ঢাকা, শনিবার 15 October 2016 ৩০ আশ্বিন ১৪২৩, ১৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সুস্থ ও গণতান্ত্রিক সমাজ এবং উন্নয়ন সমৃদ্ধির জন্যে

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : আজ থেকে প্রায় চার দশক আগে এক মার্কিন উজির সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশকে উল্লেখ করেছিলেন ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে। সেই মার্কিন মুলুকের বর্তমান উজির সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে বলে গেলেন যে, ‘এ দেশের সংস্কৃতি সারা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সমৃদ্ধশালী, বর্ণিল এবং সৌন্দর্যমন্ডিত। এ দেশ সত্যিকার অর্থেই সোনার বাংলা।’ বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি জনবহুল দারিদ্র্যপীড়িত দেশ থেকে উন্নয়নের ধারায় চলতে শুরু করে মূলত আশির দশকে সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, নব্বইয়ের দশকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণ এবং গত শতাব্দীর শেষ দশকে স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের মধ্য দিয়ে। ফলে বাংলাদেশ জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যান্য দেশকে ছাড়িয়ে যায়। বাংলাদেশ এখন স্বল্প আয়ের দেশের কাতার ছেড়ে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন মূল্যায়ন, যা কমবেশি সারা বিশ্বের মূল্যায়নকে প্রতিফলিত করে।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্য সত্ত্বেও চলমান অভ্যন্তরীণ ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার বদলে হতাশার জন্ম দেয়। এর প্রধান কারণ হলো, জাতি হিসেবে বাংলাদেশীদের মধ্যে পারস্পরিক যে সম্পর্কজাল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক যোগসূত্র, তার ক্রমাগত বিভাজন। দল-মত-পথ নির্বিশেষে সবাই যেন একে অন্যের সহযোগীর বদলে হয়ে পড়ছে প্রতিদ্বন্দ্বী। শুধু তা-ই নয়, সেই প্রতিযোগিতায় যেকোনো উপায়ে জয়ী হওয়াই যেন একমাত্র লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। সামগ্রিক পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর রেষারেষির কারণে জাতীয় রাজনীতির অচলাবস্থা, অনিয়ম আর দুর্নীতির মহামারি থেকে শুরু করে ব্যক্তিপর্যায়ে আক্রোশ আর হানাহানি হয়ে পড়েছে আমাদের দৈনন্দিন যাপিত জীবনের বাস্তবতা। ফলে দেশের অর্থনীতিতে ক্রমাগত উন্নয়ন চলতে থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে তার প্রতিফলন ঘটছে না। মানুষ আর্থিক সচ্ছলতার মাধ্যমে তুলনামূলক সুখ-সমৃদ্ধির বদলে সম্মুখীন হচ্ছে ক্রমবর্ধমান অপরাধ, অনিশ্চয়তা আর অস্থিরতার। বাংলাদেশের সমাজ যে আজ এহেন সমস্যার মুখোমুখি, এর কারণ কী? এ অবস্থা থেকে উত্তরণই বা কোন পথে?
সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষায় সমাজের সমস্যাবলির কারণ নির্ণয় করতে হলে সমাজ ও ব্যক্তির মধ্যকার সম্পর্কের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে হয়। প্রখ্যাত ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ডুর্খেইম দেখিয়েছেন যে, সমাজ ও ব্যক্তির মধ্যকার যোগসূত্র হচ্ছে সলিডারিটি বা সংহতিবোধ। আমরা নিজ নিজ অবস্থানে থেকে সমাজে বসবাস করি, নিজ নিজ পেশায় জীবিকার অন্বেষণ করি। এসব করতে গিয়ে অবশ্যম্ভাবীভাবেই আমরা আরো অনেক ব্যক্তি তথা সমাজের সঙ্গে এক ধরনের অদৃশ্য বন্ধনে অর্থাৎ সংহতির জালে আবদ্ধ হই। এ কারণে সরাসরি ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির বিষয় না থাকলেও আমরা সমাজের অন্যদের জন্য চিন্তিত হই, তাদের দুঃখে পাশে দাঁড়াই, তাদের সুখে আনন্দিত হই, তাদের সঙ্গে একত্রে কাক্সিক্ষত ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখি। অর্থাৎ সংহতিবোধের কারণেই আমরা সামাজিক মেলামেশার মধ্যে জড়িয়ে পড়ি, সমাজবদ্ধ জীবনযাপন করি। ডুর্খেইম দেখিয়েছেন যে, এ সংহতিবোধ সমাজভেদে ভিন্ন ধরনের। তিনি একে প্রধানত দুই প্রকারে বিভক্ত করেছেন যান্ত্রিক (মেকানিক্যাল) সংহতি আর জৈবিক (অর্গানিক) সংহতি। প্রথমটির বৈশিষ্ট্য হলো, এর মধ্যে সব ব্যক্তি একই রকম চিন্তাধারা, বিশ্বাস, আচার-আচরণ ধারণ করে এবং এর ভিত্তিতে সামগ্রিকভাবে একটা ‘একক সত্তা’-বিশিষ্ট সমাজ গঠন করে। এ সমাজে সবাই রক্তের বা আত্মীয়তার সম্পর্কে সম্পর্কিত হয়। উপরন্তু জনসংখ্যা অল্প হওয়ায় বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে প্রায়ই মুখোমুখি দেখা-সাক্ষাৎ ঘটে। ফলে সমাজের একত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয়। একক সত্তার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে বলে এ সমাজ কোনো রূপ ভিন্নতাকে সহ্য করে না। কোনো ব্যক্তির মধ্যে সমাজের প্রচলিত বিশ্বাস বা আচারের অন্যথা দেখা গেলে তা পুরো সমাজের বিরুদ্ধে অপরাধ বলে গণ্য হয় এবং অপরাধীর চরম শাস্তি হয়। যেমন মৃত্যুদ-। ডুর্খেইম এ সংহতিকে প্রধানত অনগ্রসর গোত্রভিত্তিক, প্রাচীন, অনাধুনিক সমাজের ভিত্তি বলে চিহ্নিত করেছেন।
আরেক ধরনের সংহতি তথা জৈবিক সংহতির ভিত্তিতে যে সমাজ গড়ে ওঠে, তা ব্যক্তির মধ্যে চিন্তাধারায়, বিশ্বাসে, আচার-আচরণে ভিন্নতাকে প্রশ্রয় ও উৎসাহ দেয় এবং ভিন্নতার মধ্যে সমন্বয় করে। রক্তের সম্পর্ক বা আত্মীয়তার বন্ধন নয়, বরং পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে থেকেই এ সংহতির উদ্ভব হয়। আধুনিকায়নের ফলে শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধি পায়, অবকাঠামোর উন্নতি হয়। পাশাপাশি চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে জনসংখ্যা দ্রুত বেড়ে গিয়ে এমন অবস্থায় উপনীত হয় যে, সরাসরি সামাজিক সম্পর্ক ছাড়াই অনাত্মীয়, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে মিলেমিশে সমাজ গঠিত হয়। তাছাড়া আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ ব্যক্তিদের মধ্যেও সরাসরি দেখা-সাক্ষাৎ বাস্তবিক নানা কারণে অসম্ভব হয়ে ওঠে। সমাজ বিকাশের এ পর্যায়ে ব্যক্তির মাঝে পারিবারিক বা গোষ্ঠীগত সম্পর্কে ক্রমাগত দূরত্ব তৈরি হয়। কিন্তু একই সঙ্গে শ্রমবিভাজনের ক্রমবিস্তৃতির ফলে একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যেমন কৃষক শুধু ফসল ফলান কিন্তু অন্যান্য বস্তু এবং সেবার জন্য তাকে অন্যদের মুখাপেক্ষী হতে হয়। ব্যবসায়ী তার কাঁচামাল, পণ্য ইত্যাদি কেনার জন্য উৎপাদক এবং সেগুলো বিক্রয়ে ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এভাবে পারস্পরিক দূরত্ব ক্রমে বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তির পারস্পরিক নির্ভরশীলতাও বৃদ্ধি পায়। ফলে ভিন্ন ভিন্ন পেশায় নিয়োজিত আলাদা জীবনাচরণে অভ্যস্ত ব্যক্তিরা জৈবিক সংহতির মধ্য দিয়ে গঠন করে আধুনিক সমাজ। এ সমাজে ব্যক্তির চিন্তাধারায়, বিশ্বাসে, আচার-আচরণে ভিন্নতা সমাজের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এ সমাজেও অপরাধ সংঘটিত হতে পারে, যার জন্য ডুর্খেইম তিন ধরনের ক্রান্তিকালীন শ্রমবিভাজনকে দায়ী বলে চিহ্নিত করেছেন; যথা বিচ্ছিন্নতামূলক শ্রম বিভাগ, যেখানে ব্যক্তি জীবনের লক্ষ্যহীনতায় ভোগে; চাপিয়ে দেয়া শ্রম বিভাগ, যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা অনুপস্থিত এবং অব্যবস্থাপনাজনিত শ্রম বিভাগ, যেখানে শৃঙ্খলা অনুপস্থিত। এ সমাজে সংঘটিত অপরাধ সমাজের বিরুদ্ধে নয়, বরং আক্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে বলে গণ্য হয়। ফলে শাস্তির মাত্রাও হয় প্রথমোক্ত সমাজের তুলনায় স্বল্প, মূলত ক্ষতিপূরণমূলক। অপরাধ দমনের জন্য ভিন্নমত বা পথকে উচ্ছেদ না করে বরং আধুনিক সমাজ ক্রান্তিকালীন এসব ‘প্যাথলজিক্যাল’ শ্রম বিভাগকে যথাযথ সংস্কারের মাধ্যমে সমাজে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করে। যেমন ব্যক্তির দক্ষতা ও আকাক্সক্ষা অনুযায়ী মেধাভিত্তিক নিয়োগ, জোরজবরদস্তিমূলক সম্পর্কের বিলোপ, মতপ্রকাশ ও চর্চার স্বাধীনতা, সুশৃঙ্খল আমলাতন্ত্র ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি।
আজ থেকে তিন-চার দশক আগেও বাংলাদেশে কোনো পরিবার মা-বাবা, ভাইবোন, দাদা-দাদি, চাচা, মামা, তাদের সন্তান-সন্ততি সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে অন্ততপক্ষে কাছাকাছি বসবাস করত। প্রতিদিন না হলেও সপ্তাহান্তে কিংবা মাসে একবার নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ঘটত। আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ এবং আচার-আচরণগুলোও সেই বাস্তবতার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ ছিল। যেমন- কারো বিয়েতে বা মৃত্যুতে সম্পর্কিত সবার অংশগ্রহণ ছিল কাক্সিক্ষত। অন্যান্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা সামাজিক আচারের ক্ষেত্রেও একইভাবে সম্পর্কিত সব ব্যক্তির অংশগ্রহণ ছিল কাক্সিক্ষত এবং স্বাভাবিক হিসেবে স্বীকৃত। কেউ যদি এই সামগ্রিক মূল্যবোধ ও তৎসম্পর্কিত সামাজিক আচারের অন্যথা করত, তাকে অনিবার্যভাবে শাস্তি পেতে হতো নানা রকম অপমান, অপবাদ, এমনকি পরিবার ও উত্তরাধিকার থেকে ত্যাজ্য হওয়ার মধ্য দিয়ে। একটা বৃহত্তর পরিবার বা গোষ্ঠীর একজন সদস্য হিসেবে ব্যক্তির জীবন নিয়ন্ত্রিত হতো সামষ্টিক ঐক্যে, বিশ্বাসে, কর্মে। এ কারণেই ব্যক্তির স্বতন্ত্র আকাক্সক্ষা বা ইচ্ছা বরাবরই পরিবার, গোষ্ঠী বা সমাজের বৃহত্তর আকাক্সক্ষার কাছে উপেক্ষিত থেকে যেত। যেমন কেউ চাইলেই পরিবারের অমতে পছন্দের ব্যক্তিকে নিয়ে ঘর-সংসার বাঁধতে পারত না, পরিবার বা গোষ্ঠীপ্রধানের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে ভোট দিতে পারত না, পরিবারের শত্রু বলে চিহ্নিতদের সঙ্গে ওঠাবসা করতে পারত না। পরিবার বা গোষ্ঠীও এই সামগ্রিক ঐক্য ধরে রাখার নানা কৌশল প্রয়োগ করতে পারত। যেমন বিস্তৃত পারিবারিক এবং অন্যান্য সামাজিক সম্পর্কজালের মাধ্যমে পরিবার ও গোষ্ঠী ব্যক্তির কার্যকলাপ তদারক করতে সক্ষম হতো। ব্যক্তিও এই শাসন মেনে নিত। কারণ যাবতীয় চাহিদা পূরণের জন্য ব্যক্তি নিজ পরিবার বা গোষ্ঠীকেই পেত সবার অগ্রভাগে।
কিন্তু আমাদের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, আমরা কয়েকশ বা কয়েক হাজার ব্যক্তি নিয়ে গঠিত কোনো গোত্রভিত্তিক, প্রাচীন, অনাধুনিক সমাজে বাস করছি না। বরং আমরা বাস করছি ১৬ কোটি মানুষের বিশাল জনসমষ্টি নিয়ে গঠিত একটি উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে ৯৯ শতাংশ ব্যক্তিই সমাজের অন্যদের সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ নয়, যাদের মধ্যে মুখোমুখি সাক্ষাৎ ঘটে না, যারা নিজেদের ব্যবহারিক প্রয়োজনে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ছাড়া আর কোনোভাবে সম্পর্কিত নয়। এ কথা পুরো সমাজের ক্ষেত্রে যেমন সত্য?, তেমনি ব্যক্তিবিশেষের জন্যও সত্য। বর্তমান সমাজে ব্যক্তির সঙ্গে পরিবার, গোষ্ঠী, বৃহত্তর সমাজের সম্পর্ক ক্রমে কাছে থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। সামাজিক বাস্তবতার জন্যই এখন পরিবার বা গোষ্ঠী ব্যক্তির সব চাহিদা মেটাতে পারে না। নানা চাহিদা পূরণের জন্য ব্যক্তিকে অনাত্মীয়, অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক নানা সম্পর্কে জড়াতে হচ্ছে। পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে স্বেচ্ছায় অন্যত্র আবাস বেছে নিতে হচ্ছে। ফলে ব্যক্তি ক্রমাগত সামষ্টিক পরিবার বা গোষ্ঠীসত্তা থেকে মুক্ত হয়ে একক ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
সমাজ ও ব্যক্তির মধ্যকার সম্পর্কের এই নতুন রূপ নানা সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে দৃশ্যমান। যেমন যৌথ পরিবার থেকে একক পরিবারের প্রাধান্য; বিয়ে, গণভোট ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আচারে ক্রমাগতভাবে পরিবারের বা গোষ্ঠীর স্থলে ব্যক্তিগত মতামতের প্রাধান্য; পেশাগত বা অন্য কোনো বস্তুগত কারণে মা-বাবা, ভাইবোন ও আত্মীয়স্বজন ছেড়ে নতুন এলাকায় বসতি স্থাপন। এসব পরিবর্তনের সূচনায় প্রথাগত মূল্যবোধের সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত চিন্তাধারা, বিশ্বাস ও আচার-আচরণের সংঘর্ষ ছিল অনিবার্য। যেমন পরিবারের মতামত উপেক্ষা করে কেউ বিয়ে করলে তাকে প্রায়ই ত্যাজ্য করা হতো, পরিবার বা গোষ্ঠীর নেতার বিপক্ষে গিয়ে নিজের পছন্দমতো ভোট দিলে লাঞ্ছনা-গঞ্জনাসহ নানা শাস্তি ভোগ করতে হতো। কিন্তু বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় পরিবার বা গোষ্ঠী না পারছে ব্যক্তির মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে, না পারছে ব্যক্তির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে। অতএব, স্বাধীন ব্যক্তিসত্তার এ উন্মেষকে পরিবার ও সমাজ বাধ্য হয়েই মেনে নিচ্ছে। এখন ব্যক্তি স্বাধীনভাবে নিজ নিজ আকাক্সক্ষা, সামর্থ্য ও সুযোগমতো নিজ নিজ জীবন বেছে নিচ্ছে; স্বীয় চিন্তাধারা, বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছে। এটাই এখন স্বাভাবিক, বাস্তব।
কোনো ব্যক্তি এককভাবে বেঁচে থাকে না, তাকে সমাজের অন্য সবার সঙ্গে মিলেমিশেই বাঁচতে হয়। পুরনো সমাজ ব্যবস্থায় ব্যক্তির সঙ্গে অন্যদের এই অনিবার্য সম্পর্কটা ছিল রক্তের এবং আত্মীয়তার সম্পর্কভিত্তিক। বর্তমান সমাজে এ সম্পর্ক পারস্পরিক বস্তুগত নির্ভরশীলতাভিত্তিক। অর্থাৎ বর্তমান সমাজের ভিত্তিমূলে রয়েছে জৈবিক সংহতি, যা ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকৃতি দেয়, ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সংরক্ষণ করে, মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ থেকে ব্যক্তির বিচ্যুতিকে সমাজের বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে না দেখে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অন্যায় বলে সাব্যস্ত করে এবং নির্যাতনমূলক শাস্তির বদলে ক্ষতিপূরণ ও পরিশোধনমূলক শাস্তি বিধান করে।
বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে ঠিক এর উল্টোটি। এখানে সামাজিক বাস্তবতা হচ্ছে ব্যক্তি রক্তের বা আত্মীয়তার নয়, বরং বস্তুগত নানা চাহিদার মাধ্যমে একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ বর্তমান সমাজের ভিত্তিতে আছে জৈবিক সংহতি। অথচ এ সমাজে ব্যক্তিকে স্বাধীনভাবে তার চিন্তাধারা, বিশ্বাস, আচার-আচরণ চর্চা করতে না দিয়ে বরং নানা দল-মত-পক্ষে বিভক্ত করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ/বিপক্ষ, এ দল/সে দল, ধার্মিক/নাস্তিক, মৌলবাদী/ সংস্কৃতিমনা প্রভৃতি বিভাজনে বাংলাদেশের সমাজ ক্রমে শতধা বিভক্ত হয়ে চলেছে। এক দলের লোকজন অন্য দলের লোকজনকে যেকোনো উপায়ে পরাজিত করতে মরিয়া হয়ে উঠছে। প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা, মনুষ্যত্ববোধ কোনো কিছুই বিপক্ষ দলের ওপর দমন-পীড়নে বাধা হতে পারছে না। অর্থাৎ এ সমাজ ব্যক্তিকে সামগ্রিক শান্তি ও কল্যাণের লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
উন্নয়নের ধারায় চলমান বাংলাদেশ সমাজের এরূপ অরাজকতাকে বিগত কয়েক দশকে পেছনে ফেলে আসার কথা। আগের সমাজ ব্যবস্থায় পরিবার বা গোষ্ঠীর মতো এখনকার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে ব্যক্তির বস্তুগত চাহিদা পূরণও সম্ভব নয়।
তাই ব্যক্তির ওপর খবরদারি আরোপ করাও সম্ভব নয়। যে কারণে পরিবার বা গোষ্ঠী ব্যক্তির ওপর সামষ্টিক আধিপত্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে, দলগুলোও একইভাবে ব্যর্থ হতে বাধ্য। অর্থাৎ আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দলগুলো এবং তাদের সমর্থকরা সমাজকে যেদিকে নিতে চেষ্টা করছে, তার সঙ্গে তুলনা করা যায় বালুমাটির ভিত্তির ওপর আকাশচুম্বী অট্টালিকা বানানোর চেষ্টার, যেখানে ভিত্তি ও ইমারত দুটোই চরিত্রগতভাবে আলাদা। বিদ্যমান সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে আমাদের প্রচলিত বিভক্তিমূলক আচরণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
অতএব, এ ধারায় সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতির ব্যর্থতা অনিবার্য। আমরা বাস্তবে সেটাই দেখছি। নব্বইয়ে স্বৈরতন্ত্রের পতনের পর থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যাত্রা করলেও তা অগণতান্ত্রিক রাজনীতিচর্চার কারণে ক্রমাগতভাবে পারিবারিক ও দলীয় একনায়কতন্ত্রের দিকে ধাবিত হয়েছে। একইভাবে সমাজের নানা সংগঠনও ক্রমে বৃদ্ধি না পেয়ে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়ছে, সাংস্কৃতিক পরিম-লে চলছে বিভেদ আর দলাদলি। কিন্তু বর্তমান সমাজ নানা দল-উপদলে বিভক্তি নয়, বরং আলাদা আলাদা দল-মত নির্বিশেষে সবার মাঝে ঐক্যের ভিত্তিতে গণতন্ত্রের সঙ্গে চরিত্রগতভাবে সঙ্গতিপূর্ণ।
আমাদের সামাজিক বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। আমাদের জৈবিক সংহতি তথা ভিন্নতার মাঝে ঐক্যের ভিত্তিতে, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বীকৃতি দিয়ে সমাজ, সংস্কৃতি এবং রাজনীতিকে তথা পুরো সমাজের ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাতে হবে। যেকোনো দল বা মতকে ‘একমাত্র সঠিক’ ধরে নিয়ে অন্যদের দমন, নির্যাতন, নিপীড়ন চলতে থাকলে অবস্থা বর্তমানের থেকেও ক্রমাগত খারাপ হবে, হবেই।
সমাজ পুনর্গঠনের এ প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক চর্চায় স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণ আর বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত মানবাধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করা হবে প্রাথমিক লক্ষ্য। এগুলো অর্জন করতে পারলে সমাজও সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারায় প্রতিষ্ঠিত হবে সমাজবদলের স্বাভাবিক নিয়মে। ফলে সবাই মিলেমিশে সমৃদ্ধ ও শান্তিময় সমাজের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে সুন্দর জীবনের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ