ঢাকা, সোমবার 24 September 2018, ৯ আশ্বিন ১৪২৫, ১৩ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

দুর্যোগে নারী-শিশুর সুরক্ষা : এক নতুন চ্যালেঞ্জ

শফিক বাশার : দুর্যোগের সময় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন হয়ে পড়ে নারী ও শিশুরা। তাদের শারীরিক সক্ষমতা তেমন থাকে না বলে সংকট তাদেরই বেশি।  বিপদ ও দুর্যোগের দুঃসময়ে নারী ও শিশুর সুরক্ষার বিষয়টি বিশ্বব্যাপী নতুন এক চ্যালেঞ্জ। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) প্রতিবেদন অনুযায়ী গত এক দশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ তিনগুণ বেড়েছে। এর ফলে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে যে কোনো সংকটে নারী ও কমবয়সী জনগোষ্ঠীকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান এবং সংকট কাটিয়ে ওঠা পর্যন্ত তাদের জন্য সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। বিশ্ব ঝুঁকি প্রতিবেদন ২০১২ অনুযায়ী, বিশ্বের সর্বাধিক দুর্যোগপ্রবণ ১৭৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান পঞ্চমে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদী ভাঙন, খরা, কালবৈশাখী, টর্নেডো, জলোচ্ছ্বাসসহ বজ্রপাতের মতো দুর্যোগ এ দেশে বারবারই আঘাত হানে। ১৯৮০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে দুইশ’র বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব বিপর্যয়ে দুই লাখের বেশি মানুষের প্রাণহানি এবং প্রায় ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ সম্পদের ক্ষতি হয়েছে।  সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হয়েছে নারী ও শিশুরা। আর প্রাণহানিও বেশি ঘটেছে এদেরই। 

সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতে বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশকে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সবচেয়ে  বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বলে চিহ্নিত করেছেন। দ্রুত নগরায়নের সঙ্গে সঙ্গে জলাবদ্ধতা, অগ্নিকা-, ভবন ধসের পাশাপাশি ভূমিকম্পের আশঙ্কাও বাড়ছে এদেশে। শুধু তাই নয়, নতুন দুর্যোগ হিসেবে যোগ হয়েছে বজ্রপাতের ব্যাপকতা।

ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে ব্যাপক হারে বনজঙ্গল ও গাছপালা নিধন, নদ-নদী ও খালবিল ভরাট, ভূগর্ভস্থ পানি ও তেল উত্তোলন, উঁচু বাঁধ নির্মাণ, ফসল উৎপাদনে ক্ষতিকর রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার করে মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে। এসব কারণেই সিডর ও আইলার মতো ভয়াবহ দুর্যোগ বেশি বেশি দেখা দিচ্ছে। 

আইপিসিসি-এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আগামী ২০ বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ শতকরা ৩২০ ভাগ বাড়বে। পাশাপাশি বাড়বে শিশুমৃত্যুর হারও। ওই প্রতিবেদনে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ২০০৯ সালে আইলার আঘাতে দুর্ভোগের শিকার মানুষের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরা হয়। উল্লেখ করা হয়, আইলার বিপর্যয়ে ক্ষত-বিক্ষত মানুষ এখনো অর্থনৈতিকভাবে আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারেনি। তারা এখনো প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া রোয়ানুর আঘাত তাদের দুর্দশার মাত্রা আরও তীব্র করেছে। বাড়িয়ে দিয়েছে নারীদের কষ্ট। খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের নারীদের লবণমুক্ত খাবার পানি সংগ্রহ করার জন্যই প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ হাঁটতে হচ্ছে। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে কন্যাশিশুদের স্কুল থেে বেশি করে প্রত্যাহার ও বাল্যবিয়েতে বাধ্য করা হয়। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. খ›ন্দকার মোকাদ্দেম হোসাইন একটি জাতীয় পত্রিককে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দুর্যোগের সময় শিশুদের আবদ্ধ অবস্থায় থাকতে হয়, তাদের স্বাভাবিক জীবন বাধাগ্রস্ত হয়। নানাবিধ কারণে নারীদের মানসিক ও শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। 

সিডর ও আইলার মতো ভয়াবহ সাইক্লোন, উপকূলীয় অঞ্চলে জলোচ্ছ্বাস, দীর্ঘমেয়াদি খরা, প্রবল বন্যা বিগত দিনগুলোতে অনেক কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করেছে পিকেএসএফ নামে একটি সংগঠন। সংস্থাটি এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে দরিদ্র মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা এবং দুর্যোগ পরবর্তী জীবন-জীবিকা শুরুর জন্য চালু করেছে নানা ধরনের সহজ ও দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগোত্তর ঋণ সহায়তা। এই কার্যক্রমে দুর্যোগের শিকার মানুষগুলোর মাঝে আশার সঞ্চার করেছে। পিকেএসএফ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্র্রগুলোতে মানবেতর ঝুঁকি এবং অবহেলার শিকার হয় নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীরা। তাই দুর্যোগে নারী, শিশু এবং প্রতিবন্ধীদের ক্ষয়ক্ষতি যথাসম্ভব কমানোর লক্ষ্যে পিকেএসএফ এবং সহযোগী সংস্থাগুলো নানা ধরনের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। 

সিডর ও আইলার মত বজ্রপাতও সম্প্রতি ভয়ঙ্কর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। চলতি বছরের মে পর্যন্ত বজ্রাঘাতে নারী শিশুসহ ৯৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, দুর্যোগ ফোরাম, গণমাধ্যমের তথ্য ও একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হিসাব মতে, গত ৫ বছরে সারা দেশে বজ্রপাতে সাড়ে ৩ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সারা দেশে ৫ হাজার ৭৭২টি বজ্রপাত হয়। এর মধ্যে ২০১১ সালে ৯৭৮, ২০১২ সালে ১ হাজার ২১০, ২০১৩ সালে ১ হাজার ৪১৫, ২০১৪ সালে ৯৫১ ও ২০১৫ সালে ১ হাজার ২১৮ বজ্রাঘাতের ঘটনা ঘটেছে আমাদের বাংলাদেশে।

বজ্রপাত নিয়ে কাজ করছে দুর্যোগ ফোরাম। তারা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালের পাঁচ মাসে বজ্রপাতে নারী-শিশুসহ মারা গেছেন ৯৩ জন। এর মধ্যে চলতি মে মাসেই মারা গেছেন ৫৭ জন । তাছাড়া ২০১৫ সালে ৪০ শিশু, ২৩ নারী, ১২৩ পুরুষ মিলিয়ে ১৮৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৪ সালে ৩৯ শিশু, ২৮ নারী ও ১৪৩ পুরুষ মিলিয়ে ২১০, ২০১৩ সালে ৫৫ শিশু, ৫৩ নারী ও ১৭৭ পুরুষসহ ২৮৫ জন মারা যায়। ২০১২ সালে মারা যায় ৩০১ জন, এর মধ্যে রয়েছে ৬১ শিশু, ৫০ নারী ও পুরুষ। ২০১১ সালে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৭৯ জন, যার মধ্যে ৩১ শিশু, ২৮ নারী ও ১২০ পুরুষ। এই প্রতিবেদন অনুসারে গত পাঁচ বছরে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে নারী ও শিশুদের।

আশার কথা হল, দুর্যোগের সময় নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় সরকার ও বেসরকারি কয়েকটি সংগঠন ইতোমধ্যেই নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যার ফলে দুর্যোগে নারী ও শিশুর ক্ষতির হার অনেকাংশেই কমে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশে দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে নারীরা শুধু যে নানা ধরনের সুযোগ পাচ্ছেন তা নয়, বরং তাঁরা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছেন। সচেতন হয়ে উঠেছেন তারা। দুর্যোগের পর নারীরা যেন আর অসহায় না থাকেন, সে জন্য তাদের জন্য নানা ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুর্যোগ পরবর্তী ক্ষতি মোকাবিলায় নারীরা যাতে ছোট ছোট উদ্যোগ  গ্রহণ করতে পারেন, তার জন্য সরকার ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে তাদের ঋণ দেয়া হচ্ছে। এসব কার্যক্রম গ্রহণের ফলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সারা বিশ্বের কাছে রোল মডেল হিসেবে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ ।

-বাসস

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ