ঢাকা, সোমবার 12 September 2016 ২৮ ভাদ্র ১৪২৩, ৯ জিলহজ্ব ১৪৩৭ হিজরী
Online Edition

কুরবানি ও মানবাধিকার

রিদওয়ান বিন ওয়ালী উল্লাহ : ঈদুল আজহা। মুসলিম উম্মাহর বিশেষ আনন্দের দিন। প্রতি বছর কুরবানির ঈদ এসে মানবজাতিকে কী ডাক দিয়ে যায় তা ক’জনই বা ভেবে দেখে? আলোচ্য নিবন্ধে ঈদুল আজহার সাথে মানবাধিকারের সম্পর্ক খুঁজে দেখার প্রয়াস পাবো। আল্লাহ তায়ালার প্রতিটি কাজ প্রজ্ঞাপূর্ণ। তাই ঈদকে মুসলমানদের আনন্দের উপলক্ষ বানানোর পেছনে রয়েছে শক্তিশালী যুক্তি। ঈদ আল্লাহর নিদর্শনাবলীর অন্যতম। আর আল্লাহ বলেন, যে আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করে, নিঃসন্দেহে তা অন্তরের তাকওয়া থেকেই- আল-হজ্ব: ৩২। সুতরাং ঈদুল আজহাকে আনন্দের উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করার পাশাপাশি আল্লাহর একটি নিদর্শন হিসেবে সম্মান প্রদর্শন করতে তার গুরুত্ব নিয়ে ভেবে দেখা প্রাসঙ্গিক। 
মুসলিম স্কলারগণ গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, আদম সন্তান হাবীলের কুরবানি ও পরবর্তীতে স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে ইবরাহীম (আঃ) এর ইসমাঈল (আঃ) কে কুরবানি করার প্রয়াসের সূত্র ধরেই উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য কুরবানির প্রচলন হয়। সূরা আস্-সাফফাতের ১০৮ নং আয়াত এই অর্থ বহন করে। ইব্রাহীমের (আঃ) ইসমাঈলকে কুরবানির ইতিহাস বর্ণনায় আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তার জন্য আমি পরবর্তীদের মধ্যে সুখ্যাতি রেখে দিয়েছি।’ পৃথীবির প্রথম মানব আদম (আঃ)। আদমের শরিয়ত অনুযায়ী তার সন্তান কাবীল বিয়ে করার কথা ছিল হাবীলের বোনকে। যে ছিল হাবীলের বোন অপেক্ষা অসুন্দরী। আর হাবীলের বিয়ে করার কথা ছিল কাবীলের সুশ্রী বোনকে।
বিধি মোতাবেক কাবীলের বোন বিয়ে করা ছিল হাবীলের অধিকার। কিন্তু কাবীল এর বিরোধিতা করলো। কারণ হাবীলের বোন তার অপছন্দ। তাই সহোদরা হওয়া সত্ত্বেও সে তার সুশ্রী বোনকে বিয়ে করতে দৃঢ় সংকল্প হলো। এমনকি হাবীলকে হত্যার হুমকি দিল। বললো- ‘অবশ্যই আমি তোমাকে হত্যা করবো’-আল-মায়েদা: ২৭ এবং হত্যা করেই বসলো। আল্লাহ তায়ালা বলেন, সুতরাং তার নফস তাকে বশ করলো তার ভাইকে হত্যা করতে। ফলে সে তাকে হত্যা করল এবং ক্ষতিগ্রস্তদের  অন্তর্গত হলো- আল-মায়েদা:৩০।
কাবীল আদমের (আঃ) বিধান না মেনে ভাইকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অপচেষ্টা এবং পরে হত্যার মাধ্যমে পৃথিবীর ইতিহাসে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রথম নজির স্থাপন করলো। অন্যদিকে ইসলাম (আদমের শরিয়ত) কাবীলের অবৈধ দাবির সামনে সমাধান দিল যে, দু’জন কুরবানি করবে। যার কুরবানি কবুল হবে সেই সঠিক দাবিদার। কাবীলের কুরবানি কবুল না হওয়ায় কাবীল হেরে গিয়ে স্বীয় ভাইকে হত্যা করে পৃথিবীর ইতিহাসে মানবাধিকার লংঙ্ঘনের কালো অধ্যায় রচনা করলো।
তাই হাবীলের কুরবানি করা ও স্বীয় সঠিক দাবিতে অটল থেকে হত্যার শিকার হওয়া প্রতিটি ঈদুল আজহাতে উম্মতে মোহাম্মদীকে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়ে যায় অনবরত।
ইসমাঈল (আঃ) কে ইব্রাহীম (আঃ)  বলেন- হে প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবেহ করছি, অতএব দেখ তোমার কী অভিমত; সে বলল, হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন। আমাকে ইনশাআল্লাহ আপনি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন-আস্-সাফফাত:১০২। ইসমাঈল (আঃ) কর্তৃক পিতা ইব্রাহীমের নির্দেশ কোন ধরনের প্রশ্ন ও উজর পেশ করা ছাড়াই আনুগত্যের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে মেনে নেয়া সমগ্র জাতির জন্য পুত্র কর্তৃক পিতার আদেশ মান্য ও অধিকার আদায়ের নির্দেশক। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা সবাই আল্লাহর গোলামি কর; তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না; পিতামাতার সাথে ভালো আচরণ কর- সূরা নিসা: ৩৬। কাছাকাছি দিকনির্দেশনা এসেছে পবিত্র কুরআনের সূরা বনি ইসরাঈল: ২৪, লুকমান: ১৪, আহ্কাফ: ১৫ এবং আনকাবূত এর ৮ নং আয়াতসহ বিভিন্ন আয়াতে। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা) বলেছেন, কবিরা গুনাহগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়  গুনাহ হলো কোন লোক তার পিতামাতাকে লা’নত করা। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! কিভাবে একজন ব্যক্তি তার পিতামাতাকে লা’নত করতে পারে? রাসূল (সা) বললেন, একজন অন্যের পিতাকে গালি দেয়। তখন সেও ঐ লোকের পিতামাতাকে গালি দেয় (বুখারী:৫৫১৬)।                          
পিতার প্রতি সন্তানের যে অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য রয়েছে তা পালিত হলে পিতা-পুত্রের মধ্যকার মানবাধিকার লঙ্ঘিত হতে পারে না। যেমন, সন্তান পিতাকে তার অধিকার আদায় না করে কোথাও অমানবিকভাবে ছেড়ে রাখা, পিতাকে নির্যাতন করা ইত্যাদি। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বৃদ্ধাশ্রমগুলোর খবর নিলে দেখা যাবে অবহেলিত পিতাদের করুণ চিত্র। 
বিভিন্ন হাদীস পর্যালোচনার পর মুসলিম পন্ডিতগণ মত প্রকাশ করেছেন যে, মোস্তাহাব পদ্ধতি হচ্ছে, কুরবানির গোশতের এক ভাগ আত্মীয় স্বজনের, এক ভাগ গরীব মিসকিনদের মাঝে বিলিয়ে দেয়া আর একভাগ নিজের জন্য রাখা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,  নিকটাত্মীয়, ইয়াতিম, মিসকিনদের সাথে নেক আচরণ কর এবং আত্মীয় প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী মুসাফির ও তোমাদের অধীনে থাকা দাস-দাসীদের প্রতি সদয় হও- সূরা নিসা: ৩৬। আত্মীয়-স্বজনকে তাদের হক দাও এবং গরিব ও মিসকিনদেরকেও তাদের হক দাও- বনি ইসরাঈল:২৬। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা) কে বলতে শুনেছি, সেই ব্যক্তি মুমিন নয়,  যে পেট ভরে তৃপ্তি সহকারে খায় অথচ তার পাশে তার প্রতিবেশী অভুক্ত-বায়হাকি: ৯২১৪। আবু শুরাইহ (রা) থেকে বর্ণিত, নবী কারীম (সা) বলেছেন, আল্লাহর কসম! সেই ব্যক্তি মুমিন নয়, আল্লাহর কসম! সেই ব্যক্তি মুমিন নয়, আল্লাহর কসম! সেই ব্যক্তি মুমিন নয়। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! কে সে? রাসূল (সা) বললেন, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়- বুখারী: ৫৫৫৭।
কুরবানির গোশত থেকে গরীবদেরকে যথাযথভাবে সহায়তা করতে পারলে এবং কুরবানির দানের শিক্ষা নিয়ে ধনীরা গরীবদের পাশে দাঁড়ালে যেমনি গরীবের প্রতি সম্পদশালীর দায়িত্ব পালন হতো তেমনি সুন্দর জীবন যাপনের লোভে অসহায় মানুষগুলো কারো সম্পদ লুট কিংবা আত্মসাতের লোভে হত্যার মত অপরাধে নিজেকে জড়াতে চাইতো না।
কাবিলের নিকট তার সহোদরা বোন ছিল আমানত। যা সে যথার্থভাবে হাবিলের নিকট পৌঁছে দেয়া ছিল তার দায়িত্ব। তেমনি ইব্রাহীমের নিকট ইসমাঈল ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া আমানত, যা সৃষ্টিকর্তা চাওয়া মাত্র ফিরিয়ে দেয়া ছিল তার দায়িত্ব। কুরবানির ঘটনা পর্যবেক্ষণে পাওয়া এই আমানতদারিতা রক্ষা হলে অনেক মানবতা বিরোধী কাজ বন্ধ হয়ে যেত। তেমনি সুরক্ষিত হতো মানবাধিকার।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহ তোমাদেরকে হুকুম দিচ্ছেন, সবরকম আমানত আমানতদার লোকদের হাতে তুলে দাও- আন নিসা: ৫৮। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (স.) বলেছেন, যে তোমার নিকট আমানত রেখেছে, তার আমানত তাকে ফেরত দাও। আর যে ব্যক্তি তোমার  আমানত আত্মসাত করে, তুমি তার আমানত আত্মসাত করো না- আবু দাউদ: ৩০৬৯
দায়িত্বশীলের নিকট ন্যায়বিচার পাওয়া অধিনস্তদের অধিকার। অন্য দিকে অধিনস্তদের প্রতি ন্যায়বিচার করা দায়িত্বশীলের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত। তাই এই আমানত তার প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দেয়া দায়িত্বশীলের কর্তব্য। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা, সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বিধবা ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, রিলিফের মালসহ বিভিন্ন ধরনের ভাতা প্রাপ্য ব্যক্তির নিকট পৌঁছে দেয়ার নিশ্চয়তা বিধান করা সামাজিক নির্বাচিত দায়িত্বশীলের কর্তব্য। আল্লাহ তায়’ালা বলেন, আর যখন লোকদের মধ্যে ফায়সালা করবে তখন ইনসাফের সাথে করবে- সূরা নিসা: ৫৮। হে ঐসব লোক, যারা ঈমান এনেছ! জেনে-বুঝে আল্লাহ ও রাসূলের সাথে খিয়ানত করো না এবং আমানতের ব্যাপারেও বিশ্বাস ভঙ্গ করো না-আনফাল: ২৭। আব্দুল্লাহ ইবনে ঊমর (রা:) নবী করীম (সা:) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, তোমার সাথে চারটি জিনিস থাকলে পৃথিবীর সব হারিয়ে ফেললেও তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। ১. আমানতের সংরক্ষণ, ২. সত্যবাদিতা, ৩. উত্তম চরিত্র, ৪. পবিত্র রিজিক-( আল মুসতাদরাক লিল হাকিম)।   
মালিকের নিকট শ্রমের পারিশ্রমিক পাওয়া শ্রমিকের অধিকার। শ্রমিকের পাওনা যথার্থভাবে ঘাম শুকানোর পূর্বেই আদায় করে দেয়া মালিকের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত। তাই এই আমানত তার প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দেওয়া মালিকের কর্তব্য। আব্দুল্লাহ ইবনে ঊমর (রা:) থেকে বর্ণিত করেন, তিনি বলেন, রাসূল (স.) বলেছেন, শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তাদের মজুরি দিয়ে দাও- ইবনে  মাজাহ: ২৪২৪। শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে হাদীসে কুদসীতে কঠোর হুশিয়ারী এসেছে। আবু হুরায়রা (রা.) নবী করীম (সা:) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কেয়ামতের দিন আমি স্বয়ং অবস্থান করব। ১. যে ব্যক্তি আমার নামে চুক্তিবদ্ধ হয়ে তা ভঙ্গ করেছে, ২. যে ব্যক্তি কোন স্বাধীন ব্যক্তিকে বিক্রি করে তার মূল্য ভোগ করেছে, ৩. যে ব্যক্তি কোন শ্রমিককে কাজে নিয়োগ করে পূর্ণ কাজ আদায় করে নেয়, অথচ তার বিনিময় দেয় না-বুখারী: ২০৭৫।
আজকাল গৃহভৃত্যদের (Home Servant) উপর নির্যাতন সচরাচর ও অতিসাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অথচ গৃহমালিকের নিকট গৃহভৃত্যদের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত আমানত রয়েছে। যা আদায় করা গৃহমালিকের অবশ্য কর্তব্য। আবু যর গিফারী (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (স.) বলেছেন তোমাদের চাকর চাকরানী ও দাস-দাসীরা প্রকৃতপক্ষে তোমাদের ভাই, তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের অধিনস্থ করেছেন। সুতরাং আল্লাহ যার ভাইকে তার অধীন করে দিয়েছে সে যেন তাকে তাই খাওয়ায়, যা সে নিজে খায়। তাকে যেন তা পরিধান করায় যা সে নিজে পরিধান করে। আর তার সাধ্যের বাহিরে যাতে কোন কাজ চাপানো না হয়। একান্ত যদি চাপানো হয়, তবে তা সমাধান করার ব্যাপারে তাকে সাহায্য করা উচিত-বুখারী: ৫৫৯০। আবু হুরায়রা (রা.) নবী করীম (সা:) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, তোমাদের ভৃত্য যতি তোমাদের জন্য খাদ্য প্রস্তুত করে নিয়ে আসে তখন তাকে হাত ধরে নিজের সঙ্গে খেতে বসাও। সে যদি বসতে অস্বীকার করে তবুও দুই-এক মুঠি খাদ্য অন্তত তাকে অবশ্যই খেতে দিতে হবে। কারণ সে আগুনের উত্তাপ ও ধূম্র এবং খাদ্য প্রস্তুত করার কষ্ট সহ্য করেছে- তিরমিযী: ১৭৭৬। 
স্বামী কর্তৃক স্ত্রী নির্যাতন একটি জঘন্য ও অমানবিক কাজ। অথচ এটি চলতি সময়ের স্বাভাবিক ও তুচ্ছ কাজে পরিণত হয়ে গেছে। ভাবতে অবাক লাগে। অনেক উচ্চশিক্ষিত স্বামীরাও যে কত অমানুষিক আচরণ করে নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষটিকে। সম্পদশালী, উচ্চশিক্ষিত পরিবার ও এলিট সোসাইটির অনেক শ্বশুর-শাশুড়ী স্বীয় ছেলে বউকে অযথা, অন্যায়ভাবে কত যে অমানুষিক নির্যাতন করছে তা প্রকাশ্যে না আসলেও বর্তমান মেকী সভ্যতায় একটি সস্তা কাজে পরিণত হয়েছে। কুরবানি যেখানে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান করে যাচ্ছে, সেই কুরবানির দিনও কত বোন যে শুধু কুরবানির গোশত কাটা, রান্না কিংবা স্বামী পক্ষের প্রিয়জনদের মন রক্ষায় শ্বশুরালয়ে অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে সে খবর কে রাখে! আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তাদের সাথে ভালোভাবে জীবনযাপন কর-সূরা নিসা: ১৯। তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাকস্বরূপ-সূরা বাকারা: ১৮৭। মেয়েদের জন্যও তেমনি ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে, যেমন তাদের উপর পুরুষদের অধিকার আছে- সূরা বাকারা: ২২৮।
স্ত্রীদের মোহর খুশী মনে (ফরয মনে করে) আদায় কর। অবশ্য যদি তারা নিজের মর্জিতে মোহরের কোন অংশ তোমাদের মাপ করে দেয় তাহলে তোমরা তা মজা করে খেতে পার-সূরা নিসা: ৪। পুরুষদের জন্য ঐ মালে হিস্যা রয়েছে, যা বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনরা রেখে গেছে এবং মহিলাদের জন্যও ঐ মালে হিস্যা রয়েছে, যা বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনরা রেখে গেছে, সে মাল অল্পই হোক আর বেশিই হোক। এ হিস্যা (আল্লাহর পক্ষ থেকে) ফরয করা হয়েছে- সূরা নিসা: ৭। আরো বর্ণনা রয়েছে সূরা নিসার ১১ নং আয়াতে। আয়েশা (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (স.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবার পরিজনের নিকট উত্তম। আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের সকলের চেয়ে উত্তম। আর তোমাদের কোন সংগী যখন মৃত্যুবরণ করবে, তখন তাকে তোমরা ছেড়ে দিবে (অর্থাৎ কোন দাবি রাখবে না)- তিরমিযী: ৩৮৩০।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (স.) বলেছেন, হে আল্লাহ দুই দুর্বল অর্থাৎ ইয়াতিম ও নারীদের প্রাপ্য ও অধিকার নষ্ট করাকে আমি অন্যায় ও গুনাহ হিসেবে নির্দিষ্ট করে দিলাম- ইবনে মাজাহ: ৩৬৬৮। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (স.) বলেছেন, কোন মুসলিম পুরুষ যেন কোন মুসলিম মহিলার প্রতি হিংসা বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ না করে। কেননা তার কোন একটি দিক তার কাছে খারাপ লাগলেও অন্য একটি দিক তার পছন্দ- মুসলিম: ২৬৭২। হাকীম ইবনে মুয়াবিয়া আল কুরাইশী তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (স:)! আমাদের কোন ব্যক্তির উপর তাঁর স্ত্রীর কী অধিকার রয়েছে? তিনি বলেন, তুমি যখন আহার কর তাকেও আহার করাও, তুমি যখন পরিধান কর, তাকেও পরিধান করাও, কখনও মুখম-লে প্রহার করোনা, কখনও অশ্লীল ভাষায় গালি দিও না এবং ঘরের মধ্যে ছাড়া তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না- আবু দাউদ: ১৮৩০। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স:) বলেছেন, সমগ্র পৃথিবীটাই সম্পদ। আর পৃথিবীর সর্বোত্তম সম্পদ হল সৎ কর্মপরায়ণ স্ত্রী- মুসলিম: ২৬৬৮।
কুরবানি আমাদেরকে আমানতদারিতার যে মহৎ গুনটির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, তার যথার্থ বাস্তবায়ন হলে মানবাধিকার সুদৃঢ় হতো। বন্ধ হয়ে যেতো সমাজের অধিকাংশ নৈরাজ্য।
কুরবানি ধনী-গরীবের মাঝে দূরত্ব কমিয়ে আনে। ফলে সমাজ থেকে বিদূরীত হয় শ্রেণী বৈষম্য। ধনীদের অসহায় ও দুর্বলদের অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসার মানসিকতা তৈরী হয়। ফলে গড়ে উঠে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ সোনার সমাজ।
একটি অপ্রিয় সত্য হচ্ছে, বাংলাদশের প্রতিটি সরকারি অফিস, বিশেষ করে প্রশাসনিক অফিসগুলো ঘুষের উপর প্রতিষ্ঠিত। এমন একটি সরকারি অফিস খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা জানি না, যেখানে অবৈধ অর্থের লোভ ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সহজে সাধারণ মানুষের ফাইলটা ওকে করে দেবে। এ সমস্ত অফিসে গেলে নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়।
সত্যি কথা, হয় অসহায় হয়ে ফেরত চলে আসতে হয় নচেৎ অবৈধভাবে টাকার বিনিময়ে কার্জ সম্পাদন করতে হয়। তখন দেশের জন্য লক্ষ লক্ষ শহীদের অকাতরে জীবন বিলিয়ে দেয়াকে অনর্থক মনে হয়। এখানে যে কত চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে তা কেউ মুখে উচ্চারণ করতে চায় না। বছরে একবার কুরবানি এসে আমাদেরকে এ হিংস্র মানুষিকতা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান করে যায়। কারণ অবৈধ সম্পদ দিয়ে কুরবানি বৈধ হয় না।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহর কাছে পৌঁছেনা এগুলোর গোশত ও রক্ত; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া-আল-হাজ্জ: ৩৭। সুতরাং যে কুরবানি করেছে সে সুদ, ঘুষ ও দুর্নীতির সাথে কখনো জড়িত হতে পারে না। সুদ, ঘুষ ও দুর্নীতি চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। কুরবানির শিক্ষা পারে সমাজকে এ হিংস্র থাবা থেকে রক্ষা করতে।
সুতরাং কুরবানির আহবানে সাড়া দিয়ে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় ঝাঁপিয়ে পড়ি। নতুন প্রজন্মের জন্য গড়ে তুলি সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ।   
লেখক : গবেষক, কলামিস্ট ও লেকচারার, ridwanullah88@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ