ঢাকা, শনিবার 02 July 2016 ১৮ আষাঢ় ১৪২৩, ২৬ রমযান ১৪৩৭ হিজরী
Online Edition

দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট : কুরআন শিক্ষার মশহুর মারকায

আখতার হোসাইন জাহেদ : পৃথিবীর সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থ পবিত্র আল কুরআনুল করীম। পৃথিবীতে এ কিতাবখানা যতবেশী পড়া হয় অন্য কোনও কিতাব ততবেশী পড়া হয়না। কারণ এর তেলাওয়াতে রয়েছে প্রতি হরফের বদলে দশ সাওয়াব। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পাঠ করে, তাকে একটি সাওয়াব প্রদান করা হয়। প্রতিটি সাওয়াব দশটি সাওয়াবের সমান। আমি বলি না যে, আলিফ-লাম-মীম একটি হরফ। বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ’। [সুনান আত-তিরমিযি] কিন্তু এ তেলাওয়াত হতে হবে সহিহ শুদ্ধ। তেলাওয়াত সহিহ না হলে সাওয়াবের পরিবর্তে গুনাহের আশংকাও রয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ আসমানী কিতাবখানা সহিহ ও তারতিলের সাথে পড়ার জন্য তার বান্দাদের প্রতি নির্দেশও দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন “তোমরা কোরআনকে তারতিলের সাথে তেলাওয়াত কর।” এ নির্দেশনায় আমল করে শামছুল উলামা হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) প্রথমে তিনি নিজে মশহুর তিন সিলসিলায় কুরআনুল কারিমের সহিহ তেলাওয়াত শিখে কুরআন পিপাসু মানুষদের শিখাতে নিজেকে ব্রতী করেছিলেন। এক পর্যায়ে তার শেখানোর পরিধি বেড়ে গেলে ১৯৪০ সালে তিনি দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট নামে কুরআন শিক্ষার একটি স্বতন্ত্র বোর্ড গঠন করেন। বর্তমানে এ বোর্ড বাংলাদেশসহ বহির্বিশ্বে কুরআন শিক্ষার এক পথিকৃত হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
আল্লামা ফুলতলী (র.) এর ইলমে কিরাত শিক্ষার ইতিহাস জানা যায় এভাবে। ভারত বিভক্তির পূর্বে তিনি ভারতের বদরপুর আলিয়া মাদরাসার অধ্যাপনায় নিয়োজিত থাকাকালীন সময়ে সর্বপ্রথম কুরআনুল কারীমের শুদ্ধ তেলাওয়াত শিক্ষাগ্রহণ করেন তাঁর সুযোগ্য উস্তাদ ও মুরশিদ হযরত আল্লামা শাহ্ ইয়াকুব বদরপুরী (র.) এর কাছ থেকে। তখনকার সময়ে ভারত উপমহাদেশের বড়বড় আলেমরাও কুরআনের সহিহ তেলাওয়াত জানতেননা।
হযরত বদরপুরী (রহ.) এর কাছে পুরো কুরআন শরীফ শুনানোর পর তারই নির্দেশে তিনি ইলমে কিরাতের আরো উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেন তখনকার উপমহাদেশের প্রখ্যাত ক্বারী আল্লামা আব্দুর রউফ করমপুরী শাহবাজপুরী (র.) এর কাছে।
এরপর ১৩৫১ বাংলা সনে তিনি মক্কা শরীফ গমন করে শায়খুল কুররা হযরত আহমদ হেজাজী মক্কী (র.) এর কাছ থেকে ইলমে কিরাতের সনদ লাভ করে ভারতীয় উপমহাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ ক্বারী হিসেবে সুখ্যাতি লাভ করেন। উল্লেখ্য, ফুলতলী সাহেবের ওপরোল্লিখিত তিনজন উস্তাদের ইলমে কিরাতের সনদ মশহুর সনদে সরাসরি আল্লাহর রাসূল (সা.) পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে। ফুলতলী (র.) মক্কা শরীফ হতে দেশে ফিরে পুনরায় যথারীতি ভারতের বদরপুর আলিয়া মাদরসায় অধ্যাপনা শুরু করেন। একদিন তিনি ক্লাসে ছাত্রদের হাদিসের র্দস দেয়ার সময় তদানীন্তন কালের প্রখ্যাত ওলিয়ে কামিল ও বিশিষ্ট আলেম আল্লামা আব্দুন নূর গড়কাপনি (রহ.) তথায় এসে সপ্তাহে একদিন কিরাত শিক্ষার ক্লাস নেয়ার জন্য তাকে অনুরোধ জানান। ফুলতলী (রহ.) তিনি এতবড় একজন বুযুর্গ ও আলেমকে কিভাবে পড়াবেন এ ভেবে এবং সময়ের অভাব ইত্যাদি অপারগতা বিনীতভাবে তাকে জানালেও তিনি পরদিন আবার এসে একই অনুরোধ জানান। ছাহেব কিবলা (রহ.)’র বারবার না পারার অনুরোধের প্রত্যুত্তরে গড়কাপনি (রহ.) বলেন- আমি বড় জায়গার ইশারা পেয়ে আপনার কাছে এসেছি। ফুলতলী ছাহেব তার ও মুরশিদ বদরপূরী রহ. এর ইশারা নাকি জানতে চাইলে তিনি বললেন, “আমি স্বপনে হুজুরে পাক (সা.) এর দিদার লাভ করি। তখন নবীজির কণ্ঠে কুরআন পাকের তেলাওয়াত শুনতে পাই। আরজ করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই কিরাত কিভাবে শিখবো? তখন নবী পাক (সা.) ডান দিকে যাকে দেখিয়ে ইশারা করলেন, চেয়ে দেখি সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি আপনি।” এ কথা শুনার সঙ্গে সঙ্গে (রহ.) কেঁদে ফেললেন। তাঁকে জড়িয়ে ধরে বললেন আমি সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার ১২টার পর নিকটবর্তী হযরত আদমখাকি (রহ.) এর মাজার সংলগ্ন মসজিদে কিরাত মশক্ব দেওয়ার ওয়াদা দিলাম। এরপর থেকে ভারত বিভক্তির পরে তিনি জকিগঞ্জের বারগাত্তায় অনুরুপভাবে গাছবাড়ী আলীয়া মাদরাসা ও সৎপুর আলীয়া মাদরাসায় সপ্তাহে একদিন কিরাতের শিক্ষা প্রদান করতেন। এমনিভাবে প্রাথমিক অবস্থায় তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে হেঁটে, ঘোড়ায় চড়ে স্বেচ্ছায়, বিনা পারিশ্র্রমিকে কিরাতের প্রশিক্ষণ প্রদান করতেন। যখনই যে অঞ্চলে যেতেন স্থানীয় ওলামায়ে কেরামসহ অসংখ্য মানুষ ক্বিরাত শিক্ষার জন্য জমায়েত হয়ে যেতেন। ফুলতলী ধৈর্য্য সহকারে তাদের ক্বেরাত মশক দিতেন।
এরপর ১৯৫০ ইংরেজি সনে আল্লামা ফুলতলী (র.) প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে নিজ বাড়িতে ইলমে কিরাতের দারস চালু করেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ও শিক্ষকদের সুবিধার্থে ছুটির অবসরকালীন ও কুরআন নাযিলের মাস পবিত্র রামাদানকে কিরাত শিক্ষার জন্য বেছে নেন। ক্রমান্বয়ে এর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। বিশাল খিদমত পরিচালনার জন্য একটি ট্রাস্ট গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে ট্রাস্ট গঠন করে তাঁর ভূ-সম্পত্তির বিশাল অংশ থেকে প্রায় ৩৩ একর জমি ট্রাস্টের নামে ওয়াকফ করে দিয়ে আল-কুরআনের খিদমতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
তার ওয়ালিদ মুহতারাম হযরত মাওলানা আব্দুল মজিদ চৌধুরীর নামানুসারে এ প্রতিষ্ঠানের নাম রাখা হয় ‘দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট’। বর্তমানে (২০১৫ সালের হিসেবে) এ বোর্ডের অধীনে বাংলাদেশে- ১৬৭০টি, যা রাজধানী ঢাকার দারুন্নাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদরাসা, খিলগাওস্থ লতিফিয়া হিফযুল কুরআন মাদরাসা, ডেমরা, উত্তরা উত্তরখান হাফিজিয়া মাদরাসা ইত্যাদি, সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) এর দরগাহ মসজিদ, সুবহানীঘাটস্থ হযরত শাহজালাল দারুচ্ছুন্নাহ ইয়াকুবিয়া কামিল মাদরাসা ইত্যাদি, ফেনীর ছাগলনাইয়া ইসলামিয়া ফাযিল মাদরাসা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লার বুড়িচং দরবার, সোনাকান্দা দরবার, বরিশাল, টাঙ্গাইল, রংপুর, চাঁদপুর, কুয়াকাটা, কক্সবাজার, মাদারীপুর, শেরপুর, বগুড়া, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, ব্রাক্ষণবাড়িয়াসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। লন্ডনে-৪২টি, যা দারুল হাদিস লতিফিয়াসহ প্রায় প্রতিটি স্টেটে রয়েছে। ভারতে- ৩৮টি,যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আসামের উজানডিহি ছহেব বাড়ি।
আমেরিকায়- ৪টি, ইতালি- ১টি ও স্পেনে- ১টি অনুমোদিত শাখাসহ অসংখ্য শাখা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে রয়েছে এবং প্রতিবছর এর সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। জামাতে সূরা থেকে খামিছ পর্যন্ত ৬টি জামাতে এ সমস্ত শাখায় মাদ্রাসাসহ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থীরা বিশুদ্ধ কুরআন শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে।
২০১৫ সালে যার সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ লক্ষাধিক। ২০১৬ সালে তা বেড়ে প্রায় ৪ লক্ষাধিকে দাঁড়িয়েছে। ট্রাস্টের অধীনে বিভিন্ন স্থানে শাখা পরিচালিত হলেও সর্বশেষ তথা ফাইনাল জামাত ‘ছাদিছ’ বাংলাদেশের সিলেটের ফুলতলী ছাহেব বাড়িতে পরিচালিত হয়। প্রতি বছর এ জামাতে প্রায় ৫-৬ হাজারের মত ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে তিন হাজারের অধিক ছাত্রদের থাকা-খাওয়ার ব্যয়ভার সম্পূর্ণভাবে বহন করে এ ট্রাস্ট। মূলত শামসুল উলামা আল্লামা ফুলতলী (রহ.) তার বিশুদ্ধ কুরআনের সূরের মূর্ছনায় গোটা সমাজব্যবস্থাকে আলোড়িত করতে পেরেছিলেন। তার এই অনন্য খেদমতের ধারা অব্যাহত রাখতে পারলেই গোটা সমাজব্যবস্থা আল-কুরআনের আলোয় আলেকিত হয়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ।
লেখক : আখতার হোসাইন জাহেদ
সুপার, আলহাজ্ব অছিয়ত আলী করিমুন্নেছা হাফিজিয়া দাখিল মাদরাসা, টিলাগড়, সিলেট।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ