয়ে তিনি ধরা পড়লেন (৩০শে জুন, ১৭৫৭ খ্রিঃ)। ২রা জুলাই রাতে সাধারণ বন্দী মত শৃঙ্খলিত অবস্থায় তাকে মুর্শিদাবাদে মীরজাফরের সম্মুখে উপস্থিত করা হল। নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে মুর্শিদাবাদে বন্দী অবস্থায় নিয়ে আসলে দারুণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। মীরজাফরের পুত্র মীরণের আদেশে সেই রাতে সিরাজউদ্দৌলা নিহত হন। পরদিন অতি প্রত্যুষে সিরাজের মৃতদেহ একটি হাতির পিঠে করে মুর্শিদাবাদের রাস্তায় প্রদক্ষিণ করানো হয়। মীরণ কেবল সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করেই ক্ষাšত হয়নি। সে একে একে সিরাজের একমাত্র জীবিত ভাই মির্জা মাহদী, সিরাজের মৃত ভাই ইকরামুদ্দৌলা প্রভৃতি আলিবর্দীর সকল উত্তরধিকারীকেই হত্যা করে। পূর্ণিয়ার শওকত জঙ্গের ভাই মির্জা রমজানীর ভাগ্যে কি ঘটেছিল সে সম্বন্ধে কিছূ জানা যায়নি।
নবাব সিরাজউদ্দৌলা হত্যার দায়িত্ব সম্পর্কে মতভেদ আছে। বন্দী অবস্থায় তাকে মুর্শিদাবাদে আনা হলে দরবারে একটি বিচারের প্রহসন হয়। সিরাজের ভাগ্য বিপর্যয় মীরজাফরের হৃদয়ে অনুকম্পার সৃষ্টি হয়েছিল এবং তিনি অনুচরবর্গের প্ররোচনা সত্ত্বেও প্রকাশ্য দরবারে সিরাজের প্রতি কোনরূপ দন্ডাজ্ঞা প্রদান করেননি। বন্দীর উপযুক্ত তত্ত্বাবধানের নির্দেশ দিয়ে মীরজাফর স্বীয় পুত্র মীরণের হাতে সিরাজদ্দৌলাকে সমর্পণ করেন। সেই রাতে মুহম্মদী বেগ নামক সিরাজের জনৈক অনুচর পুরস্কারের লোভে সিরাজকে ছুড়ির আঘাতে হত্যা করে। ক্লাইভ সে সময়ে মুর্শিদাবাদে উপস্থিত ছিলেন। যদিও ক্লাইভ তার বিচারকালে পার্লামেন্টের নিকট বলেছিলেন যে, সিরাজউদ্দৌলার হত্যার ব্যাপারে তিনি কিছুই অবগত ছিলেন না। তথাপি তার উপস্থিতকালে সিরাজউদ্দৌলার হত্যা স্বভাবতই তার নির্দোষিতা সম্পর্কে সন্দেহের সৃষ্টি করে। অবশ্য ক্লাইভের দায়িত্ব সম্পর্কে সঠিক কিছু বলা যায় না।
পলাশী যুদ্ধের তাৎপর্য : (১) পলাশী যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা ও যুদ্ধের ব্যাপকতার দিক দিয়ে বিচার করলেই যুদ্ধকে বৃহৎ যুদ্ধের পর্যায়ভূক্ত করা যায় না। মেলিসন যথার্থ বলেছেন, “plassey, though decisive,can never be considered a great battle.” তথাপি পলাশী যুদ্ধের ঐতিহাসিক তাৎপর্য অস্বীকার করা যায় না।
(২) পলাশীর পরাজয় সকল ক্ষেত্রে ভারতের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। এই প্রথম ভারতের সর্বাধিক অঞ্চল বিদেশী শক্তির পদানত হল এবং এর সঙ্গে ইংরেজ ও ভারতীয়দের মধ্যে অকস্মাৎ সম্পর্কের রূপান্তর ঘটল। এ যাবত ইংরেজ কোম্পানি ভারতীয় শাসক গোষ্ঠীর নিকট ছিল কৃপা ও অনুগ্রহ প্রার্থী। কিন্তু পলাশীর যুদ্ধের পর ইংরেজগণ নিজেরাই অনুুগ্রহ বিতরণের অধিকার অর্জন করল। ইংরেজগণ প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হয় এবং অতঃপর তারা ’নৃপতি স্রষ্টার’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।
(৩) বাংলার ব্যবসা বাণিজ্য ইংরেজদের একচেটিয়া হয় এবং দেশীয় বণিকদের সমাধি রচিত হয়। প্রকৃত পক্ষে পলাশীর যুদ্ধের অথনৈতিক প্রতিক্রিয়া সুদূরপ্রসারী হয়েছিল।
(৪) পলাশীর যুদ্ধের ফলে বাংলায় এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই বিজিত রাজ্যের প্রকৃত প্রভুকে  এই প্রশ্ন অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। কারণ নবাবকে প্রকৃত ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করা হয়, ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পনিও ছিল বহুদূরে এবং ছিল একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মাত্র। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করার মত উপযুক্ত সংগঠন এর ছিল না। এক কথায়, বাংলার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে এক ভয়াবহ শূন্যতার উদ্ভব হয়, যা বাংলার পক্ষে এক অশেষ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক লেকী-র মন্তব্য, “Power was practicall monopolised by a  great multitude of isolated officials... far removed from control...”
(৫) পলাশী যুদ্ধের ফলেই যে বাংলাদেশে তথা ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সার্বভৌমত্ব স্থাপিত হয়েছিল- এমন মনে করার কোন কারণ নেই। কারণ মীরজাফরের সঙ্গে ইংরেজদের যে সন্ধি সম্পাদিত হয়েছিল তাতে ইংরেজদের কিছু পরিমাণ অর্থ লাভ, কলকাতা ও চব্বিশ পরগণার জমিদারি প্রদান এবং কিছু বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা ছাড়া মীরজাফরের সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন হতে পারে এরূপ কোন শর্ত ছিল না। ১৭৫৯ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রিকে লিখিত রবার্ট ক্লাইভের এক পত্রে সর্ব প্রথম বাংলাদেশে ইংরেজদের সার্বভৌমত্ব স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানা যায়। কিন্তু ক্লাইভের এই পরিকল্পনায় ব্রিটিশ সরকার সম্মত হননি। তবে একথা অনস্বীকার্য ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা পলাশীর যুদ্ধ ও মীরজাফরের অযোগ্যতার পরোক্ষ ফল। অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলাদেশ ছিল ভারতের সর্বাধিক সমৃদ্ধ অঞ্চল। বাংলার ধনাগার আওরঙ্গজেবকে দীর্ঘকালব্যাপী দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধ বিগ্রহে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল। পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলার সম্পদ ইংরেজগণকে ভবিষ্যতে ভারতে রাজ্যবিস্তারের অভাবনীয় সাহায্য করেছিল সন্দেহ নেই। বস্তুত বাংলাদেশ থেকেই ইংরেজগণ ভারতের অন্তদেশে প্রবেশ করে প্রভুত্ব স্থাপন করার সুযোগ পেয়েছিল।
 (৬) বাংলার শাসন ব্যবস্থায় পরোক্ষভাবে ইংরেজগণ এক অতি শক্তিশালী প্রভাব করতে সমর্থ হয়। তদানীন্তন বাংলার দুর্নীতিপূর্ণ সমাজের উপর ইংরেজদের প্রভাব যে ফলপ্রসূ হয়েছিল একথা স্বীকার না করে উপায় নেই। বাংলা তথা ভারতবর্ষের উপর উন্নত ধরনের পাশ্চাত্য প্রভাব পলাশী ইংরেজদের চূড়ান্ত জয়লাভ। The battle of plassey may be truly said to have ecided the fate of French in India.”
(৮) পলাশীর যুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের মধ্যযুগের অবসান হয়ে আধুনিক যুগের সূচনা হয়। ইউরোপীয় সামরিক সংগঠন, উন্নত কূটনীতি, আধুনিক আইন কানুন শিক্ষা ইত্যাদি বাংলা তথা ভারতে এক নতুন প্রগতিমূলক যুগের সূচনা করে।
সিরাজউদ্দৌলার চরিত্র ও কৃতিত্ব : প্রকৃতপক্ষে সিরাজউদ্দৌলা ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব। মাতামহ নবাব আলিবর্দী খানের ভাগ্যোন্নতির কালে সিরাজের জন্ম হয়েছিল বলে আলিবর্দী তাকে প্রাণাধিক ভালবাসতেন। স্নেহান্ধ আলিবর্দী দৌহিত্রের বিলাস-ব্যসন এবং যৌবনের উচ্ছৃঙ্খলতায় বাধা দান করেননি। নিজের উত্তরাধিকার হিসাবে মনোনীত করেও দৌহিত্রকে শাসন ও সংসার সম্পর্কে উপযুক্ত শিক্ষাদানের ব্যবস্থাও তিনি করেননি। স্বভাবতই সিরাজ বিলাস ব্যসনপ্রিয় উচ্ছৃঙ্খল অনভিজ্ঞ যুবক হিসাবে বাংলার মসনদে আরোহণ করেন। তাই ইতিহাসের প্রচলিত ধারণায় শুধু নয়, মননশীল লেখকদের ভাষ্যেও সিরাজউদ্দৌলা ছিলেন দুশ্চরিত্র, নিষ্ঠুর ও লম্পট। সমসাময়িক বিদেশী পর্যটকের বিবরণ ও ফরাসি ইতিহাসে সিরাজউদ্দৌলার এ রকম চরিত্র চিত্রিত হয়েছে। অতি সাম্প্রতিক লেখাতেও সিরাজকে জেদী, একরোখা হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, বাংলার সব নবাবই ছিলেন একই চরিত্র দোষে দুষ্ট। দুশ্চরিত্র আর নিষ্ঠুর কেউ কম ছিলেন না। মুর্শিদকুলী খান থেকে আলিবর্দী পর্যন্ত সব নবাবই নিষ্ঠুরতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। সুজাউদ্দিন ও সরফরাজ খান দুজনেই দুশ্চরিত্র ছিলেন। তাহলে সিরাজকে কেন শুধু এ বিশেষ অপবাদ দেয়া হয়? সিরাজ-চরিত্রের যে কদর্য দিকটার কথা সবাই উল্লেখ করেছেন, তা কিন্তু সিরাজউদ্দৌলা নবাব হবার আগের চরিত্র। নবাব হবার পরে সিরাজের মধ্যে যে পরিবর্তন এসেছিল তা আমরা জানতে পারি ইংরেজ কেম্পানির কর্মচারী স্ক্রাফটনের লেখা থেকে। স্ক্রাফটন লিখেছেন, আলিবর্দীর মৃত্যু শয্যায় সিরাজ মদ্য স্পর্শ করবেন না বলে যে প্রতিঙ্গা করেছিলেন তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন।
সিরাজের চরিত্র বিচারে ঐতিহাসিগণ পক্ষপাতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন, একথা অনস্বীকার্য। সিরাজের অভিঙ্গতার অভাব, সমসাময়িক সুলতান বাদশাহের উৎচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপনের রীতি, মুসলমান শাসনে পুনঃ পুনঃ সিংহাসন নিয়ে বিবাদ বিসংবাদে ইতিহাস স্বরণ রাখলেই সিরাজের চরিত্র ও পরিস্থিতি সম্পর্কে নিরপেক্ষ বিচার করা সম্ভব হবে। অনভিজ্ঞতাবশত কতকগুলি ত্রুটির জন্য সিরাজ দায়ী ছিলেন। তিনি মীরজাফরের দুরভিসন্ধির কথা জানতে পেরেও মীরজাফরকে কারারুদ্ধ না করে ভুল করেছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রেও তিনি বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের পরামর্শ গ্রহণ করতে সম্মত হয়েছিলেন। মোহনলালকে শেষ পর্যšত যুদ্ধ করার সুযোগ দান না করে তিনি জয়ের মুহূর্তে পরাজয় ডেকে এনেছিলেন। বলাবাহুল্য এই সকল ঘটনা থেকে তার চরিত্রের দৃঢ়তা ও দূরদর্শিতার অভাব ছিল একথা প্রমাণিত হয়। কিন্তু স্মরণ রাখা দরকার যে চতুর্দিকে শত্রু ও বিশ্বাসঘাতক দ্বারা পরিবৃত্ত অবস্থায় মানসিক ধৈর্য বজায় রাখা অভিজ্ঞ শাসকের পক্ষেও সম্ভব হত না। অবশ্য তিনি যে কোন কোন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক জ্ঞানের পরিচয় না দিয়েছেন এমন নয়। সিরাজউদ্দৌলা তার অপর প্রধান শত্রু ঘসেটি বেগমকে আকস্মিকভাবে নিজ প্রাসাদে আবদ্ধ রেখে রাজনৈতিক কূটকৌশলের পরিচয় দিয়েছেন একথা স্বীকার করতেই হবে। তারিখ-ই-বাঙ্গালা-ই মহব্বত জঙ্গী এর লেখক ইউসুফ আলি খানও তার তারিফ করেছেন। সিরাজের পয়লা নম্বরের শত্রু ও মসনদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন শওকত জঙ্গ। শওকত জঙ্গ অনেক বেশী শক্তিশালী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে সিরাজকে অস্ত্রধারণ করতে হয়েছিল। সিরাজ তাকে পরাজিত ও নিহত করে মসনদে নিজেকে নিস্কন্টক করেছিলেন। ইংরেজদের সাথেও প্রথমে সিরাজ শান্তিপূর্ণভাবে আপোষ মীমাংসার প্রচেষ্টা করেছেন, পরে অবশ্য একদিকে অস্ত্রধারণ ও অপরদিকে কূটনীতির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছেন।
মঁসিয়ে ল’র লেখা থেকে সিরাজউদ্দৌলা ফরাসীদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্নই ছিলেন। তাদের প্রতি কোন প্রকার নিষ্ঠুরতা বা উগ্রতা দেখাননি। কাশিম বাজারের ইংরেজ কুঠির প্রধান উইলিয়াম ওয়াটসন লিখেছেন, সিরাজউদ্দৌলা ক্ষমতা এবং ধনসম্পত্তির প্রাচুর্যে কিঞ্চিৎ বেসামাল। কিন্তু মাত্র পনের মাসের রাজত্বকালে সিরাজ কোন পাগলামি, অর্বাচীনতা কিংবা নিষ্ঠুরতার পরিচয় দেননি। তবে একথা ঠিক নবাব শাসক হিসাবে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা তিনি করেছেন। এদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে এসে নবাবের কর্তৃত্বকে অস্বীকার করার মতো কোন ঔদ্ধত্য তিনি সহ্য করতে চাননি। উইলিয়াম ওয়াটস আরও লিখেছেন, সিরাজউদ্দৌলা বিদেশী বণিক গোষ্ঠীর কাছে প্রত্যাশা করেছেন যে, তারা নবাবের আদেশ বিনা দ্বিধায় মেনে নেবে। তাই বলে নবাব সিরাজউদ্দৌলা সব সময় যুদ্ধংদেহি মনোভাব দেখিয়েছেন, এ কথা ঠিক নয়। নির্মম নিষ্ঠুর এবং বদমেজাজীর জন্য যে তরুণ সিরাজ কুখ্যাত ছিলেন, নবাব হিসাবে মসনদে বসার পর কাশিম বাজারের ইংরেজ কুঠির অবরোধ ও আত্মসমপর্ণের পরে পরাজিত ইংরেজদের প্রতি উদার মানবিকতাপূর্ণ আচরণ করেছেন, এ তথ্য কাশিমবাজার কুঠির এক ইংরেজ কর্মচারীরই। কাশিম বাজারের পতনের পর শুধু ওয়াটস এবং কোলেটকে কলকাতা যাত্রা করতে হয়েছিল- কিন্তু বন্দী হিসাবে নয়। কলকাতার গভর্নর ড্রেকের উপর চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই সম্ভবত নবাব তা করেছিলেন। সিরাজ আশা করেছিলেন এতে হয়তো ড্রেক নবাবের সঙ্গে একটা শান্তিপূর্ণ মীমাংসায় আসবেন। কাশিম বাজারে ইংরেজদের কোন বিষয় সম্পত্তিতে নবাব হাত দেননি, তিনি শুধুমাত্র সেখানকার অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। স্ত্রী লুৎফুন্নেসার প্রতি সিরাজের গভীর ভালবাসা ছিল। তাছাড়া দেশাত্ববোধ ও সততার দিক থেকে বিচার করলে তিনি যে তার প্রতিপক্ষ মীরজাফর ও ক্লাইভের চেয়ে বহু ঊর্ধ্বে ছিলেন, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। ব্যক্তিগত স্বার্থ অপেক্ষা বাংলার মসনদের মর্যাদা ও স্বাধীনতা রক্ষা করাই ছিল তার প্রধান উদ্দেশ্য। তিনি মীরজাফরকে বাংলার নবাবের উষ্ণীষের মর্যাদা  রক্ষার জন্য কাতর অনুরোধ জানিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক ম্যালসন সিরাজউদ্দৌলা সম্পর্কে বলেন, ”তার যত দোষই থাকুক না কেন, তিনি তার প্রভু ও দেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। বেদনাময় নাটকের প্রধান অভিনেতাদের মধ্যে একমাত্র তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম, যিনি প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করেননি। ব্যক্তিগত স্বার্থের খাতিরে নিজেদের দেশ বিদেশীদের কাছে বিক্রয়ের নীচতা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন।
মীরজাফর : বিশ্বাসঘাতকতা, জালিয়াতি, শঠতা-সর্ব প্রকার নীচ স্বার্থপরতার মিলিত আঘাতে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটলে বিশ্বাসঘাতকতার পুরস্কার স্বরূপ ইংরেজদের সাহায্যে মীরজাফর বাংলার মসনদ লাভ করেন (২৯শে জুন, ১৭৫৭ খ্রিঃ। মসনদে আরোহণ করেই মীরজাফর নানা প্রকার বিপত্তির সম্মুখীন হন। প্রথমেই তাকে তিনটি বিদ্রোহের সম্মুখীন হতে হয়। মেদেনীপুরের শাসনকর্তা রাজা রাম সিংহ, বিহারের শাসনকর্তা রাজা রামনারায়ণ এবং পূর্ণিয়ার শাসনকর্তা হাজির আলি প্রভৃতি মীরজাফরের মসনদ লাভ অবৈধ বলে ঘোষণা করে বিদ্রোহী হন। এই সকল বিদ্রোহের জন্য রায় দুর্লভকে দায়ী সাব্যস্ত করে নবাব দিওয়ানকে শাস্তি প্রদান করতে উদ্যত হন। কিন্তু রবার্ট ক্লাইভের হম্তক্ষেপের ফলে রায় দুর্লভ রক্ষা পান। অতঃপর মীরজাফর উপরিউক্ত বিদ্রোহগুলি দমন করার জন্য প্রস্তুত হন। কিন্তু অবশেষে ক্লাইভের মধ্যস্থতায় রাম সিংহ ও রাজা রামনারায়ণ এর বিরোধ আপোষে মিটমাট হয়ে যায়। উভয় ক্ষেত্রেই বিদ্রোহী শাসনকর্তাদ্বয় নবাব মীরজাফর অপেক্ষা ক্লাইভের উপরই অধিক আস্থা স্থাপন করে নবাবের শাসন মেনে নেন এবং যথোপযুক্ত উপঢৌকন প্রদান করে নবাবকে সম্মান প্রদর্শন করেন। এ কথা ঠিক যে মীরজাফরের শাসনের অক্ষমতা, একাধিক বিদ্রোহ দমন ও দিল্লির সম্রাট শাহ আলমের আমন্ত্রণ প্রতিহত করার ব্যাপারে বারংবার ইংরেজদের সাহায্য গ্রহণ প্রভৃতি কারণে বাংলায় ইংরেজদের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে। এ ছাড়া ইংরেজদের উপর নবাবের নির্ভরশীলতা ও শাসনকার্যে নবাবের ব্যর্থতার প্রধান কারণ হল তার আর্থিক দুরবস্থা। মীরজাফর মসনদের বিনিময়ে ক্ষমতার অতিরিক্ত পুরস্কার ইংরেজদিগকে দিতে প্রতিশ্রুতি হয়েছিলেন। মসনদে আরোহণ করেই বিভিন্ন খাতে নবাব দেড় কোটি টাকা ইংরেজদিগকে প্রদান করেন। ক্লাইভ একুশ লক্ষ টাকা পুরস্কার ছাড়াও বাৎসরিক ত্রিশ হাজার পাউন্ড আয়ের জায়গির লাভ করেন। এ ছাড়া নৌবহর ও সৈন্যবাহিনীর জন্যেও অতিরিক্ত পঁচিশ লক্ষ টাকা নবাব দিতে বাধ্য হন। কিন্তু ইংরেজ কোম্পানির অর্থের চাহিদা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং নবাবের বিপত্তির সুযোগ নিয়ে ইংরেজরা তার উপর অর্থের দাবি করতেই থাকে। চুক্তি অনুযায়ী ইংরেজদের সকল দাবি দাওয়া মিটিয়েও নবাবকে বর্ধমান, নদীয়া, হুগলী, প্রভৃতি পরগণার রাজস্ব পর্যšত তাদের হাতে সমর্পণ করতে হয়। কিন্তু এতেও মীরজাফর ইংরেজদের সহানুভূতি বা বিশ্বাস কখনও অর্জন করতে পারেননি।
নবাব মীরজাফর তার পরমুখাপেক্ষীহীনবস্থার প্রতি একেবারে অচেতন ছিলেন না। তিনি শীঘ্রই এটা বুঝতে পারেন যে, তাকে নামে মাত্র নবাব করে ইংরেজরা রাজনৈতিক কর্তৃত্ব করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ইংরেজদের  উদ্ধত আচরণ, নবাবের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন এবং শাসনকার্যে প্রতিনিয়ত হস্তক্ষেপ প্রভৃতি কারণে মীরজাফরের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে এবং তিনি ইংরেজদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি খর্ব করার জন্য ওলন্দাজদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনে যত্নবান হন। কিন্তু ওলন্দাজগণ নবাবের উদ্দেশ্য বুঝতে না পেরে তার বিনা অনুমতিতেই ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয় এবং বাটাভিয়া থেকে সামরিক সাহায্য পাওয়া মাত্র হুগলী আক্রমণ করে (১৭৫৯ খ্রিৎ)। কিন্তু বিদরের যুদ্ধে ওলন্দাজগণের পরাজয়ে ওলন্দাজ বণিক এবং মীরজাফর উভয়েরই ভবিষ্যৎ আশা বিনাশপ্রাপ্ত হয়। ইংরেজরা ওলন্দাজদের এই আক্রমণের জন্য মীরজাফরকে অভিযুক্ত করল বটে, কিন্তু এর সপক্ষে কোনরূপ প্রমাণ দেখাতে পারল না। তাছাড়া ক্লাইভ নিজেই স্বীকার করলেন যে, ওলন্দাজদের আক্রমণের বিরুদ্ধে নবাব বাহিনী ইংরেজদের সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছিল। সম্ভবত মীরজাফরের উদ্দেশ্য ছিল ওলন্দাজগণকে কিছু সুযোগ প্রদান করে ইংরেজদের প্রতিপত্তি কিছু পরিমাণে খর্ব করা। এমন সময় মোগল সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীরের পুত্র শাহাজাদা আলী গৌহর ওয়াজির গাজিউদ্দিনের হাতে পিতা এক প্রকার বন্দিদশা প্রাপ্ত হয়েছেন দেখে দিল্লি থেকে পলায়ন করেন। তিনি এলাহাবাদের শাসনকর্তা মুহম্মদ কুলী খান ও অযোধ্যার শাসনকর্তা সুজাউদ্দৌলার সাহায্য নিয়ে বাংলাদেশ জয় করতে চাইলেন। এভাবে তিনি এক স্বাধীন রাজ্য স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি মুহম্মদ কুলী খানের সাহায্য নিয়ে ১৭৫৮ খ্রিষ্টাব্দে বিহার আক্রমণ করেন। কিন্তু কুলী খানের অনুপস্থিতির সুয়োগ নিয়ে সুজাউদ্দৌলা এলাহাবাদ আক্রমণ করলে কুলী খান বাধ্য হয়ে নিজ রাজ্যে ফিরে যান। কয়েক মাসের মধ্যেই ওয়াজির গাজিউদ্দিন সম্রাট আলমগীরকে হত্যা করলে আলী গৌহর ’দ্বিতীয় শাহ আলম’ উপাধি নিয়ে সম্রাট হন এবং সুজাউদ্দৌলাকে নিজ ওয়াজির নিযুক্ত করেন। ১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ও সুজাউদ্দৌলা পুণরায় পাটনা আক্রমন করতে গিয়ে পরাজিত হন। এরপর তিনি মুর্শিদাবাদ আক্রমণ করতে গিয়েও ইংরেজদের হাতে পরাজিত হন।
নবাব মীরজাফর তার পরমুখাপেক্ষীহীনবস্থার প্রতি একেবারে অচেতন ছিলেন না। তিনি শীঘ্রই এটা বুঝতে পারেন যে, তাকে নামে মাত্র নবাব করে ইংরেজরা রাজনৈতিক কর্তৃত্ব করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ইংরেজদের  উদ্ধত আচরণ, নবাবের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন এবং শাসনকার্যে প্রতিনিয়ত হস্তক্ষেপ প্রভৃতি কারণে মীরজাফরের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে এবং তিনি ইংরেজদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি খর্ব করার জন্য ওলন্দাজদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনে যত্নবান হন। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ