ঢাকা, রোববার 07 February 2016 ২৫ মাঘ ১৪২২, ২৭ রবিঃ সানি ১৪৩৭ হিজরী
Online Edition

সূরা মরিয়ম

প্রফেসর তোহুর আহমদ হিলালী :
‘তুমি কি দেখো না আমি এ সত্য অস্বীকারকারীদের ওপর শয়তানদের ছেড়ে দিয়েছি, যারা এদেরকে (সত্য বিরোধিতায়) খুব বেশি করে প্ররোচনা দিচ্ছে? বেশ, তাহলে এদের ওপর আযাব নাযিল করার জন্য অস্থির হয়ো না, আমি এদের দিন গণনা করছি। সে দিনটি অচিরেই আসবে যেদিন মুত্তাকীদের মেহমান হিসেবে রহমানের সামনে পেশ করা হবে এবং অপরাধীদের পিপাসার্ত পশুর মতো জাহান্নামের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। সে সময় যে রহমানের কাছ থেকে পরোয়ানা হাসিল করেছে তার ছাড়া আর কারো সুপারিশ করার ক্ষমতা থাকবে না’। সূরা মরিয়ম ৮৩-৮৭
‘নিঃসন্দেহে যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে শিগগিরই রহমান তাদের জন্য অন্তরে ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেবেন। বস্তুত হে মুহাম্মদ! এ বাণীকে আমি সহজ করে তোমার ভাষায় এজন্য নাযিল করেছি যাতে তুমি মুত্তাকীদের সুখবর দিতে ও হঠকারীদের ভয় দেখাতে পারো। এদের পূর্বে আমি কত জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছি। আজ কি কোথাও তাদের নাম নিশানা দেখতে পাও অথবা কোথাও শুনতে পাও তাদের ক্ষীণতম আওয়াজ’? সূরা মরিয়ম  ৯৬-৯৮
নামকরণ : এই সূরায় হযরত মরিয়ম (আ.)-এর প্রসঙ্গে উল্লেখ থাকায় এর নাম হয়েছে মরিয়ম।
নাযিলের সময়কাল : মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় হিজরতের প্রাক্কালে এই সূরাটি নাযিল হয়।
ঐতিহাসিক পটভূমি : সুদীর্ঘ ৪০টা বছর মুহাম্মদ (সা.) তাঁর সমাজে অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার সাথে জীবন-যাপন করেছেন। উন্নত নৈতিক চরিত্র ও আচার-আচরণের কারণে সর্বজনপ্রিয় একজন ব্যক্তি হিসেবে সমাজে তাঁর অবস্থান তৈরি হয়েছিল। তিনি ছিলেন আল-আমিন ও আস-সাদিক। অথচ যখনই তিনি মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত দেয়া শুরু করেন তখনই মানুষ প্রথমে তাঁকে উপেক্ষা করতে থাকে এবং পরবর্তীতে ঠাট্টা-বিদ্রুপ, লোভ-লালসা, ভয়-ভীতি প্রদান শুরু করে দেয় এবং নবুয়্যতের পাঁচ বছরের মধ্যেই তাঁর ওপর অত্যাচার-নির্যাতন শুরু হয়ে যায়। বিশেষ করে যারা একটু দরিদ্র ও দাসশ্রেণির ছিল তাদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা ছিল বড় তীব্র। হাতের নাগালের মধ্যে পেলেই মারপিট করা, আটকে রাখা, অভুক্ত রাখা, তাদের কাছ থেকে কাজ করিয়ে নিয়ে পারিশ্রমিক না দেয়া, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দেয়া নানাবিধ উপায়ে নিপীড়ন করতো। জুলুম-নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে একদিন হযরত খাব্বাব (রা.) খানায়ে কাবায় বিশ্রামরত রসূল (সা.)-এর কাছে আল্লাহর সাহায্যের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন-‘জুলুম-নির্যাতন আর কি দেখলে? অতীতকালে যারাই ঈমানের দাবি করেছে তাদের কাউকে করাতে দ্বিখ-িত করা হয়েছে, আবার লোহার চিরুণী দিয়ে কারো শরীর থেকে গোশ্ত পৃথক করা হয়েছে; তারপরও তারা ঈমানহারা হননি। সেদিন খুব নিকটে যেদিন একজন ষোড়শী সান’আ থেকে হাজরামাউত একাকী হেঁটে যাবে তাকে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করতে হবে না’। মু’মিনদের প্রকাশ্যে চলাফেরা ও ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে রসূল (সা.) তাদেরকে আবিসিনিয়ায় হিজরত করার পরামর্শ দিয়ে বলেন যে, সেখানকার বাদশা নাজ্জাশী অত্যন্ত সৎ ও দরদী মানুষ এবং মানুষের প্রতি তিনি কখনও জুলুম করেন না। প্রথমে ১১ জন নারী-পুরুষ হিজরত করেন। তাঁরা হিজরতের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লে কাফিররা তাঁদেরকে ধাওয়া করে; কিন্তু নদীর তীরে পৌঁছার পূর্বেই সাহাবীদের নৌকা ছেড়ে দেয়। বিভিন্ন পর্যায়ে ১০১ জন নারী ও পুরুষ আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন এবং এই মুহাজিরদের নেতৃত্ব দেন হযরত জাফর বিন আবু তালিব (রা.)। আবিসিনিয়ায় হিজরতের পর মাত্র ৪০ জন নারী-পুরুষ সে সময়ে মক্কায় রয়ে যান। মুসলমানদের এভাবে চলে যাওয়াতে মক্কার কুরাইশ নেতৃবৃন্দ আরো অস্থির হয়ে পড়ে, কারণ হিজরতকারীদের সাথে প্রত্যেক বংশের কারো ভাই-বোন, কারো ছেলে-মেয়ে-জামাই বা আত্মীয়-স্বজন ছিল। কুরাইশ নেতৃবৃন্দ দু’জন ঝানু কূটনীতিককে (আবু জেহেলের বৈপিত্রেয় ভাই আব্দুল্লাহ ইবনে আবী বারী’আহ ও আমর ইবনে আস) প্রচুর উপঢৌকনসহ বাদশাহ নাজ্জাশীর দরবারে প্রেরণ করে। এই দুই কূটনীতিক প্রথমে নাজ্জাশীর সভাসদদের প্রচুর উপঢৌকনের মাধ্যমে তাদের পক্ষে নেন; তারপর উপঢৌকনসহ উপস্থিত হয় নাজ্জাশীর দরবারে এবং সেখানে উপস্থিত হয়ে মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের ধর্মত্যাগী ও ফাসাদ সৃষ্টিকারী হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদেরকে ফেরত দানের জন্য আবেদন জানায়। সভাসদরাও তাদের সাথে একমত হয়ে ফেরত দানের জন্য বাদশাহর প্রতি অনুরোধ করেন। জবাবে বাদশা বলেন যে অভিযুক্তদের কথা না শুনে আমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবো না, কারণ আমি জালিম নই। বাদশাহর পক্ষ থেকে মুহাজিরদের হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়া হলে তাঁরা পরস্পর পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেন যে রসূল (সা.) তাঁদেরকে যা শিখিয়েছেন সেখানে তাঁরা তাই বলবেন। বাদশাহর দরবারে উপস্থিত হলে বাদশাহ তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা করেন- তোমরা কেন তোমাদের স্বজাতির ধর্ম পরিত্যাগ করলে, আবার আমার ধর্মও গ্রহণ করলে না বা অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ না করে নতুন ধর্মমত গ্রহণ করলে? জবাবে হযরত জাফর বিন আবু তালিব (রা.) আরবের ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থার বর্ণনা প্রদান করেন এবং সমাজে দুষ্কৃতির একটি চিত্র উপস্থাপন করার সাথে সাথে রসূল (সা.)-এর চরিত্র ও তাঁর শিক্ষা-দীক্ষাও পেশ করেন। এর ফলে আরবের কুরাইশদের সীমাহীন জুলুম-নির্যাতন এবং এর প্রেক্ষিতে তাঁর দেশে একটি নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় আসার কথা ব্যক্ত করেন। বাদশাহ তাঁদের নবীর ওপর যে কালাম নাযিল হয় তা তাঁকে শোনানোর জন্য বললে হযরত জাফর বিন আবু তালিব (রা.) সূরা মরিয়ম পাঠ করে শোনান। তাতে বাদশাহ মুগ্ধ হয়ে পড়েন এবং তাঁর চোখ অশ্রুসজল হয়ে পড়ে। তারপর কুরাইশ প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে বলা হয় যে হযরত ইসা (আ.) সম্পর্কে তাদের আকিদা ভালো নয়। বাদশাহ জানতে চাইলে মুহাজিররা বলেন যে হযরত ইসা (আ.) আল্লাহর বান্দাহ ও রসূল এবং কুমারি মরিয়ম (আ.)-এর পুত্র। তাতে বাদশাহ বলেন তাঁর সম্পর্কে যথার্থই বলা হয়েছে এবং তিনি এর থেকে সামান্যতম বেশি কিছু নন। এরপর তিনি উপঢৌকনাদিসহ কুরাইশ প্রতিনিধি দলকে ফেরত পাঠান এবং মুহাজিরদের বলে দেন যে যতদিন খুশি তাঁরা তাঁর দেশে থাকতে পারবেন।
ব্যাখ্যা : আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনটা একেবারেই নগন্য (তোমাদের যা কিছু দেয়া হয়েছে তা দুনিয়ার জীবনের কয়েকদিনের সামগ্রী মাত্র; আর আখিরাতে যা রয়েছে তা যেমন উত্তম-উৎকৃষ্ট, তেমনি স্থায়ী-আশ শূরা)। কাফির-মুশরিকরা পরকাল অবিশ্বাস করার কারণে দুনিয়ার জীবনটাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে, আর দুনিয়ার জীবনে ভোগ-বিলাস ও প্রাধান্য বিস্তারের ক্ষেত্রে বাধা মনে করে নবী-রসূল ও তাঁদের অনুসারী ঈমানদারদের। তাই সকল যুগে সত্যপন্থী ঈমানদারদের শত্রু বিবেচনা করে তারা তাঁদের ওপর সীমাহীন জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে ও তা অব্যাহত রয়েছে। শয়তান মানবজাতির আদি পিতা আদম (আ.)-কে সেজদাহ না করে অভিশপ্ত হয়ে জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত হয় এবং আল্লাহর কাছে মানুষকে পথহারা করার ক্ষমতা ও অবকাশ প্রার্থনা করলে আল্লাহ তা মঞ্জুর করেন। অবশ্য সাথে সাথে বলে দেন যে, আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দাহদের ওপর তার কোন কর্তৃত্ব চলবে না। মানুষকে তার দলে ভেড়াবার জন্য শয়তানের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দীয় কাজ হলো কারো প্রতি জুলুম করা এবং আখিরাতে জালেমের শাস্তি হবে বড় ভয়াবহ। শয়তান তার অনুচরদের (কাফির-মুশরিক) জুলুম-নির্যাতনে প্ররোচিত করে এবং এতে তার দুটো লাভ-এক. চরম দমন-পীড়নের মধ্যে নিমজ্জিত করে দেয়ায় তার অনুসারীদের ফিরে আসার পথ রুদ্ধ করে দেয়, দুই. ঈমানদারদের একটি অংশকে ঈমানের ব্যাপারে সন্দেহপরায়ণ ও নিষ্ক্রিয় করে দেয়। শয়তানের ব্যাপারে আল্লাহর ঘোষণা হলো-‘শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন এবং তোমরা শয়তানকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না’। এ পৃথিবীতে আল্লাহর যত নাফরমানিমূলক কাজ (গুনাহের কাজ) তার মূলে রয়েছে শয়তানের প্ররোচনা। যত দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও ফাসাদ তা সবই শয়তানের মদদেই ঘটে থাকে। এখানে আয়াতে আল্লাহ সে কথাই বলেছেন। শয়তানকে ছেড়ে দেয়ার অর্থ ইসলামের দুশমনদের সীমাহীন জুলুম-নির্যাতনে সাধারণত আল্লাহ ঢিলা দেন। এ দুনিয়া একটা পরীক্ষাগার এবং এখানে আল্লাহ হক ও বাতিল উভয়েরই পরীক্ষা গ্রহণ করেন। সত্য অস্বীকারকারীরা কতখানি সীমালঙ্ঘন করতে পারে এবং ঈমানদাররা তার মোকাবিলায় কতখানি ধৈর্য অবলম্বন করতে পারে বা দ্বীনের ওপর টিকে থাকতে পারে সে পরীক্ষাই এখানে চলছে। আল্লাহর ভাষায়-তাঁকে দেখে নিতে হবে যে ঈমানের দাবিতে কে সত্যবাদী আর কে মিথ্যাবাদী। সত্য অস্বীকারকারীরা ঈমানদারদের প্রতি জুলুম-নির্যাতনে মানবিক মূল্যবোধ ও সাধারণ সৌজন্যবোধ কোন কিছুরই ধার ধারে না বরং নিত্য-নতুন পন্থা উদ্ভাবন করে ও শাস্তিদানের মাধ্যমে চরম উল্লাস প্রকাশ করে। আল্লাহর ভাষায় এ সবই শয়তানের প্ররোচনার ফল। এমতাবস্থায় অস্থির হয়ে তাদের প্রতি গজব নাযিলের জন্য আল্লাহর কাছে কাকুতি-মিনতি না করে পরম ধৈর্য অবলম্বনের জন্য ঈমানদারদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যত্র আল্লাহ বলেন ঈমানদারদের সাথে যা করা হচ্ছে তা তিনি দেখছেন। দিন গণনা করছেন অর্থ আল্লাহর কাছে আখিরাত অতি নিকটবর্তী। এছাড়া মৃত্যুর সাথে সাথে মানুষের আখিরাতের জীবন শুরু হয়ে যায়। যে সমস্ত ঈমানদারদের প্রতি যুলুম-নির্যাতন চালানো হচ্ছে তাদের মর্যাদা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে তারা সেদিন আল্লাহর মেহমান হিসেবে বরিত হবেন। পক্ষান্তরে জালেমদের বড় অপমানের সাথে পিপাসার্ত জন্তু-জানোয়ারের মতো জাহান্নামের দিকে তাড়িয়ে নেয়া হবে।
আজ সত্য অস্বীকারকারীরা যাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছে (তাদের সেই পরম সুহৃদ শয়তান ও তার অনুসারীরা) সেদিন কেউ তাদের কোন উপকারে আসবে না। ঈমানদারদের মধ্যে আল্লাহর বাছাইকৃত কিছু বান্দাহ (নবী-রসূল, শহীদ, আলেম-উলামা, কুরআনে হাফিজ, ঈমানদারদের সন্তান-সন্ততি যারা অতি শৈশবে ইন্তিকাল করেন ও তিনি যাঁকে পছন্দ করেন) যাঁদেরকে আল্লাহ অনুমতি দেবেন এবং যাঁদের জন্য সুপারিশ তিনি পছন্দ করবেন তারা ছাড়া আর কারো পক্ষে আল্লাহর আদালতে কথা বলার সাহস হবে না। সুপারিশের বিষয়টি কুরআন ও হাদিসে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে। তাতে উপলব্ধি করা যায় যে ইসলামের দুশমনদের জন্য কোন ধরনের সুপারিশের সুযোগ নেই।
চরম জুলুম-নির্যাতনের পরও আল্লাহ চান তাঁর প্রিয় ঈমানদার বান্দারা সকল অবস্থায় সৎ কাজ অব্যাহত রাখুক। সৎ কাজের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। মানবপ্রকৃতি যে কাজকে ভালো ও কল্যাণকর মনে করে এমন সব কিছুকে ইসলাম নেক আমল হিসেবে গ্রহণ করে যদি তার পশ্চাতে কোন কূটকৌশল না থেকে থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি। আচার-আচরণ, লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, চাষাবাদ সকল ক্ষেত্রে সকল অবস্থায় একজন মু’মিন অবশ্যই সততা অবলম্বন করবে। এমন কি তার শত্রুর সাথেও সে নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দেবে না। এমতাবস্থায় মু’মিন যাদের মাঝে অবস্থান করে তাদের ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব সে লাভ করে। জালেমের প্রতি ভয়-ভীতি ও নত হয়ে চলা খুবই সাময়িক। স্বৈরশাসকরা জোর-জুলুম করে মানুষের আনুগত্য লাভ করলেও ওরা কখনও মানুষের হৃদয় জয় করতে পারে না। তাই সুযোগ পেলেই তারা স্বৈরাচারকে পরিহার করে ঈমানদারদের কাতারে শামিল হয়ে পড়ে। নবী (সা.)-এর জীবনে সেটাই ঘটেছিল। তিনি তাঁর ১৩ বছরের মক্কী জীবনে শুধুই নির্যাতিত হয়েছেন, পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের সামান্যতম কোন ঘটনা পাওয়া যায় না। কিন্তু তাঁর দাওয়াত একটি মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকেনি। এমন সময়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমেই বেশির ভাগ দাওয়াত সম্পন্ন হয়েছে।
মানুষের হেদায়াতের জন্য মহান আল্লাহতায়ালা রসূল (সা.)-এর নিজ ভাষায় কুরআনকে অত্যন্ত সহজভাবে নাযিল করেছেন যাতে তিনি মুত্তাকীদের সুখবর শোনাতে ও সত্য অস্বীকারকারীদের ভয় দেখাতে পারেন। সুখবর দেয়া ও ভয় দেখানো কাজটা তখনই সম্ভব যখন মানুষ তার নিজের ভাষায় কুরআনকে উপলব্ধি করতে পারে। অতীত জাতিসমূহকে ধ্বংস করে দেয়ার কথা বলে সত্য অস্বীকারদের সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। কোন জনপদে যুলুম-নির্যাতন বৃদ্ধি পেলে এবং দাওয়াতের পথ একেবারে রুদ্ধ হয়ে পড়লে সাধারণত সে সময়ে আল্লাহ গজব নাযিল করেন। কিন্তু যুলুম-নির্যাতন সত্ত্বেও আল্লাহর এক দল বান্দাহ মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকা অব্যাহত রাখলে তেমন অবস্থা সাধারণত দেখা যায় না। একটি জনপদে মু’মিন বান্দারা আল্লাহর রহমত। সেই জনপদকে আল্লাহ টিকিয়ে রাখেন তাঁর মু’মিন বান্দাহদের কারণে। পৃথিবীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে শত প্রতিকূলতার মাঝেও মু’মিনদের উচিত আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকা অব্যাহত রাখা।
শিক্ষা :
মু’মিনের ওপর যুলুম-নির্যাতন খুবই স্বাভাবিক এবং এটাকে পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে তা থেকে উত্তরণের জন্য সবর অবলম্বন ও আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে। আখিরাতে মু’মিনরা আল্লাহর মেহমান হিসেবে সাদরে গৃহীত হবেন।
সত্য অস্বীকারকারীদের জুলুম-নির্যাতনের প্রেক্ষিতে তাদের প্রতি আযাব নাযিলের জন্য অস্থির হতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। ঈমানদারদের সাথে যা কিছু করা হচ্ছে তা তিনি জানেন এবং দুনিয়ায় কিছুদিন অবকাশ দেয়া হলেও আল্লাহ শাস্তিদানের জন্য দিন গণনা করছেন।
সত্য অমান্যকারীদেরও আল্লাহ পরীক্ষা নেন। তাদেরকে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দান করা হলে তারা ঈমানদারদের প্রতি জুলুম-নির্যাতন চালায় এবং শয়তানকে তারা অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে বিধায় যুলুম-নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন বাড়ে। এদের পরিণতি জাহান্নাম এবং তাদের জন্য অপমানকর শাস্তি ছাড়া আর কিছুই নেই।
মু’মিনদের জন্য রসূল (সা.) ও নেক লোকদের সুপারিশ রয়েছে। পক্ষান্তরে সত্য অমান্যকারীদের জন্য কোন সুপারিশকারী নেই।
সাময়িকভাবে বিপদাপদ আসলেও ঈমানদারদের ঈমান ও নেক আমলের কারণে জনপদের লোকদের অন্তরে আল্লাহতায়ালা ভালোবাসা পয়দা করে দেন। ফলশ্রুতিতে মানুষ সত্য অস্বীকারকারীদের ছেড়ে ঈমানদারদের কাতারে শামিল হয়।
রসূল (সা.)-এর ভাষা আরবী এবং আরবী ভাষায় কুরআন নাযিল হওয়ার কারণে সহজেই তিনি মুত্তাকীদের সুখবর ও হঠকারীদের ভয় দেখাতে পেরেছেন। তাই আমাদেরকেও মাতৃভাষায় কুরআন বুঝতে হবে যাতে আমরাও মানুষকে সুখবর দিতে ও সতর্ক করতে পারি।
অতীতে সীমালঙ্ঘনকারী অনেক জাতিকে আল্লাহ ধ্বংস করে দিয়েছেন। আল্লাহর পথে আহ্বানকারী লোকরা যখন মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকা ছেড়ে দেয় বা একটি জনপদের মানুষ যখন দায়ীদের বরদাশ্ত করতে না পারে সে অবস্থায় আল্লাহ গজব দিয়ে থাকেন।
লেখক : উপাধ্যক্ষ (অব.), কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ