ঢাকা, মঙ্গলবার 4 October 2016 ১৯ আশ্বিন ১৪২৩, ২ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

হযরত সুমাইয়্যা বিনতে খুব্বাত : নারী জাতির গৌরব

সুমাইয়্যা সিদ্দীকা : হযরত সুমাইয়্যা বিনতে খুব্বাত (রাঃ)। এক দৃঢ়চেতা নারী। পৃথিবীর তাবৎ মযলুমের প্রতিচ্ছবি। শহীদি মিছিলের অগ্রপথিক। নবুয়তের বাগানে ফোটা ক্ষণজন্মা এক মহীয়সী বীর নারী। সত্য পথের নির্ভীক এক যোদ্ধা। আদর্শের সাথে আপোষহীন প্রেরণার নাম সুমাইয়্যা (রাঃ)। আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্যের অনুপম উপমা তিনি। যিনি মহামহিম সত্তার সন্তুষ্টিকে নিজ প্রাণের চেয়েও প্রাধান্য দিয়েছেন। তার ভালোবাসার জন্য হাসিমুখে জীবন বিলিয়ে দিতে ও পিছপা হননি। ইসলামের প্রথম শহীদ হযরত সুমাইয়্যা (রাঃ) নারী জাতির গৌরব।
ক্রীতদাসী হিসাবে যার দিন-রাত শেষ হতো। সেই সুমাইয়্যা (রাঃ) এর নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হবে কেউ কি ভেবে ছিল কখনো? সমাজের চোখে নগণ্য এই নারীই একদিন বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত মর্যাদায় ভূষিত হবে তাও হয়তো কারো কল্পনাতে আসেনি কখনো। আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা সুমাইয়্যাকে দান করছে অফুরন্ত রিযিক। ঈমানের দীপ শিখার বলে কিয়ামত অবধি প্রতিটি শাহাদাতকামী মানুষের হৃদয়ের গভীরে সুমাইয়্যা (রাঃ) গেড়ে নিয়েছেন সুউচ্চ অবস্থান।
ইতিহাসের পাতায় হযরত সুমাইয়্যার পিতা খাবাতের নাম পাওয়া যায়। এছাড়া তার বংশ পরিচয়, মক্কায় আগমন ইত্যাকার বিষয়ে ঐতিহাসিকরা নিশ্চুপ। তবে এটা সবাই নিশ্চিত করেছেন যে, মক্কার আবু হুযায়ফা ইব্ন আল-মুগীরা আল-মাখযুমীর ক্রীতদাসী ছিলেন তিনি। মাসের পর মাস শেষ হয়। পশ্চিমাকাশের নতুন চাঁদ ক্ষয় হয়ে হয়ে আবার নতুন চাঁদ উঁকি দেয় আকাশ গগণে। কিন্তু সুমাইয়্যার জীবনাকাশ থেকে দাসত্বের বোঝা লাঘব হয় না। দাসত্বের শৃংখলে কাটতে থাকে তাঁর জীবন।
এদিকে হারানোর ভাইয়ের খোঁজে দু’ভাইকে নিয়ে ইয়ামেনের কাহতানি বংশের ইয়াসির মক্কাতে আসেন। শত চেষ্টাতেও মিললো না হারানো ভাইয়ের হদিশ। কিন্তু কা’বার স্নিগ্ধতা ইয়াসিরকে মুগ্ধতার আবেশে জড়িয়ে রাখলো। দেশের মায়া ত্যাগ করে স্থায়ীভাবে থেকে গেলেন মক্কায়। আবু হুযায়ফার হালিফ হলেন। তার ক্রীতদাসী সুমাইয়্যাকে বিবাহ করলেন। মনিব দয়াপরবশ হয়ে ইয়াসিরের সাথে সুমাইয়্যাকে বিয়ে দিলেন।
কিন্তু দাসত্বের হাত থেকে মুক্তি মেলেনি সুমাইয়্যার। আবু হুযায়ফার মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীদের কাছেও তিনি ক্রীতদাসী। তাইতো সীমাহীন মর্মজ্বালাতে দিন কাটে তার। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে... কখনো কি দাসত্বের অবসান হবে না? মুক্ত বিহঙ্গের মত মুক্ত জীবনের স্বাদ কি অধরাই থেকে যাবে সুমাইয়্যার জীবনে? কালের পরিক্রমায় ইয়াসিরের ঔরসে সুমাইয়্যার কোল আলো করে আসে দু’পুত্র সন্তান। আব্দুল্লাহ ও আম্মার।
মক্কায় গোপনে ইসলামের প্রচারকালে হযরত সুমাইয়্যা বার্ধক্যজনিত সময় পার করছিলেন। চোখের তারা সাদা হয়ে এলেও সুমাইয়্যার হৃদয় ছিল উন্মুক্ত। সত্যের আলো তার কাছে উদ্ভাসিত হতেই স্বামী ও পুত্রসহ  সত্যের আহ্বানে সাড়া দেন তিনি। বিন্দুমাত্রও দ্বিধা করেননি। কত কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে তাকে ও তার পরিবারকে সেদিকেও ভ্রুক্ষেপ করেননি। মক্কায় কোন আত্মীয়-পরিজন নেই, তদুপরি তিনি এক দাসী মাত্র। মক্কার কুরাইশ কাফেরদের মোকাবিলায় তাদের সহযোগিতা করার মত মক্কাতে কেউই নেই- এ অনুভূতিও তাকে সত্যের স্বীকৃতি দেয়া হতে বিরত রাখতে পারেনি।
প্রকাশ্যে পরিবারসহ ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলেন সুমাইয়্যা (রা)। যেন মৌচাকে ঢিল ছুঁড়লেন তিনি। সত্যান্ধ আবু জাহ্ল বাহিনীর প্রথম শিকার সুমাইয়্যা ও তার পরিবার। অত্যাচারের যত রকম ফের আছে সবটারই পরীক্ষা চলে আত্মীয় বান্ধবহীন অসহায় সুমাইয়্যা ও তার পরিবারের উপর। এমনকি নারী হিসাবে সুমাইয়্যাকে সামান্যতম অনুকম্পাও দেখায়নি আবু জাহল বাহিনী। বাতহা উপত্যাকার উত্তপ্ত বালুর মাঝে লোহার বর্ম পরিয়ে শুইয়ে থাকতে বাধ্য করা হতো তাদের। পিঠে আগুনের দাগ দেয়া, পানিতে ডুবিয়ে কষ্ট দেয়া ছিল নিত্যকার ঘটনা।
এমনি একদিন রাসূল (সাঃ) বাতহা উপত্যকা অতিক্রম ছিলেন। দেখলেন আবু জাহ্ল ও তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ইয়াসির, সুমাইয়্যা ও তাদের ছেলেদের উপর শক্তির মহড়া প্রদর্শন করছে। অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে কটূক্তি করছে- মুহম্মদের দীন কবুলের মজা বুঝে নে।
তাদের অসহায়ত্বে রাসূল (সাঃ) দারুণ ব্যথিত হলেন। কেঁদে উঠলো তার হৃদয়াত্মা। তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বললেন-“ হে ইয়াসির পরিবারবর্গ! ধৈর্য্য ধারণ কর! তোমাদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ রয়েছে।”
সারাটাদিন অত্যাচার চলে তাদের ওপর। সন্ধ্যায় সাময়িক মুক্তি পান তারা। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে আবু জাহলের অত্যাচারের মাত্রা বেড়েই চলেছে।
৬১৫ খ্রিস্টাব্দের এক সন্ধ্যা। সারা দিনের নির্যাতন থেকে মুক্তি পেয়ে বাড়ী ফিরেছেন সুমাইয়্যা। কিন্তু আবু জাহ্ল পিছু ছাড়েনি। অশালীন ভাষায় গালি দিতে দিতে আসছে। এমনকি আল্লাহ্ ও রাসূলুল্লাহকে নিয়েও কটূক্তি করতে থাকে নরাধম। অত্যাচারের জর্জরিত সুমাইয়্যা তীব্র কণ্ঠে প্রতিবাদ করেন আবু জাহলের। এতে চরম ক্ষিপ্ত হয়ে আবু জাহ্ল নিজের বর্র্শা ছুড়ে মারে সুমাইয়্যাকে লক্ষ্য করে। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে ঢলে পড়েন সুমাইয়্যা। মুহূর্তে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসে রক্ত। মৃত্যুর সন্ধিক্ষণেও সুমাইয়্যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবমাননাকে মেনে নেননি সুমাইয়্যা। হাসিমুখে জীবন বিলিয়ে দিয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তিনি। হিজরতের পূর্বে এ মর্মবিদারী ঘটনাটি ঘটেছিল। তাইতো সুমাইয়্যা হলেন ইসলামের প্রথম শহীদ।
সত্যিই বড়ই সৌভাগ্যবান সুমাইয়্যা (রাঃ)। যার মৃত্যুর  পর আল্লাহ্র রাসূল (সাঃ) দু’আ করেছিলেন- ‘হে আল্লাহ্! তুমি ইয়াসির পরিবারের কাউকে জাহান্নামের আগুনের শাস্তি দিওনা।’
এমনকি বদরের যুদ্ধে আবু জাহ্ল নিহত হলে আম্মারকে রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন- তোমার মায়ের হত্যাকারীকে আল্লাহ্ হত্যা করেছেন।
সত্যিই সুমাইয়্যা (রাঃ) আমাদের জন্য অনুপম এক উপমা। অসত্য আর অসুন্দরের সাথে আপোষ না করার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সত্যের পথের এক দীপ্তিময় নক্ষত্র সুমাইয়্যা (রাঃ)।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ