ঢাকা, শনিবার 15 October 2016 ৩০ আশ্বিন ১৪২৩, ১৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

হাঙ্গেরী বিজয় তুরস্কের ইতিহাসে স্মরণীয় ঘটনা

এম এস শহিদ : রোডস বিজয়ের পর সুলতান সোলায়মান দু’বছর সাম্রাজ্য পূণর্গঠন ও সামরিক বাহিনী সংস্কারে অতিবাহিত করেন। সুলতানের এ যুদ্ধ বিরতিতে দুর্ধর্ষ জেনিসারি বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। কেননা তারা সামরিক ঘাঁটিতে একঘেয়ে অবসর যাপনে মোটেও অভ্যস্ত ছিলেন না। যুদ্ধ ও লুণ্ঠনের প্রতিই তাদের অদম্য স্পৃহা ছিল। সুতারাং তারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং প্রধানমন্ত্রী ইবরাহিম পাশাসহ বিভিন্ন উচ্চপদস্থ রাজকর্ম-কর্তাদের বাড়িতে ব্যাপক লুণ্ঠন চালায়। কঠোর হস্তে এ বিদ্রোহ নির্মূল করা হয় এবং বিদ্রোহীদের নেতা জেনেসারি বাহিনীর প্রধানসহ কতিপর দোষী সামারিক কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এ ঘটনার পর সুলতান সোলায়মান নিশ্চুপ থাকা নিরাপদ মনে করলেন না।
সুতারাং তুর্কী সৈন্যবাহিনীর অদম্য যুদ্ধস্পৃহা, তাঁর ব্যাক্তিগত বিজয়লিপ্সা এবং একইসাথে ইউরোপীয় নরপতিগণের অন্তকলহ সুলতান সোলায়মানকে পুনরায় যুদ্ধের প্রতি উৎসাহিত করে তোলে। এ সময় হাঙ্গেরীর রাজা দ্বিতীয় লুই বেলগ্রেড ব্যর্থতার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তুর্কীদের ওপর বর্বর অত্যাচার শুরু করে। সুতারাং সুলতান সোলায়মান তুর্কীদের রক্ষার জন্য হাঙ্গেরীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর জন্য মোক্ষম সুযোগ এসে গেল। ১৫২৫ খ্রিস্টাব্দে পাভিয়ার যুদ্ধে ফ্রান্সের সম্রাট প্রথম ফ্রান্সিস অষ্ট্রীয়ার সম্রাট পঞ্চম চার্লসের কাছে পরাজিত হন।
তাই সম্রাট ফ্রান্সিস তার শত্রু পঞ্চম চার্লসকে জব্দ করার জন্য সুলতান সোলায়মনকে প্ররোচিত করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, অষ্ট্রীয়র সম্রাট পঞ্চম চার্লস হাঙ্গেরীর রাজা দ্বিতীয় লুই এর আত্মীয় ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ইবরাহিম পাশা এ সুযোগ হাতছাড়া না করার জন্য সুলতানকে উৎসাহ দিলেন।
সুলতান সোলায়মান প্রধানমন্ত্রীর উৎসাহ ও সম্রাট ফ্রান্সিসের পরামর্শ অনুযায়ী ১৫২৬ খৃস্টাব্দের এপ্রিল মাসে এক লক্ষ সৈন্য ও তিনশত কামানের সমন্বয়ে গঠিত মুসজ্জিত মুসলিম বাহিনী নিয়ে হাঙ্গেরীর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করলেন। সুলতানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপতি ইবরাহিম পাশা পথিমধ্যে খৃস্টানদের অগ্রবর্তী বাহিনীকে পরাজিত ও বিধ্বস্ত করে পেটেরওয়ারদিন অধিকার করলেন এবং কারাভা নদী অতিক্রম করে মোহাক নামক স্থানে হাঙ্গেরীর সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হলেন।
১৫২৬ খৃস্টাব্দের ২৬ আগস্ট মোহাকের প্রান্তরে সুলতান সোলায়মানের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনীর সাথে হাঙ্গেরীর রাজা দ্বিতীয় লুই এর নেতৃত্বাধীন খৃস্টান বাহিনীর প্রচণ্ড লড়াই হয়। এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী খৃস্টান বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। এ যুদ্ধে হাঙ্গেরী রাজা দ্বিতীয় লুই নিহত হন। এ ছাড়া আটজন বিশপ, বহুসংখ্যক অভিজাত ও বিশ হাজার সৈন্য মুসলমানদের হাতে প্রাণ হারায়। এ যুদ্ধে জয়লাভের ফলে হাঙ্গেরীর রাজধানী বুদাপেষ্ট সুলতান সোলায়মানের অধিকারে আসল। তুর্কী মসুলিম বাহিনীর হাতে সমগ্র হাঙ্গেরী লুণ্ঠিত হয় এবং প্রায় এক লক্ষ হাঙ্গেরীয়ানকে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়।
মোহাক যুদ্ধে জয়লাভের পর প্রায় একশত চল্লিশ বছর পর্যন্ত হাঙ্গেরী তুরস্ক সাম্রাজ্যের প্রদেশে পরিণত হয়েছিল। নানা কারণে সুলাতান সোলায়মানের পক্ষে হাঙ্গেরীতে দীর্ঘদিন অবস্থান করা সম্ভব  হয়নি। তাই সুলতান স্বীয় প্রাধান্য অক্ষুন্ন রাখার জন্য তাঁর অনুগত ট্রানসিলভানিয়ার ডিউটকাউন্ট জেপোলিয়াকে হাঙ্গেরীর শাসনক্ষমতা অর্পণ করেন। অতঃপর তিনি রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে ফিরে আসেন।
 ফ্রান্সের সম্রাট জেপোলিয়র প্রতি তার সমর্থন ব্যক্ত করলেন এবং উভয় পরপতিই হাফ্সবার্গ বিরোধী নীতি মেনে চলার অঙ্গীকার করলেন। কিন্তু সুলতানের এই ব্যবস্থা হাঙ্গেরীয়গণ মেনে নিতে পারলো না। ফলে হাঙ্গেরী গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হলো। পশ্চিম হাঙ্গেরীর প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ পেসবার্গে এক সভায় মিলিত হলো এবং তারা অষ্ট্রীয়ার সম্রাট পঞ্চম চার্লসের ভ্রাতা আর্কডিউক ফাডিনান্ডকে তাদের রাজা বলে ঘোষণা করলো। ফার্ডিনান্ড পরলোকগত রাজা লুই এর আত্মীয়তার সূত্রে নিজেকে হাঙ্গেরীর সিংহাসনে উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করলেন। তিনি হাঙ্গেরীয়দের উত্তেজিত করে সুলতান সোলায়মানের নিযুক্ত শাসনকর্তা জেপোলিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান করলেন।
১৫২৭ খৃস্টব্দে টোকাই এর যুদ্ধে ফার্ডিনান্ড জেপোলিয়াকে পরাজিত ও বিতাড়িত করে হাঙ্গেরীর সিংহাসন অধিকার করলেন। পরাজিত জেপোলিয়া তার শশুর পোল্যান্ডের রাজা সিগিসমন্ডের আশ্রয় গ্রহণ করলেন এবং শ্বশুর ও সুলতান সোলায়মানের নিকট সাহায্যের আবেদন জানান। হাঙ্গেরীর ঘটনা তুর্কী সাম্রাজ্যে প্রবল ক্ষোভের সৃষ্টি করলো। তুর্কিদের আক্রমণের ভয়ে ধুর্ত ফাডিনান্ড সুলতানের অধীনতা স্বীকার করে নিয়মিত কর দিতে অঙ্গীকার করলেন। কিন্তু সুলতান এ প্রস্তাবে সন্তুষ্ট হলেন না। কারণ সুলতানের মনোনীত রাজাকে বিতাড়িত করে ফার্ডিনান্ড প্রকারান্তরে সুলতানকেই হেয় প্রতিপন্ন ও তাঁর কর্তৃত্বকে অস্বীকার করলেন। সুতারাং সুলতান জেপোলিয়ার অনুরোধে সাড়া দিয়ে তাকে সহায়তা করার জন্য পুনরায় হাঙ্গেরীতে সমরাভিযানের সিদ্ধান্ত নিলেন। ঠিক এ সময় ফ্রান্সের রাজা অষ্ট্রীয়ার বিরুদ্ধে এক যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সুলতানের সাহায্য প্রার্থনা করলেন। সুলতান সোলায়মান আর বিলম্ব না করে ১৫২৯ খৃস্টাব্দে প্রায় আড়াই লক্ষ সৈন্য ও সাত শতাধিক কামানধারী সুসজ্জিত মুসলিম বাহিনী নিয়ে জেপোলিয়ার সাহায্যে অগ্রসর হলেন এবং হাঙ্গেরী আক্রমণ করলেন।
সুলতান সোলায়মানের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে ফার্ডিনান্ডের নেতৃত্বাধীন খৃস্টান বাহিনী পরাজিত ও বিধ্বস্ত হয় এবং সমগ্র হাঙ্গেরী সুলতান সোলায়মানের পদানত হলো। ফার্ডিনান্ড যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আত্মরক্ষা করলেন। সুলতান সোলায়মান পুনরায় তাঁর অনুগত কাউন্ট জেপোলিয়াকে হাঙ্গেরীর সিংহাসনে বসালেন। অতঃপর সুলতান সোলায়মান তাঁর দুর্ধর্ষ মুসলিম বাহিনী নিয়ে ক্ষীপ্রগতিতে অষ্ট্রীয়ার রাজধানী ভিয়েনার দিকে ধাবিত হলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ