ঢাকা, বুধবার 5 October 2016 ২০ আশ্বিন ১৪২৩, ৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রতিষ্ঠার একশ’ বছর পর খুলনার বিএল কলেজে নির্মিত হচ্ছে মেডিকেল সেন্টার

খুলনা অফিস : প্রতিষ্ঠার একশ’ বছর পর খুলনার সরকারি বিএল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে নির্মিত হচ্ছে মেডিকেল সেন্টার। বিএল কলেজ অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের নিজস্ব অর্থায়নে এ সেন্টারের নির্মাণ কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে। তিন তলা বিশিষ্ট এ ভবনটির দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত নির্মাণ হচ্ছে অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের নিজস্ব অর্থায়নে। তৃতীয় তলায় হবে ছাত্রী কমনরুম এবং সেটি হবে কলেজের অর্থে। ভবনটির প্রথম তলায় মেডিকেল সেন্টার এবং দ্বিতীয় তলায় অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের অফিস করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিএল কলেজ অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের সূত্রটি জানায়, ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হবার পর ২০১৩ সালের ৫ মে নির্বাহী কমিটির সভায় এসোসিয়েশনের অর্থায়নে কলেজ ক্যাম্পাসে একটি মেডিকেল সেন্টার ও অ্যালামনাই অফিস নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। একই বছর ১১ জুন কলেজের অধ্যক্ষের মাধ্যমে এ জন্য জমি বরাদ্দের আবেদন জানিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়। কলেজ কর্তৃপক্ষ ওই আবেদন একই বছর ৮ জুলাই সাইট প্ল্যানসহ মন্ত্রণালয়ে পাঠান। ২০১৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অ্যালামনাই ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু ভবনের নকশা করার সময় কলেজ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এর তৃতীয় তলায় ছাত্রী কমনরুম করার অনুরোধ জানানো হলে সেটি গৃহীত হয় এবং পুরো নকশাটি সেভাবে করা হয়। গত বছর ১৭ এপ্রিল অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রফেসর হারুনুর রশীদ ‘বিএল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য মেডিকেল সেন্টার, অ্যালামনাই অফিস ও ছাত্রী কমনরুম (প্রস্তাবিত) ভবনের’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সেই থেকে ভবনটির কাজ এগিয়ে চলছে। 

সরেজমিনে কলেজে গিয়ে দেখা যায়, কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশের দ্বিতীয় গেট সংলগ্ন অভ্যন্তরীণ রাস্তার দক্ষিণ পাশে ব্যবহার অনুপযোগী পুরাতন গণিত ভবন ভেঙ্গে সেখানে ওই ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রথম তলার কাজ শেষ করে দ্বিতীয় তলার ছাদ ঢালাইয়ের প্রস্তুতি চলছে। দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত ভবনটি নির্মাণ এবং আসবাবপত্র ক্রয় বাবদ এক কোটি টাকা খরচ হচ্ছে উল্লেখ করে সূত্রটি জানিয়েছে, পুরো টাকাই অ্যালামনাই এসোসিয়েশন বহন করছে। এসোসিয়েশনের সভাপতি প্রফেসর হারুনুর রশীদ বলেন, দ্বিতল ভবনটি নির্মাণ শেষে এটি কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে। কলেজ কর্তৃপক্ষই মেডিকেল সেন্টারটি পরিচালনা করবে এবং তৃতীয় তলার নির্মাণ সম্পন্ন করে ছাত্রী কমনরুম হিসেবে ব্যবহার করা হবে। তিনি বলেন, ত্রিশ হাজারের উপরে ছাত্র-ছাত্রী সম্বলিত একটি কলেজে কোন মেডিকেল সেন্টার থাকবে না সেটি কল্পনা করাও অসম্ভব। এজন্য এসোসিয়েশন সদস্যদের দায়বদ্ধতা থেকেই এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে এর অনুমোদন দেয়ায় তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত কলেজের যেসব অধ্যক্ষ দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। 

কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ প্রফেসর গুলশান আরা বেগম বলেন, মেডিকেল সেন্টারের জন্য পৃথক কোন মেডিকেল অফিসারের পদ না থাকলেও আপাতত: নিজস্ব অর্থায়নে যে একজন চিকিৎসক রয়েছেন তাকে সেখানে বসিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হবে। পরবর্তীতে মেডিকেল সেন্টারটির পরিধি বৃদ্ধি করা যায় কি না সে ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিএল কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, ঐতিহ্যবাহী একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কলেজে আগেই একটি মেডিকেল সেন্টার গড়ে তোলা উচিত ছিল। কিন্তু একশ’ বছরেও এমন উদ্যোগ কেউ নেননি। অ্যালামনাই এসোসিয়েশন যে সূচনা করল এটিকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিতে কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এগিয়ে আসা উচিত। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করে মেডিকেল সেন্টারের জন্য জনবল নিয়োগের পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েরও সহযোগিতা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল সেন্টার গড়ে তোলার জন্য চেষ্টা করা উচিত বলেও শিক্ষার্থীরা জানান।

উল্লেখ্য, সরকারি বি এল কলেজ খুলনার অন্যতম প্রধান কলেজ। নগরীর দৌলতপুরে ভৈরব তীরে অবস্থিত এ কলেজটি ১৯০২ সালের জুলাই মাসে শিক্ষানুরাগী ব্রজলাল চক্রবর্তী (শাস্ত্রী) কলকাতার হিন্দু কলেজেরে আদলে দুই একর জায়গার উপর দৌলতপুরে হিন্দু একাডেমী নামে এটি প্রতিষ্ঠিত করেন। পরবর্তীতে হাজী মহম্মদ মহসীন ট্রাস্ট তার সৈয়দপুর এস্টেটের ৪০ একর জমি এ প্রতিষ্ঠানে দান করে এবং মাসিক ৫০ টাকা অনুদান বরাদ্দ করে। ১৯০২ সালের ২৭ জুলাই থেকে দুটি টিনশেড ঘরে প্রতিষ্ঠানটির ক্লাশ শুরু হলেও আজ এর ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা ত্রিশ হাজারেরও উপরে। যা অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েও নেই। 

১৯০৭ সালে এটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠাতা ব্রজলালের মৃত্যুর পর কলেজের নামকরণ করা হয় ব্রজলাল হিন্দু একাডেমি। পরবর্তীতে একাডেমিকে কলেজে উন্নীত করা হয় এবং নাম সংক্ষিপ্ত করে বি এল কলেজ রাখা হয়। কলেজটি পরে পর্যায়ক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায় অধিভুক্ত হয় এবং এরপর থেকে এখন পর্যন্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রয়েছে। ১৯৬৭ সালের ১ জুলাই এটি সরকারি কলেজে পরিণত হয়। ১৯৯৩ সালে এটিকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উন্নীত করা হয়।

কলেজটিতে ২১টি বিষয়ে অনার্স এবং ১৬টি বিষয়ে মাস্টার্স পর্যায়ে পাঠদান করা হয়। ১৯৯৬ সাল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পাঠদান বন্ধ হলেও ২০১০ সালে আবার এই স্তরে পাঠদান শুরু হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য দু’টি মহিলা হোস্টেলসহ মোট সাতটি হোস্টেল রয়েছে। বিভাগসমূহে আলাদা আলাদা সেমিনার লাইব্রেরী ছাড়াও খুবই সমৃদ্ধ একটি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার আছে। এ গ্রন্থাগারে পুস্তকের সংখা প্রায় ৫০ হাজার। বাংলা, ইংরেজি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, উদ্ভিদবিজ্ঞান, প্রাণিবিজ্ঞান এবং গণিত বিষয়ে অনার্স এবং মাস্টার্স কোর্স চালু আছে। এছাড়া সমাজকর্ম, মনোবিজ্ঞান, ভূগোল, পরিসংখ্যান, মার্কেটিং, ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিষয়ে অনার্স এবং ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ