ঢাকা,বৃহস্পতিবার 15 November 2018, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সন্ত্রাসের পথ ইসলামের পথ নয়

মুহাম্মদ আবুল হুসাইন: ইসলামের যাবতীয় ব্যাপারে চূড়ান্ত মাপকাঠি হচ্ছেন আল্লাহ। অর্থাৎ তাঁর কালাম আল কোরআন। আর আল্লাহ’র কালাম আল কোরআনকে মানার ক্ষেত্রে যথার্থ মডেল বা আদর্শ হচ্ছেন আল্লাহ’র রাসূল। আল্লাহ’র হুকুম ও রাসূলের আদর্শই হচ্ছে দ্বীনের যথার্থ ভিত্তি এবং ইসলামী আদর্শের চিরন্তন উৎস। আল্লাহ’র আইন বা ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ করতে হলেও তা কেবল আল্লাহ’র কালামের দিক-নির্দেশনা ও রাসূলের দেখানো পথেই করা যেতে পারে। ইসলামের নামে নিজেদের খাম-খেয়ালীপনা কিংবা ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ-বিরোধী পন্থায় ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না এবং তা কখনো গ্রহণযোগ্যও নয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন অত্যন্ত সুষ্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন :‘হে নবী, লোকদের বলে দাও, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও তবে আমার অনুসরণ কর। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ মাফ করে দিবেন। তিনি বড়ই মাশীল ও অসীম দয়াবান। তাদের বল আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কবুল কর। এরপর তারা যদি তোমাদের দাওয়াত কবুল না করে, তাহলে সে লোকদেরকে - যারা তাঁর ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করতে অস্বীকার করে, তাদেরকে আল্লাহ কিছুতেই ভালোবাসতে পারেন না।’-[আলে ইমরান : ৩১-৩২] ; ‘নিঃসন্দেহে রাসূলের জীবনে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। অবশ্য তাদের জন্য, যারা আল্লাহর সাথে সাাৎ ও পরকালীন মুক্তির ব্যাপারে আশাবাদী এবং যারা আল্লাহকে বহুল পরিমাণে স্মরণ করে।’ -[আহযাব : ২১]

রাসূলের জীবনাদর্শের দিকে তাকালে আমরা দেখব, তিনি ইসলাম কায়েমের জন্য কোন নেতিবাচক পথ কিংবা চরমপন্থাকে গ্রহণ করেননি। বরং তাঁর পথ ছিল দাওয়াতের পথ। অর্থাৎ ইতিবাচক পন্থায় ইসলামের শিাকে তিনি মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলেন। আল্লাহর বিধান অনুসরণের গুরুত্ব ও সুফল তিনি মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলেন এবং পাশাপাশি ঐশী হেদায়াত প্রত্যাখ্যানের পরিণাম সম্পর্কেও তিনি মানুষকে সতর্ক করে দিতেন। কিন্তু সত্যের আদর্শ ইসলামকে গ্রহণ করার জন্য তিনি কখনো মানুষকে বাধ্য করেননি। জোর করে আল্লাহ’র বিধান মানব সমাজে চাপিয়ে দেননি কিংবা চরমপন্থায় ইসলামী শাসন কায়েম করেননি। এটা আল্লাহ’রই নির্দেশ ছিল যে, তিনি তাঁর নবীকে ‘দারোগা’ করে পাঠাননি। কারণ আল্লাহ’র নেয়ামত অপাত্রে দেয়ার মত বিষয় ছিল না। যে জাতি আল্লাহ’র হেদায়াত গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়, আল্লাহ জোর করে তাদের উপর তা চাপিয়ে দিতে চান না। অবশ্য যারা আল্লাহ’র কালামকে গ্রহণ করতে আগ্রহী হয় তাদেরকেই তিনি এ নেয়ামতের সুফল ভোগ করার সুযোগ প্রদান করেন। এ কারণে ইসলামী সমাজ কায়েমের ক্ষেত্রে জনমতটি ছিল সব সময়ই প্রধান বিবেচ্য বিষয়। গণমত ইসলামের অনুকূল হলেই কেবল ইসলাম কায়েম সম্ভব হয়েছে, আর যেখানে জনমত ইসলামের প্রতিকূলে ছিল, সেখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

আমরা জানি, মহানবীর জীবনকালের ছিল দুটি প্রধান অধ্যায়। এর একটি হল মাক্কী যুগ, অন্যটি মাদানী যুগ। আমরা দেখেছি মাক্কী যুগে আল্লাহর রাসূল দীর্ঘ তেরটি বছর মক্কাবাসীকে দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন। কিন্তু মক্কার অধিকাংশ লোক ছিল রাসূলের দাওয়াতের ঘোর বিরোধী। তারা ইসলামের সুমহান আদর্শকে গ্রহণ করেনি। আলাহর কর্তৃত্ব ও রাসূলের নেতৃত্ব গ্রহণ করার জন্য তারা মোটেই প্রস্তুত ছিল না। তারা আল্লাহর রাসূলের দাওয়াতকে ব্যাহত করার জন্য নানা ভাবে চক্রান্ত করেছে, শক্তি প্রয়োগ করেছে, নির্যাতন করেছে, রক্ত ঝরিয়েছে এমনকি শেষ পর্যন্ত তারা মহানবীকে হত্যা করারও চেষ্টা করেছে। যার কারণে আল্লাহর রাসূল ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের হিযরত করতে হয়েছে এবং মক্কায় ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে মদীনার লোকেরা ইসলামের আহবানে ব্যাপকভাবে সাড়া দিয়েছিল। তারা মহানবীকে মদীনায় আমন্ত্রণ জানায় এবং সাদরে বরণ করে নেয়। তাঁরা শুধু যে মহানবীর নেতৃত্বকে গ্রহণ করে তাঁর আনুগত্য করার শপথ (বায়াত) করেছিলেন তাই নয়, ঘোষণা করেছিলেন, ‘হে রাসূল আপনি যদি আমাদেরকে আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে নির্দেশ দেন, তাহলে আমরা তাই করব।’-[আসহাবে রাসূলের জীবনকথাÑমুহাম্মদঅ আব্দুল মা’বুদ] যার কারণে মদীনায় গড়ে উঠেছিল ইসলামী সমাজ এবং কালক্রমে তা পরিণত হয় বিশাল ইসলামী খেলাফতের মূল কেন্দ্রে।

মূলত ইসলামী সমাজ-বিপ্লবের ক্ষেত্রে জনমত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জনমতকে উপেক্ষা করে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার কোন সুযোগ নেই। মক্কায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য অনুকূল জনমত ছিল না বলেই সেখানে তখন ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি এবং মদীনার জনমত ইসলামের পে অনুকুল ছিল বলেই সেখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিল Ñ এ ইতিহাস তো অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু মক্কার লোকেরা মহানবীর দাওয়াতের বিরোধী ছিল -এ অজুহাতে তো তিনি কখনো তাদের বিরুদ্ধে চরমপন্থা, উগ্রবাদ বা সন্ত্রাসবাদী কর্মকা- পরিচালনা করেছিলেন বলে ইতিহাসে কোন প্রমাণ নেই। বরং আমরা দেখেছি, তায়েফের লোকেরা আলাহর রাসূলের দাওয়াতকে প্রত্যাক্ষাণ করে তাঁকে চরমভাবে অপমাণ ও শারীরিক নির্যাতন করে তাড়িয়ে দিয়েছিল, তাঁর সারা শরীর যখন রক্তরঞ্জিত হয়েছিল এবং রাস্তার উপর যখন তিনি বেহুশ হয়ে পড়েছিলেন তখনও তিনি তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়াটুকু পর্যন্ত করেননি। এমনকি, রাসূলের প্রতি এই অত্যাচার দেখে তাঁর সাথীরা ঐ বর্বর, ইতর লোকদের অভিশাপ দেয়ার জন্য রাসূলকে অনুরোধ জানালে তিনি যে জ্যোতির্ময় মন্তব্য করেছিলেন তা আজও বিবেকবান মানুষকে অভিভুত করে। আল্লাহ’র রাসূল দুশমনদের প্রতি অভিশাপ দেয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বললেন, ‘আমাকে অভিশাপ দেয়ার জন্য পাঠানো হয়নি।’ শুধু তাই নয়, পরম মমতায় তাদের হেদায়েতের জন্য তিনি আলাহর দরবারে দু হাত তুলে দোয়া করেছেন, তাদের কল্যাণ কামনা করেছেন। সুবহানালাহ! এই তো ইসলাম। অথচ এই ইসলামই আজ দাঁড়িয়ে আছে সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ আর চরমপন্থার অপবাদ, অপমান মাথায় নিয়ে বিশ্ব সভ্যতার কাঠগড়ায়! আমাদের চৈতন্যহীনতা ও অজ্ঞানতা যে আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তা ভাবতেও গা শিউড়ে ওঠে।

আসলে ইসলাম তো শান্তির ধর্ম। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যই ইসলামের আগমন এবং মহানবীর মিশনের চূড়ান্ত লক্ষও ছিল এটি - সারা বিশ্বের মানব সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা বা মানবতার কল্যাণ। তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বজাহানের জন্য আল্লাহ’র রহমত। আল কোরআনে বলা হয়েছে : ‘আমরা তোমাকে বিশ্ববাসীর জন্য আমার রহমত স্বরূপ পাঠিয়েছি।”Ñ[আল আম্বিয়া : ১০৭] । ইসলাম তো এসেছে পৃথিবীতে একটি স্বর্গীয় পরিবেশ তৈরি করার জন্য। আল্লাহ’র নবী যে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সে সমাজ তো ছিল সাম্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের সমাজ, সে সমাজ ছিল হক ও ইনসাফ-ভিত্তিক সমাজ। মানুষের মধ্যে প্রেম, ভালোবাসা, সৌজন্যবোধ ও স্বর্গীয় বোধগুলোকে জীবন্ত করে তোলাই ছিল তাঁর জীবনাদর্শ। মানবীয় মাহাত্ম ও নৈতিক চরিত্রের পূর্ণ বিকাশ সাধনের জন্যই তো তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন। তিনি তো এসেছিলেন মানুষকে ইনসানে কামেলে পরিণত করার জন্য। আর মানুষের প্রতি দয়া-মায়া ও মানুষের কল্যাণ কামনা তো একজন মহৎ মানুষের প্রধান গুণ। সুশীল ও শান্তিপূর্ণ সমাজ তো কেবল মানুষের বিবেকবোধের লালনের মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে। কেননা, ভালোবাসাই ভালোবাসার জন্ম দেয়, আর হিংসা কেবল হিংসারই জন্ম দিয়ে থাকে। পৈশাচিকতার মাধ্যমে মানবতার ও সত্যের আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না, বরং এর মাধ্যমে সত্যের শুভ্র সফেদ মুখকে কলংকিত করা হয়। আর এ কারণেই তো মহানবী (সঃ) ও তাঁর সাহাবীদের (সাথীদের) প্রতি মহান রাব্বুল আ’লামীনের নির্দেশ ছিল সত্যের সাক্ষী হওয়ার, আদর্শেরমডেল হওয়ার; যার আলোচনা আমরা আগেও করেছি। আল্লাহ বলেছেন : ‘আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতি বানিয়েছি, যেন তোমরা মানুষের জন্য সাী হও আর রাসূলও যেন তোমাদের জন্য সাী হয়।’ আর ইতিহাসও সাী দেয়, মহানবী ছিলেন মানব জাতির সামনে আদর্শের মূর্ত প্রতীক। তিনি ছিলেন সত্য ও সুন্দরের জীবন্ত নমুনা। আর মহানবীর পবিত্র পরশে তাঁর মহান সাহাবীগণও হয়ে উঠেছিলেন মানবতার মহান আদর্শ।

তাছাড়া, সমাজ-মানসের ব্যাপক পরিবর্তন ছাড়া সমাজ পরিবর্তন সম্ভব হতে পারে না। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে প্রচলিত ভূল ধারনার অপনোদনই শুধু নয়; নৈতিকতা ও স্বভাব-চরিত্রের পুনর্গঠন ও পরিশোধনও জরুরী। ইসলামী সমাজ গঠনের জন্য এমন এক নৈতিক শক্তির প্রয়োজন Ñ যে নৈতিকতার বলে ব্যক্তি ও সমাজ-সংগঠনকে সম্পূর্ণভাবে আদর্শের আলোকে সজ্জিত ও বিন্যস্ত করা সম্ভব হবে। যার ফলে সমাজের লোকেরা সব ধরনের লোভ-লালসা ও স্বার্থের হাতছানি উপেক্ষা করে আদর্শের পথে অবিচল ও অনঢ় থাকতে পারবে, নিষ্টার সাথে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে। এভাবে নৈতিক বিপ্লব করা গেলে সমাজ সংস্কার ও পুনর্গঠনের প্রয়োজনে লোকেরা অপরিসীম ত্যাগ ও কোরবানী প্রদান করতেও সব সময় প্রস্তুত থাকবে। শুধু তাই নয়, ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রকে রক্ষা করার জন্যও তখন জনগণ আল্লাহ’র পথে জিহাদ ও শাহাদাতের প্রেরণা নিয়েই এগিয়ে আসবে। এ কারণেই সমাজ পরিবর্তন; ইসলামী সমাজ প্রবর্তন তথা গণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য সবার আগে নৈতিক বিপ্লবের গুরুত্ব অপরিসীম। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেনÑ ‘আল্লাহ ততণ পর্যন্ত কোন  জাতির ভাগ্যের (অবস্থার) পরিবর্তন করেন না যতণ না সে জাতির লোকেরা নিজেদের অবস্থার (গুণাবলী) পরিবর্তনে উদ্যোগী না হয়।’- [আর রা’দ : ১১]।

এ কারণে আমরা দেখি, শুধু দাওয়াত প্রদানই নয়, আত্মগঠন ও সমাজ-সংস্কারও ছিল মহানবীর জীবনের অন্যতম প্রধান মিশন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন : ‘যেমন আমি তোমাদের প্রতি তোমাদেরই মধ্য হতে একজন রাসূল পাঠিয়েছি, যে তোমাদেরকে আমার আয়াত পড়ে শোনায়, তোমাদের জীবনকে পরিশুদ্ধ ও উৎকর্ষিত করে, তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেয় এবং যেসব কথা তোমাদের অজ্ঞাত তা তোমাদের জানিয়ে দেয়।’ -[বাকারা : ১৫১]; ‘তিনি সেই সত্তা যিনি নিররদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন। যিনি তাদেরকে তাঁর আয়াতসমূহ পড়ে শোনান, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেন। অথচ এর আগে তারা সুস্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত ছিল।’ -[জুমুয়া : ২]; মহানবী নিজেও পবিত্র কালামের আলোকে তাঁর জীবন মিশন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন : ‘নৈতিক চরিত্রের পূর্ণতা বিধানের জন্যই আমি আবির্ভূত হয়েছি।’

কিন্ত সমাজ মানসের ব্যাপক পরিবর্তনের কোন উদ্যোগ গ্রহণ না করে, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং নেতৃত্বের পরিবর্তন না করে বিক্ষিপ্ত ভাবে নিজেদের হাতে আইন তুলে নেয়ার চেষ্টা করা, কিংবা জোর করে আল্লাহ’র বিধান মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা, বিচারক হত্যা করা, চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন পরিচালনা কোন গ্রহণযোগ্য পথ নয় এবং ইসলামের শিক্ষাও এটি নয়। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) কখনো এ ধরনের পন্থা অবলম্বন করেননি।

জোর করে, নেতিবাচক পন্থায়, নৈরাজ্য ও ধ্বংসাত্মক পন্থায় মানুষের মনের পরিবর্তন করা যায় না। মানুষের মনের স্বাধীনতা আল্লাহই প্রদান করেছেন। কারণ আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন মানুষকে দিয়েছেন তাঁর খেলাফতের মর্যাদা বা প্রতিনিধিত্বের মর্যাদা। এ মর্যাদার কারণেই আল্লাহ মানুষকে ইচ্ছার স্বাধীনতা দিয়েছেন। মানুষ ছাড়া আর কোন সৃষ্টিকে বিশ্ব বিধাতা এ স্বাধীনতা দেননি। ব্যক্তি-স্বাধীনতার এ মর্যাদার কারণেই মানুষ ফেরেশতার চেয়েও শ্রেষ্ঠ। এই ইচ্ছার স্বাধীনতা বা ব্যক্তি-স্বাধীনতা সত্ত্বেও মানুষ বিশ্ব বিধাতার আনুগত্য করে কিনা এটিই তিনি দেখতে চান। আল্লাহ চান কারো চাপে পড়ে নয়, মানুষ যেন তাঁর দিকে অগ্রসর হয় শুধু মাত্র তাঁকে ভালোবেসেই। অন্তর থেকে আল্লাহর প্রতি যথার্থ প্রেম, ভালোবাসা ও আন্তরিকতার পরিবর্তে পার্থিব কোন লোভ বা স্বার্থ হাসিলের ল্েয আল্লাহর ইবাদত কিংবা হুকুম মেনে চললে সে ইবাদত গ্রহণ যোগ্য হবে না বলে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। এ কারণেই আল্লাহ নিজে যেমন মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতার উপর হস্তপে করা পছন্দ করেননি, তেমনি অন্য কেউ মানুষের এই অধিকারের উপর হস্তপে করুক তাও তিনি পছন্দ করেননি। এমনকি স্বয়ং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে পর্যন্ত আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। কোরআন শরীফে আল্লাহ বলেছেন : ‘এবং যদি তোমার প্রভু ইচ্ছা করতেন তাহলে প্রথিবীর বুকে বসবাস কারী সকল মানুষকেই একসাথে বিশ্বাসী বানিয়ে ফেলতে পারতেন। সুতরাং (হে মুহাম্মাদ!) তুমি কি তাহলে বিশ্বাস স্থাপনের জন্য লোকদেরকে জবরদস্তি করতে চাও?’-[সূরা ইউনুস, আয়াত-৯৯]|মাক্কীযুগে আল্লাহ’র রাসূল যখন ইসলামের দিকে মানুষ আহবান করছিলেন, দাওয়াত দিচ্ছিলেন, তখনই দিক-নির্দেশনা হিসেবে আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলকে এ নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমনকি মাদানী যুগেও, যখন ইসলাম একটি বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যখন মুসলমানরা রাষ্ট্র-ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী হয়েছিল, তখন পবিত্র কালামের নির্দেশ ছিল : ‘দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি নেই। হেদায়েতের পথ থেকে গোমরাহিকে পৃথক করে দেখানো হয়েছে। এখন যে কেউ তাগুতকে (খোদাদ্রোহী-সীমালংঘনকারী শক্তিকে) প্রত্যাখান করে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে সে এমন একটি মজবুত রজ্জু (অবলম্বন) ধারণ করেছে যা কখনো ছিন্ন হবার নয়। আল্লাহ সব কিছু শুনেন ও জানেন।’

এ প্রসঙ্গে কেউ কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, মহানবী ও সাহাবায়ে কেরাম তো যুদ্ধও করেছিলেন। হ্যা, এ কথা ঠিক, আল্লাহ’র রাসূল ও তাঁর সাহাবীরা যুদ্ধও করেছেন, তবে তারা যুদ্ধ করেছেন মাদানী যুগে, একটি ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর, তাকে রা করার প্রয়োজনে; কেননা বিরুদ্ধ শক্তি মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রটিকে ধ্বংস করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল। তাই সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে, ইসলামী রাষ্ট্রকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার প্রয়োজনে আল্লাহ’র রাসূল ও তাঁর মহান সাহাবীগণকে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ-বিগ্রহেরক্ষেত্রেও মহানবী ঐশী আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। মহানবীর যুদ্ধনীতি ছিল Ñ ‘কখনও আক্রমণের আকাক্সা পোষণ ক’রো না, নিরাপত্তার জন্য আল্লাহ’র শরণাপন্ন হও।’

বলাবাহুল্য, মহানবীর যুদ্ধ ছিল একান্তভাবেই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য। প্রতিহিংসা বা পরসম্পদ লুট কিংবা দেশ দখল তাঁর যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল না। পারতপক্ষে তিনি যুদ্ধে জড়াতে চাইতেন না, সন্ধি-সমঝোতাকেই প্রাধান্য দিতেন। আর মহানবীর এ নীতি ছিল মূলত পবিত্র কোরআনের নির্দেশেরই প্রতিফলন। অনর্থক রক্তয়ের উন্মাদনা থেকে বিরত থাকার জন্য আল্লাহই তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেছেন : ‘অতঃপর তারা যদি তোমাদের থেকে পৃথক থাকে, তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই না করে এবং তোমাদের সাথে সন্ধি করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আল্লাহ তোমাদেরকে কোন পথ দেননি।’-[নিসা : ৯০]
মহানবী (সঃ) তাঁর সাহাবীদেরকে বলতেন, ‘শত্রুর শিবির থেকে ধৃত হলেও’ তারা যেন কোন নির্দোষ নারী, শিশু ও অম বৃদ্ধদের হত্যা না করে। এছাড়া তিনি আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা না করার জন্যও কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। ফলন্ত বৃ, সম্পদ বিনষ্ট করাও নিষিদ্ধ করেছেন তিনি। এমনকি প্রাণ বাঁচানোর জন্য যদি কেউ ঈমানের মিথ্যা ঘোষণা দেয়, তবুও তাকে হত্যা না করার নির্দেশ দিয়েছেন রাহমাতুল্লিল আ’লামীন। একবার এক যুদ্ধে প্রতিপরে এক যোদ্ধা কালেমা উচ্চারণ করা সত্ত্বেও জনৈক মুসলিম সৈন্য তাকে হত্যা করে ফেলে। এ কথা রাসূলের কাছে উত্থাপিত হলে আল্লাহ’র রাসূল খুবই মর্মাহত হয়ে সাহাবা সৈনিককে কৈফিয়ত তলব করেন। সাহাবী আরজ করেন, হে আল্লাহ’র াহর রাসূল, সে তো প্রাণ বাঁচানোর জন্য ঈমান এনেছে! তখন আল্লাহ’র রাসূল তাকে বলেন, ‘তুমি কি তার অন্তর চিরে দেখেছিলে?’ আরেক যুদ্ধে কিছু শিশু মুসলমানদের হাতে নিহত হলে আল্লাহ’র রাসূল খুবই পেরেসান হয়ে ওঠেন। রাসূলের পেরেসানি দেখে মুসলিম সৈন্যরা আরজ করল, হে আল্লাহ’র রাসূল, এরা তো মুশরিকদের সন্তান।’ মহানবী এ কথায় অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, ‘এ শিশুরা তোমাদের চেয়েও উত্তম, কেননা, তারা স্বভাবধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত। তোমরা কি মুশরিকদের সন্তান নও? সাবধান, কখনও শিশুদের হত্যা করবে না।’

পবিত্র কোরআনে মানুষকে আল্লাহর বিধানের দিকে মানুষকে ফিরে আসার জন্য যত আহবাই জানানো হয়েছে, তার সবই ছিল ইতিবাচক পন্থায় এবং যুক্তির ভাষায়। গোঁড়ামী, চরমপন্থা কিংবা সন্ত্রাসবাদের কোন ধারণাই ইসলাম অনুমোদন করেনি, যার কথা আমরা আগেও আলোচনা করেছি। ইসলাম সব সময় বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিগ্রাহ্য উপস্থাপনার মাধ্যমে ইতিবাচক পদ্ধতিতেই ইসলামের শাশ্বত আদর্শের প্রতি মানুষকে আহবান জানায় এবং এটিই ছিল নবী-রাসূলদের সুন্নত এবং আসমানী কিতাবের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট। মূলত ইসলাম হল আল্লাহ প্রদত্ত একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রাকৃতিক ধর্ম। মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেককে আশ্রিত করেই এ ধর্ম বিস্তার লাভ করে। ইসলামের আবেদন মূলত মানুষের জ্ঞান ও বুদ্ধি-বিবেকের প্রতি হওয়ায় মানুষ স্বস্ফূর্তভাবেই এ ধর্মের আহবানে সাড়া দিয়েছে, কোন ধরনের শক্তি প্রয়োগ, জবরদস্তি ও দমননীতির মাধ্যমে নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ