ঢাকা, শনিবার 17 November 2018, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মাগুরছড়া গ্যাসকূপে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ১৯ বছরপূর্তি আজ

অনলাইন ডেস্ক: ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন মধ্যরাতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাগুরছড়া গ্যাসকূপে খননকাজ চলাকালে ঘটে ভয়াবহ এক বিস্ফোরণ।  আর্থিক হিসেবে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা ক্ষতিসাধনকারী ওই বিস্ফোরণে পুড়ে নষ্ট হয়েছিল ২৪৫ বিলিয়ন ঘনফুট অমূল্য গ্যাস সম্পদ, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সংরক্ষিত বিস্তীর্ণ বনভূমি, স্থানীয় ও আদিবাসীদের আবাসভূমিসহ সড়ক, রেলপথ ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাপনা। আজ মঙ্গলবার ওই বিস্ফোরণের ১৯ বছর পূর্ণ হলো। 

বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল মৌলভীবাজার গ্যাসফিল্ডের মাগুরছড়া ১৪নং গ্যাস ব্লকসহ রেলপথ, সড়ক পথ, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, আদিবাসী খাসিয়াদের পানপুঞ্জি ও বৈদুত্যিক লাইন।  সে সময় অনেক চেষ্টার পরও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে না পেরে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল গ্যাস কুপটিকে। যে কারণে মাটির নিচে থাকা উত্তোলনযোগ্য বিপুল গ্যাস পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের ৯ জানুয়ারি উদগীরিত গ্যাসের উৎসমুখ সীল করা হয়।

মাগুরছড়া ক্ষতিপুরনের দাবিতে শ্রীমঙ্গলে পরিবেশবাদি বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়।

১৯৯৭ সালে মাগুরছড়ায় মার্কিন প্রতিষ্ঠান অক্সিডেন্টালের অধীনে গ্যাসকূপ খননের সময় যে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে তার ক্ষয়ক্ষতি এখন কাটিয়ে উঠতে পারা যায়নি। স্থানীয়ভাবে প্রতিবাদের সম্মুখীন হতে না হতেই পরে অক্সিডেন্টালের কাছ থেকে দায়িত্ব নেওয়া মার্কিন প্রতিষ্ঠান ইউনিকলের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে পাওয়া শেভরন সুকৌশলে সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে জনমত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

মৌলভীবাজারের বিভিন্ন স্থানে ছয়টি কূপ খনন শেষে ইতোমধ্যে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে কমলগঞ্জের নূরজাহান ও ফুলবাড়ি চা বাগান এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলার জাগছড়া চা বাগানে মার্কিন প্রতিষ্ঠান শেভরন বাংলাদেশ লি. ৭ ও ৮নং কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন করেছে। এ দু’টি কূপ খননের জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে শেভরন ২০ বছরের জন্য লিজ নিয়েছে। এই কূপ খননে চা বাগানের ভেতরে গ্যাস ফিল্ড ও রাস্তা নির্মাণে হাজার হাজার সবুজ বেষ্টনির চা গাছ, শত শত ছায়াবৃক্ষ ও পাহাড়ি টিলা কাটা হয়। তবে চা গাছ ও ছায়াবৃক্ষের বিপরীতে শেভরন ক্ষতিপূরণ দিলেও তা প্রকাশ করেনি আজও।

মাগুরছড়ায় গ্যাসকূপে বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত বিস্তীর্ণ বনভূমি

শেভরনের কূপ খননে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল ও মাগুরছড়ার মতো দুর্ঘটনার আশঙ্কায় স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশবাদিরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। ২০০৮ সালে বনাঞ্চল, মাগুরছড়া ও লাউয়াছড়ার বুকচিরে শেভরন ত্রিমাত্রিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ কাজ সম্পন্নকালে বিভিন্ন এলাকার বাড়ি-ঘর, মসজিদের ক্ষয়ক্ষতি হয়। সেই ক্ষতি এখনও শেভরন পুরোপুরি পরিশোধ করেনি।

গ্যাসকুপ বিস্ফোরণের পরপরই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহফুজুল ইসলামকে প্রধান করে ওই সময়ে এক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটি এক মাস অনুসন্ধান চালিয়ে ১৯৯৭ সালের ৩০ জুলাই মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব বর্তমান সরকারের বিদ্যুৎ ও  জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই এলাহী চৌধুরীর কাছে প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন প্রতিষ্ঠান অক্সিডেন্টালের খামখেয়ালীর কারণেই বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে চা-বাগান, বনাঞ্চল, বিদ্যুৎ লাইন, রেলপথ, গ্যাস পাইপ লাইন, গ্যাসকুপ, মৌলভীবাজার স্ট্রাকচার, গ্যাস রিজার্ভ, পরিবেশ প্রতিবেশ, ভূমিস্থ পানিসম্পদ, রাস্তাঘাট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী বনাঞ্চলের ৬৫.৫ হেক্টর এলাকার ২৫ হাজার ৬৫০টি পুর্ণবয়স্ক বিরল প্রজাতির অসংখ্য বৃক্ষ আগুনে পুড়ে যায়। সব মিলিয়ে মাগুরছড়ার মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। ওই সময়ে বিশাল এ ক্ষতির বিষয়টি সরজমিনে প্রত্যক্ষ করতে তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও মাগুরছড়া এলাকা পরিদর্শন করেছিলেন।

অক্সিডেন্টাল প্রতিষ্ঠান ১৯৯৯ সালের আগস্ট মাসে তাদের শেয়ার ইউনিকল নামে অপর এক মার্কিন প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করে দেওয়ার পর ক্ষতি পূরণের বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সাথে বৈঠক হয়েছে। কিন্তু এর সঠিক কোনও সুরাহা হয়নি। আজ অব্দি তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী গ্যাস সম্পদ, বন ও পরিবেশের হাজার হাজার কোটি টাকার  ক্ষতিপূরণ আদায় হয়নি।

তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর  পরিবেশগত ক্ষতিপূরণের জন্য ১৯৯৭ সালের আগস্ট মাসে উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন করেছিল বেলা (বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি)।  সেটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়াও ক্ষতিপুরনের বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য অধ্যাপক এম শামসুল আলম ২০০৩ সালে উচ্চ আদালতে আরেকটি রিট আবেদন (নং২৪৬১) দাখিল করেন।  সেটিও বিচারাধীন রয়েছে।

সেদিনকার আগুনে পোড়া সেই স্থানে আজ নতুন করে জেগেছে সবুজ। এ সবুজের সমারোহের মধ্যেই বিস্ফোরিত মূল কূপ স্থলটি এখনও পুকুরের রূপ ধারণ করে টিকে আছে। ওই এলাকটির চর্তুদিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনি তৈরি করা হয়েছে। টিলার ওপর সবুজ বনায়নের মধ্যে মধ্যে আগুনের পোড়া মাথা, ভাঙা, ডাল-পালাবিহীন কালো রঙের গাছগুলো এখনও সেদিনের দুর্ঘটনার নিরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রতিবছর ১৪ জুন দিনটি ফিরে এলে বিষয়টি নিয়ে মিডিয়ায় তোলপাড় হয় ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্রের এতে বিপুল পরিমাণের সম্পদ  ক্ষতিপূরণ আদায়ে তোড়জোড় সরকারিভাবে লক্ষ্য করা যায় না। ১৯৯৭ থেকে ২০১১ সালে বিগত দলীয় সরকারসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসেও মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ, পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংসের কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মার্কিন প্রতিষ্ঠান অক্সিডেন্টাল-ইউনোকল- শেভরনের কাছ থেকে আদায় করতে পারেনি।

ক্ষয়ক্ষতি আদায়ে জাতীয় ও স্থানীয় ভাবে বেশকয়েকটি সংগঠন প্রতিবছরের এদিনে মানববন্ধনসহ সভা-সেমিনার আয়োজন করে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকে। কিন্তু দুভার্গ্যজনক ভাবে মাগুরছড়া গ্যাসকূপের অগ্নিকাণ্ডের সরকারি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আজও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।

২০১০ সালের ২৪ মে অনুষ্ঠিত সরকারি হিসাব সম্পকির্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় কমিটির সভাপতি মহীউদ্দীন খান আলমগীর মাগুরছড়ার ক্ষতিপূরণ আদায়ের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু এরপর থেকে কোনও অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। এদিকে আবারো বিগত ২০০৮ সালে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মাগুরছড়া ও লাউয়াছড়ার বুক চিরে মার্কিন তেলগ্যাস উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান শেভরন ত্রিমাত্রিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ কাজ সম্পন্ন করেছে।

লাউয়াছড়ায় শেভরনের জরিপ কাজ চালানোর সময় বনাঞ্চলে জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতির কারণ বলে পরিবেশবিদরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। সে সময়ে ভূতাত্ত্বিক জরিপে স্থানীয়ভাবে অনেকের বাড়ির দেয়াল ও মসজিদে ফাটল দেখা দেয় এবং পানির নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হলে এলাকাবাসী প্রতিবাদ মূখর ওঠেন। এরপর কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল উপজেলার ক্ষয়ক্ষতির শিকার লোকজন শেভরনের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি জানালে  অল্পসংখ্যক লোক ক্ষয়ক্ষতি পান।

দূর্ঘটনার প্রায় ১৯ বছর অতিক্রান্ত হলেও গ্যাস ক্ষেত্রের মালিকানা অক্সিডেন্টাল থেকে ইউনোকল তারপর দায়িত্ব পেয়েছে তাদেরই স্বদেশি কোম্পনী শেভরন। এই দীর্ঘ ১৯ বছরে এখন পর্যন্ত পরিপূর্ণ ক্ষতি পূরণ পায়নি সিলেট-আখাউড়া রেল সেকশন, ক্ষতিগ্রস্ত বন , পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।

বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী প্রত্যক্ষ ক্ষতি ৩২ দশমিক ৫৩ কোটি এবং অন্যান্য ক্ষতি মিলিয়ে মোট ১৭৬ দশমিক ৯৭ কোটি টাকা। এই সময়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয় পুরো হিসাব মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৬০৯ কোটি টাকা নিরূপণ করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান অক্সিডেন্টালের কাছে দাবি জানায়। দুর্ঘটনার সময়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের খনিজ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহফুজুল ইসলামকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

তদন্ত কমিটি ১৯৯৭ সালের ৩০ জুলাই মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পেশ করে। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী অক্সিডেন্টালের দায়িত্বহীনতাকেই দায়ী করা হয়। ১৯৯৯ সালের আগস্ট মাসে প্রতিষ্ঠান অক্সিডেন্টাল মাগুরছড়া গ্যাসকূপসহ তাদের ব্যবসাসংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় অপর মার্কিন প্রতিষ্ঠান ইউনিকলের কাছে হস্তান্তর করে। ইউনিকল দায়িত্ব নেয়ার পর ক্ষতিপূরণ বিষয়ে টালবাহানা শুরু করেন।

কিন্তু গ্যাস উত্তোলনে ইউনিকল মাগুরছড়া পরিত্যক্ত কূপ এলাকার প্রায় ৩শ’ গজ পশ্চিমে নতুন করে একটি ও জেরিন চা বাগানের অভ্যন্তরে আরেকটি কূপ খনন শেষে গ্যাস উত্তোলন শুরু করে পাইপ লাইনের মাধ্যমে শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালাপুর গ্যাস প্লান্টের সঙ্গে সংযুক্ত করে জাতীয় গ্যাস গ্রিড লাইনে অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করছে।

শেভরন সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালের ত্রি-মাত্রিক ভূ-ত্বাত্তিক জরিপ অনুয়ায়ী কমলগঞ্জের পাত্রখোলা চা বাগান থেকে দেওড়াছড়া চা বাগান এলাকা পর্যন্ত ৯৫ শতাংশ, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এলাকায় ৫ শতাংশ এলাকায় গ্যাস রয়েছে।

জানা যায়,বর্তমানে মৌলভীবাজারের গ্যাস ফিল্ডের চারটি কুপ থেকে প্রতিদিন ৬০ মিলিয়ন ঘন ফুট গ্যাস হবিগঞ্জের রশিদপুরের জাতীয় গ্রীডে সরবরাহ করা হচ্ছে। কমলগঞ্জের নুরজাহান ও জাগছড়া গ্যাসকূপের ড্রিলিং শেষে  গ্যাস উত্তোলন শুরু হলে শেভরন এ দুটি কূপ থেকে আরও ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রীডে সরবরাহ করেছে।

ফলে জাতীয় গ্রীডে মৌলভীবাজারের কালাপুর গ্যাস প্লান্টে দৈনিক সরবরাহ হচ্ছে ১৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। মাগুরছড়া তেল গ্যাস আদায় জাতীয় কমিটির সধারন সম্পাদক সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন ক্ষতিপুরনের বিষয়টি নিষ্পত্তির ব্যাপারে বর্তমানে অক্সিডেন্টাল-ইউনিকলের উত্তরসুরী শেভরন ও সরকারের  কোনও উদ্যোগ বা আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। চূড়ান্তভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হলে আমাদেরকে আন্তর্জাতিক কোর্টে যেতে হবে।
-বাংলা ট্রিবিউন

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ