ঢাকা, সোমবার 12 September 2016 ২৮ ভাদ্র ১৪২৩, ৯ জিলহজ্ব ১৪৩৭ হিজরী
Online Edition

হাটে বিক্রির ধুম ছোট ও মাঝারি গরুর দাম বেশি

নাছির উদ্দিন শোয়েব : দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল আযহা। এ উৎসবের মূল অনুসঙ্গ পশু কুরবানি। আর তাই গরু-ছাগল, মহিষ ও উটসহ কুরবানির সব পশুর আগমনে জমে উঠছে রাজধানীর হাটগুলো। কানায় কানায় পূর্ণ হাটগুলোতে পা ফেলার যেন জায়গা নেই।
গতকাল রোববার সকাল থেকে গরু বিক্রির ধুম পড়েছে। এখন আর কেউ হাটে এসে খালি হাতে ফেরত যাচ্ছেন না। দাম বেশি হলেও কিনে নিয়ে যাচ্ছে গরু বা ছাগল। তবে বড় গরুর তুলনায় ছোট ও মাঝারি সাইজের গরুর চাহিদা থাকায় দামও বেশি। ক্রেতাদের অভিযোগ-দাম বেশি দিয়েই কিনতে হচ্ছে গরু। হাতে সময় না থাকায় ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না অনেকেই। শেষের দিকে আরো দাম বাড়তে পারে এই আশঙ্কায় বেশি দাম দিয়েই চাহিদামত পশুটি কিনে নিচ্ছেন ক্রেতারা। আর এবার গরু বিক্রি করে বিক্রেতারাও বেশ খুশি।
তবে গরু সরবরাহ কম থাকলে কুরবানির আগের দিন দাম আরো বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল থাকলে ঢাকার বাইরে থেকে পশুর ট্রাক ঢাকায় ঢুতে পারলে দাম কমে যেতে পারে-এমন আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে দাম মোটামুটি পর্যায়ে পেলে ব্যবসায়ীরাও ঝুঁকি নিচ্ছেন না। এদিকে গরু ছাড়াও এবার দাম বাড়তি রয়েছে ছাগল ও ভেড়ার। ছোট গরুর দাম বেশি থাকায় অনেকেই ছাগল ও ভেড়ার দিকে ঝুকছেন।
গতকাল সকালে গাবতলী গরুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, হাট পুরোপুরি জমে উঠেছে। সকাল থেকেই বিক্রির ধুম লেগেছে। গরুর পাইকাররা জানান, বিকালের দিকে বিক্রি আরও বাড়বে। আজই (সোমবার) হবে মূল বিক্রি।
গরু কিনে বাড়ি ফিরছিলেন আলমগীর হোসেন নামে মিরপুরের এক ব্যবসায়ী। তিনি জানান, ৫৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কিনেছেন। দাম আরও বেড়ে যেতে পারে সে আশঙ্কায় তিনি আগেভাগেই কিনে ফেলেছেন বলে জানান। আলমগীর বলেন, মধ্যবিত্তদের চাহিদা ছোট ও মাঝারি সাইজের গরু। এজন্য এই সাইজের গরু তুলনামূলক দাম বেশি। বড় গরুর ক্রেতা কম। তাই ছোট গরুর তুলনায় বড় গরুর দাম কম। গাবতলী হাট কাউন্টারের কর্মী ওমর ফারুক বলেন, আজ সকাল বিক্রি জমে উঠেছে। আমাদের এখানে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সাড়ে চার লাখ টাকার গরু বিক্রি হয়েছে। এখানে ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদাই বেশি।
আফতাবনগর থেকে প্রচুর লোক গরু কিনে বের হয়ে আসছেন। প্রবেশপথের বাইরেও অনেককেই গরু নিয়ে বাড়ির দিকে ছুটতে দেখা যায়। তেজকুনিপাড়ার তোফাজ্জল রহমান নামের একজন মাঝারি আকারের একটি গরু নিয়ে ফিরছিলেন। তিনি বলেন, গরুটির দাম পড়েছে ৬২ হাজার টাকা। এর সঙ্গে আরও ৩ হাজার ১০০ টাকা হাসিল দিতে হয়েছে। গরুটি কিনতে পেরে তিনি খুব খুশি বলে জানালেন। এ সময় আরও কয়েকজনের কাছে জানতে চাইলে বলেন, কেউ কিনেছেন ৪৬ হাজার টাকায়, কেউ ৬২ হাজার টাকায়, ৯৮ হাজার টাকায়, ৬০ হাজার টাকায়, কেউবা আবার ৫২ হাজার টাকায় কিনেছেন গরু। তবে এবার গরুর দাম একটু বেশি বলে জানান আবুল কাসেম নামের একজন ক্রেতা।
ভেতরে একটি হাসিল ঘরে গিয়ে জানা গেল, প্রচুর গরু বেচাকেনা হচ্ছে। একটি হাসিল ঘরের হিসাবকারী (কাউন্টার) আবদুস সালাম জানান, আজ (রোববার) সকাল থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ টাকা হাসিল আদায় হয়েছে। আরেকটি হাসিল ঘরে গেলে হান্নান সরকার নামের একজন হাসিল আদায়কারী বলেন, তাদের হাসিল ঘরে সকাল থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত প্রায় ৬০০ গরু বিক্রির তথ্য নিবন্ধন করা হয়েছে। তিনি জানান, এই হাটে এ রকম ১০টি হাসিল ঘর রয়েছে।
অন্যদিকে এবার গরু বিক্রি করে বিক্রেতারাও বেশ খুশি। তাদেরই একজন বাহার আলী। তিনি ঝিনাইদহের হরিণাকু-ু থেকে ৫০টি গরু নিয়ে এসেছিলেন। এর মধ্যে ১৭টি বাকি আছে, বাকি গরুগুলো এরই মধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। তিনি বলেন, লাভের পরিমাণে তিনি খুশি। তাঁর গরুগুলো ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন বলে জানালেন। গরুর আমদানি এবং দামে বিক্রেতারা যেমন খুশি, তেমনি ক্রেতারাও বেশ সন্তুষ্ট। তবে আজ সোমবার দাম বাড়তে পারে বলে তিনি ধারণা করছেন
রাজধানীর আফতাবনগর পশুর হাটে বিপুল সংখ্যক ছাগল আনা হয়েছে বিক্রির জন্য। যার দাম ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। যা একই হাটে ওঠা বড় আকৃতির দেশি গরুর চেয়ে দাম বেশি। তবে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দাম হাকালেও ৬০/৮০ হাজার টাকা বিক্রি-ই বিক্রেতার প্রত্যাশা। এখন পর্যন্ত দু-চারটে যা বিক্রি হয়েছে, তা এ দামেই। কুষ্টিয়ার আরপাড়া থেকে ৭টি খাসি নিয়ে আফতাবনগর কুরবানির হাটে এসেছেন খন্দকার আরিফুল ইসলাম মিলন। এরই মধ্যে ৬০ হাজার টাকা করে তিনটি খাসি বিক্রি করেছেন তিনি। বাকি ৪টি খাসির মধ্যে বড়টির দাম হাঁকাচ্ছেন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। দাম শুনে অনেকেই টিপ্পনি কেটে চলে গেলেও কেউ কেউ খাসিটির দাম ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত বলেছেন- দাবি মিলনের। প্রায় ৮০ কেজি ওজনের এই খাসিটি ৮০ হাজার টাকার কম হলে সোজা কুষ্টিয়ায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন বলে জানান মিলন।
এদিকে সকালে কমলাপুর হাটে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। রোদ-বৃষ্টির ভয়ে তাঁবু টানিয়ে সারিবদ্ধভাবে বেঁধে রাখা হয়েছে শত শত গরু। আশপাশে দাঁড়িয়ে আছেন বিক্রেতারা। হাতেগোনা দু-একজন ক্রেতা হাটে আসলেও দাম শুনে ফিরে যাচ্ছেন। সিরাজগঞ্জের গরু ব্যবসায়ী ইদ্রিস আলী বলেন, ৬টি গরু নিয়ে বৃহস্পতিবার হাটে এসেছি। সকাল পর্যন্ত মাত্র দুটি গরু বিক্রি হয়েছে। ঈদের আর একদিন বাকি থাকলেও হাটে ক্রেতার উপস্থিতি অনেক কম। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থেকে গরু নিয়ে আসা আশরাফুল ইসলাম আশা প্রকাশ করে বলেন, ক্রেতা সংখ্যা কমবেশি যাই হোক ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা আছে। বড় গরু বিক্রি হচ্ছে কম। বিশেষ করে লাখ টাকার বেশি দামের গরু। আরেক ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, অনেক ক্রেতাই ভাবছেন শেষদিনে গরুর দাম কমে যাবে, তাই অপেক্ষা করছেন। আবার অনেকেই এসে দাম জিজ্ঞেস করে চলে যাচ্ছেন।  তবে হাটে আসা ক্রেতাদের অভিযোগ বেপারি বা গরুর মালিকরা প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দাম চাইছেন। তাই গরু কিনতে দেরি করছেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী মো. তারেক বলেন, আমার বাজেট ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু এ দামের গরু হাঁকা হচ্ছে ৮০-৯০ হাজার টাকা। তাই এখনোও কেনা সম্ভব হয়নি। আরেক ক্রেতা হারুনুর রশিদ বলেন, রাতে গরু বিক্রি বেশি হয়। ঈদের একদিন বাকি আছে, দেখা যাবে অনেকেই দিনে না এসে রাতে আসবেন। তারও অভিযোগ, বিক্রেতারা অতিরিক্ত দাম চাইছেন।
পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জ খেলার মাঠ। এ মাঠে বসেছে কুরবানির পশুর অস্থায়ী হাট। হাটের প্রধান আকর্ষণ মুন্সীগঞ্জের ‘মীর কাদিমের গাভী।  গতকাল সকালে ৩০০ থেকে ৩৫০টি গাভী হাটে তোলা হয়েছে। বিভিন্ন আকারের এসব গাভীর অধিকাংশের গায়ের রঙ ধবধবে সাদা। তবে কিছু রয়েছে লালচে রঙের। সব গাভীরই সিং খাড়া, চোখ কাজল কালো, তুলতুলে শরীর।
হাটে অন্যান্য গরুর তুলনায় মীর কাদিমের গাভীর দাম আকাশচুম্বী। চার মণ মাংস পাওয়া যাবে এমন একটি গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। তারপরও মীর কাদিমের গাভী নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে রহমতগঞ্জ মাঠে। মুন্সীগঞ্জের মীর কাদিম পৌরসভার রিকাবি বাজার থেকে চারটি গরু রহমতগঞ্জ হাটে তুলেছেন রফিকুল ইসলাম। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দুটি গরু বিক্রি করেছেন তিনি।  রফিকুল ইসলাম বলেন, মীর কাদিম থেকে আমরা আজ হাটে এসেছি প্রায় ১৫০ জন। ৩০০ থেকে ৩৫০টি গরু হাটে নিয়ে আসা হয়েছে। আমি চারটি গরু নিয়ে এসেছি, এর মধ্যে দুটি বিক্রি হয়েছে। সবাই গরুগুলো বিক্রি করে আজই বাড়ি ফিরবো। গরু নিয়ে আমাদের হাটে বসে থাকতে হয় না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ