ঢাকা, বৃহস্পতিবার 20 September 2018, ৫ আশ্বিন ১৪২৫, ৯ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

কুরবানির আনুষ্ঠানিকতা এবং আধ্যাত্মিকতা

॥ মুহাম্মদ আবুল হুসাইন ॥

আসলে মুমিন জীবনে আল্লাহর আনুগত্যের বাইরে পৃথক কোন জীবন নেই। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে, প্রতিটি মুহূর্তকে আল্লাহর নিরংকুশ আনুগত্যের অধীনে আনা এবং আল্লাহর আনুগত্যের মোকাবেলায় অন্য সব আনুগত্যকে প্রত্যাখ্যান করাই হলো তাওহীদের মূলকথা। মানুষের অখণ্ড জীবনে আল্লাহর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাই হচ্ছে ঈমানের দাবী। পবিত্র কোরআনে মানুষের জীবনোদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, মানুষকে সৃষ্টিই করা হয়েছে কেবল মাত্র আল্লাহর গোলামী করার জন্য :

‘আমি জ্বিন ও মানব জাতিকে কেবল আমার ইবাদত-দাসত্বের জন্যই সৃষ্টি করেছি।’ -[সূরা আয যারিয়াত : ৫৬]

ইসলাম ধর্মের আনুষ্ঠানিক ইবাদত সমূহের তাৎপর্য

ইসলাম ধর্মে আনুষ্টানিক উপাসনা বা ইবাদত গুলোর তাৎপর্য এখানেই যে, এগুলো বাস্তবক্ষেত্রে বা কর্মজীবনে আল্লাহর আইন বা হুকুম পালনের জন্য মানুষকে প্রস্তুত করে। কারণ বাস্তব কর্মক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম পালন করতে গেলে অন্তর ও বাহির উভয় দিক থেকে নানা ধরনের বাধা মানুষের সামনে এসে দাঁড়ায়। মানুষের নফস বা প্রবৃত্তি যেমন তাকে বিভ্রান্ত করে, তেমনি সমাজে তার বা অন্যের প্রতিষ্ঠিত স্বার্থও তাকে কুমন্ত্রণা দেয়। এতসব বাধার পাহাড় ডিঙ্গিয়ে স্রষ্টার একনিষ্ঠ বান্দা হওয়া বা খাঁটি মুসলমান হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। এ কারণেই বাস্তব জীবনে আল্লাহর যথার্থ বান্দা হওয়ার জন্য ইসলামের আনুষ্ঠানিক ইবাদত বা মৌলিক ইবাদতগুলো মূলত এক বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের ভূমিকা পালন করে তাকে সারাক্ষণ আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের জন্য প্রস্তুত করে রাখে। এ ইবাদতগুলো মূলত আল্লাহর স্মরণ। মানুষের মনে যতক্ষণ আল্লাহর স্মরণ থাকবে ততক্ষণ তার পক্ষে কোন পাপ, অন্যায় বা বিবেকহীন কাজ করা সম্ভব নয়। একারণেই নামাজ, রোজা, হজ্জ্ব, যাকাত ইত্যাদি ইবাদতগুলো এমনভাবে চক্রাকারে বিন্যস্ত হয়ে মানুসের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে যে, কোন ব্যক্তি যদি এসব ইবাদতগুলোর যথার্থ তাৎপর্য বুঝে এগুলোকে পালন করে তাহলে তার জীবন শুদ্ধ ও পবিত্র না হয়ে পারে না।

উদাহরণ স্বরূপ নামাজের কথাই ধরা যাক। দিনে পাঁচবার নামাজ পড়া বাধ্যতামূলক। ফজর, যোহর, আসর, মাগরিব এবং এশা -এই পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ ছাড়াও আনুষঙ্গিক আরো অন্যান্য বিভিন্ন ওয়াক্তের নফল নামাজও রয়েছে। প্রতিদিন এই পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ ও নফল নামাজের মাধ্যমে একজন মুসলমানকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে আনুগত্যের মস্তক অবনত করতে হয়, সিজদা করতে হয়। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সারা দিনের বৈষয়িকতার নানা পর্যায়ে লোভ-লালসায়, সংসারের নানা প্রাচুর্যের মোহে মানুষ যাতে আল্লাহকে ভুলে পংকিলতায় জড়িয়ে না যায়, পাপ ও অশ্লিলতার খপ্পরে না পড়ে। এ কারণে পবিত্র কোরআনে নামাজকে আল্লাহর স্মরণ বা জিকর বলা হয়েছে। কারণ মানুষের অন্তরে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর ভয়, তাঁর স্মরণ জাগরুক থাকবে, ততক্ষণ তার পক্ষে পাপাচারে অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয় না। মানুষের অন্তরে সারাক্ষণ আল্লাহর স্মরণ, তাঁর ভয়, তাঁর মহব্বত জাগরুক রাখার জন্যই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ব্যবস্থাকে বিন্যস্ত করা হয়েছে।

একজন মুসলমানের দিনের শুরই হয় নামাজ অর্থাৎ আল্লাহর দরবারে মাথা নত করার মাধ্যমে আবার তার দিনের শেষও হয় - অর্থাৎ রাত্রিবেলা শয্যাগ্রহণও হয় পরম প্রভুকে সিজদা করার মাধ্যমে। এভাবে মুমিনের অন্তরে যখন আল্লাহর ভয় জাগরুক থাকে, তখন তার পক্ষে অনৈতিক বা বিবেক-বিরুদ্ধ কাজ করা সম্ভব হয় না। পাপাচার মুক্ত, অশ্লিলতামুক্ত জীবন গড়া তখন তার পক্ষে সম্ভব হয়। এ কারণেই পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন -

‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লিল ও পাপাচার থেকে বিরত রাখে।’ - [আনকাবুত : ৪৫]

অনুরূপভাবে রোজার কথাও বলা যায়। মাহে রমজানের এক মাসের সিয়াম-সাধনার কর্মসূচী মূলত আত্মশুদ্ধিরই এক দীর্ঘ-মেয়াদী বিরামহীন কর্মসূচী। মাহে রমজানের রোজা মূলত এক ধারাবাহিক সাধনার নাম। এই সাধনা হলো নফসের উপর; মানুষের বস্তুসত্তার উপর তার নৈতিকসত্তার বা তার বিবেকের নিয়ন্ত্রণকে বিজয়ী ও জোরদার করার সাধনা, পাশবিকতার উপর নৈতিকতার শৃংখল প্রতিষ্ঠার সাধনা।

সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর নির্দেশে, তাঁর সন্তোষ লাভের আশায় খাদ্য-পানীয়, যৌন-বাসনা, মিথ্যা, গীবত, অশ্লিল ও পাপাচার থেকে বিরত থাকার এই এক মাসের বিরামহীন সাধনার মাধ্যমে সমস্ত হারাম কথা ও কাজ থেকে ‘পরহেজ’ বা বিরত থাকার অভ্যাসের মাধ্যমে বৈষয়িক ও সামাজিক জীব মানুষ তার কলংকিত আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার সুযোগ পায়। এবং এভাবেই সে আল্লাহর একজন প্রিয় বান্দা - মুত্তাকী বা ‘পরহেজগার’ হতে পারে এবং এই পরহেজগার বা খোদাভীরু লোক তৈরি করাই হচ্ছে রোজার উদ্দেশ্য। পবিত্র কোরআনে রোজার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে :

‘হে ঈমান্দারগণ, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিলো, যাতে তোমারা মুত্তাকী (খোদাভীরু) হতে পারো।’ -[বাকারা : ১৮৩]

অনুরূপভাবে যাকাত এবং হজ্জের কথাও বলা যায়। ইসলাম মানুষকে পরিণত করতে চায় ‘ইনসানে কামেলে’। মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশই হলো ইসলামের লক্ষ। আল্লাহর রাসূল বলেছেন ‘নৈতিক চরিত্রের পূর্ণতা বিধানের জন্যই আমি আবির্ভুত হয়েছি।’ কাজেই ইসলামের কাক্সিক্ষত সমাজ হচ্ছে মানবিক আদর্শের সর্বোৎকর্ষমণ্ডিত সমাজ। হক-ইনসাফ ও পারস্পারিক সাম্য-সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা ইসলামী সমাজের মূল উদ্দেশ্য। ইসলাম একদিকে যেমন সম্পদের প্রতি মানুষের সীমাহীন লোভ-লালসাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, আবার অপর দিকে চায় ধনী-গরীবের মধ্যকার ব্যাপক বৈষম্যকে দূর করতে। এ কারণে যে কোন ভাবে - কোন ধরনের বাছ-বিচার না করে অবৈধভাবে সম্পদ আয়ের উপর যেমন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, তেমনি সম্পদ ব্যায়ের ক্ষেত্রেও বল্গাহীন স্বাধীনতাও ইসলাম অনুমোদন করে না। অর্থাৎ ইসলাম ধর্ম বৈধ পথে অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে মানুষের স্বাভাবিক স্পৃহাকে রুদ্ধ করতে চায় না, তবে মানুষ যাতে সম্পদের গোলামে পরিণত হয়ে বিবেকবোধ ও মনুষ্যত্বকে বিসর্জন দিয়ে না বসে, সেজন্যই মানুষের বল্গাহীন অর্থ আয় ও ব্যয়ের উপর ‘হালাল-হারামের’ লাগাম পরিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রিত ও সংযত করতে চায়। আল কোরআনে বলা হয়েছে :

‘আল্লাহ তোমাদেরকে যে হালাল ও উৎকৃষ্ট জীবিকা দিয়েছেন তা গ্রহণ কর।’ -[আল মায়েদা : ৮৮]

কিন্তু সীমা লংঘন করতেও নিষেধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং অন্যের সম্পত্তি আত্মসাত করার উদ্দেশ্যে জেনে-শুনে বিচারকদের সামনে মিথ্যা বলো না।’ ‘আল্লাহ সীমা লংঘনকারীদের পছন্দ করেন না।’ এছাড়াও বলা হয়েছে ‘হালাল রুজি ইবাদত কবুলের পূর্ব শর্ত।’ অর্থাৎ ইসলাম মানুষকে ইতর প্রাণীর মত শুধু ভোগবাদী হিসেবে দেখতে চায় না। ভোগবাদের পরিবর্তে বরং ইসলাম মানুষকে ত্যাগের আদর্শেই উদ্বুদ্ধ করতে চায়, সম্পদ প্রেমের চেয়ে আল্লাহ প্রেমকেই মানবীয় আদর্শ হিসেবে স্থাপন করতে চায়। বলা হয়েছে :

‘কারো অনুগ্রহের প্রতিদান নয়, বরং তারা (মুমিন ব্যক্তিরা) ধন-সম্পদ দান করে আত্মশুদ্ধির জন্য। তার মহান প্রভুর সন্তুষ্টিই থাকে তার একমাত্র প্রত্যাশা। আর তিনি অবশ্যি (তার প্রতি) সন্তুষ্ট হবেন।’ -[লাইল : ১৮-২১]

এই স্পিরিটকে মূর্ত করার জন্যই যাকাতের বিধান দেয়া হয়েছে। যাকাতের উদ্দেশ্য হচ্ছে ধনী-গরীবের বৈষম্য নিয়ন্ত্রণ ও দারিদ্র-বিমোচন। ইসলাম যে ভ্রাতৃত্বের আদর্শে সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখায় অর্থনৈতিক বৈষম্য এই পথে এক বিরাট বাধা। এই বৈষম্য যত বৃদ্ধি পাবে পারস্পারিক ভ্রাতৃত্ববোধ তত নষ্ট হবে। এই ভ্রাতৃত্ববোধকে সুরক্ষা দিতে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দারিদ্র বিমোচনই হচ্ছে ইসলামের যাকাত ব্যবস্থা। যাকাত-ভিত্তিক অর্থনীতিই ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও দারিদ্রমুক্ত সমাজব্যবস্থার গ্যারান্টি ও রক্ষাকবচ। যাকাত ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের অন্যতম। নামাযের পরই এর গুরুত্ব। কোরআনের প্রায় আয়াতেই নামাজের সাথেই যাকাতের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ একজন ধার্মিক, নামাজি মানুষের কৃপণ, কারুন হওয়ার সুযোগ নেই। একজন সত্যিকার ঈমানদার-মুসলমান ব্যক্তি অবশ্যই দানশীল এবং গরীব মানুষের প্রতি রহমদীল হবেন, মুসলমান অবশ্যই মানুষকে ভালোবাসবেন। বলা হয়েছে:

‘যারা কার্পণ্য করে এবং মানুষকে কার্পণ্যের নির্দেশ দেয়; আর যে (গরীবদের থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে জেনে রাখুক, আল্লাহ অভাবমুক্ত ও প্রশংসিত।’ -[হাদীদ : ২৪] ;
‘শয়তান তোমাদরকে দারিদ্রের ভয় দেখায় আর কার্পণ্যের নির্দেশ দেয়। আর আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্র“তি প্রদান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ -[বাকারা : ২৬৮]

অনুরূপভাবে হজ্জ্বেরও উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলিম উম্মাহ’র মধ্যকার সৌ-ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যকে সংহত করা। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, ইসলামের আনুষ্ঠানিক ইবাদতগুলো মূলত আত্মশুদ্ধি এবং ইসলামের মূল স্পিরিটকে জাগ্রত করার উদ্দেশ্যে গৃহীত কতগুলো মৌলিক প্রোগ্রাম। বৃহত্তর কর্মক্ষেত্রে মানুষকে যথার্থ আত্মসমর্পনকারী তথা সত্যিকার মুসলমানে পরিণত করাই এ আনুষ্ঠানিক ইবাদতগুলোর উদ্দেশ্য।

এর ফলে একদিকে জায়নামাজে বা আনুষ্ঠানিকভাবে আবার অন্যদিকে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের কঠিন ময়দানে আল্লাহর দরবারে আনুগত্য-সিজদার মাধ্যমের নিরন্তর কর্ম-প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মুসলমানের ব্যক্তি ও সমাজ-সংস্কৃতি শুদ্ধরূপ লাভ করে পৃথিবী শান্তি ও সুন্দরের আবহ নির্মাণ করে।

কুরবানির তাৎপর্য:

মুসলমানদের প্রধান দুটি ধর্মভিত্তিক উৎসবের একটি হল ঈদুল আযহা বা কুরবানির ঈদ। বাহ্যত কুরবানি হচ্ছে নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পশু জবেহ করা। শরিয়তের দৃষ্টিতে ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ সন্ধ্যা পর্যন্ত নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু জবেহ করাকে কুরবানি বলে। এই দিনে ঈদ পালন করা হয়ে থাকে এ জন্য একে কুরবানির ঈদ বলে। এদিনের অন্য নাম ঈদুল আজহা। আরবি শব্দ আজহা অর্থ কুরবানির পশু। যেহেতু এদিনে কুরবানির পশু জবেহ করা হয়। তাই একে ঈদুল আজহা বলা হয়। কুরআনে এসেছে- “তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর ও পশু কুরবানি কর।” (সূরা আল কাউসার-২)

এই ঈদে পশু কুরবানির মাধ্যমে মানুষ একদিকে যেমন ত্যাগস্বীকারের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে আল্লাহর আনুগত্যের অধীনে থাকার সুযোগ পায়। অন্য দিকে তার মাঝে লুকিয়ে থাকা পশুত্বকে বিসর্জন দিয়ে মনুষ্যত্ববোধের জাগরণের সুযোগ পেয়ে থাকে।

পারিভাষিক অর্থে কুরবানি : ইমাম রাগিব বলেন- “যে বস্তু দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। চাই তা জবেহকৃত বা অন্যকোন দান খয়রাত হোক।” তাফসিরে মাযহারির বর্ণনা মতে- “আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে নজর-মানত রূপে যা পেশ করা হয় তাকেই কুরবানি বলে।” ইমাম আবু বকর জাস্সাস বলেন- “আল্লাহর রহমতের নিকটবর্তী হওয়ার জন্য কৃত প্রত্যেক নেক আমলকে কুরবানি বলে।”

কুরবানির ইতিহাস : হযরত আদম (আ) থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত প্রতিটি ধর্মে, সকল যুগে কুরবানির প্রথা চালু রয়েছে। মানব ইতিহাসে নজিরবিহীন কুরবানি পেশ করেন হযরত ইবরাহিম (আ)। আল্লাহ তায়ালা হযরত ইবরাহিম (আ)কে বিভিন্ন পরীক্ষায় অবতীর্ণ করেছেন এবং ইবরাহিম (আ) সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। নিজ পুত্র জবেহ করার মত কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন হযরত ইবরাহিম (আ)। এ বিষয়ে সূরা আস সাফফাতের ১০০ থেকে ১০৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- “তিনি বললেন হে প্রভু আমাকে নেক সন্তান দান করুন। অতঃপর আমি তাকে সুসংবাদ দিলাম অত্যন্ত ধৈর্যশীল সন্তানের (ইসমাঈল)। পরে যখন সে সন্তান তার সাথে দৌড়াদৌড়ি করে বেড়ানোর বয়সে পৌঁছলো তখন তিনি (ইবরাহিম আ) বললেন, হে বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি আল্লাহর হুকুমে তোমাকে জবেহ করছি। তুমি চিন্তা করে দেখ. তোমার অভিমত কী? তিনি (ইসমাঈল) বললেন, হে পিতা আপনি তাই করুন যা করতে আপনি আদিষ্ট হয়েছেন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন। অতঃপর যখন দু’জনই আল্লাহর আদেশ মানতে রাজি হলেন তখন তিনি (ইবরাহিম) পুত্রকে জবেহ করার জন্য শুইয়ে দিলেন। আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইবরাহিম তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। আমি এভাবেই নেক বান্দাদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এটি একটি বড় পরীক্ষা। আর আমি তাকে বিনিময় করে দিলাম এক বড় কুরবানির দ্বারা এবং যা পরবর্তীদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলাম। শান্তি বর্ষিত হোক ইবরাহিম (আ) এর প্রতি।”

কুরবানি আল্লাহ তায়ালার একটি বিধান। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- “তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং কুরবানি কর।” (সূরা আল কাউসার ২)

তাফসিরে রুহুল মাআনির ভাষ্যমতে- কতিপয় ইমাম ঐ আয়াত দ্বারা কুরবানি ওয়াজিব হওয়াকে প্রমাণ করেছেন। আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ পালন মূলত ওয়াজিব তথা ফরজ। তাই সামর্থ্যবান সকল মুসলমানের ওপর কুরবানি করা আবশ্যক।

রাসূল (সা) বলেছেন- “যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করে না সে যেন আমার ঈদগাহে না আসে।” (ইবনে মাজাহ ৩১২৩, হাদিসটি হাসান)

যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি ত্যাগ করে তাদের প্রতি এ হাদিসটি সর্তকবাণী।

আল্লাহু আকবার বলে আল্লাহর নামে কুরবানির পশু জবাই করার আগে একটি বিশেষ দোয়া পড়তে হয়। দোয়াটির বাংলা উচ্চারণ হল: ইন্নাস্সলাতি ওয়া নুসুকী ওয়া মাহ্ইয়া ইয়া ওয়া মামাতী লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন। লা শারীকালাহু ওয়া বি যালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমীন। এর অর্থ হচ্ছে: ‘বল, আমার নামাজ আমার কুরবানী আমার জীবন আমার মরণ সবকিছু আল্লাহ রাববুল আলামীনের জন্য। তার কোন শরীক নেই, এ নির্দেশই আমাকে দেয়া হয়েছে আর আমি হলাম সবার আগে তার অনুগত-ফরমারদার। -(সূরা আনআম-১৬২-১৬৩)

ঈমানের পথে চলতে গেলে, ইসলামের পথে তথা হকের পথে চলতে গেলে পদে পদে ধৈর্য, ত্যাগ, তিতীক্ষঅ, কুরবানি অপরিহার্য। আসলে ঈমানের অপরিহার্য দাবীই হচ্ছে ত্যাগ-কোরবানী। আমরা যখন ঈমানের ঘোষণা প্রদান করি তখন আমাদের উপর অপরিহার্য হয়ে পড়ে এ ঘোষণার সত্যতা প্রমাণ করা। আর তখনই আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় অসংখ্য বাঁধার পাহাড়। প্রতিষ্ঠিত কায়েমী স্বার্থবাদী তথা তাগুতি গোষ্ঠী র্মা র্মা কাট্ কাট্ করে তখন আমাদের দিকে তেড়ে আসে। আর তখনই প্রমাণ হয়ে যায় কার কতটুকু ঈমান আছে কিংবা ঈমানদারী আর পরহেজগারীর দাবীতে আসলে কে কতটুকু সৎ। কারণ তখন আমাদের অনেক প্রিয় জিনিস স্বেচ্ছায় ত্যাগ করতে হতে পারে কিংবা ঝাঁপিয়ে পড়তে হতে পারে কঠিন বিপদের মধ্যে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে :

‘মানুষেরা কি মনে করেছে যে, আমরা ঈমান এনেছি একথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে? আর তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? অথচ আমি তাদের পূর্ববর্তীদেরকে পরীক্ষা করেছি। ঈমানের দাবীতে কারা সত্যবাদী আর কারা মিথ্যাবাদী আল্লাহ অবশ্যই তা জেনে নিবেন। -[আনকাবুত : ২-৩]

“মুমিনদের বৈশিষ্ট্য এই যে, যখন তাদের মাঝে ফায়সালার জন্য আল্লাহ ও রাসূলের (বিধানের) প্রতি ডাকা হয়, তখন তারা বলে, আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম। আর এ ধরনের লোকেরাই প্রকৃত সফলকাম।” -[আন-নূর : ৫১]

‘তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত কোন কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ তোমাদের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু আল্লাহর জন্য ত্যাগ না করতে পারবে। তোমরা যা কিছুই কর আল্লাহ সে সম্পর্কে অবগত।’ -[আলে ইমরান : ৯২]

আসলে পশু কুরবানির আনুষ্ঠানিকতা তখনই যথার্থ হয়, যখন আমরা আমাদের বাস্তব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম পালন করতে যেয়ে ত্যাগ স্বীকার কিংবা কুরবানির নজরানা পেস করতে পারব। আর এর সাথে আরেকটি অপরিহার্য গুণ থাকতে হবে, তাহল ধৈর্য। যারা নফসের বিপক্ষে ঈমানদারীর উপর অটল থাকে, সমস্ত বাঁধা-বিপত্তিকে পায়ে ঠেলে যারা সুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির ব্যাপারেই থাকে পাগলপারা, সেসব সাচ্চা মুমিনদের জন্যই তাঁদের রবের তরফ থেকে নাযিল হয় রহমতের ফল্গুধারা। তাঁদের জন্যই অপেক্ষা করে সাফল্য ও বিজয় :

‘নিশ্চয়ই যারা বলে আমাদের প্রভু আল্লাহ, এরপর তাতে অটল থাকে, তাদের কাছে ফেরেস্তা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় কর না, চিন্তা কর না এবং তোমাদের প্রতিশ্র“ত জান্নাতের সুসংবাদ শোন।’-[হা-মীম-আস সিজদা : ৩০]

যারা প্রকৃত ঈমানদার তারা ভরসা করে আল্লাহর উপর। তারা বিশ্বাস করে আল্লাহই সর্বশক্তিমান।তিনিই আমাদের সত্যিকারের সাহায্যকারী। আল্লাহর সাহায্যের ব্যাপারে তারা কখনো নিরাশ হয় না। এ কারণে শয়তানের কোন ওয়াসওয়াসাই তাদেরকে ঈমানের পথ থেকে বিচ্যূত করতে পারে না। আল্লাহ বলেছেন :

‘কারণ আমার রহমত প্রতিটি জিনিসকেই পরিব্যাপ্ত করে রযেছে।’ -[আলআরাফ : ১৫৬]

‘হে নবী, আমার বান্দাহ যদি আমার তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে, তাহলে তাদের তুমি বলে দাও যে, আমি তাদের অতি নিকটে। যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি এবং উত্তর দিয়ে থাকি। কাজেই আমার আহ্বানে সাড়া দেয়া এবং আমার প্রতি ঈমান আনা তাদের কর্তব্য। এসব কথা তুমি তাদের শুনিয়ে দাও, হয়তো তারা সঠিক পথের সন্ধান পাবে।’ - [বাকারা : ১৮৬]

পক্ষান্তরে যারা দুর্বল ঈমানদার তারা শয়তানি শক্তির সামান্য আঘাতেই ভেঙে পড়ে এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে পড়ে। তারা অতি সহজেই শয়তানের খপ্পরে পড়ে বাতিলের সাথে হাত মিলায় এবং বাতিলকেই তাদের শুভাকাঙ্খি ও সাহায্যকারী মনে করে। ঐসব বিভ্রান্ত লোকেরাই যুগে যুগে স্রষ্টার দেয়া শাশ্বত সনাতন জীবন বিধান ইসলামকে বাদ দিয়ে বাতিল পথের অনুসারী হয়, হেদায়াতের পরিবর্তে গোমরাহিকে খরিদ করে নেয়। সেসব বিভ্রান্ত লোকদের উদ্দেশ্যেই আল্লাহ বলেছেন :

‘নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত থেকে অবিশ্বাসীগণ ছাড়া আর কেউ নিরাশ হয় না।’-[ইউসুফ : ৮৭]

‘যারা আল্লাহর পরিবর্তে অপরকে সাহায্যকারী রূপে গ্রহণ করে তাদের উদাহরণ মাকড়সা। সে ঘর বানায়। আর ঘর সমূহের মধ্যে মাকড়সার ঘরই তো অধিক দুর্বল। যদি তারা জানতো।’ -[আনকাবুত : ৪১]

প্রশ্ন হতে পারে, আনুষ্ঠানিক ইবাদত তো যথেষ্ট পালিত হচ্ছে, কিন্তু কাক্সিক্ষত ফলাফল কি আমরা পাচ্ছি? মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা বাড়ছে, রমজান মাসে মসজিদগুলোতে মুসল্লিদের উপচে পড়া ভীড়। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ লোক হজ্জ্ব পালন করছে, পশু কুরবানি করছে, কিন্তু নৈতিক মানের তো তেমন পরিবর্তন হচ্ছে না।

এর উত্তর হচ্ছে, আমরা ধর্মের আনুষ্ঠানিকতাকে যেভাবে গুরুত্ব দিচ্ছি, এর স্পিরিটকে সেভাবে গুরুত্ব দিচ্ছি না। স্পিরিট হলো ধর্মের প্রাণ। ধর্ম থেকে যখন তার স্পিরিট হারিয়ে যায়, তখন তা পরিণত হয় নি¯প্রাণ আনুষ্ঠানিকতায়। এ কারণেই আমরা দেখি একটি লোক জায়নামাজে দাঁড়িয়ে মহান প্রভু আল্লাহর উদ্দেশ্যে আত্মসর্ম্পনের ভঙ্গিতে দাঁড়াচ্ছে, রুকু করছে, সিজদা করছে এবং মুখে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও তাঁর সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করছে এবং আল্লাহর কালাম তেলাওয়াত করে তাঁর নিরংকুশ আনুগত্য করার এবং অন্য কারো আনুগত্য না করার ঘোষণা দিচ্ছে; আল্লাহকে একমাত্র প্রভূ ও অভিভাবক ও বন্ধু বলে জীবনের প্রতি মুহূর্ত ও প্রতি কাজে তাঁর উপর ভরষা করার স্বীকৃতি দিয়ে তাঁর রহমত ভিক্ষা করে মোনাজাত করছে অথচ সে ব্যক্তিই মসজিদ থেকে বের হয়ে আল্লাহর আইনের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।-Lighthouse ।। বাতিঘর ।।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ