ঢাকা, সোমবার 12 September 2016 ২৮ ভাদ্র ১৪২৩, ৯ জিলহজ্ব ১৪৩৭ হিজরী
Online Edition

উম্মাহর সংঘাত নিরসনে মুসলিম নেতাদের একত্রে কাজ করার আহ্বান

# ধর্মীয় উগ্রতা ও উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে
# মানুষকে দ্বীনের পথে আনতে হবে সুন্দর হৃদয় দিয়ে


সংগ্রাম ডেস্ক : গতকাল রোববার সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর অদূরে আরাফাত ময়দানে হাজীদের উকুফ বা অবস্থানের মধ্য দিয়ে এবারের পবিত্র হজ্বের চূড়ান্ত-পর্ব অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। সারা বিশ্ব থেকে এবার প্রায় ২০ লাখ হাজী গতকাল আরাফাত ময়দানে সমবেত হন। তাদের তালবিয়া (‘লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লা শারিকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়াননি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্্ক লা শারিকা লাক।’ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! আমি হাজির। তোমার কোন শরীক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সব প্রশংসা, নিয়ামত ও সব সা¤্রাজ্য শুধু তোমারই’) পাঠে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা আরাফাত ময়দান। হাজিরা এখানে একসঙ্গে জোহর ও আসরের নামায এক আজান ও দুই ইকামতে আদায় করেন। আবর নিউজ/বাংলানিউজ/নতুন বার্তা।
পবিত্র হারাম শরীফের গ্রান্ড ইমাম শেখ আবদুর রহমান আস সুদাইস আরাফাত ময়দানের নামিরা মসজিদে হজ্বের খুতবা দেয়ার পর নামাযে ইমামতি করেন। দীর্ঘ খুতবা প্রদানকালে আস সুদাইস বিশ্বের মুসলিম নেতাদের প্রতি উম্মাহর মধ্যকার সংঘাত মিটিয়ে ফেলতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
ইমাম ও আলেমদের উদ্দেশে আব্দুর রহমান আস সুদাইস বলেন, আমরা নবী মোহাম্মদ (স) এর উম্মত। আমাদের দায়িত্ব অনেক বেশি ভুলে গেলে চলবে না। মানুষকে দ্বীনের পথে আনতে হবে সুন্দর হƒদয় দিয়ে। বল প্রয়োগ করে ধর্ম প্রচার করা যাবে না। উগ্রতা পরিহার করতে হবে। ইসলাম প্রচারে সব মাধ্যম ব্যবহার করতে হবে।
খতিব বলেন, আরব-অনারবের কোনো পার্থক্য নেই। জাতি ও দেশ ভেদের পার্থক্য ইসলাম সমর্থন করে না। এটা নবীর শিক্ষা। তিনি এখানে দাঁড়িয়ে এটা বলেছিলেন। তিনি আরও বলেছেন, মুসলমানরা এক অঙ্গভুক্ত। একজনের থেকে আরেকজনকে আলাদা করার সুযোগ নেই, পরস্পরের প্রতি দয়া ও ভালবাসা প্রদর্শন করতে হবে। পরস্পরের মঙ্গল কামনা করতে হবে।
বয়ানে তিনি নির্যাতিত ফিলিস্তিন, ইরাক, ইয়ামেন মুসলমানদের জন্য দোয়া করেন এবং মুক্তি কামনা করেন।
‘মুসলমানরা ভাই-ভাই। আমাদের সেভাবে চলতে হবে। ইসলাম মানবতার ধর্ম, সহানুভূতির ধর্ম। ইসলাম গ্রন্থিত হয়েছে ন্যায়বিচার দ্বারা, সততা দ্বারা ও ভালো ব্যবহার দ্বারা। এটা আমাদের মানতে হবে। আপনারা এটা মানবেন, আপনারা নিরাপদ ভূমিতে যেভাবে চলছেন হজ্ব¡-পরবর্তী জীবনে সেভাবেই চলবেন’।
যুবকদের জন্য তিনি বলেন, ইসলামের প্রচার ঘটেছে তোমাদের মতো যুবকদের হাত ধরে। তোমাদের দায়িত্ব অনেক বেশি সেটা ভুলবে না। যৌবনে গা ভাসিয়ে চলবে না।
পুরো খুতবায় ধর্মীয় উগ্রতা ও উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান নতুন খতিব আব্দুর রহমান আস সুদাইস।
ভাষণে আব্দুর রহমান আস সুদাইস আরও বলেন, আজকের দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে এ দিবসের তাৎপর্যের নানা দিক তুলে ধরেন।
স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় খুতবা শেষ হয়।
তিনি সুন্নতের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন এবং হজ্ব-পরবর্তী চার দিনের কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে বলে দেন।
সবার উদ্দেশে তিনি বলেন, ভালো কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করবেন। আল্লাহর ইবাদতে বেশি সময় কাটাবেন, নামাযকে গুরুত্ব দেবেন। নবীর প্রতি দরূদ পড়বেন, তাঁর শাফায়াত প্রত্যাশা করবেন।
বয়ানে তিনি ইসলামের চার খলিফার নাম উল্লেখ করেন এবং তাদের অবদানের কথা তুলে ধরেন।
ভাষণের শেষ অংশে দোয়ায় তিনি বিশ্ব শান্তি কামনা করে মুসলমানদের ঐক্য প্রত্যাশা করেন। আত্মশুদ্ধি কামনা করেন। আল্লাহর গুণবাচক নাম নিয়ে নিয়ে মানবতার মঙ্গল কামনা করেন। এ সময় কান্নার আওয়াজ শোনা যায় আরাফার মাঠ থেকে।
দোয়ায় তিনি নবীর দেখানো পথে চলার শক্তি কামনা করেন। উপস্থিত হাজিদের জন্য আল্লাহর দরবারে কবুল হজ্ব কামনা করেন। হজ্ব ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জন্য দোয়া করেন। সমগ্র বিশ্বের কবরবাসীদের মাগফিরাত কামনা করেন।
সৌদি আরবের গ্রান্ড মুফতি আবদুল আজিজ আশশেখ স্বাস্থ্যগত কারণে খুতবা দিতে অপারগ। এবার হজ্বের খুতবা দেন শেখ আবদুর রহমান আস সুদাইস। আশশেখ একটি চেয়ারে বসে আস সুদাইসের খুতবা শোনেন।
এ বছর বিশ্বের ১৬৪টি দেশ থেকে ১৩ লাখ ২৫ হাজার ৩৭২ হাজী পবিত্র হজ্বে অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ ১ হাজার ৭৫৮ জন হাজী হজ্বে অংশ নেন। গত বছরের তুলনায় এ বছর বিদেশী হাজী ৬৪ হাজার ৮৮৯ জন অর্থাৎ ৫% কম এসেছে।
তালবিয়া পাঠ করে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে পাপমুক্তির আকুল বাসনায় লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান (হাজি) গতকাল রোববার মিনা থেকে আরাফাতের ময়দানে সমবেত হন। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তারা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন। কেউ পাহাড়ের কাছে, কেউ সুবিধাজনক জায়গায় বসে ইবাদত করেন।
পবিত্র হজ্ব ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। আর্থিক ও শারীরিকভাবে সমর্থ পুরুষ ও নারীর জন্য হজ্ব ফরজ।
হজ্বের দিনে সারাক্ষণ আরাফাতে অবস্থান করা ফরজ। হজ্বের প্রতিটি অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে হাজিরা একই সারিতে সমবেত হন। সবাই আল্লাহর বান্দা ও রাসূলের উম্মত।
জানা গেছে, হজ্ব ভিসা নিয়ে যারা সৌদি আরবে গিয়ে অসুস্থতার জন্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তাদেরও অ্যাম্বুলেন্সে করে আরাফাতের ময়দানে স্বল্প সময়ের জন্য নেয়া হয়। কারণ, আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত হওয়া হজ্বের অন্যতম ফরজ।
মূলত ৯ জিলহজ্ব আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করাই হজ্ব।
আরাফাহ ও আরাফাত এই দুটো শব্দই আরবিতে প্রচলিত। দৈর্ঘ্যে দুই মাইল, প্রস্থেও দুই মাইল। এই বিরাট সমতল ময়দানের নাম আরাফাত। ময়দানের তিন দিক পাহাড়বেষ্টিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ