ঢাকা, সোমবার 12 September 2016 ২৮ ভাদ্র ১৪২৩, ৯ জিলহজ্ব ১৪৩৭ হিজরী
Online Edition

বিটি বেগুন ও জিএমও বিতর্ক নিয়ে মুখ খুললেন বাংলাদেশের কৃষক

বিটি বেগুন নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা খোলাসা করলেন বাংলাদেশের বিটি বেগুন চাষি মোহাম্মাদ হাফিজুর রহমান। বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ২০১৩ সালের ৩০ অক্টোবার জিনগতভাবে রূপান্তরিত (জিএম) বিটি বেগুন চাষের অনুমোদন দেয়, যা ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধে সক্ষম। উন্নয়নশীল দেশের প্রথম অনুমোদিত জিএম খাদ্যশস্য হওয়ায় বিটি বেগুন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বিটি বেগুন চাষি মোহাম্মাদ হাফিজুর রহমান ২০১৫ সালের মে মাসে বিবিসির ‘পেনারোমা’ অনুষ্ঠানে নিজের বিটি বেগুন চাষের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি সাক্ষাৎকার প্রদান করেন। বিবিসির ঐ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তার ক্ষেতে বিটি বেগুন কীটনাশক ছাড়াই সফলভাবে ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধ করে। উল্লেখ্য, অন্যান্য সাধারণ জাতের বেগুন চাষের ক্ষেত্রে ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধ করতে প্রতি মওসুমে সাধারণত ৮০-১০০ বার কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়, যা পরিবেশ ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।
হাফিজুর বিবিসিকে বলেন, বিটি বেগুন চাষের ফলে তার জমিতে কীটনাশকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে , কমেছে উৎপাদন খরচ এবং এটি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। উল্লেখ্য, হাফিজুর রহমানের বিটি বেগুন চাষের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমেরিকার নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যেখানে বিটি বেগুন চাষের ফলে কীটনাশক ব্যবহার কমে যাওয়ার বিষয়টি আলোকপাত করা হয়।
বিবিসির পেনারোমা অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হওয়ার পর জিএমও এবং বিটি বেগুনবিরোধী প্রচার কর্মীরা দাবি করেন, হাফিজুর রহমানের বিটি বেগুনক্ষেতে কোনো ফলন হয়নি এবং এ নিয়ে বিবিসি ও নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য মিথ্যা। জিএমও বিরোধীদের এই দাবি আরও জোরালো হয়- যখন বাংলাদেশে ইউএনবির এক রিপোর্টার হাফিজুর রহমানের বিটি বেগুন নিয়ে ভুলভাবে একটি খবর উপস্থাপন করেন। ইউএনবির সেই খবরে বলা হয়, বিটি বেগুন চাষের ফলে হাফিজুরের ক্ষেতের সব বেগুন গাছ মারা যায়। ইউএনবির সেই রিপোর্টার এর আগেও বিটি বেগুন নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি দাবি করেন- বিভিন্ন জেলায় বিটি বেগুন চাষের ফলে কৃষকদের লোকসান হওয়ায় কৃষকরা ভুক্তভোগী।
প্রকাশিত ওই সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. রফিকুল ইসলাম ম-ল সংবাদ মাধ্যমকে জানান, দেশের বিভিন্ন জেলায় বিটি বেগুনের আবাদ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং কৃষকের মাঠে সাধারণ বেগুনের তুলনায় বিটি বেগুনের ফলন অনেক ভালো হয়েছে।
বাংলাদেশে বিটি বেগুনের পক্ষে এবং বিপক্ষে এ ধরনের সংবাদ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বেশ গোলমেলে মনে হয়। বিটি বেগুন চাষি হাফিজুরের ক্ষেত্রে ঠিক কী হয়েছে, তা দেখতে ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে কর্নেল এলায়েন্স সায়েন্সের একটি দল তার কাছে যায় এবং তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। হাফিজুর তার বিটি বেগুন চাষের সাফল্য সম্পর্কে দ্ব্যর্থহীন এবং সবরকম ব্যর্থতার দাবি প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি বলেন, ‘আমার অন্যান্য প্রায় ১০ বছরের বেগুন চাষের অভিজ্ঞ্যতা, গত বছর বেগুন চাষ করে যে ফলন পেয়েছি, এই রকম ফলন আমি আমার জীবনে কোনো দিন দেখি নাই, আমার এলাকাবাসীও দেখে নাই। এজন্য এলাকাবাসী উদ্বুদ্ধ, আমিও উদ্বুদ্ধ। আমি খুবই আগ্রহী যাতে এই বেগুন আমি ভালোভাবে আরও চাষ করতে পারি।’
হাফিজুর জানান, ইউএনবির রিপোর্টার তাকে জিএমও বিরোধী লেখাসংবলিত বিভিন্ন জিনিস দেখায় আর এর ক্ষতি সম্পর্কে বুঝাবার চেষ্টা করে, যা সাংবাদিকতা পেশায় অনৈতিক। হাফিজুর আরও বলেন, বিটি বেগুন চাষ করে তিনি অসন্তুষ্ট এমন কোনো কথা ইউএনবির রিপোর্টারকে বলেননি। ‘এই কথা আমি বলিনি। গাছের বয়েস শেষ হলে বিটি বেগুন মরা শুরু করে। সব জিনিসের একটা শেষ আছে, তাই না? বেগুন গাছ কি সারা বছরই থাকবো? সেটা তো সম্ভব না।’
হাফিজুর বলেন, ইউএনবির রিপোর্টার সহজ এই বিষয়টি বোঝেননি যে হাফিজুর বিটি বেগুনক্ষেত থেকে বহুবার ফসল সংগ্রহ করেছেন আর মওসুমের শেষে বেগুন গাছ মরতে শুরু করে। ‘উনি যে সময় আসছেন, তখন বেগুন গাছ মরা শুরু করে দিছে। গাছে বেগুনই নাই। ওই সময় আসছে। তখন আমি এই বেগুন গাছের মধ্যে ধুন্দুল চাষ লাগায় দিছি। তখন আমি ওনারে বলছি যে, এই আমার বেগুন চাষ শেষ, এই গাছের ওপর দিয়ে আমি এখন ধুন্দুল চাষ শুরু কইরা দিছি।’
হাফিজুর আরও বলেন, ‘বিভিন্ন অফিস থেকে জিএমও বিরোধী বিভিন্ন কর্মীরা আমার সাথে কয়েকবার দেখা করেছে এবং বিটি বেগুনের ক্ষতিকর বিভিন্ন বিষয় বলতে বলেছে। তারা আমাকে একটা বই দিয়েছে আর বলেছে যে বিটি বেগুনের অনেক ক্ষতিকর দিক আছে। যে বেগুন পোকায় খায় না সেটা মানুষের খাওয়া ভালো হবে না এই কথা তারা আমাকে বলছে। আমার উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে আমি তাদের প্রশ্ন করেছি, মানুষ কৃমির উপদ্রপ থেকে বাঁচার জন্য ওষুধ খায়, কৃমি মরে তাহলে মানুষ মরে না কেন? তারা আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি।’
হাফিজুর রহমানের মতো কৃষকদের নিজেরদের কথা বলার সুযোগ বাড়লে বিকৃতি এবং মিথ্যা প্রতিবেদনের ভয় ছাড়াই তারা জিএমও ও বিটি বেগুন নিয়ে বিশ্বব্যাপী পাঠক ও শ্রোতার কাছে নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলতে পারবেন। আর এক্ষেত্রে মিডিয়ার পক্ষপাতহীন ও স্বচ্ছ ভূমিকা সকলের কাম্য।
-মোঃ আরিফ হোসেন

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ