ঢাকা, সোমবার 19 November 2018, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

কাঁকড়া চাষ শ্যামনগরের নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

রফিকুল ইসলাম,শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) : সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলা উপকূলীয় এলাকার চিংড়ি মাছের মতো কাঁকড়ায় রয়েছে অর্থনৈতিকো এক বিশাল ভান্ডার। এ অঞ্চলে এ খাত থেকে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। সম্ভাবনাময় জলজ সম্পদ কাঁকড়া আহরণে যদি আধুনিকায়নের ছোয়া দেয়া যায় তাহলে এটি হতে পারে দারিদ্র বিমোচনের অন্যতম হাতিয়ার। এমন একটি খাতকে অবহেলার দৃষ্টিতে না দেখে বরং তা সামনে রেখে বিরাট সাফল্য বয়ে আনা সম্ভব বলে অভিমত ব্যাক্ত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ সংলগ্ন সুন্দরবনের শত শত নালা ও খালে, সমুদ্রজলসীমা, মোহনায় প্রাকৃতিক ভাবে উৎপাদিত কাঁকড়া আহরণ চলছে। তবে গত বছর জলদস্যুদের উৎপাতে বিগত বছরগুলোর তুলনায় কম কাঁকড়া আহরিত হয়। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ, আধুনিক পদ্ধতি ও আহরণকারীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব। যার ফলে সরকার প্রতি এ খাত থেকে শত শত কোটি টাকার বৈদশিক মুদ্রা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তবে প্রাকৃতিক ভাবে কাঁকড়া আহরণের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভিত্তিকে ঘেরে ও পুকুরে কাঁকড়া উৎপাদন করে অনেকেই সফলতা পেয়েচে। তেমনি বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে চাষাবাদ করলে কাকড়া শিল্প থেকে দেশের একটি উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় হবে।

সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, প্রতিবছর আন্তজার্তিক বাজারে কাঁকড়ার চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি দাম ও বাড়ছে। কিন্তু হ্রাস পাচ্ছে এর উৎপাদন। কাঁকড়া আরোহন মৌসুমে উপকূলীয় এলাকায় সহস্যাধিক জেলে সুন্দরবনের বিভিন্ন স্টেশন হতে পাশ সংগ্রহ করে গভীর বনে যায় কাঁকড়া আহরনের জন্য। রাজস্ব দিতে হয় জন প্রতি নৌকা সহ ৩/৫ টাকা। গভীর সুন্দরবনের হরিণ পয়েন্টসহ সমুদ্র পর্যন্ত তারা কাঁকড়া আহরণ করে। কাঁকড়া আহরণ কারীরা জানান, জলদস্যুদের উৎপাতের কারণে এবার সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরা জেলেদের আগমন কম। ৪/৫ বাহিনীকে চাঁদা দিতে হচ্ছে তাদের। তাছাড়া জেলে অপহরন মুক্তিপন আর মারধর তো আছেই। জেলেরা তাদের আহরিত কাঁকড়া কেজি প্রতি ১০০-২০০ শত টাকা দরে বিক্রি করে থাকে স্থানীয় বাজারে। এর পরে মাছ কোম্পানির ডিপোতে কাঁকড়া বিদেশে রপ্তানির জন্য চালান প্রস্তুত করা হয়।

উপকূলীয় জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা চিংড়ি ঘের গুলোতে প্রাকৃতিক ভাবেই কাঁকড়া উৎপাদিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে সরকারি পৃষ্ট পোষকতা পেলে কাঁকড়া রপ্তানি করে আরো বেশি বৈদশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। জানা গেছে, স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি কাঁকড়ার দাম গ্রেড বেদে ৩০০-৫০০ টাকা।

মৎস অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, আশির দশকের শুরুতে প্রথম অপ্রচালিত পন্য হিেেব কাঁকড়া বিদেশে রপ্তানি শুরু হয়। রপ্তানি ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে বিদেশে প্রথম কাঁকড়া রপ্তানি হয়। এর পর বন্ধ থাকে প্রায় ৩ বছর।
১৯৮২-৮৩ অর্থবছরে আবার বিদেশে রপ্তানি করা হয়। পর্যায়ক্রমেআন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা বাড়তে তাকে। পাশাপাশি বাড়তে থাকে এ খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়। ১৯৯০-৯১ সালে কাঁকড়া রপ্তানি করে আয় হয় ২৭ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। ১৯৯৫-৯৬ অর্থ বছরে রপ্তানি প্রায় কয়েকগুন বেড়ে যায়। ঐ অর্থবছরে ২৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকার কাঁকড়া রপ্তানি করা হয় বিদেশে। ১৯৯৮-৯৯ অর্থ বছরে কাঁকড়া রপ্তানি হয় ১২৫ কোটি ২২ লাখ ৩৯ হাজার টাকার। ১৯৯৯-২০০০ অর্থ বছরে কাঁকড়া রপ্তানি করা হয় ১৪১ কোটি ৬৬ লাখ ৬ হাজার টাকা। ২০০১-০২ অর্থ বছরের এ খাত থেকে আয় হয় প্রায় ৫৩ মিলিয়ন টাকা। ২০০২-০৩ অর্থ বছরে বিদেশে কাঁকড়া রপ্তানি করা হয়েছে ৬৩০ মেট্রিকটন। বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয় ২ দশমিক৫২ মিলিয়ন ডলার। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে এই আয় গিয়ে দাঁড়ায় ২০ সিলিয়ন টাকায়। কাঁকড়া আহরণের সবচেয়ে বড় ভান্ডার সুন্দরবন। এখানে কাঁকড়া আহরণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবার বন বিভাগ ব্যাপকভাবে টহল জোরদার করেছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাঁকড়ার চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকায় এখন অনেকেই কাঁকড়া চাষে আগ্রহী হচ্ছে। তবে খুলনা বিভাগীয় কাঁকড়া ব্যাবসায়ী সমিতির একজন কর্মকর্তা জানান কিছু অসৎ ব্যাবসায়ী ও চাঁদা বাজের কারণে সম্ভবনাময় এ ব্যাবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমান এ ব্যাবসা হুমকির মুখে। চাঁদা আর জুলুম বাজির কারণে ক্ষুদ্র কাঁকড়া ব্যাবসায়ীরা ব্যাবসা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।

কাঁকড়া চাষীর সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যাক্তির কাছ থেকে জানা গেছে, সুন্দরবন সংলগ্ন নদীগুলোতে যে পরিমান কাঁকড়া ধরা পড়ে তা প্রাকৃতিকভাবে রেনু থেকে বড় হয়। এ অঞ্চলের ১২ মাস লবনাক্ত পানি কাঁকড়া চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। তাছাড়া চিংড়ি চাষের জন্য প্রচুর জমি ও অর্থের প্রয়োজন হলেও কাঁকড়া চাষের জন্য জমি ও অর্থ দুটোই কম লাগে। সাধারণত মালয়েশিয়া, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুরে কাঁকড়া রপ্তানি করা হয়ে থাকে।

সংশ্লিষ্ট সুত্র থেকে জানা যায়, আমাদের দেশে ১৫ প্রজাতির কাঁকড়া রয়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে সিলা মেটরা (শিলা কাঁকড়া) কাঁকড়ার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এই কাঁকড়া সুন্দরবনে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত যে কাঁকড়া ধরা পড়ে তা সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে রপÍানি এবং সরকারিভাবে ব্যাংক ঋণের সুবিধা দেয়া হলে উপকূলীয় জেলা ছাড়তে দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে কাঁকড়া রপ্তানি বিরাত সাফল্য বয়ে আনবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ