ঢাকা, মঙ্গলবার 18 September 2018, ৩ আশ্বিন ১৪২৫, ৭ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে চীনের নেতৃত্বাধীন এআইআই ব্যাংক

অনলাইন ডেস্ক: বিশ্ব ব্যাংকসহ অন্য দাতা সংস্থাগুলো বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ঋণ সহায়তা কমিয়ে দিচ্ছে। সেক্ষত্রে বিকল্প হতে পারে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকে (এআইআইবি)। চীনের প্রস্তাবিত এবং নেতৃত্বাধীন এই ব্যাংকটির অন্যতম উদ্যোক্তা বাংলাদেশ।সে কারণে বাংলাদেশ এই ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ও বেশি পরিমাণে ঋণ পেতে পারে বলেও মনে করেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্ব ও এশিয়ার আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও এ দেশের অবস্থান জানান দেয়ার সুযোগ করে দিয়েছে এআইআইবি। সংস্থাটিকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা এডিবির সমমানের এবং সমপর্যায়ের একটি ব্যাংক বলে দাবি করছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখত বলেন, নতুন প্রতিষ্ঠিত এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক একটি আঞ্চলিক ব্যাংক। এ হিসেবে নিজেদের এলাকার ব্যাংক বলে বাংলাদেশ বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। তাছাড়া বাংলাদেশ এ ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের একজন, তাতে দাবি আরো বেশি হবে। রাখতে পারবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নীতিনির্ধারণী ক্ষমতাও।

তার মতে, বর্তমান ঋণদানকারী ব্যাংকগুলো যথা বিশ্বব্যাংক, ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ঋণের জন্য অনেক প্রতিযোগী দেশ তৈরি হয়েছে। অনেক দেশ এসব ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে চেষ্টা করছে। নতুন করে আমেরিকার দেশগুলোর ঋণ নিতে আগ্রহী হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সারা বিশ্বের কথা বিবেচনায় নিয়ে সংস্থাটির ঋণ বিতরণ করতে হয়। সে হিসেবে বাংলাদেশ কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হচ্ছে। এদিক দিয়ে এআইআইবিতে প্রতিযোগী কম থাকবে। কেননা এর অর্থ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর জন্যই ব্যবহৃত হবে। তাই বাংলাদেশও কম প্রতিযোগিতায় পড়বে। তবে এআইআইবিতে ঋণের সুদ কিছুটা বেশি হতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও বৈশ্বিক উন্নয়নের জন্য কাজ করছে বলে তাদের সুদের হার অনেক কম থাকে। তবে নিজেরা উদ্যোক্তা বলে সহজ শর্তে ও বেশি পরিমাণে ঋণ পেতে পারে। এআইআইবির উদ্যোক্তাদের অন্য অনেক উন্নত দেশ থাকলেও বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বেশি প্রায়োরিটি পাবে।

আরেক অর্থনীতিবিদ সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, রিজিওনাল ব্যাংক হিসেবে এআইআইবি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আবার বাংলাদেশে উন্নতির ধারা অব্যাহত রাখতে হলে বিপুল বিনিয়োগ দরকার। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, গ্যাস, রাস্তাঘাট, অবকাঠামো ইত্যাদির উন্নয়নে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন। নিজেদের অভ্যন্তরীণ সম্পদ দিয়ে তাতে উন্নতি করা সম্ভব হবে না। তাছাড়া বিদ্যমান দাতা সংস্থা বিশ্ব ব্যাংকসহ অন্যরা এখন অবকাঠামো উন্নয়নে ঋণ কমিয়ে দিচ্ছে। সেক্ষত্রে বিকল্প হতে পারে এশিয়ান ইনফ্রাস্টাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক। নিজেদের ব্যাংক বলে বাংলাদেশ সহজে ঋণের জন্য দাবি করতে পারবে।

তিনি বলেন, এখানে বাংলাদেশকে সতর্ক হয়ে চলতে হবে। কোনো অবস্থাতেই বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবিকে বাদ দেয়া যাবে না। তারা যেন কোনোভাবেই মনে না করতে পারে যে, তাদের বাদ দিয়ে বাংলাদেশ এআইআইবি-মুখী হচ্ছে। বাংলাদেশের ব্যাপারে এ বড় দাতা সংস্থাগুলো যেন কোনো প্রকার বিরূপ আচরণ করতে না পারে, তার প্রচেষ্টা সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে।

তবে এক্ষেত্রে কিছু সমস্যাও থাকতে পারে বলে মনে করেন সাবেক এ বাংলাদেশ ব্যাংকপ্রধান। তার মতে বিশ্বব্যাংকসহ বিদ্যমান দাতাদের কাছ থেকে কম সুদে ঋণ পাওয়া যায়। এমনকি ৩০-৫০ বছরের গ্রেস পিরিয়ড (এ সময়ে ঋণের কিস্তি শোধ করতে হয় না) সুবিধা পাওয়া যায়। এআইআইবির ক্ষেত্রে তেমন সুবিধা নাও থাকতে পারে। আবার এ ব্যাংকে আঞ্চলিক বড় দেশগুলোর অংশগ্রহণ বেশি, তাই ঋণের ক্ষেত্রে তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট শর্তও যোগ করতে পারে। সেসব বিষয়ে বাংলাদেশকে সচেতনভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশ হতে হলে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ, সড়ক, বন্দর, টেলিযোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এজন্য প্রতি বছর ১ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ হওয়া উচিত। বর্তমানে বিনিয়োগ হচ্ছে ৪০০ কোটি ডলার।

অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ দেশের বিনিয়োগ ঘাটতি পূরণে এআইআইবি বিকল্প হিসেবে ধরা দেবে। বাংলাদেশ ব্যাংকটির উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের এক দেশ। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সামনে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) মতো বিশ্বমাপের ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবির পাশাপাশি এআইআইবি থেকেও ঋণ নেয়ার সুযোগ হবে।

তারা মনে করেন, বাংলাদেশের মতো উঠতি রাষ্ট্রের অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। আর যে ব্যাংকে (এআইআইবি) বাংলাদেশ নিজেই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে থাকবে, সে ব্যাংক থেকে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ঋণ প্রাপ্তি সহজ হবে। তাছাড়া প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ এআইআইবির নীতিনির্ধারণেও ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে, যা বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং আইএমএফের মতো সংস্থায় কল্পনাও করা সম্ভব নয়।

এশিয়া অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১৩ সালে এশিয়াপ্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন সামিটে (এপ্যাক) এআইআইবির প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয় চীন। গত বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশসহ ২১টি দেশ এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একমত হয় এবং সবাই একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। এ ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধনের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ১ মিলিয়ন শেয়ারে বিভক্ত এবং প্রতিটি শেয়ারের মূল্য এক লাখ ডলার। অনুমোদিত ১০০ বিলিয়ন ডলার মূলধনের মধ্যে ২০ শতাংশ সদস্যদের এখন পরিশোধ করতে হবে। কোন সদস্য কত শতাংশ শোধ করবে এবং এক মিলিয়ন শেয়ারের কতটুকু পাবে সেটি নির্ভর করবে সদস্যের মোট দেশজ উৎপাদনের [জিডিপি] ওপর। এ ব্যাংকে চীনের ৩০.৩৪ শতাংশ অংশীদারিত্ব থাকবে কিন্তু ভোটিং অধিকার থাকবে ২৬.০৬ শতাংশ। ভারত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ নিয়ে এর দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশীদার হবে এবং তৃতীয় ও চতুর্থ হবে রাশিয়া ও জার্মানি।

তবে আশার কথা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান একে প্রত্যাখ্যান করলেও পশ্চিমা বিশ্বের দেশ ব্রিটেন, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, ইতালি, রাশিয়া, ডেনমার্ক, দক্ষিণ কোরিয়া এ ব্যাংকে যোগ দিয়েছে।

ডি.স/আ.হু

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ