ঢাকা, শনিবার 15 October 2016 ৩০ আশ্বিন ১৪২৩, ১৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে কিছু প্রস্তাব

সৈয়দ আলী হাকিম : ১৩ সেপ্টেম্বর ঈদ-উল আযহার দিন থেকে ২১ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ১২ দিনে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা দাড়িয়েছে ২১২টি। যাতে ২৬৫ জন মানুষের জীবন গেছে। আহত বা পঙ্গুত্ববরণ করেছেন প্রায় সহস্রাধিক মানুষ। গোটাবিশ্বে কোন দেশেই এত স্বল্প সময়ে এত সড়ক দুর্ঘটনার নজির এ পর্যন্ত জানা নেই। সড়ক দুর্ঘটনায় এ যেন এক বিশ্ব রেকর্ড। কেন এই আঁৎকে ওঠার মত সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা এটা সত্য যে সড়ক থাকলে, যান্ত্রিক যানবাহন থাকলে দুর্ঘটনা কিছু কিছু হতেই পারে, তাই বলে এই পরিমাণ কি?।
ক’দিন ধরে টিভির বিভিন্ন চ্যানেল এ বিষয়ে কয়েকটি টকশো হয়েছে। এ সব টকশোতে সংশিষ্ট প্রতিষ্ঠান সমূহের প্রতিনিধি পরিবহন সেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ দেশের বিভিন্ন স্তরের সুধী ও বিজ্ঞজন নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা শ্রদ্ধের অভিনেতা জনাব ইলিয়াস কাঞ্চন সাহেবসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। আলোচনার মাধ্যমে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বা কমিয়ে আনার যে সকল উপায় প্রস্তায়ী প্রস্তাবনা সমূহ সন্বয় করে এবং আমার ব্যক্তিয়াত কিছু ভাবনার সম্মিলনে সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে পেশ করছি।
সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত আইনের প্রয়োগ বিচার ব্যবস্থা গতিশীল করতে হবে। একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার কার্য সম্পন্ন করে রায় ঘোষণা ও কার্যকর করতে হবে।
প্রত্যেকটি মহাসড়কে কনক্রিট ডিভাইডার ব্যবস্থা স্থাপন করে রাস্তা গুলি আরও চওড়া করা দরকার। ডিভাইডারবিহীন কোন মহাসড়কে যাতে দ্বিমুখী যানবাহন চলাচল না করতে পারে সে ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ দেখাগেছে দেশের শতকরা নব্বইভাগ সড়ক দুর্ঘটনাই ঘটে থাকে দু’টি গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে।
ত্রিশ বছরের নীচে এবং কোন অবিবাহিত ব্যক্তিকে তিন চাকার অধীক যানবাহন চালনার লাইসেন্স দেয়া যাবে না। কারণ দেখা যায় ত্রিশ বছরের বেশী এবং বিবাহিত ব্যক্তিগণ সাধারণত ধীর-স্থির এবং বিবেচনা সম্পন্ন হয়ে থাকেন।
পঁচিশ বছরের নীচে কোন ব্যক্তি যন্ত্রচালিত দ্বিচক্রযান বা মোটরসাইকেল চালাতে পাবেন না। কারণ দেখা যায় অল্প বয়সী যুবক ছেলেরা সাধারণত দ্রুত গতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে থাকে।
 যন্ত্রচালিত যে কোন যান চালনায় ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে হলে কমপক্ষে এস,এস,সি পাস হতে হবে। কোন শহরের সড়কের দৈর্ঘ্য অনুপাতে ঐ শহরের ক্ষুদ্র ও ভারী যানবাহনের সংখ্যা নির্ধারিত থাকবে এবং এই হিসাবে গোটা দেশের ক্ষুদ্র ও ভারী যানবাহনের সংখ্যা নির্ধারিত থাকবে।
প্রত্যেক শ্রেণির যানবাহনের সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ যান্ত্রিকভাবেই করা থাকবে।
ছোট সড়ক থেকে মহাসড়কে ওঠার সংযোগস্থলে ছোট সড়কে স্পিড ক্রেকার অথবা দু’টি মহাসড়কের সংযোগ স্থলে স্পিড ব্রেকার রাখতে হবে।
চালক নিয়োগের সময় লিখিত ও মৌলিক পরীক্ষার পাশাপাশি মনস্তাত্তিক পরীক্ষা  মনস্তত্ত্ববিদদের দ্বারা করাতে হবে।
নেশা জাতীয় দ্রব্য গ্রহণকারী ব্যক্তি ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবেন না।
চলন্ত অবস্থায় কোন চালক মোবাইলে কথা বললে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। একটি সড়ক দুর্ঘটনার ফলে কোন ব্যক্তি নিহত হোক বা না হোক দোষী চালককে নির্ধারিত দণ্ড প্রদান ছাড়াও কমপক্ষে সাতদিন গাড়ি চালনা থেকে বিরত রাখতে হবে। এ ধরনের শাস্তি ব্যক্তিগত গাড়ির চালকের জন্য ও প্রযোজ্য হবে।
মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক সড়কসমূহ পরিদর্শনের ব্যবস্থা থাকবে।
কোন সড়কের দুরবস্থা জনিত কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে নির্দিষ্ট সড়কের ব্যবস্থাপকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
রাস্তার উপর কোন গাড়ি পাকিং করা যাবেনা নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া যাত্রী উঠানো নামানো যাবে না। সকল সড়ক অবৈধ দখল মুক্ত রাখতে হবে।
ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রতিদিন গাড়ির সাথে কেন্দ্রীয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সংযোগ রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রতিটি পরিবহন চালনার পূর্বে চালকের স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি টার্মিনালে একজন ডাক্তারসহ চিকিৎসক কেন্দ্র থাকবে।  প্রতিটি গাড়ি রাস্তায় নামার পূর্বে গাড়ির যান্ত্রিক পরীক্ষা  বা ফিটনেস করে নিতে হবে।
কোন গাড়ির জন্য কোন চালক নির্বাচিত হয়েছে, এবং তিনি ইতিপূর্বে কত ঘন্টা বিশ্রাম গ্রহণ করেছেন তা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষে জানাতে হবে।
কোন চালক এক নাগাড়ে ১০০ কিলোমিটার এর বেশি গাড়ি চালাতে পারবেন না, ১৫-২০ মিনিট বিরতি নিয়ে গাড়ি চালাবেন। ৩০০-৩৫০ কিলোমিটার চালনায় পর চালককে কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা বিশ্রাম নিতে হবে।
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত-আহতদের পরিবারকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্ষতিপূরণ এবং নিহতদের জন্য জন প্রতি এক লক্ষ এবং আহতদের জন্য জনপ্রতি সর্বোচ্চ পঞ্চাশ হাজার টাকা এক সপ্তাহের মধ্যে প্রদান করতে পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা ব্যক্তি বাধ্য থাকবে।
ক্ষতিপূরণ দিতে প্রতিদিন বিলম্বের জন্য পাঁচ হাজার টাকা করে বৃদ্ধি পাবে তাবে আহত ব্যক্তির ক্ষতি পূরণ মোবাইল কোর্টের বিচারকের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর এই টাকার পরিমাণ পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। উপরোক্ত প্রস্তাবনা ও আইনসমূহ প্রণয়ন ও প্রয়োগের মাধ্যমে আশা করি হয়তো দেশে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা যাবে। এ প্রেক্ষিতে জাতীয় পর্যায়ে সংশিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি ওয়ার্কসপ করে প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও  আইন প্রণয়নও করা যেতে পারে।
লেখক : সভাপতি, জাতীয় কবি নজরুল গবেষণা পরিষদ, খুলনা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ