ঢাকা, মঙ্গলবার 4 October 2016 ১৯ আশ্বিন ১৪২৩, ২ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মুসলিম ইন আমেরিকা : সেরা ব্যক্তিত্ব - হামযা ইউসুফ

তিল ধারণের জায়গা নেই লেকচার হলটিতে, এমনকি লেকচার হলের বাইরেও উপচেপড়া ভিড়। স্টেজের উপর দাঁড়িয়ে একজন বক্তা স্পষ্ট আরবী এবং নির্ভুল কুরআনিক ভাষায় যে বক্তব্য রাখলেন, তা শুনে বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে যে তাঁর জন্ম মধ্যপ্রাচ্যের কোন দেশে নয়। তিনি হলেন শেখ হামযা ইউসুফ, জন্মসূত্রে আমেরিকান এবং কনভার্টেড মুসলিম। গোটি স্টাইলের দাড়ি ও স্পোর্টস জ্যাকেট পরিহিত হামযা ইউসুফ দেখতে অনেকটা আমেরিকান কলেজ প্রফেসরের মত। নিজে কোন কলেজের ফুলটাইম প্রফেসর না হলেও, জ্ঞান-গরিমায় তিনি একজন প্রফেসরের তুলনায় কোন অংশেই কম নন। তাঁর জ্ঞানের বিষয়: ইসলাম। শেখ হামযা ইউসুফ ইতিমধ্যেই আমেরিকায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো তাঁর জ্ঞানগর্ভ লেকচারসূহ এবং ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তাঁর তীব্র নিন্দা। কুরআন-হাদিসের উক্তি ছাড়াও তিনি সাধারণত তাঁর লেকচারগুলোতে St. Augustine, Patton, Eric Erikson, Jung, Solzhenitsyn, Auden, Robert Bly, Gen. William C. Westmoreland প্রমুখ এবং বাইবেলের রেফারেন্স দিয়ে থাকেন।
শেখ হামযা ইউসুফের জন্ম ১৯৬০ সালে আমেরিকার ওয়াশিংটন রাজ্যের ‘ওয়ালা ওয়ালা’ শহরে। তখন তাঁর নাম ছিল মার্ক হ্যানসন। তিনি জীবনের প্রথম অংশ কাটিয়েছেন উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় এবং তাঁর পরিবার ছিল খ্রীষ্টান (গ্রীক অর্থডক্স) ধর্মালম্বী। তাঁর বাবা ছিলেন একজন প্রফেসর ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেটারেন এবং মা একজন anti-war activist. ১৯৭৭ সালে হামযা ইউসুফ (তখন মার্ক হ্যানসন) গাড়ি দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে আহত হন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে এইরকম নিকটমৃত্যুর অভিজ্ঞতা তাঁকে পরকাল সম্পর্কে ভাবতে উৎসাহিত করে তুলে এবং তিনি মৃত্যু বিষয়ে বিভিন্ন মতবাদের দৃষ্টিভঙ্গী জানতে আগ্রহী হন। কুরআন শরীফে মৃত্যু ও পরকাল বিষয়ে বিষদ বিবরণ দেখে তিনি ইসলাম ধর্মের ব্যপারে আগ্রহী হয়ে উঠেন এবং পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন।
তিনি ইসলাম বিষয়ে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রথমে চার বছর কাটান মধ্যপ্রাচ্যে, এবং পরবর্তীতে পশ্চিম আফ্রিকার মৌরিতানিয়া, মেদিনা, আলজেরিয়া, ও মরক্কোতে। ইসলাম শিক্ষার উদ্দেশ্যে দেশের বাইরে এক দশকের বেশী সময় অতিবাহিত করে তিনি আমেরিকাতে ফিরে যান, এবং নার্সিং ও ধর্মবিদ্যায় ডিগ্রী অর্জন করেন যথাক্রমে Imperial Valley College I San José State University থেকে। ক্যালিফোর্নিয়ায় আবস্থিত যায়তূনা ইনস্টিটিউট এর একজন সহ-প্রতিষ্ঠাতা তিনি। যায়তূনা ইনস্টিটিউট এর প্রধান উদ্দেশ্য হল, ইসলামিক বিজ্ঞানচর্চার পুনর্জন্ম ও ঐতিহ্যবাহী ইসলামিক শিক্ষাপদ্ধতির সংরক্ষণ। বার্কলিতে বর্তমানে একটি ইসলামিক সেমিনারি (ধর্মীয় শিক্ষার স্কুল) প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। হামযা ইউসুফের মতে বর্তমান দুনিয়ায় মুসলিমদের দুর্দশার প্রধান কারণ হলো তাদের ধর্মীয় জ্ঞানের আভাব। হামযা ইউসুফ দুঃখ প্রকাশ করেন এই বলে যে, মুসলিম বিশ্বের বেশীর ভাগ সেমিনারিগুলো বর্তমানে বৌদ্ধিকভাবে মৃত (intellectually dead) এবং মুসলিম দেশের ভাল ভাল ছাত্রগুলো আজ ধর্মবিদ্যার পরিবর্তে ইঞ্জিনিয়ারিং এর মত প্রযুক্তিগত বিষয়ে শিক্ষাগ্রহণ করছে। (এর ফলাফল হিসেবে আজকে আমাদের মুসলিম বিশ্বে ভাল ভাল নেতার অভাব। এরই ফলস্বরূপ স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিরা নিজেদের নেতা বলে পরিচয় দিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ইসলামকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কারণ শূন্য স্থান কখন খালি থাকে না, ভাল নেতারা যদি শূন্য স্থান পূরণ না করে, তবে খারাপরাই তা পূরণ করতে হয়-আমার মতামত)।
ইসলাম বিষয়ক লেকচার দেয়ার জন্য হামযা ইউসুফকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করতে হয়। এছাড়াও তিনি বই লেখেন, আরবী পদ্য আনুবাদ করেন, সিডি ও টেলিভিশন শো রেকর্ড করেন, নিয়মিত সবাই, পাদ্রীদের সাথে আলোচনায় অংশ নেন, এবং সুইজারল্যন্ডের World Economic Forum প্রতিবছর যোগদান করেন। “রিহলা (ভ্রমণ) উইথ শেখ হামযা”- নামক একটি টিভি সিরিজের তিনটি সিজনে তিনি হোস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সিরিজটি আরবি স্যাটেলাইট চ্যানেল NBC-তে প্রচারিত হয়।
১১ই সেপ্টেম্বরের টুইন টাওয়ার হামলার মাত্র ৯ দিনের মাথায় আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ এক বিশেষ মিটিং ডাকেন বিভিন্ন ধর্মের ৬ জন ধর্মীয় নেতাকে নিয়ে এবং সেই মিটিংয়ে মুসলিমদের প্রতিনিধি হিসেবে হামযা ইউসুফ আমন্ত্রিত হন। তাঁর উপদেশ মোতাবেক জর্জ বুশ আফগানিস্তানে মার্কিন মিশনের নাম “Infinite Justice” থেকে বদলে “Operation Enduring Freedom” রাখা হয়, কারণ ইসলাম ধর্মঅনুযায়ী, “Infinite Justice” এর মালিক একমাত্র আল্লাহ্। তৎকালীন সময়ে তাঁকে আমেরিকান সংবাদ মাধ্যমগুলো প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা” হিসেবেও সংবধন করেছিল। কিন্তু দঃখজনকভাবে এর পরে হামযা ইউসুফের আর কোন উপদেশই জর্জ বুশ শুনেননি।
বর্তমানে শেখ হামযা ইউসুফ বসবাস করেন ক্যালিফোর্নিয়ার ড্যানভিলে তাঁর স্ত্রী ও ৫ সন্তানকে নিয়ে। তাঁর স্ত্রী লিলিয়ানা জন্ম একটি ক্যাথলিক-হিস্পানিক পরিবারে ও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন কলেজে হামযা ইউসুফের সাথে পরিচিত হবার পর।
তাঁর লেখা বইসমূহ:
* The State We Are In: Identity, Terror, and the Law of Jihad (contributing Author), 2006.
* Educating your Child in Modern Times
* Agenda To Change Our Condition (Co-authored with Imam Zaid Shakir)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ