ঢাকা, বুধবার 5 October 2016 ২০ আশ্বিন ১৪২৩, ৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

৩ মাসে রেমিট্যান্স কমেছে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা

স্টাফ রিপোর্টার : বিদেশে শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি ক্রমেই আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের ডামাডোল পেটানো হলেও রেমিট্যান্সের গতি প্রবাহের প্রভাব দেখে সরকারের দেয়া সব পরিসংখ্যানই এখন অসাড় মনে করা হচ্ছে। গেল কুরবানির ঈদ কেন্দ্রীয় রেমিট্যান্স এর যে হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশ করেছে তাতে গত বছরের তুলনায় গত তিন মাসেই রেমিট্যান্স কমেছে ৭০ কোটি ১৫ লাখ ডলার, টাকার অংকে যা দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যসহ মালয়েশিয়াতে দক্ষ অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর গতি এখন উল্টো পথে। অনেক চেষ্টা তদবির করেও মালয়েশিয়াতে শ্রমিক পাঠানোর কোন পথই খোলা যায়নি। অন্যদিকে সৌদি আরবেও শ্রমিক পাঠানোর পথ বন্ধ। ফলে এই দুটি দেশ থেকে প্রতিবছর যে পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে গেল দু’বছর যাবৎ সেটিও বন্ধ। সব মিলিয়ে প্রবাসী আয়ের খাতে সরকার যে সাফল্যের কথা প্রচার করছে তা গত তিন মাসের হিসেব মিথ্যা প্রমাণ করেছে। 

সূত্রমতে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এসেছিল ১৩৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার। আর চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে এসেছে ১০৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার; আগের বছরের তুলনায় যা ৩০ কোটি ৬০ লাখ ডলার কম। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরে দেশে রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমেছে প্রায় ২৩ শতাংশ। শুধু সেপ্টেম্বর নয়, একই চিত্র অর্থবছরের পুরো প্রথম প্রান্তিকের।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রমতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর) দেশে মোট ৩৯৩ কোটি ৩৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এলেও চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এসেছে ৩২৩ কোটি ২১ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ। অর্থের অংকে তা ৭০ কোটি ১৫ লাখ ডলার বা ৫ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা ( প্রতি ডলার ৭৭ টাকা ৯৫ পয়সা)।

এদিকে বৈধ পথে দেশে রেমিট্যান্স বা প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়াকে দেশের আর্থিক খাতের জন্য অশুভ ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্রমতে, সত্তরের দশক থেকে দেশের শ্রমশক্তির বড় একটি অংশ বিদেশমুখী হয়। নব্বইয়ের দশকে বিদেশে যাওয়ার পালে হাওয়া লাগে। এ সময়ে বিপুলসংখ্যক দক্ষ-অদক্ষ জনশক্তি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজের সন্ধানে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে দেশের অর্থনীতির দ্বিতীয় বৃহত্তর উৎস হিসেবে স্থান করে নেয় প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ।

রেমিট্যান্স প্রবাহের গতি প্রবাহের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রথমবারের মতো ধাক্কা খায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে। এর পর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আবারো কমে যায়। ২০০৯-১০ অর্থবছরে ১ হাজার ৯৮ কোটি ৭৪ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে আসে। ক্রমান্বয়ে বেড়ে এ অর্থের পরিমাণ ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৪৬ কোটি ১১ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ আগের অর্থবছরের তুলনায় ২৩ কোটি ২৮ লাখ ডলার কমে ১ হাজার ৪২২ কোটি ৮৩ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। এর পর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৫৩১ কোটি ৬৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে এলেও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা ১ হাজার ৪৯৩ কোটি ১১ লাখ ডলারে নেমে আসে। রেমিট্যান্সে নেতিবাচক প্রবাহ চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেও অব্যাহত থাকে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার। চলতি বছরের আগস্টে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দেশে রেমিট্যান্স আসে ৬৭ কোটি ১৬ লাখ ডলার। সেপ্টেম্বরে এসব দেশ থেকে রেমিট্যান্স প্রায় ১০ কোটি ডলার কমে ৫৭ কোটি ১৬ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে আশঙ্কাজনক হারে রেমিট্যান্স কমেছে দেশের প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে। আগস্টে সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স আসে ২৩ কোটি ৯ লাখ ডলার। অথচ সেপ্টেম্বরে এসেছে ১৭ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। এক মাসে সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স কমেছে ৫ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। একইভাবে আগস্টে আরব আমিরাত থেকে রেমিট্যান্স আসে ২০ কোটি ১২ লাখ ডলার। সেপ্টেম্বরে তা ১৬ কোটি ৯২ লাখ ডলারে নেমে আসে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বরাবরের মতো সেপ্টেম্বরেও সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে। দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী ব্যাংকটির মাধ্যমে আগস্টে দেশে এসেছে ২৫ কোটি ২৫ লাখ ডলার। রেমিট্যান্স আহরণে এর পরই রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক। আগস্টে ব্যাংকটির মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স আসে ১১ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ৯ কোটি ৩০ লাখ ও জনতা ব্যাংক ৮ কোটি ৩১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স আহরণ করেছে। দেশের বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক ৪ কোটি ৬৭ লাখ ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে ৪ কোটি ৮৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তফসিলভুক্ত ৫৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ৫০টির মাধ্যমে দেশে সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স এসেছে।

 রেমিট্যান্সের নেতিবাচক প্রবাহের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, গত বছরের জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের তুলনায় চলতি বছরের তিন মাসে রেমিট্যান্স কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, তেলের দাম কমে যাওয়া, যুক্তরাজ্যের মুদ্রার মান পড়ে যাওয়া, টাকার বিপরীতে বিদেশী মুদ্রার মান কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ দেশে কমেছে বলেই মনে হয়। এছাড়া রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়ে শ্রম বাজার সংকুচিত হওয়া ছাড়াও অন্য কোনো কারণ আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ