ঢাকা, সোমবার 12 September 2016 ২৮ ভাদ্র ১৪২৩, ৯ জিলহজ্ব ১৪৩৭ হিজরী
Online Edition

রাজধানীতে কুরবানির বর্জ্য অপসারণে ১২ হাজার ৪৮২ কর্মী

তোফাজ্জল হোসেন কামাল :কুরবানির পশু জবাইয়ের জন্য ঢাকার দু‘সিটি কর্পোরেশন নির্ধারিত স্থান‘র সংখ্যা এ বছর ১১‘শ ৫২টি । এ ছাড়াও অনির্ধারিত স্থানে পশু জবাই দেবেন নগরবাসী । এবারের কুরবানি ঈদে রাজধানীতে ৩ লক্ষাধিক পশু জবাই হবে বলে ধরণা করছেন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কতৃপক্ষ। আর এ থেকে নগরীতে কমপক্ষে ৩০ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত বর্জ্য উৎপাদন হবে। বিগত বছরগুলোতে কুরবানির পশুর বর্র্জ্য অপসারণে যে হিমশিম অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়েছিল ,তার পূর্ব অভিজ্ঞতা নিয়েই এবার বাড়তি প্রস্তুতি নিয়েছে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন । সংস্থা দুটিই জানিয়েছে ,এ বছর পৃথকভাবে ১২ হাজার ৪৮২ জন কর্মী গোটা রাজধানীতে কুরবানির বর্জ্য অপসারণে কাজ করবে। তাদের ওপর ভরসা করেই ৪৮ ঘন্টায় বর্জ্য অপসারণের আশা করছেন দু‘মেয়রই । অবশ্য তারা এ আশাবাদের সাথে নগরবাসীর সহায়তাও চেয়েছেন ।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি ) সূত্র জানিয়েছে , বর্জ্য অপসারণে এবার ৯ হাজার ২৫২ জন পরিচ্ছন্ন কর্মীর পাশাপাশি পর্যাপ্ত সরঞ্জামও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বেও প্রতিটি অঞ্চলে গঠন করা হয়েছে একটি করে মনিটরিং সেল। এজন্য নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। বাতিল করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীদের ছুটি। গত বছর ঈদে উৎপাদিত বর্জ্য অপসারণ করতে ৭২ ঘণ্টা সময় লেগেছিলো। এ বছর সময় বেধে দেয়া হয়েছে ৪৮ ঘণ্টা। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মতে পশু জবাই দিতে নতুন ইউনিয়নসহ করপোরেশন এলাকায় ৫০৪টি স্থান নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে এসব স্থানে থাকছে তাবু ও সামিয়ানা।
সূত্রমতে , এ বছর দক্ষিণ সিটি এলাকার নিয়মিত ৫ হাজার ২০০ পরিচ্ছন্ন কর্মীর পাশাপাশি অতিরিক্ত এক হাজার ৫২ জন করে দুই দিনে দুই হাজার ১০৪ জন কর্মী নিয়োজিত থাকবে। ১৪টি হাটের বর্জ্য অপসারণে দৈনিক আরো এক হাজার ৪৩৪ জন করে তিন দিনে ৪ হাজার ৩০২ জন কর্মী নিয়োজিত থাকবে। চামড়ার উচ্ছিষ্ট বর্জ্য অপসারণে পোস্তা ও হাজারীবাগ এলাকায় প্রথম তিন দিন ৬০ জন হিসেবে ১৮০ জন এবং পরবর্তী দিন ৫৫ জন করে ১৬৫ জন শ্রমিক কাজ করবে। ঈদ পরবর্তী সময়ে বিশেষ সড়কগুলোর জন্য ২১০ জন শ্রমিক কাজ করবে। এ ছাড়া প্রাইমারি কালেকশন সার্ভিস প্রোভাইডারের (পিসিএসপি) তিন হাজার কর্মী ও ৬০০ ভ্যান পরিচ্ছন্ন কাজে নিয়োজিত থাকবে। সব মিলিয়ে দক্ষিণ এলাকায় ৯ হাজার ২৫২ জন পরিচ্ছন্ন কর্মী নিয়োজিত থাকবে। 
সূত্র জানায় ,কুরবানি বর্জ্য অপসারণে ১৪টি পে-লোডার, ৪টি টয়ার ডোজার, ৬০টি ডাম্পার, ৪টি ট্রেইল, ২টি প্রাইম মোভার ও ২টি ব্যাক-হো লোডার নিয়োজিত থাকবে। এ ছাড়া সেনাবাহিনী, নৌ-বাহিনী, রাজউক, তমা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ ও আব্দুল মোমেন লিমিটেড থেকে পে-লোডার, ডাম্পট্রাক সংগ্রহ করে কুরবানির পশুর হাট পরিষ্কারের কাজে ব্যবহার করা হবে। ৮৫টি কন্টেইনার ক্যারিয়ার এবং ১৬টি কম্পেক্টরসহ নিয়মিত ৩২৫টি কন্টেইনার ব্যবহার হবে। অতিরিক্ত আরো ৪০টি কন্টেইনার বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হবে। পরিচ্ছন্ন কাজে ১২৫টি খোলা ট্রাক, ৮৫টি কন্টেইনার ক্যারিয়ার এবং ১৬টি কম্পেক্টরসহ নিয়মিত ৩২৫টি কন্টেইনারের পাশাপাশি অতিরিক্ত আরো ৪০টি কন্টেইনার স্থাপন করা হবে।
ঈদের নামাযের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে ৫টি করে ৫৭টি ওয়ার্ডে মোট ২৮৫টি এবং নতুন ৮টি ইউনিয়নে ৪০টিসহ মোট ৩২৫টি স্থানে প্যান্ডেল নির্মাণ করা হবে। পশু জবাইয়ের নির্ধারিত স্থানে প্রতিটি ওয়ার্ডে ৫টি করে ৫৭টি ওয়ার্ডে ২৮৫টি এবং নতুন ৮টি ইউনিয়নে ৪০টিসহ মোট ৩২৫টি স্থানে বৃষ্টি প্রতিরোধক ত্রিপলসহ সামিয়ানা ও ব্যানার টানানো হবে। এ ছাড়া বর্জ্য অপসারণ করতে দুই লাখ ১০ হাজার চটের ব্যাগ বিনামূল্যে সরবরাহ করা হবে। পরিচ্ছন্ন কর্মীদের মধ্যে ঝাড়ু, বেলচা, কোদালসহ অনুসাঙ্গিক যন্ত্রপাতি থাকবে।
সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রধান সড়কে পশুর রক্ত ও বর্জ্য পানি দিয়ে ধুয়ে দিতে করপোরেশনের নিজস্ব ৯টি পানির গাড়ির পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসা, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী ও নৌ-বাহিনী থেকে প্রাপ্ত গাড়ি সরবরাহ করা হবে। সরু গলির জন্য প্রতিটি ওয়াডে একটি করে ৫৭টি গাড়ি থাকবে। এ ছাড়া এক হাজার লিটার জীবানু নাশক তরল ও ৩০ টন ব্লিসিং পাউডার ছিটানোর জন্য দেয়া হবে। 
ঈদ শেষে কুরবানি পশুর হাট দ্রুত পরিষ্কার, ক্রেতা-বিক্রেতাদের অভিযোগ ও পরামর্শ এবং জন সচেতনা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিটি পশুর হাটে একটি করে মিনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। হাটগুলোতে থাকছে মেয়রের আহ্বান সম্বলিত ডিজিটাল ব্যানার-ফেস্টুন। ঈদের পূর্বের দুই দিন প্রতিটি ওয়ার্ডে সচেতনতামূলক মাইকিং করা হবে। এ ছাড়া এক লাখ ৫ হাজার লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। থাকছে একাধিক গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপনও। ঈদের দিন বেলা ২টায় ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকন আনুষ্ঠানিক বর্জ্য অপসারণ কাজের উদ্বোধন করবেন বলে জানা গেছে। 
এবারের  প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, ’৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বর্জ্য অপসারণ করতে যা যা করা প্রয়োজন সবই করবো। এ জন্য পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। আশা করি বর্জ্যরে গন্ধ ছড়ানোর আগেই নগরী পরিষ্কার হয়ে যাবে।’
এ দিকে , নগরবাসী ও মিডিয়ার সহযোগিতায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরুর ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ঢাকা শহরের কুরবানির পশুর বর্জ্য সম্পূর্ণ অপসারণের ঘোষণা দিয়েছেন উত্তরের মেয়র আনিসুল হক। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি ) সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়ে মেয়র জানান গাবতলীর পশু হাটের পাশাপাশি নগরবাসীর সুবিধার্থে এবার ৮ কোটি ৩৫ লক্ষ ১৬ হাজার ৭৮৭ টাকার বিনিময়ে ৮ টি অস্থায়ী পশু হাট ইজারা দেয়া হয়েছে। এসব পশুর হাটে সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে মোবাইল টিম কর্মরত থাকছে। হাটের বর্জ্য দ্রুত অপসারণের জন্য তৈরি রয়েছে বর্জ্যবাহী পর্যাপ্ত সংখ্যক যানবাহন ও পরিচ্ছন্নকর্মী। হাটগুলোর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার জন্য ব্লিচিং পাইডার, ফিনাইল ও স্যাভলন মিশ্রিত পানি ছিটানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ডিএনসিসি সূত্র জানায় , এবার কুরবানির পশুর বর্জ্য দ্রুত অপসারণের সুবিধার্থে নগরবাসীর জন্য ২ লাখ পলিব্যাগ সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রায় সবগুলো ওয়ার্ডের প্রত্যেকটিতে অন্ততঃ ৫ টি করে ১৯৬ টি স্থানে ডিএনসিসি’র পক্ষ থেকে সামিয়ানা টানানো ছাড়াও কুরবানির পশু জবাইয়ের জন্য মাওলানা ও কসাইসহ যাবতীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর বাইরে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়ও কিছু স্থানে পশু জবাই করা যাবে। সবমিলে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৬৪৮ টি স্থানে কুরবানির পশু জবাইয়ের জন্য ৮২৪ জন ইমাম এবং ৭৫৫ জন কসাই নিযুক্ত থাকবেন। পশু জবাইয়ের পর ফিনাইল ও স্যাভলন মিশ্রিত পানি দিয়ে প্রতিটি স্থান পরিষ্কার করা হবে। এসম্পর্কিত মাইকিং এবং ৫ লক্ষ ৫০ হাজার লিফলেট বিতরণ কাজ শুরু হয়েছে। টেলিভিশন, পত্রিকা, রেডিও এবং ভ্রাম্যমাণ প্রচারণার জন্য ৬ টি গাড়ীর সাহায্যে ৭ দিনব্যাপী ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
ডিএনসিসি’র ২২২৫ জন পরিচ্ছন্নকর্মীর সাথে নিয়মিত আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে ১০০৫ জন পরিচ্ছন্নকর্মী নিযুক্ত থাকেন। ঈদে অতিরিক্ত আরও পরিচ্ছন্নকর্মী নিযুক্ত করা হবে। এই বিশাল কর্মীবাহিনীর পাশাপাশি বর্জ্যব্যবস্থাপনা বিভাগের যান্ত্রিক বহরে রয়েছে নিজস্ব ১৩০ টি আধুনিক বর্জ্যবাহী ট্রাক, ১৬ টি ডাম্পার, ৮টি পেলোডার, ৩টি টায়ার ডোজার, ১ টি প্রাইম মুভার, ২টি ট্রেইলর, ১ টি এক্সকেভেটর ও ৩ টি চেইন ডোজার। প্রতিদিনের ২ হাজার ৫০০ টন বর্জ্যরে পাশাপাশি ঈদ উপলক্ষে প্রায় ৯ হাজার টন অতিরিক্ত বর্জ্য অপসারণ কাজে গতিশীলতা বৃদ্ধির জন্য আরও ৭০ টি ট্রাক, ৬ টি ডাম্পার, ২ টি এক্সকেভেটর, ১ টি চেইনডোজার ও ১ টি প্রাইম মুভার ভাড়া নেওয়া হয়েছে। পশুর হাটের বর্জ্য অপসারণে ঈদের পূর্ব রাতে আরো ১০ টি ট্রাক নিয়োজিত করা হবে। পশুর হাট এবং কুরবানিকৃত পশুর বর্জ্য অপসারণের পর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে ডিএনসিসি’র পানির গাড়ীসহ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং নৌবাহিনী থেকে ৭ টি পানিবাহী গাড়ী ঈদের দিন সকাল থেকেই নিয়োজিত রাখা হবে।
সূত্র জানায় , নগরবাসীর কুরবানির পশুর বর্জ্য দ্রুত অপসারণের জন্য প্রতিটি এলাকায় থাকছে পর্যাপ্ত ভ্যান সার্ভিসের ব্যবস্থা। পশুর বর্জ্য সিটি কর্পোরেশনের নির্ধারিত ডাস্টবিনে ফেলতে অসমর্থ হলে তা ডাস্টবিনে ফেলার জন্য এই ভ্যান সার্ভিসের সহায়তা গ্রহণ করা যাবে। পাশাপাশি পশুর বর্জ্যরে দ্বারা যেন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি না হয় সে লক্ষ্যে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে ভ্যানগাড়ীতে করে স্যাভলন ও ফিনাইল মিশ্রিত পানি ছিটানোর ব্যবস্থা রাখা হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য কন্ট্রোলরুম স্থাপন করা হয়েছে। ঈদের দিন দুপুর ১২ টা থেকে বনানী কমিউনিটি সেন্টারে নির্বাহী প্রকৌশলী (বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ) এর অফিসরুমে আরও একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হবে যা বর্র্জ্য অপসারণ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্নভাবে চালু রাখা হবে। ঈদ উপলক্ষে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচ্ছন্নতা কর্মীসহ কর্মকর্তা/কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ঈদের দিন দুপুর ২ টায় উত্তরা বা করাইল টিএন্ডটি কলোনির একটি অস্থায়ী পশুর হাট পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শুরু করা হবে বলে সূত্রটি জানায়।
উত্তরের মেয়র নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তাঁরা যেন এলাকার প্রধান রাস্তাগুলোর উপর যেখানে সেখানে কুরবানির পশু জবাই না করে নির্দিষ্ট স্থানসমূহে পশু জবাই এবং ডিএনসিসি’র সরবরাহকৃত পলিব্যাগের মধ্যে পশুর বর্জ্য ভরে পরিচ্ছন্নকর্মীদের জন্য রেখে দেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ