ঢাকা, সোমবার 12 September 2016 ২৮ ভাদ্র ১৪২৩, ৯ জিলহজ্ব ১৪৩৭ হিজরী
Online Edition

দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলাম

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : দরিদ্র ও দারিদ্র্য বর্তমান বিশ্বে একটি অন্যতম আলোচিত বিষয়। এ বিষয়ে পাশ্চাত্যের বস্তুগত ধারণার সাথে ইসলামী ধারণার কোন মিল নেই। ইসলাম ইহকাল এবং পরকালের কল্যাণে ধন-সম্পদ অর্জন ও ব্যয় করতে নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু পাশ্চাত্যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন দর্শনে পারলৌকিক বিষয়াদি তেমন প্রাসঙ্গিক বলে ধরা হয় না। যুগে যুগে মুসলমানদের মধ্যে এমনও দেখা গেছে এবং এখনো হয়তো বা তেমন মুসলমান খুঁজে পাওয়া যাবে যারা পারলৌকিক কল্যাণ কামনায় বা কেবল আল্লাহ্ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য ইহলোকে বিত্তশালী হওয়া প্রয়োজন মনে করেন না। এরা প্রচুর বিত্ত-বৈভবের অধিকারী হওয়া ও জৌলুসহীন জীবন যাপনে অভ্যস্ত। আল্লাহ্ তাআলার ইবাদতে বিঘ্ন ঘটতে পারে বিবেচনা করে ইহলৌকিক ভোগ-বিলাস তাঁরা এড়িয়ে চলেন। যেটুকু বৈষয়িক সম্পদ হাতে না রাখলে আল্লাহ্ তা’আলার ইবাদতে মনের একাগ্রতা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সে সামান্যটুকু হাতে রেখেই তাঁরা তুষ্ট। বৈষয়িকভাবে তাঁরা নিতান্তই দরিদ্র জীবন যাপন করলেও আত্মার পরিপুষ্টি ও সমৃদ্ধিতে তাঁরা অনেক মহান এবং উন্নত। এই উন্নত ও মহান আত্মা তাঁরা মহান আল্লাহ্র প্রতি নিবেদন করেন। কিন্তু তাই বলে ইসলাম দারিদ্র্যকে আদর্শায়িত করে না, যেমন হালাল পথে অর্জিত ধনও প্রয়োজনাতিরিক্ত নিজ অধিকারে রাখাকে প্রশ্রয় দেয় না। শরীয়তের বিধান অনুসারে উত্তরাধিকার বিধি ও যাকাত প্রদানের মাধ্যমে হালাল সম্পদের সুসমবণ্টনে ইসলাম বিশ্বাসী। ইসলাম দারিদ্র্যকে ভালবাসে, তবে দারিদ্র্যকে কামনা করেনা। এ নিবন্ধে দরিদ্র ও দারিদ্র্যকে প্রথমত পশ্চিমা বৈষয়িক দৃষ্টিকোন এবং দ্বিতীয়ত ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে এটাই দেখাতে চেষ্টা করা হয়েছে যে, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে দরিদ্র ও দারিদ্র্যের প্রতি ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিই উত্তম। নিবন্ধটি সাজানো হয়েছে এভাবে-দরিদ্র ও দারিদ্র্যের বস্তুতান্ত্রিক ধারণা, দরিদ্র ও দারিদ্র্য সম্পর্কে ইসলাম, ইসলামের দৃষ্টিতে দারিদ্র্যের কারণ।
আমরা সচরাচর দরিদ্র ও দারিদ্র্য শব্দ দুটি পশ্চিমা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে থাকি। এই বিবেচনায় বস্তুগত দারিদ্র্যই প্রাধান্য পেয়ে থাকে যা মূলত বস্তুগত সম্পদের মালিকানা ও ভোগ বিলাসের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ইসলাম দরিদ্র ও দারিদ্র্যকে কেবল সে দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে না। ইসলামের দৃষ্টিতে দরিদ্রকে মূলতঃ দু’ভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে: (১) বৈষয়িক বা বস্তুগত দরিদ্র এবং (২) আধ্যাত্মিক দারিদ্র্য। দ্বিতীয় প্রকারের দরিদ্র যা ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সাথে সম্পৃক্ত তা পশ্চিমা অর্থনৈতিক আলোচনায় তেমন একটা প্রাধান্য পায় না। এমন কি বস্তুগত দরিদ্র নিরসনের উপায় অবলম্বনের ক্ষেত্রেও যে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক বিধিবিধান মেনে চলতে হয়, তার উপরও পশ্চিমা অর্থনীতি তেমন গুরুত্ব আরোপ করে না। আল্লাহ বলেন: “তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না”। “আল-কুরআন, ৪;২৯” ইসলাম এ ক্ষেত্রে মানবজাতিকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়, কারণ ইহকালই শেষ কথা নয়। ইহকালের কর্মকা-ের জন্য প্রত্যেককে পরকালে জবাবদিহি করতে হবে। তাই ইহকাল ও পরকালে কল্যাণকর এমন আর্থিক জীবন যাপনের প্রতি সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে আল্লাহ বলেন: “মানুষের মধ্যে যাহারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদিগকে ইহকালেই দাও বস্তুত পরকালে তাহাদের জন্য কোন অংশ নাই। আর তাহাদের মধ্যে যাহারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দাও এবং আখিরাতে কল্যাণ দাও এবং আমাদিগকে অগ্নির শান্তি হইতে রক্ষা কর-তাহারা যা অর্জন করিয়াছে তাহার প্রাপ্য অংশ তাহাদেরই। বস্তুতঃ আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর।” “আল-কুরআন, ২:২০০-২০২” অধিকন্তু আল্লাহ আরো বলেন: “পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক ব্যতীত আর কিছুই নয় এবং যাহারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাহাদের জন্য আখিরাতের আবাসই শ্রেয়; তোমরা কি অনুধাবন কর না?” “আল-কুরআন, ৬:৩২” কেননা “জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিবে”। “আল-কুরআন, ৩:১৮৫” “এবং তোমাদের মৃত্যু হইলে অথবা তোমরা নিহত হইলে আল্লাহরই নিকট তোমাদিগকে একত্র করা হইবে।” “আল-কুরআন, ৩:১৫৮” আল্লাহ বলেন: “শুধু আমাকে ভয় কর”। “আল-কুরআন, ৫:৩” সুতরাং এ আল্লাহভীতিই পার্থিব জীবনে ও পারলৌকিক জীবনে কল্যাণ ও সাফল্য অর্জনের প্রধান নিয়ামক। এ দৃষ্টিকোণ থেকেই আমাদেরকে দরিদ্র ও দারিদ্র্যের সংজ্ঞা নিরূপণ করতে হবে, পশ্চিমা নীতি-আদর্শহীন বস্তুগত অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়।
দরিদ্র ও দারিদ্র্যের বস্তুতান্ত্রিক ধারণা : ১. দরিদ্র ও দারিদ্র্যের বস্তুতান্ত্রিক ধারণা: পাশ্চাত্যের বস্তুতান্ত্রিক ধারণা অনুযায়ী দারিদ্র্যের পরিমাপ কি কেবল জনপ্রতি প্রয়োজনীয় কেলরি গ্রহণের মাত্রার ভিত্তিতে শরীর ঠিক রেখে বেঁচে থাকাটাই জরুরি বুঝতে হবে? নাকি জীবনের সাথে যুক্ত অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ইত্যাদিরও প্রয়োজন আছে? এ ছাড়াও যে বিষয়টি অধিক বিবেচনার দাবি রাখে তা হলো দারিদ্র্যের ধারণাটি কি দেশ কালের প্রেক্ষিতে ‘অবিমিশ্র’, ‘আপেক্ষিক’, নাকি ‘পরিবর্তনশীল’? অর্থাৎ দরিদ্র কি এমন একটি প্রপঞ্চ যা সামাজিক ও ঐতিহাসিক পারিপার্শ্বিকতা দ্বারা নির্ধারিত, নাকি এমন একটি অবস্থান যা কতিপয় সর্বকালীন স্থির সূচক দ্বারা নির্ধারিত।
যে আর্থিক অবস্থাকে প্রায় শতবর্ষ পূর্বে দারিদ্র্য বলা হত না, আজকের সমাজব্যবস্থায় তাকে দারিদ্র্য বলতে কেউ দ্বিধা করবে না। সমাজে যদি কমবেশি সকলেই একই জীবনযাত্রার মান ভোগ করে তবে সেখানে কেউ কাউকে দরিদ্র বলার সুযোগ থাকে না। সে সমাজে কেউ নিজেকে দরিদ্র ভাবারও কারণ থাকে না। অপরদিকে, কোন দেশ বা সমাজের ভেতরে কিংবা বাইরের কোন দেশে যদি ধন বৈষম্য থাকে এবং সমাজের একটি অংশ অপর অংশের তুলনায় অধিক বিত্তশালী বা ধনী হয়, তাহলে তুলনামূলকভাবে দরিদ্র অংশটির অবস্থান নির্ধারিত হয়ে যায়। অর্থাৎ দারিদ্র্যের অনুভূতি সমাজে বা বিভিন্ন দেশের মধ্যে ধন বৈষম্যের মাত্রার উপর নির্ভরশীল।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে “দারিদ্র্য সীমারেখা (poverty line) হয়েছে প্রতি বয়স্ক মানুষের জন্য বার্ষিক ১০,৮৩০ ডলার এবং চারজনের একটি পরিবারের বার্ষিক ২২,০৫০ ডলার আয়ের নিরিখে”। “মিতবাক, দিন বদলায়, দৈনিক ইত্তেফাক, ৫৮তম বর্ষ, ৩২৩ তম সংখ্যা, ২৩ নভেম্বর, ২০১০, পৃ. ১০” অপরদিকে, Bangladesh, with a 2000 gross national income per capita of just $380 which at purchasing power parity becomes $1,6050 per capita and with a (current population of 160 million) and with 29% of the population live on less than $1 a day (or less than $365 per year) and 78% live on less than $2 a day (or less than $730 per year)| ÒTodaro, Michael P. and Stephen C. Smith, Economic Development, Delhi: Eight Education, Published by Pearson Education (Singapore) Pte., Indian Branch,k 2008, p. 503” এ হিসেবের ভিত্তিতে আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশে গড়ে চার সদস্য বিশিষ্ট প্রায় চার কোটি পরিবারের প্রতিটির বাৎসরিক আয় প্রায় ৬,৬০০ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে মোট পরিবার সংখ্যার ২৯% অর্থাৎ ১.১৬ কোটি পরিবারের (জনপ্রতি দৈনিক ১ মার্কিন ডলারের কম হিসেবে) বার্ষিক আয় ১,৪৬০ মার্কিন ডলারের কম এবং ৭৮% অর্থাৎ ৩.১২ কোটি পরিবারের (জনপ্রতি দৈনিক ২ মার্কিন ডলারের কম হিসেবে) বার্ষিক আয় ২,৯২০ মার্কিন ডলার। এ হিসেব থেকে এটা সহজেই অনুমান করা যায় যে, মার্কিন মুল্লুকের যে সকল বয়স্ক সদস্য দারিদ্র্য সীমায় অবস্থান করছে তারা বাংলাদেশের গড়পরতা চার সদস্য বিশিষ্ট যে কোন পরিবারের তুলনায় সচ্ছল। আবার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যে সকল চার সদস্য বিশিষ্ট পরিবার বার্ষিক ২,৯২০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি বা কম আয় নিয়ে জীবন যাপন করছে তারা চার সদস্যের ঐ সকল পরিবারের তুলনায় সচ্ছল যাদের বার্ষিক আয় ১,৪৬০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি বা কম, যদিও এটা সত্য যে, উভয় শ্রেণীর বার্ষিক আয়ের পরিবারগুলোই মার্কিন মানদণ্ডে চরম দারিদ্র্য জীবন যাপন করছে। “বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানবেতর জীবনধারা যেমন দেখি, সে রকম দারিদ্র্য আমেরিকায় চোখে পড়েনি কোথাও। এর কারণ, বিকশিত বাজার অর্থনীতির দেশ আমেরিকায় আর আমাদের দেশের জাতীয় বা বিশ্বব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত দারিদ্র্যসীমারেখা এক নয়”। “মিতবাক, দিন বদলায়, দৈনিক ইত্তেফাক, ৫৮তম বর্ষ, ৩২৩তম সংখ্যা, ২৩ নভেম্বর, ২০১০, পৃ. ১০” এ থেকে এটা অনুমান করা যায় যে, দারিদ্র্য সীমায় অবস্থানরত মার্কিন মুল্লুকের বয়স্ক সদস্য ও চার সদস্য বিশিষ্ট পরিবারগুলোর বার্ষিক আয় বাংলাদেশের অধিকাংশ সচ্ছল পরিবার ও সদস্যদের সমান্তরাল বা বেশি বিবেচনা করা যেতে পারে।
ভেবে দেখুন, “সে প্রস্তর যুুগের আদিম সাম্যবাদী সমাজে, যখন সব মানুষ অতি অল্প পরিমাণ সম্পন্ন হলেও সমাজের মোট জীবন-উপকরণ সবাই মিলে সমান ভাগ করে নিয়ে জীবন যাপন করত, তখন কি কেউ নিজেকে দরিদ্র (কিংবা ধনী) বলে অনুভব করত? এসব বিবেচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, দারিদ্র হলো একাধারে একটি বস্তুনির্ভর বাস্তবতা এবং তার চেয়েও বেশি, তা হলো একটি সামাজিক অনুভব যা সামাজিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা দ্বারা কালপরিক্রমায় একেক মাত্রায় ও রূপে নির্ধারিত হয়ে থাকে। সমাজে বৈষম্যের মাত্রা দ্বারা বহুলাংশেই দারিদ্র্যের চেহারা ও অনুভব নির্ধারিত হয়”। “সেলিম, মুজাহিদুল ইসলাম, ক্ষুদ্রঋণের জন্য ‘খাই-খালাসী আইন’ প্রয়োজন, দৈনিক ইত্তেফাক, ৫৮তম বর্ষ, ৩২২তম সংখ্যা, ২২ নভেম্বর, ২০১০, পৃ. ১০।”
এ ধরনের ধন বৈষম্য ইসলাম সমর্থন করে না: “আল্লাহ্ জীবনোপকরণে তোমাদের কাহাকেও কাহারও উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। যাহাদিগকে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হইয়াছে তাহারা তাহাদের অধীনস্থ দাস-দাসীদিগকে নিজেদের জীবনোপকরণ হইতে এমন কিছু দেয় না যাহাতে উহারা এ বিষয়ে তাহাদের সমান হইয়া যায়। তবে কি তাহারা আল্লাহ্র অনুগ্রহ অস্বীকার করে?” “আল-কুরআন, ১৬:৭১।” এ থেকে এটাই অনুমিত হয় যে, ইসলাম ধন-সম্পদের ব্যক্তি মালিকানায় আস্থা রেখেই এর শরীয়া ভিত্তিক সমবণ্টনে বিশ্বাস।
২. পশ্চিমা পুঁজিবাদী সমাজে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের কারণ: এ কারণ ব্যাখ্যা করতে যেয়ে সংক্ষেপে বলা যায়- The cornerstone of the capitalist mode of production is, however, the fact that our present social order enables the capitalists to buy the labour power of the worker at its value, but to extract from it much more than its value by making the worker work longer than is necessary to reproduce the price paid for the labour power. The surplus-value gvK©m-Gi fvlvq: [The] increment or excess over the original value I call ‘surplus-value.’ The value originally advanced, therefore, not only remains intact while in circulation, but adds to itself a surplus-value or expands itself. It is this movement that converts into capital. Surplus-value .... splits up into various parts. Its fragments fall to various categories of persons, and take various forms, independent the one of the other, such as profit, interest [i.e. Usury], merchants’ profits, rent, & c. .... Whatever be the proportion of surplus-value the industrialist capitalist retain for himself, or yields up to others, he is the one who, in the first instance, appropriates it.’’ Vide. Marx, Capital. Vol. I. 1948. Pp. 149, 529-530’’ produced in this fashion is divided among the whole class of captalists and landowners, together with their paid servants, from the Pope to the Keiser down to the night watchman and bellow. We are not concerned here with how this distribution comes about but this much is certain: that all those who do not work can live only on the pickings from this surplus-value, which reach them in one way or another.’’ Marx, Karl, Frederick Engels, Selected Works, Moscow: Foreign Languages Publishing House, 1962. Vol. I, p. 558.’’
পুঁজিবাদী অর্থনীতির এ জাতীয় শ্রম-শোষণ ইসলামী অর্থনীতিতে নৈতিকতা পরিপন্থী। “দুর্ভোগ তাহাদের জন্য যাহারা মাপে কম দেয়, যাহারা লোকেদের নিকট হইতে মাপিয়া লইবার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাহাদের জন্য মাপিয়া অথবা ওজন করিয়া দেয়, তখন কম দেয়”। “আল-কুরআন, ৮৩:১-৩”। আরো বলা হয়েছে, “শ্রমিকের পারিশ্রমিক ও ঋণ পরিশোধ নিয়ে ধনী ব্যক্তিদের টালবাহানা করা জুলুম।” “মান্নান অধ্যাপক মাওলানা আব্দুল ও অন্যান্য সম্পাদিত, দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০০. পৃ. ৪৯৯ এই গ্রন্থে হাদিসটি বুখারী ও মুসলিম, সূত্র: মিশকাত, পৃ. ২৫১ থেকে উদ্ধৃত।” আল্লাহ্ বলেন: “প্রতিশ্রুতি পালন করিও; নিশ্চয় প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হইবে”। “আল-কুরআন, ১৭:৩৪।” শ্রমিকের ন্যায্য পারিশ্রমিক আদায়ে টালবাহানাকারীকে আল্লাহ্র দরবারে জবাবদিহি করতে হবে।
৩. পাশ্চাত্যের বস্তুতান্ত্রিক ব্যস্ততা: পুঁজিবাদে বস্তুগত সম্পদ আহরণে তৎপর পাশ্চাত্যের মডেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। “আমেরিকা জোর গলায় দাবি করে, তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিবার, বন্ধু ও বিশ্বাস। কিন্তু বাস্তবে তাদের জীবনের অধিকাংশ সময়ই ব্যয় হয় বস্তুগত নানা সংগ্রহ ও ভোগ্যপণ্যের চাহিদা পূরণের জন্য। কোন না কোন ভাবে আমেরিকানরা বাজারের দাস হয়ে পড়ছে। শুধু আমেরিকা নয়, বিশ্ব জুড়েই ক্রমশ বেশি বেশি মানুষ এই ভাগ্য বরণের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে”। “মিতবাক, দিন বদলায়, দৈনিক ইত্তেফাক, ৫৮তম বর্ষ, ৩২৩তম, সংখ্যা, ২৩ নভেম্বর, ২০১০, পৃ. ১০”। এ বিষয়ে আল্লাহ্ সম্যক্ অবহিত: “মানুষ ধন-সম্পদ প্রার্থনায় কোন ক্লান্তি বোধ করে না”। “আল-কুরআন, ৪১:৪৯”। সমগ্র মানবজাতির প্রতি আল-কুরআনের সাবধান বাণী: “হে মানুষ! নিশ্চয় আল্লাহ্র প্রতিশ্রুতি সত্য; সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাদিগকে কিছুতেই প্রতারিত না করে এবং প্রবঞ্চক (শয়তান) যেন কিছুতেই আল্লাহ্ সম্পর্কে তোমাদিগকে প্রবঞ্চিত না করে”। “আল-কুরআন, ৩৫:৫।” পাশ্চাত্যের বস্তুগত কল্যাণ সাধনায় ত্বরাপ্রিয় ব্যস্ত পরলোকে বিশ্বাসহীন মানুষ নিজের অজান্তেই নিজের অকল্যাণ করে বসে: এবং যাহারা আখিরাতে ঈমান আনে না তাহাদের জন্য প্রস্তুত রাখিয়াছি মর্মন্তদ শাস্তি। আর মানুষ অকল্যাণ কামনা করে; যেইভাবে কল্যাণ কামনা করে; মানুষ তো অতি মাত্রায় ত্বরাপ্রিয়”। “আল-কুরআন, ১৭:১০-১১”। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ