ঢাকা, শনিবার 15 October 2016 ৩০ আশ্বিন ১৪২৩, ১৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পোল্ট্রি ও মাছের খাদ্যে বিষ!

সম্প্রতি একটি টিভি চ্যানেলে সম্প্রচারিত সচিত্র রিপোর্টে জানা যায় যে, ট্যানারি কারখানায় চামড়া প্রসেসিংয়ে যেসব রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহৃত হয় তার মধ্যে ক্রোনিয়াম উল্লেখযোগ্য। এটি মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। এই ক্রোনিয়ামসহ নানারকম রাসায়নিক মিশ্রিত ট্যানারির বর্জ্য বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে বিনষ্ট করে ফেলার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক খবর হচ্ছে, সেই ক্রোনিয়ামসহ আরও কয়েক প্রকার ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশ্রিত ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে পোল্ট্রিফিড তৈরি হচ্ছে। এ পোল্ট্রিফিড যেমন হাঁস-মুরগির খামারে ব্যবহৃত হচ্ছে, তেমনই তা মাছের খামারেও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে আলোচ্য টিভি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। পোল্ট্রি ও মাছের খামারে রাসায়নিক মিশ্রিত খাবার ব্যবহারের ফলে তা সহজেই মানবদেহে চলে যায়। এতে মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিশেষত কিডনি, লিভার, ফুসফুস, পেনক্রিয়াস প্রভৃতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মানুষ অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। অথচ ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশ্রিত ট্যানারির বর্জ্য নষ্ট না করে অর্থের বিনিময়ে পোল্ট্রি ও মাছের খামারিদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। এতে যে জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতির কারণ ঘটছে সেদিকে কারুরই কোনও খেয়াল নেই। ফলে মানুষের কিডনি, লিভার, ফুসফুসসহ নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অকালে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং মানুষের আয়ুষ্কাল কমে যাচ্ছে।
বাঙালির প্রিয় খাদ্যতালিকায় মাছের স্থান সবার ওপরে। মুরগি এবং হাঁসের স্থানও খুব নিচের দিকে নয়। কিন্তু মাছ ও মুরগিপ্রিয় বাঙালির জন্য ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে পোল্ট্রিফিড ও মাছের খাবার প্রস্তুতের এই খবর নিশ্চয়ই আনন্দদায়ক নয়। বরং উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার খবর বৈকি। একশ্রেণির ট্যানারি ব্যবসায়ী ক্রোনিয়ামসহ নানা রাসায়নিক মিশ্রিত ট্যানারি বর্জ্য যেমন পোল্ট্রি খামারি ও মৎস্য খামারিদের কাছে বিক্রি করছেন অবৈধভাবে, তেমনই পোল্ট্রি মালিক ও মৎস্য খামারিরাও স্বল্পমূল্যে বিষাক্ত ট্যানারিবর্জ্য কিনে হাঁস-মুরগি ও মাছকে খাওয়াচ্ছেন। এর ফলে যে জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে কিংবা ট্যানারিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক ক্রোনিয়াম মানবদেহের বারোটা বাজিয়ে ছাড়ছে, সেদিকে নজর দেয় কে? আমাদের খাদ্যদ্রব্য, চাল, ডাল, আটা, তেল ইত্যাদি মানসম্পন্ন কিনা অথবা এসবে কোনও রাসায়নিক মেশানোর ফলে তা মানহীন বা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে কিনা তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখ-ভালের জন্য একটি সরকারি বিভাগ রয়েছে। কিন্তু এ বিভাগের তেমন কোনও কর্মতৎপরতা চোখেই পড়ে না। মাঝে-মধ্যে র‌্যাব ও খাদ্য বিভাগের লোকজন বাজার-হাটে অভিযান পরিচালনা করলেও তা প্রায়শ জনগণের আইওয়াশের জন্যই মনে হয় আমাদের কাছে।
অথচ আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করার জন্য এ বিভাগটিকে জরুরি ভিত্তিতে শক্তিশালী করা দরকার। নিয়োগ দেয়া দরকার প্রয়োজনীয় লোকবলও। কিন্তু সেদিকে কারুর খেয়াল নেই বলা চলে। ফলে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা একদমই ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। সবখানে ভেজালের দৌরাত্ম্য। ব্যবসায়ীরা যে যেভাবে পারছেন খাদ্য বাজারজাত করে জনগণের অর্থ লুটে নিয়ে রাতারাতি বড়লোক হচ্ছেন। খাদ্য মানসম্পন্ন এবং ঝুঁকিমুক্ত কিনা সেদিকে তাদের নজর দেবার সময় নেই।
ভেজাল খাদ্য গ্রহণ করে আমাদের এ জাতির আগামী প্রজন্ম শুধু যে স্বাস্থ্যঝুঁকির শিকার হচ্ছে তাই না, তারা মেধাশূন্যতারও শিকার হচ্ছে মারাত্মকভাবে। ভেজাল ও মানহীন খাদ্যপণ্য একটি জাতিকে এভাবে পঙ্গু করতে করতে কোথায় নিয়ে যাবে তা কেবল ভবিতব্যই বলতে পারে। তাই খাদ্যপণ্যের ভেজাল ও মানহীনতা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেবার জন্য আহ্বান জনাই। ক্ষতিকর ক্রোনিয়াম মিশ্রিত ট্যানারি বর্জ্যে যারা পোল্ট্রি ও ফিশফুড প্রস্তুত করছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হোক অবিলম্বে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ