ঢাকা, রোববার 07 February 2016 ২৫ মাঘ ১৪২২, ২৭ রবিঃ সানি ১৪৩৭ হিজরী
Online Edition

কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধির তালিকায় এশিয়ায় দ্বিতীয় বাংলাদেশ

এইচ এম আকতার : অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জ্বালানি তেলের ব্যবহারও। জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের প্রভাবেও প্রতিনিয়ত পুড়ছে জ্বালানি। এতে উন্নত দেশগুলোতে কার্বন নিঃসরণ দ্রুত বৃদ্ধির সাথে বাড়ছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতেও। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে অবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। দুই যুগের ব্যবধানে দেশে কার্বন নিঃসরণ বেড়েছে ৪২২ শতাংশ। দেশের পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এর জন্য অনেকটাই দায়ী।
প্যারিসভিত্তিক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) সম্প্রতি প্রকাশিত ‘সিওটু ইমিশনস ফ্রম ফুয়েল কমবাসচিয়ান-২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বেশ পুরনো। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ব্যবহার সক্ষমতা কমছে। ফলে বিদ্যুত্ উৎপাদনে অধিক গ্যাস ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে একদিকে গ্যাসের বড় অংশের অপচয় হচ্ছে। অন্যদিকে নিঃসরিত কার্বন বায়ুদূষণ বাড়াচ্ছে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের কার্বন নিঃসরণ দ্রুত বাড়ার কারণ হিসেবে তাই পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকেই দায়ী করে আইইএ।
সংস্থাটি বলছে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ছিল ৫৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন টন। এর মধ্যে গ্যাস ব্যবহারের কারণে নিঃসরণ হয়েছে ৪০ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন বা ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ। আর জ্বালানি তেল পোড়ানোর জন্য নিঃসরণ হয়েছে ১৪ দশমিক ৯ টন বা ২৫ শতাংশ। এর বড় অংশই ব্যবহার হয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
২০১৩ সালে নিঃসরিত কার্বনের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ছিল ৩০ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন বা ৫১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের অধিকাংশই বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) অধীনে। এগুলোয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রচুর পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করা হয়। এছাড়া ২০১৩ সালে শিল্প খাত থেকে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ছিল ১০ দশমিক ৬ মিলিয়ন টন, পরিবহন খাত থেকে ৮ দশমিক ২ ও বাসাবাড়ি থেকে ৬ দশমিক ১ মিলিয়ন টন।
পাঁচ বছর আগেও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কম ছিল বলে জানায় আইইএ। সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০০৮ সালে দেশে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ছিল ৪৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন টন। এর মধ্যে ২০ দশমিক ১ মিলিয়ন টন বা ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর। এছাড়া ২০১০ সালে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ছিল ৫০ দশমিক ৭ মিলিয়ন টন। সে সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে নিঃসরিত কার্বনের পরিমাণ ছিল ২২ দশমিক ২ মিলিয়ন টন বা ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
জানতে চাইলে পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) খালেদ মাহমুদ বলেন, আইইএর প্রতিবেদনটি দেখা হয়নি। আর কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কীভাবে পরিমাপ করা হয়েছে, তাও জানা নেই। তবে আইইএ যে কারণটি বলেছে, তা ঠিক আছে। পিডিবির বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বেশির ভাগই অনেক পুরনো। এতে গ্যাস কিছুটা বেশি ব্যবহার হয়। পরিস্থিতির উত্তরণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে পুরনো কেন্দ্রগুলো রি-পাওয়ারিং বা পুনঃক্ষমতায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি দ্বৈত জ্বালানিভিত্তিক করা হচ্ছে। এতে বিদ্যুত্ উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণও অনেক কমবে। ফলে কার্বন নিঃসরণও অনেক কমে আসবে।
আইইএর প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ১৯৭১ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণ অনেক ধীরগতিতে বেড়েছে। ১৯৯০ সালের পর থেকে তা বৃদ্ধির মাত্রা বাড়তে থাকে। আর ২০১০ সাল থেকে কার্বন নিঃসরণ দ্রুত বাড়ছে। তবে এখনো বাংলাদেশে নিঃসরিত কার্বনের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। ২০১৩ সালে দেশে মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ছিল দশমিক ৩৮ টন, যা বিভিন্ন উন্নত দেশে ১০ টনের বেশি।
১৯৯০ সালে বাংলাদেশে মোট কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ছিল ১১ দশমিক ৪ মিলিয়ন টন। ২০১৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন টন। অর্থাৎ দুই যুগের ব্যবধানে বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণ বেড়েছে ৪৮ দশমিক ২ মিলিয়ন টন বা ৪২১ দশমিক ৬ শতাংশ। আর ২০১০ সালে দেশে কার্বন নিঃসরণ ছিল ৪৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন টন, যা ২০০৫ সালে ৩২, ২০০০ সালে ২০ দশমিক ৯ ও ১৯৯৫ সালে ১৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন ছিল।
কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধির হারে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। দুই যুগের মধ্যে এশিয়ার দেশগুলোয় সবচেয়ে দ্রুত কার্বন নিঃসরণ বেড়েছে ভিয়েতনামে, ৬৪৮ দশমিক ২ শতাংশ। এর পর রয়েছে চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া। তবে মোট নিঃসরণের দিক থেকে বাংলাদেশ এশিয়ায় দশম। এক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে চীন। এর পর রয়েছে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, চায়নিজ তাইপে, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন। 
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ম. তামিম বলেন, বাংলাদেশে ভারী শিল্প এখনো ব্যাপক আকারে গড়ে ওঠেনি। তাই মাথাপিছু জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ অনেক কম। আবার দেশে মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণও অনেক কম। এতে দেশে কার্বন নিঃসরণ খুব ধীরে বাড়ার কথা। তবে সাম্প্রতিককালে কার্বন নিঃসরণ দ্রুত বাড়ছে। এর মূল কারণ পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্র। এসব কেন্দ্রের জ্বালানি ব্যবহারে সক্ষমতার হার সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ, যদিও আন্তর্জাতিকভাবে এ হার ৭০ শতাংশের বেশি। পরিস্থিতির উত্তরণে এখনই সতর্ক হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে পুরনো কেন্দ্রগুলো উন্নয়নের পাশাপাশি নতুন কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি ব্যবহার সক্ষমতার প্রতিও নজর দিতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ