ঢাকা, বুধবার 20 April 2016 ৭ বৈশাখ ১৪২৩, ১২ রজব ১৪৩৭ হিজরী
Online Edition

মীর কাসেমের মামলার রায় সম্পর্কে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী

স্টাফ রিপোর্টার : জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য মীর কাসেম আলীর আপিলের রায় বদলাতে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ করেছেন আপিল বিভাগের সাবেক বিতর্কিত বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। অনুষ্ঠানে মূলত প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সাম্প্র্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করেন সাবেক এই বিচারপতি। তিনি বলেন, ‘ওই ঘটনার (দু’মন্ত্রীর আলোচনার) জন্যই মীর কাসেমের এই রায় এসেছে। না হলে রায় অন্যদিকে চলে যেত। কত টাকার যে লেনদেন হয়েছে।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খানের ‘গত এক দেড় মাস খুব যাতনায় ভুগেছি। দু’জন মন্ত্রী দন্ডিত হয়েছেন। এই দন্ড আমাদের জন্য আশীর্বাদ। উনারা দন্ডিত, আমরা গর্বিত। আই ওউন ইট।’ এই বক্তব্যের পরই শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এসব কথা বলেন।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ওপর এক সেমিনারের আয়োজন করে বাংলাদেশ হেরিটেজ ফাউন্ডেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান। আওয়ামী লীগ সমর্থক সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান এর প্রতিষ্ঠাতা। সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। সেমিনারটিতে তারা এসব কথা বলেন।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ গত ৮ মার্চ মীর কাসেম আলীর আপিলের রায় ঘোষণার দিন ধার্য থাকা অবস্থায় তিনদিন আগে সরকারের খাদ্য মন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক রায় নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে নতুন বেঞ্চে পুনঃশুনানির দাবি জানান। শেষ পর্যন্ত আপিলের রায়ে মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদন্ডের রায় বহাল থাকে। পরবর্তীতে গত ২৭ মার্চ আদালত অবমাননার দায়ে দু’ মন্ত্রীকে ৫০ হাজার টাকা করে দন্ডিত করেন আপিল বিভাগ। 

কুমিল্লার কলেজ ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যাকান্ডের বিচার প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের সমালোচনা করে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন ‘তনু হত্যা সম্পর্কে চিফ জাস্টিস যা বলেছেন, তা যদি রাস্তার কোনো লোক বলত-মানা যেত। প্রধান বিচারপতি বলেছেন-বর্তমান আইনে তনু হত্যার বিচার করা সম্ভব নয়। এটা কেমন কথা হতে পারে? দেশের সর্বোচ্চ বিচারকের কাছ থেকে এই ধরণের কথা আসায় তদন্ত প্রভাবিত হতে পারে। তদন্তাধীন বিষয় নিয়ে এ ধরণের বক্তব্য কোনো বিচারকের কাছ থেকে আশা করা যায় না। প্রসঙ্গত প্রধান বিচারপতি চলতি মাসের শুরুতে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, তনু হত্যার ঘটনা একটি আধুনিক অপরাধ। পুরনো ফৌজদারি আইন দিয়ে এর সুষ্ঠু তদন্ত কিংবা বিচার সম্ভব নয়।

‘আইন প্রণেতারা অজ্ঞ-প্রধান বিচারপতির এই কথাটা সঠিক নয়’ মন্তব্য করে শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমাদের সংসদে অনেকেই আছেন যারা বিশ্বমানের। সে কারণেই সিপিএ এবং আইপিইউতে বাংলাদেশ নেতৃত্ব দিচ্ছে। সংসদে কোনো আইন তৈরি হয় না। সংসদে আইন আসে খসড়া হিসাবে। এটা তৈরি করে আইন মন্ত্রণালয়ের ড্রাফটিং ইউনিটের বিশেষজ্ঞরা। সংসদ সদস্যদের বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নাই। উনি (প্রধান বিচারপতি) কীভাবে এটা বললেন! এটা বোঝার জন্য সংবিধানের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নাই।

মুক্তিযুদ্ধে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল উল্লেখ করে শাসমুদ্দিন চৌধুরী বলেন, জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মুছে দিতে উন্মাদ হয়ে উঠেছিলেন। এ কারণেই অনেকে মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধে জিয়া পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার চর হিসেবে কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে জিয়া তার পিস্তল থেকে একটি গুলীও খরচ করেননি দাবি করে মুক্তিযুদ্ধে জিয়ার ভূমিকা নিয়ে তদন্তের দাবিও জানান তিনি।

হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের এই সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ওয়লিউর রহমান। বক্তব্য রাখেন মেজর জেনারেল (অব.) শিকদার আহমেদ, ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর জিয়াদ আল মালুম প্রমুখ।

প্রসঙ্গত আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী নানা কারণে বিতর্কিত হাইকোর্টে বিচারপতি থাকাকালে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতির কাছে তার অভিসংশনের জন্য দুটি আবেদন জমা পড়েছিল। বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো.আবদুল হামিদ জাতীয় সংসদের স্পিকারে থাকাকালে ২০১৩ সালের ২৯ মে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সড়ক ভবন সরিয়ে নেয়ার একটি মামলায় তিনি স্পিকারের সমালোচনা করেন। এ নিয়ে সংসদ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদ সদস্যরা বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরীকে ‘স্যাডিস্ট’ বলে অভিহিত করেন। তা সত্ত্বেও স্পিকার থেকে রাষ্ট্রপতি হলে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী আপিল বিভাগে নিয়োগ পান।

গত বছর সেপ্টেম্বরে অবসরে যাওয়ার আগে ১৩ সেপ্টেম্বর বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী রাষ্ট্রপতি বরাবারে একটি চিঠি দিয়ে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে সংবিধানের লঙ্ঘন, শপথ ভঙ্গ এবং অসাদাচারণের অভিযোগ করেন। এই চিঠি প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, আইনমন্ত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের সব বিচারপতিদের কাছে পাঠানো হয়। বিরোধ থেকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আপিলের রায়ের আগে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে তার কথোপকথনের একটি অডিও টেপ প্রকাশ হয় এবং এ বিষয়ে জনকণ্ঠে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। এ নিয়ে জনকন্ঠকে আদালত অবমাননার জন্য দন্ডিত করে সর্বোচ্চ আদালত। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। 

এরপর চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে প্রধান বিচারপতি অবসরের পর রায় লেখা সংবিধানের লঙ্ঘন বলে বক্তব্য দেন। এরপর প্রধান বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরীকে তার কাছে তাকে রায়ের সকল নথিপত্র ফেরত দিতে বলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন শামসুদ্দিন চৌধুরী। তিনি গত ৮ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যকে বলেন প্রধান বিচারপতির এই আদেশ আমি মানি না। যদিও শেষ পর্যন্ত রায়ের সকল নথি ফেরত দিতে বাধ্য হন শামসুদ্দিন চৌধুব্ধুী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ